ইমাম হাসান (আ.) এর শাহাদাত

মূল : মীর সাদিক সাইয়্যেদ নেজাদ

অনুবাদ : ইউনুস গাজী

ইমাম হাসান (আ.) তৃতীয় হিজরীর ১৫ই রমজান মদিনায় জন্মগ্রহণ করেন। ৭ বছর পর্যন্ত স্বীয় পিতামহ হযরত মুহাম্মাদ (স.) এর সান্নিধ্য লাভের পর পিতার সাথে ছিলেন প্রায় ৩০ বছর। আমিরুল মু'মিনীন (আ.) এর শাহাদাতের পর ১০ বছর যাবত ইমামতের দায়িত্ব পালন করেন এবং ৫০ হিজরীর ২৮শে সফর ৪৭ বছর বয়সে মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ানের চক্রান্ত ও নির্দেশে স্বীয় স্ত্রী জো'দা বিনতে আশয়াস বিন কায়েস কর্তৃক বিষপ্রয়োগে শাহাদাত বরণ করেন।

যেভাবে শহীদ হন

সন্ধী করতে ইমাম হাসান (আ.) কে বাধ্য করে উমাইয়া সরকার তাদের বিভিন্ন কুউদ্দেশ্যে পৌঁছুতে সক্ষম হলেও তাদের অনেক কর্মসূচী বাস্তবায়নে ইমাম হাসান (আ.) এর অস্তিত্ব ছিল বিরাট বাধা। মুয়াবিয়ার অন্যতম টার্গেট ছিল স্বীয় কুলাঙ্গার পুত্র ইয়াযিদকে নিজের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে মনোনীত করা; যা ছিল ইমাম হাসান (আ.) এর সাথে কৃত সন্ধীর শর্ত বিরোধী। আর তাই সে এ বিষয়ে উদ্বিগ্ন ছিল। সে জানতো যে, যদি ইমাম (আ.) এর জীবদ্দশায় এ ধরনের কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করে তবে হাসান (আ.) এর কঠোর বিরোধিতার মুখোমুখি হবে। এরই ভিত্তিতে সে যে কোন উপায়ে ইমাম (আ.) কে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। বিভিন্ন আলোচনা ও পর্যালোচনার পর এ চক্রান্ত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ইমাম (আ.) এর স্ত্রী জো'দা বিনতে আশয়াসকেই তারা বেছে নেয়। আর তাই গোপনে জো'দার নিকট এক লক্ষ দিরহাম পাঠিয়ে তাকে এ প্রলোভন দেখানো হয় যে, যদি হাসানকে হত্যা করতে পারো তবে তোমাকে ইয়াযিদের সাথে বিয়ে দেওয়া হবে। আর জো'দাও মুয়াবিয়ার চক্রান্তে সাড়া দিয়ে ইমামের খাওয়ার পানিতে বিষ মিশিয়ে দেয় এবং ইমাম হাসান (আ.) ঐ বিষে আক্রান্ত হয়েই শাহাদাত বরণ করেন।

ইমাম (আ.) এর ওসিয়ত

ইমাম হাসান (আ.) কে বিষ প্রদানের পর তার অবস্থার অবনতি হতে থাকে তাঁর ভাইয়েরা তার শিয়রে এসে উপস্থিত হয়ে যখন তার অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন তখন ইমাম (আ.) বললেন : ‘আমি আখেরাতের দিনগুলোর প্রথম দিনে এবং দুনিয়ার দিনগুলোর শেষ দিনে অবস্থান করছি'। এরপর তিনি বললেন : ‘আমি আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষ্য দিচ্ছি, তার কোন শরিক নেই এবং তিনিই একমাত্র উপাসনার যোগ্য। যে তার অনুসরণের পথ বেছে নেবে সে সফলকাম হবে, আর যে তার অবাধ্য হবে সে পথভ্রষ্ট হবে। আর যে গুনাহ ও ভুলের পর তার নিকট তওবা করবে সে হেদায়েত লাভ করবে। হে হুসাইন! আমার লাশকে আমার নানা আল্লাহর রাসূল (স.) এর পাশে দাফন করো, তবে শর্ত হল যেন কেউ এতে বাধা না দেয়। যদি কেউ এ কাজে তোমাকে বাধা দেয় তবে তুমি যেন দৃঢ়তা দেখিও না। কেননা এ কাজের জন্য একটি ফোঁটাও রক্ত ঝরুক আমি তা কখনই চাই না।'

