ইবনে তাইমিয়ার পর ওহাবি মতাদর্শ ও মো. ইবনে আব্দুল ওয়াহাব

ইবনে তাইমিয়ার মৃত্যুর পর তাঁর চিন্তাদর্শেরও প্রায় মৃত্যু ঘটে গিয়েছিল। খুব কম লোকই তাঁর চিন্তাদর্শের অনুসারী ছিল। কিন্তু পাঁচ শতাব্দি পর ‘মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজদি’নামের এক লোক ইবনে তাইমিয়ার আকায়েদের ভিত্তিতে নতুন করে একটি ফের্কার জন্ম দেন। তাঁর ওই ফের্কার নাম হচ্ছে ‘ওহাবিয়্যাত’ বা ওহাবি মতবাদ। এই মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওহাব হিজরি ১১১৫ সালে সৌদি অরবে জন্মগ্রহণ করেন। তরুণ বয়সেই তিনি ইবনে তাইমিয়ার চিন্তাধারায় প্রভাবিত ছিলেন। তিনি এমন একটি মতবাদের প্রবর্তন করেন যাতে ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষাগুলোর সাথে যার ব্যাপক মতপার্থক্য ছিলো। তবে তিনি তাঁর আকিদা বিশ্বাসের বিস্তারের ক্ষেত্রে নজদের শাসক ‘মুহাম্মাদ বিন সাউদে’র শক্তি ও ক্ষমতাকে ব্যাপকভাবে কাজে লাগিয়েছেন। আব্দুল ওহাব পুনরায় সালাফি মতবাদের প্রচার ঘটান। তিনি মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে পবিত্র কেন্দ্র অর্থাৎ মক্কা এবং মদিনায় তাঁর এই মতবাদ পেশ করেন এবং ভয়াবহ সংঘর্ষের মাধ্যমে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন।

 

মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওহাবের পিতা তার এই সন্তানের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে শৈশব থেকেই উদ্বিগ্ন ছিলেন, কেননা তার ছেলের কথা-বার্তায় আচার-আচরণে গোমরাহি বা বিচ্যুতির লক্ষণ ছিলো স্পষ্ট। আব্দুল ওহাব মুসলমানদের বেশিরভাগ আকিদা বিশ্বাসকেই ঠাট্টা মশকরা করে উড়িয়ে দিতো। মদিনায় পড়ালেখা করার সময় প্রায়ই এমন কিছু বিষয় তুলে ধরতো নির্দিষ্ট একটি আকিদার সাথে যা ছিল সামঞ্জস্যপূর্ণ। শিক্ষকরাও তার ভবিষ্যৎ বিচ্যুতির ব্যাপারে পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওহাব মদিনাতেও ইসলামের নবির শরণাপন্ন হওয়া বা তাঁর রওজা যিয়ারত করতে আসা মানুষের সমালোচনা করতেন। জানা যায়, শৈশবে তিনি মিথ্যা নবুয়্যতের দাবিদার যেমন মুসাইলামাতুল কাজ্জাব কিংবা সাজ্জাদ, আসওয়াদ আনাসির মতো ব্যক্তিদের জীবনী পড়তেন এবং এ ব্যাপারে ভীষণ আকর্ষণ বোধ করতেন। তবে তাঁর আকিদা বিশ্বাসের ওপর সরাসরি ছাপ পড়েছে ইবনে তাইমিয়া এবং তাঁর ছাত্র ইবনে কাইয়্যেম জুযির মতো লোকদের।

মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওহাব যখন তার আকিদার কারণে মদিনার লোকজনের বিরোধিতার সম্মুখিন হলেন তখন তিনি মদিনা ছেড়ে চলে গেলেন নাজদে। তারপর কিছুদিন ছিলেন বসরায়। বসরায় যখন ছিলেন তখন তিনি তাঁর আকিদা নিয়ে আবারো বাড়াবাড়ি করেন এবং বসরা থেকেও বিতাড়িত হন। ওহাব ধর্মের সরল সঠিক পথ থেকে এতো বেশি বিচ্যুত হন যে আপামর মুসলমানকে কাফের-মুশরিক বলে বেড়াতে শুরু করেন এমনকি মুসলমানদের হত্যা করাকে ওয়াজিব বলেও মন্তব্য করেন। আব্দুল ওহাব তার অসুস্থ চিন্তাধারার ভিত্তিতে এমনকি মক্কা-মদিনার মতো ইসলামের পবিত্রতম ভূখণ্ডগুলোকে পর্যন্ত ‘দারুল কুফ্‌র’ এবং ‘দারুল হার্‌ব’ বলে অভিহিত করেন। পবিত্র এই স্থাপনাগুলোকে দখল করা এবং ধ্বংস করাকে তার অনুসারীদের ওপর ওয়াজিব বলে ঘোষণা করেন। সহিংসতা ছিল আব্দুল ওহাব এবং তার অনুসারীদের আচরণগত প্রধান বৈশিষ্ট্য।

আব্দুল ওহাবের ভ্রান্ত আকিদার বিরুদ্ধে মুসলিম জনগোষ্ঠি তো বটেই, এমনকি তার পিতা এবং আপন ভাইও ঐ মতবাদ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার ভাই শায়খ সোলাইমানের জীবনকথায় এসেছে আব্দুল ওহাবের পিতা জীবিতকালে ছেলের এ ধরনের আকিদা প্রচারের ব্যাপারে বাধা দিয়েছিলেন। তবে হিজরি ১১৫৩ সালে পিতার মৃত্যুর পর অনগ্রসর কিছু লোকের মাঝে তার আকিদা প্রচারের সুযোগ পায়। মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওহাবের আকিদার বিষয়টি স্পষ্ট হবার পর তার বিরুদ্ধে বড়ো বড়ো বহু আলেম উঠে আসেন। স্বয়ং তার ভাই শায়খ সোলায়মান-যিনি ছিলেন একজন হাম্বলি আলেম-তিনিও ওহাবের আকিদা প্রত্যাখ্যান করে একটি বই লেখেন। ইমানী দায়িত্বের অংশ হিসেবে ওহাবকে কোরআন হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে বহু চিঠিও লেখেন তিনি এবং ইসলামের ভেতর এসব বেদায়াত প্রবেশ করানো থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। একটি পত্রে তিনি সূরা নিসা’র ১১৫ নম্বর আয়াত উদ্ধৃত করেন যেখানে লেখা রয়েছেঃ ‘সত্য সুস্পষ্ট হবার পর যে কেউ নবীজীর বিরোধিতা করে এবং মুমিনদের পথ ব্যতীত অন্য কোনো পথের অনুসরণ করে, আমরা তাকে সেই বাতিল পথেই চলতে দেবো এবং দোযখে প্রবেশ করাবো, সেই স্থানটি খুবই বাজে।’

তারপরও আব্দুল ওহাব তার জাহেলি বিশ্বাসের ওপর স্থির থাকে এবং যে-ই তার দৃষ্টিভঙ্গির বিরোধিতা করে তাকেই কাফের বলে সাব্যস্ত করে। সোলায়মান এক জায়গায় আব্দুল ওহাবের মূর্খতার কথা উল্লেখ করে তাকে উদ্দেশ্য করে বলেছেনঃ রাসূলে আকরাম (সা) বলেছেন ‘কোনো বিষয়ে যার সঠিক জ্ঞান নেই সে বিষয়ে তার উচিত নয় মতামত ব্যক্ত করা,বরং তার উচিত হলো যেটা সে জানে না তা একজন জ্ঞানী লোকের কাছ থেকে জেনে নেওয়া’। সূরা আম্বিয়ার ৭ নম্বর আয়াতেও এসেছেঃ فاَسئلوا أهلَ الذکر ان کنتم لا تعلمون অর্থাৎ’যদি না জানো তাহলে যে জানে তার কাছে জিজ্ঞেস করো।’সেজন্যেই শায়খ সোলায়মান বলতেন-ওহাবের জ্ঞানের অভাব রয়েছে,তাই তার উচিত যারা জ্ঞানী ও ইসলামী চিন্তাবিদ তাদেরকে জিজ্ঞেস করা এবং তাদের অনুসরণ করা।

যাই হোক ওহাবের বিরুদ্ধে সে সময় এতোসব বিরোধিতা সত্ত্বেও সে তার ভ্রান্ত আকিদাকে নাজদ অঞ্চলের কিছু লোকের মাঝে প্রচার করতে সক্ষম হয়েছিল। সমাজ বিজ্ঞানীগণ এর কারণ হিসেবে বলেছেন ঐ এলাকাটি ছিল প্রত্যন্ত মরু,তাদের লেখাপড়া কিংবা দ্বীনী জ্ঞান ছিল একেবারেই নগণ্য। সেই এলাকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দৈন্যতার কারণেই সেখানকার কিছু লোকজন ওহাবের আকিদা গ্রহণ করেছিল। এই শ্রেণীর লোকজনকে যে-কেউ খুব সহজেই প্রতারিত করতে পারে। তাছাড়া ওহাবের কথাবার্তার ভঙ্গিটাও ছিল বেশ আকর্ষণীয় এবং মুগ্ধকর। সবোর্পরি ইবনে সাউদ এবং ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী শক্তির ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতা ছিল তার পেছনে।

এমনিতেই পশ্চিমা উপনিবেশবাদী শক্তিগুলো এ সময় চারদিক থেকে মুসলিম বিশ্বকে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছিল। ব্রিটিশরা পূর্বদিক থেকে ভারতের বৃহৎ অংশ দখল করে পারস্য উপসাগর উপকূলের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলো। তারা প্রতিটি মুহূর্তে ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হচ্ছিলো। ফরাশিরাও নেপোলিয়নের নেতৃত্বে মিশর, সিরিয়া এবং ফিলিস্তিন দখল করে ভারতের দিকে যাবার চিন্তা করছিলো। রুশরাও চেয়েছিলো ইরান এবং তুরস্কে বারবার হামলা চালিয়ে তাদের সাম্রাজ্য একদিক থেকে সেই ফিলিস্তিন পর্যন্ত অন্যদিকে সুদূর পারস্য উপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত করতে। সে সময়কার আমেরিকাও উত্তর আফ্রিকার মুসলিম দেশগুলোর দিকে তাদের লোলুপ দৃষ্টি নিক্ষেপ করেছিল। তারা লিবিয়া এবং আলজেরিয়ায় গুলিবর্ষণ করে মুসলিম বিশ্বে অনুপ্রবেশ করার চেষ্টা চালিয়েছিল। এরকম একটি কঠিন পরিস্থিতিতে যখন শত্রুদের মোকাবেলায় মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতামূলক হৃদ্যতার প্রয়োজন ছিলো,ঠিক সে সময় মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওহাব ভ্রান্ত মতাদর্শ প্রচারের মাধ্যমে মুসলমানদেরকে কাফের সাব্যস্ত করে মুসলিম ঐক্যকে চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছিলো।

এদের মাঝে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদই ছিলো সবচেয়ে অগ্রসর। তারা মুসলমানদের ঐক্যে ফাটল সৃষ্টি করে তাদের সম্পদ লুট করার চেষ্টা চালিয়েছিল। এই ফাটল সৃষ্টি করার জন্যে মুসলিম বিশ্বে মাজহাবগত মতপার্থক্য সৃষ্টির চেষ্টা চালায়। এ কারণেই কোনো কোনো ঐতিহাসিক ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীদের স্বার্থসিদ্ধির সাথে ওহাবি ফের্কার আবির্ভাবের যোগসূত্রের বিষয়টিকে উড়িয়ে দেন নি। ইতিহাসে ব্রিটিশ গোয়েন্দা মিস্টার হ্যাম্পারের সাথে আব্দুল ওহাবের যোগাযোগের কথা এসেছে। হ্যাম্পার মুসলিম দেশগুলোতে বৃটেনের পক্ষে গোয়েন্দাবৃত্তি করতো। সে ইসলামী বেশভুষায় মূলত মুসলমানদের মাঝে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টির পথ খুজেঁ বেড়াতো। হ্যাম্পার তার ডায়েরিতে ব্যক্তিগত স্মৃতিকথায় লিখেছে ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলীয় বসরা শহরে আব্দুল ওহাবের সাথে তার দেখা হয়। ওহাব সম্পর্কে তার মূল্যায়ন এরকমঃ ‘মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওহাবের মাঝে আমি আমার হারানো আমিকে খুজেঁ পেলাম। মাজহাব সংরক্ষণে তার নির্লিপ্তি, তার আত্মম্ভরি ও অহমিকাপূর্ণ আত্মা ও মানসিকতা, সমকালীন আলেমদের প্রতি তার ঘৃণা, স্বাধীন দৃষ্টিভঙ্গি এমনকি চার খলিফা সম্পর্কে গুরুত্বহীনতা ইত্যাদি ছিল তার চিন্তাগত বৈশিষ্ট্য। কোরআন ও সুন্নাহর সামান্য জ্ঞানই ছিল মূল ভিত্তি। ওহাবের এইসব গুণাবলিই ছিল দুর্বল স্থান যার মধ্য দিয়ে তার ভেতরে অনুপ্রবেশ করার সুযোগ ঘটে।’

হ্যাম্পারের বক্তব্য থেকে যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায় তাহলো সে মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওহাবকে ওহাবি ফের্কা প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারে উৎসাহিত করেছিলো এবং এ ব্যাপারে ব্রিটিশ সরকার তাকে ও মুহাম্মাদ ইবনে সাউদকে সার্বিক পৃষ্ঠপোষকতা দেবে বলেও ঘোষণা করেছে। কিন্তু বাধ সেধেছে সে সময়কার আলেম সমাজ। ওহাবের ভাই, পিতাসহ সবাই তার ভ্রান্ত আকিদার বিরোধিতা করেছে। পিতার মৃত্যুর পর ওহাব যখন যেখানে গেছে কিছুদিন পরপর সেখান থেকে বিতাড়িত হয়েছে। সবশেষে এসে ভিড়েছে নজদের বিখ্যাত শহর দারিয়ার গভর্নর মুহাম্মাদ ইবনে সাউদের কাছে। ইনিই ছিলেন আলে সউদের পূর্বপুরুষ। তার সাথে ওহাবের চুক্তি হয় উগ্র ওহাবি চিন্তাধারা বিকাশের মধ্য দিয়ে ইবনে সাউদের সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটানো হবে। শাসক থাকবেন ইবনে সাউদ আর ধর্মীয় প্রচারণা চালাবে ওহাব। এই চুক্তিকে আরো মজবুত করার জন্যে দুই পরিবার বৈবাহিক সূত্রেও আবদ্ধ হয়।

 

আলে সাউদের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে আব্দুল ওহাব তার মতবাদের বিস্তার ঘটায়। বিশেষ করে তারা আশপাশের শহর এবং গোত্রগুলোতে দ্রুততার সাথে প্রচার কাজ শুরু করে। ওহাবি মতবাদ প্রচারের একেবারে শুরুতেই যে কাজটি করা হয় তাহলো উয়াইনা’য় সাহাবাদের এবং আওলিয়াদের মাযারগুলোকে ধ্বংস করে দেয়। আব্দুল ওহাব আল্লাহর অলিদের শরণাপন্ন হওয়াকে শিরক এবং মূর্তিপূজার মতো অপরাধ বলে গণ্য করতো এবং যারা একাজ করতো তাদেরকে কাফের বলে সাব্যস্ত করতো। তাদেরকে হত্যা করা জায়েয এবং তাদের মালামালকে যুদ্ধে প্রাপ্ত গনিমত বলে ঘোষণা করেছিল। এই ফতোয়া পেয়ে ওহাবের অনুসারীরা হাজার হাজার নিরীহ মুসলমানের রক্ত ঝরিয়েছে। মজার ব্যাপার হলো সে সময় দিরইয়ের লোকজন অভাবগ্রস্ত ছিল। এই রক্তপাতের পর তাদের ভাষায় প্রচুর গনিমত পাবার ফলে অভাব কেটে যায়। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ বুশ্‌র নজদি’ লিখেছেনঃ আমি আমার কাজের শুরুতে দিরইয়া শহরের দুর্ভিক্ষাবস্থা দেখেছি,কিন্তু পরবর্তীতে এই শহর সাউদের অর্থাৎ মুহাম্মাদ ইবনে সাউদের উত্তর পুরুষের সময়ে বেশ সম্পদশালী হয়ে ওঠে। কিন্তু কীভাবে এতোটা সম্পদশালী হলো তার বর্ণনা প্রসঙ্গে ইবনে বুশর ইতিহাসের উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেনঃ নজদের অন্যান্য শহরসহ বিভিন্ন গোত্রের মুসলমানদের ওপর হামলা চালিয়ে তাদের সম্পদ লুট করে এরকম সম্পদশালী হয়েছে। যারাই ওহাবি মতবাদ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে তাদের ওপর হামলা করা হয়েছে। হামলা করে যেসব গনিমত পেত তার সবই শায়খ মুহাম্মাদের নিয়ন্ত্রণে থাকতো আর মুহাম্মাদ ইবনে সাউদ, তার অনুমতিক্রমে একটা অংশ নিতো। আব্দুল ওহাব তার ইচ্ছামতো এই সম্পদ ব্যবহার করতো। অনেক সময় দেখা যেত ওহাব সকল সম্পদ মাত্র দু’তিন জনের মাঝে বিলি করে দিয়েছে। ওহাব বিভিন্ন শহরের লোকজনকে তার মতবাদের দিকে আমন্ত্রণ জানাতো। যারা গ্রহণ করতো তারা নিরাপদ ছিলো, আর যারা বিরোধিতা করতো তাদের জান-মালকে হালাল ঘোষণা করে আক্রমণ চালাতো। নজদ এবং নজদের বাইরে ওহাবিরা এরকম বহু যুদ্ধ করেছে। ইয়েমেন, হেজাজ, সিরিয়ার উপকণ্ঠ, ইরাকে ওহাবিরা যতো যুদ্ধ করেছে সবই তাদের মতবাদ গ্রহণে অস্বীকৃতির কারণেই করেছে। ‘আহসা’ শহরের ‘ফুসুল’ নামের একটি গ্রামের তিন শ’ মুসলমানকে ওহাবিরা হত্যা করে তাদের সকল মালামাল লুট করেছে।

আব্দুল ওহাব নিজেকে হাম্বলি মাজহাবের অনুসারী বলে পরিচয় দিতেন। অথচ এই মাজহাবের মূল প্রবক্তা আহমাদ ইবনে হাম্বলকেও সে কাফের বলে ঘোষণা করেছিল। কেননা তিনি কারবালায় ইমাম হোসাইন (আ) এর মাযার যিয়ারত সম্পর্কে বই লিখেছিলেন। ওহাবের দৃষ্টিতে পবিত্র কোনো স্থাপনা যেমন অলি-আওলিয়া, মাসুমিনদের মাযারের মতো মহান স্থাপনাগুলো যিয়ারত করা শির্‌ক, তাই এইসব স্থাপনা যিয়ারতকারীদের জানমাল হরণ করা মোবাহ অর্থাৎ সওয়াবের কাজ। তার এই চরমপন্থী মতবাদ শুরু থেকেই যে আলেমদের বিরোধিতার সম্মুখিন হয়েছিল সেকথা আমরা ইতোপূর্বেও বলেছি। সে সময়কার হেজাজের বিখ্যাত আলেমে দ্বীন এবং মক্কার মুফতি সাইয়্যেদ আহমাদ ইবনে যিনি দাহলান ‘খুলাসাতুল কালাম’ নামক গ্রন্থে লিখেছেন ‘১১৬৫ হিজরিতে আব্দুল ওহাবের জীবিতাবস্থায় নজদের একদল ওহাবি আলেম মক্কা শহরে গিয়েছিলেন সেখানকার আলেমদের সাথে বাহাস করার জন্যে। তারা তাদের আকিদার কথা বর্ণনা করতো আর মক্কার আলেমগণ তাদের বক্তব্য খণ্ডন করতেন। কোরান-হাদিস বিরোধী ওহাবি আকিদা মক্কী আলেমগণ কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না। তাঁরা ওহাবি মতবাদকে ভিত্তিহীন এবং নষ্ট আকিদা বলে মনে করতেন। ঠিক সে সময় মক্কার কাজি ওহাবি আলেমদেরকে কারাবন্দী করার আদেশ দেন। ঐ আদেশের পর কিছু কিছু ওহাবি আলেম পালিয়ে গিয়েছিলো আর কিছু কিছু আলেমকে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল।

ওহাবি আলেমদেরকে কারাগারে পাঠানোর ঘটনা একটু ভিন্নভাবে ১১৯৫ হিজরি তথা ১৭৮১ খ্রিষ্টাব্দেও ঘটেছিলো। আলে সাউদ এবং ওহাবি ফের্কার মূল কেন্দ্র দিরইয়া শহরের ওহাবি আলেমরা মক্কায় গিয়েছিলো সেখানকার আলেমদের সাথে নতুন তৌহিদ নিয়ে কথা বলার জন্যে। মক্কার আলেমগণ তখনো ওহাবি আলেমদেরকে কাফের বলে তাদেরকে মক্কা থেকে বিতাড়িত করেছিল এবং তাদের ওপর হজ্ব করা বা আল্লাহর ঘর যিয়ারত করার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলো। এখানে একটি প্রশ্ন এসে যায়,তাহলো ওহাবিরা কেন তাদের আকিদা নিয়ে মক্কায় যেত? জবাব হলো মক্কা শহর ছিলো ইসলামের সবচেয়ে পবিত্র স্থান ও প্রাণকেন্দ্র। তাই ওহাবিরা চেয়েছিল মক্কা দখল করে তাকে তাদের ধর্মীয় কেন্দ্র বানাতে যাতে মুসলমানরা ইসলামের পরিবর্তে ওহাবি আকিদায় দীক্ষিত হয়।

ইতোমধ্যে মুহাম্মাদ ইবনে সাউদ ১১৭৯ হিজরি তথা ১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দে মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পর স্থলাভিষিক্ত হন তাঁরই পুত্র আব্দুল আযিয। বাবার মতো আব্দুল আযিযও ওহাবের সাথে মৈত্রীতে আব্দ্ধ হন। বাবা বেঁচে থাকতে আব্দুল আযিয পিতার সেনাবাহিনীর একাংশের পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন, আব্দুল ওহাবের পৃষ্ঠপোষকতায় সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তাই সৌদি আরবের বিরাট একটি অংশ দখল করতে সক্ষম হন তিনি। ওহাবি মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওহাব শেষ পর্যন্ত ১২০৭ হিজরিতে অর্থাৎ ১৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দে ৯৬ বছর বয়সে মারা যান। তার মৃত্যুর পর তার সন্তানেরা ওহাবি মতবাদ প্রচারের কাজ চালিয়ে যেতে থাকে। তারই উত্তরপুরুষ আব্দুল লতিফ ওহাবি মতবাদের ওপর বহু বই লিখেছেন। এভাবে ওহাবের ছেলেরা, পৌত্রেরা ভ্রান্ত ওই মতবাদ ব্যাখ্যা করে বহু বই লিখেছেন।

সূত্র: http://www.islamibd.com/2012/10/2012-10-28-03-08-40.html