ইমাম হাসান (আ.) এর ওপর ক্রন্দনের ফজিলত ও প্রভাব

ইবনে আব্বাস বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর রাসূল (স.) বলেছেন : ‘যখন আমার সন্তান হাসান মুজতাবাকে বিষ প্রয়োগে শহীদ করা হবে তখন জমীন ও আসমান তার জন্য শোক পালন করবে। জেনে রাখো আমার সন্তান হাসানের জন্য ক্রন্দন ও শোক প্রকাশের বিশেষ ফজিলত রয়েছে। যে ব্যক্তি তার উপর বয়ে যাওয়া মুসিবতের কথা স্মরণ করে ক্রন্দন করে, যেদিন সকলের চোখ অন্ধ হয়ে যাবে সেদিন তার চোখে দৃষ্টি শক্তি থাকবে এবং যেদিন সকলের অন্তর ভারাক্রান্ত থাকবে সেদিন তার অন্তর সকল দুঃখ-বেদনা হতে মুক্ত থাকবে। আর যে ব্যক্তি (জান্নাতুল) বাকীতে তার কবর যেয়ারত করবে, পুলে সিরাতে যখন সকলের পা নড়বড়ে অবস্থায় থাকবে তখন তার পা থাকবে দৃঢ়।'

জুনাদাহ'র প্রতি ইমাম হাসান (আ.) এর ওসিয়ত

ইমাম হাসান (আ.) কে বিষ প্রয়োগের পর তিনি গুরুতর অসুস্থ হলে জুনাদাহ বিন আবি উমাইয়া তার নিকট আসলো। কুশল বিনিময়ের পর ইমাম (আ.) কে বললো: হে আল্লাহর রাসূল (স.) এর সন্তান আমাকে নসিহত করুন। ইমাম হাসান মুজতাবা (আ.) তার উদ্দেশ্যে বললেন : ‘হে জুনাদাহ, মৃত্যু তোমার দরজার কড়া নাড়ার পূর্বেই যে সফর তোমার সামনে রয়েছে তার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করো। জেনে রাখো, তুমি সর্বদা দুনিয়ার সন্ধানে আর মৃত্যু সর্বদা তোমার সন্ধানে। যে দিনটি এখনও এসে পৌঁছায়নি সেদিনের দুঃখকে যে দিনে তুমি অবস্থান করছো তার উপর চাপিয়ে দিও না... জেনে রাখো, পৃথিবীর হালাল সম্পদের জন্য রয়েছে হিসাব আর হারাম সম্পদের জন্য রয়েছে শাস্তি এবং সন্দেহভাজন সম্পদের জন্য রয়েছে ইতাব ও তিরস্কার... নিজের দুনিয়ার জন্য এমনভাবে চেষ্টা করো যেন তুমি সর্বদা সেখানে অবস্থান করবে এবং নিজের আখেরাতের জন্য এমনভাবে কাজ করো যেন আগামীকালই তোমার মৃত্যু হবে। যদি তুমি সম্মান ও... এর সন্ধানে রয়েছো তবে গুনাহে লিপ্ত হওয়ার হীনতা এবং আল্লাহর অবাধ্যতা হতে নিজেকে বাঁচিয়ে রেখে আল্লাহর আনুগত্য করাকে নিজের উপর আবশ্যক করে নাও।'

ইমাম হাসান (আ.) এর শেষ ক্রন্দন

বর্ণিত হয়েছে যে, যখন বিষ ইমাম হাসান (আ.) এর সমস্ত দেহে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করলো এবং তিনি মূমূর্ষ অবস্থা অতিক্রম করছিলেন তখন হঠাত তার চোখ অশ্রুসিক্ত হল। উপস্থিত সকলে জিজ্ঞেস করলেন : ‘হে আল্লাহর রাসূল (স.) এর সন্তান, আল্লাহর নবী (স.) এর নিকট আপনার যে মর্যাদা ও স্থান রয়েছে এবং এত ইবাদত ও আল্লাহর আনুগত্যের পরও এমন মূহুর্তে ক্রন্দন করছেন? তিনি (আ.) বললেন : ‘আমি দু'টি জিনিষের জন্য ক্রন্দন করছি; প্রথম, কেয়ামতের দিনের ভীতির বিষয়ে যা সত্যিই কঠিন দিন। দ্বিতীয়, আমার আত্মীয়-স্বজনদের হতে পৃথক হওয়ার কারণে; এটাও কঠিন কাজ।'

ইমাম হাসান (আ.) হতে বর্ণিত কতিপয় অমীয় বাণী

সালামের গুরুত্ব : ইমাম হাসান মুজতাবা (আ.) বলেছেন : ‘যে ব্যক্তি সালাম প্রদানের পূর্বে কথা শুরু করে তার কথার উত্তর দিও না।’

জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব : তিনি (আ.) বলেছেন : ‘নিরবতা, ত্রুটি গোপন রাখে এবং সম্মান রক্ষা করে। যে এ গুণের অধিকারী সে সর্বদা প্রশান্তিতে থাকে এবং তার সহচর ও তার সাথে ওঠাবসাকারীরাও তার হতে নিরাপদে থাকে।’

শ্রেষ্ঠ সৌভাগ্য ও কল্যাণ :  তিনি (আ.) বলেছেন : ‘যে কল্যাণের মাঝে কোন মন্দ থাকে তা হল : নেয়ামতের বিপরীতে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করা এবং অনাকাঙ্খিত ঘটনা ও বিপর্যয়ের সময় ধৈর্য্যধারণ করা।'

বুদ্ধিবৃত্তির পূর্ণতা : তিনি (আ.) বলেছেন : ‘জনগণের সাথে উত্তম ব্যবহার, বুদ্ধিবৃত্তির পূর্ণতার পরিচয়'।

ওয়াজিবের জন্য মুস্তাহাব কর্ম ত্যাগ করা : তিনি (আ.) বলেছেন : ‘যখন মুস্তাহাব ইবাদাত ও কর্মসমূহ, ওয়াজিব ইবাদাত ও কর্মসমূহের ক্ষতিসাধন করে তখন তা ত্যাগ করো।'

আধ্যাত্মিক বিষয়ে গুরুত্ব প্রদান : তিনি (আ.) বলেছেন : ‘আমি ঐ সকল ব্যক্তিদের বিষয়ে আশ্চর্য হই যারা নিজেদের শরীরের খাদ্যের বিষয়ে চিন্তা করে কিন্তু আধ্যাত্মিক বিষয়াদি ও আত্মার খাদ্যের বিষয়ে চিন্তা করে না। ক্ষতিকর খাদ্য থেকে নিজের পেটকে বাঁচিয়ে রাখে, কিন্তু যে সকল নোংরা চিন্তা তার অন্তরকে দূষিত করে তা হতে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখে না।'

আত্মীয়তার বিষয়ে : জনৈক ব্যক্তি ইমাম হাসান (আ.) এর উদ্দেশ্যে বললেন : আমার একটি বিবাহযোগ্যা কন্যা রয়েছে, কেমন ব্যক্তির সাথে তার বিবাহ দেব? ইমাম হাসান (আ.) বললেন : এমন ব্যক্তির সাথে তার বিয়ে দাও যে তাকাওয়াধারী ও পরেজগার। কেননা তাকওয়াবান ব্যক্তি যদি তাকে ভালবাসে তবে তাকে সম্মান করবে। আর যদি তাকে ভাল নাও বাসে তবে অন্তত তার উপর অত্যাচার করবে না।'

ইমামের দৃষ্টিতে রাজনীতি : জনৈক ব্যক্তি ইমাম (আ.) কে সিয়াসাত তথা রাজনীতির অর্থ জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেন : ‘রাজনীতি হল, আল্লাহর অধিকার এবং আল্লাহর জীবিত ও মৃত বান্দাদের অধিকার মেনে চলার নাম।' অতঃপর তিনি ব্যখ্যা দিতে গিয়ে বলেন : ‘আল্লাহর অধিকার হল; যা কিছু মহান আল্লাহ্ বাস্তবায়নের নির্দেশ ও আঞ্জাম দিতে নিষেধ করেছেন তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মেনে চলা'। আল্লাহর জীবিত বান্দাদের অধিকার হল, ‘নিজের দ্বীনি ভাইয়ের বিষয়ে তোমার কর্তব্যকে পালন করা, তোমার দ্বীনি ভাইয়ের সেবা দানের ক্ষেত্রে বিলম্ব না করা এবং ইসলামি সমাজের নেতার বিষয়ে, যতক্ষণ সে জনগণের বিষয়ে একনিষ্ঠ থাকে ততক্ষণ তুমিও তার প্রতি একনিষ্ঠ থেকো, আর যখন সে সত্য পথ হতে বিভ্রান্ত হয়ে যায় তখন তার প্রতিবাদ জানাও'। আর আল্লাহর মৃত বান্দাদের অধিকার হল; ‘তাদের উত্তম কর্মসমূহকে স্মরণ করা এবং তাদের মন্দ কর্মসমূহকে গোপন করা'।

সূত্র : http://www.erfan.ir

কীওয়ার্ড: