ইসলামী ঐক্য সপ্তাহ

ইসলামী ঐক্য সপ্তাহ ইসলামের নবী প্রিয় রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সা) দীর্ঘ তেইশ বছর ধরে জনগণকে ইসলামের দাওয়াত দিতে গিয়ে ব্যাপক দুঃখ কষ্ট সহ্য করেছেন।মদিনায় বসবাস করার সময় তিনি ইসলামী সরকার গঠন করে মুসলিম সমাজে ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠার জন্যে ব্যাপক চেষ্টা প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। অবশ্য আল্লাহর আদেশেই তিনি এই পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। কেননা কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে মুসলমানদের ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নবীজীর চেষ্টায় তাঁর সময়ে ইসলামী সমাজ ঐক্য ও সহমর্মিতার আস্বাদ লাভ করে। ইসলামের নবীর ওফাতের পরপরই তাঁর স্থলাভিষিক্ত কে হবেন তা নিয়ে ব্যাপক মতানৈক্য দেখা দেয়। একদল বললো জনগণ কিংবা তাদের প্রতিনিধিদের রায়ের মাধ্যমে খলিফা নির্বাচন করা উচিত।আবার আরেক দল বললো গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল এই বিষয়টি আল্লাহ এবং রাসূলে খোদার আদেশ অনুযায়ী ফয়সালা হওয়া উচিত। কেননা নবী করিম (সা) গাদিরে খুমসহ বিভিন্ন সময়ে আলী (আ) কে তাঁর স্থলাভিষিক্ত বলে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। সে সময় যদিও আলী (আ) খেলাফতের দায়িত্বে অভিষিক্ত হন নি, তবুও তাঁর কার্যক্রম প্রমাণ করেছে যে, আলী (আ) এর দৃষ্টিতে ইসলামী সমাজের ঐক্য অন্যান্য বহু বিষয়ের চেয়েও এমনকি জনগণের ওপর শাসনাধিকারের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।এ কারণেই আলী (আ) যে কেবল খলিফাদের বিপরীতেই দাঁড়ান নি তাই নয় বরং স্পর্শকাতর বহু বিষয়ে তিনি খলিফাদের সহযোগিতাও করেছেন।ঐক্যের অবস্থান এবং মূল্য সম্পর্কে ইমাম আলী (আ) বলেছেনঃ ‘ইসলামী সমাজের সাথে সংশ্লিষ্ট থেকো,কেননা আল্লাহর হাত সবসময় সমষ্টির সাথে থাকে এবং বিচ্ছিন্নতা পরিহার করো, কেননা বিচ্ছিন্ন হলে শয়তানের গ্রাসে পরিণত হতে হয় যেমন দুম্বা পাল ছাড়া হলে নেকড়ের শিকারে পরিণত হয়। ইসলামের ইতিহাসে ধর্মীয় বা মাযহাবগত মতপার্থক্যকে শত্রুরা সবসময়ই সদ্ব্যবহার করে মুসলমানদের ওপর প্রভাব বা আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ সৃষ্টির কাজে লাগিয়েছে।এ কারণেই আলী (আ) এর পর নবীজীর আহলে বাইতের মহান ইমামগণও ইসলামী সমাজে সর্বপ্রকার বিচ্ছিন্নতা বা বিক্ষিপ্ততা পরিহার করেছেন।ইমামগণ যদিও সমকালীন বহু আলেমের বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গির সাথে একমত ছিলেন না তারপরও সবসময় চেষ্টা করেছেন এই মতপার্থক্য যেন জ্ঞানের ক্ষেত্রে উপস্থাপিত হয় যাতে ইসলামী সমাজে বিচ্ছিন্নতা কিংবা দ্বিধা বিভক্তি না ঘটে। ইসলামের ইতিহাস পরিক্রমায়ও দেখা গেছে আলোকিত আত্মা ও প্রখর দৃষ্টিসম্পন্ন বহু যুগ সচেতন আলেমে দ্বীনও মতপার্থক্য থেকে দূরে অবস্থান করেছেন এবং ঐক্য ও একাত্মতার দাওয়াত দিয়েছেন।কিন্তু দুঃখজনকভাবে বিগত এক বা দুই শতাব্দীতে উপনিবেশবাদীদের মদদপুষ্ট শাসকরাই মুসলিম দেশগুলোর মসনদে আরোহী ছিল। এ সময় সাইয়্যেদ জামালুদ্দিন আসাদাবাদীর মতো দূরদৃষ্টিসম্পন্ন আলেমগণ মানুষকে ইসলামী ঐক্যে দিকে আহ্বান জানিয়েছেন। যার ফলে শাসকদের বিচিত্র হুমকি , ধমকি আর রোষানলে পড়তে হয়েছে তাদেঁর।পশ্চিমা উপনিবেশবাদীরা মুসলমানদের দেশগুলোকে লুণ্ঠন করার লক্ষ্যে তাদেঁর মাঝে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টির ব্যাপক চেষ্টা চালিয়েছেন।তারা তাদের লক্ষ্যে পৌঁছার জন্যে বহু বই পুস্তক লেখা ছাড়াও বিচিত্র মাধ্যমে প্রচার প্রচারণা চালিয়েছে। আধিপত্যবাদী শক্তিগুলো মুসলমানদের মাঝে ধর্মীয় মতানৈক্য সৃষ্টি করে, গোত্রীয় উগ্রতার জন্ম দিয়েহিংসা-প্রতিহিংসার আগুণ জ্বালিয়ে দিয়েছিল। ইরানে ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের আগ পর্যন্ত পশ্চিমা উপনিবেশবাদীরা তাদের সাফল্যের চাবিকাঠি দেখেছিল মুসলমানদের মাঝে ঐ বিভেদের জাল সৃষ্টি করার মধ্যে,কেননা তারা ভেবেছিলো পারস্পরিক মতপাথর্ক্য ইসলামী হুকুমাত প্রতিষ্ঠার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। ইরানে ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের পর আধিপত্যবাদী শক্তিগুলো নতুন উপায়ে মুসলমানদের মাঝে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টির চেষ্টা চালায়। এ অবস্থায় ইসলামী বিপ্লব মুসলমানদের মাঝে নতুন শক্তি ও উদ্যম এনে দেয়, যার ফলে শত্রুদের সর্বপ্রকার ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করতে সক্ষম হয়। ইমাম খোমেনী (রহ) জানতেন ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের জন্যে প্রথমেই প্রয়োজন ইরানী সমাজে ইসলামী ঐক্য গড়ে তোলা,সকল দল ও গোষ্ঠি একবাক্যে একাত্ম হওয়া।ইমাম এমন একটি দেশে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলেছেন যে দেশে বহু গোত্র এবং বহু মাযহাব রয়েছে।ইমাম খোমেনী (রহ) ইরানে ইসলামী ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্যে কোনোরকম লুকোচুরির আশ্রয় নেন নি, একেবারে খোলামেলাভাবেই প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের উপনিবেশবাদীদের লক্ষ্য উদ্দেশ্যগুলোকে জনগণের সামনে স্পষ্ট করে তুলেছেন। তিনি ইসলামী মূল্যবোধ ও শিক্ষাগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করে তুলে এবং সামাজিক বিশ্বাস ও সংস্কৃতিকে দৃঢ়তা দান করে ঐক্যের ভিত্তিকে মজবুত করেছেন। ইরানের আপামর জনগণও ইমাম খোমেনী (রহ)এর ঐক্যের দিক নির্দেশনাগুলো অনুসরণ করে ইসলামী বিপ্লবকে বিজয়ের শিরোপা পরিয়েছে। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে একটি জাতির উন্নয়ন ও অগ্রগতি নির্ভর করে সে জাতির ঐক্যের ওপর।বিন্দু বিন্দু জলের একত্র সমাবেশে যেমন বাঁধগুলো পূর্ণ হয়, যেভাবে ছোটো ছোটো ঝর্ণাধারা একত্রে মিলিত হয়ে বৃহৎ নদীর জন্ম দেয়, তেমনিভাবে মানুষেরাও পরস্পরে ঐক্যবদ্ধ হয়ে শক্তিশালী কাফেলার জন্ম দেয়।কোরআনের বক্তব্য অনুযায়ী মুসলমানদের বৃহৎ সারি শত্রুদেরকে ভীত সন্ত্রস্ত করে তোলে এবং মুসলমানদের ওপর অত্যাচার অবিচার করার চিন্তা তাদের মাথা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। ইমাম খোমেনী (রহ) কোরআনে কারিমের মাহাত্ম্যপূর্ণ আয়াতের অনুসরণেই ঐক্যবদ্ধ একটি ইসলামী উম্মাহ গঠন করার চেষ্টা চালান। ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা মুসলিম দেশগুলোর রাষ্ট্রপ্রধানদের প্রতি ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে বলেনঃ মুসলিম বিশ্বের সামগ্রিক কল্যাণে আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং আধিপত্যবাদীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। তিনি বলেনঃ আমাদের বক্তব্য হলো এই ‘বিভিন্ন দেশ ও জাতির মাঝে বিদ্রোহ দেখা দেওয়ার আগে সরকারগুলোর উচিত বিনয়ী হওয়া এবং পরস্পরে বন্ধুত্ব স্থাপন করা। এখন ইসলামী জাগরণের যুগের সূচনা ঘটেছে। আজ ইমাম খোমেনী (রহ) এর চিন্তাদর্শ ও বাণীর প্রতিধ্বনি মুসলিম বিশ্বের দিকে দিকে শোনা যাচ্ছে।উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন মুসলিম দেশে আজ জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়ে দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে। জনগণের প্রতি সেখানকার স্বৈরাচারেরা যেই অত্যাচার নিপীড়ন চালিয়েছে, তার ফলে তারা অপমাণিত বোধ করেছে, লাঞ্ছিত হয়েছে, হতাশায় ভুগেছে। আজ ঐক্যের আল্লাহু আকবার ধ্বনি তাদের মুখে শ্লোগানে শ্লোগানে মুখরিত। তিউনিশিয়া, ইয়েমেন, জর্দান বিশেষ করে মিশরে সকল শ্রেণী ও গোত্রের মানুষের মাঝে ইসলামী জাগরণের জোয়ার এসছে।তারা আজ নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করার লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছেঃ ‘আল্লাহ কোন জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যে পর্যন্ত না তারা তাদের নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে। আল্লাহ তাদের ঐক্য কবুল করুন, বিজয়ের সূর্য উদিত হোক তাদের স্বপ্নীল চোখে। ইমাম খোমেনী (রহ) এর দৃষ্টিতে ইসলামী ঐক্য বিজ্ঞ মনীষীগণের কল্যাণ চিন্তায় সবসময়ই ইসলামী ঐক্যের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচিত হয়েছে। ইমাম খোমেনী (রহ) মুসলিম জগতের কল্যাণকামী এবং ঐক্যের আহ্বানকারীদের অন্যতম একজন ব্যক্তিত্ব।মুসলিম ফের্কাগুলোর মাঝে ঐক্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তাঁর সুস্পষ্ট কিছু পরিকল্পনা ছিলো। বিপ্লবের আগে এবং পরেও ইমাম তাঁর ঐ পরিকল্পনা অনুযায়ী মুসলমানদের ঐক্যের আহ্বান জানান এবং এ বিষয়টির ওপর গুরুত্বারোপ করে ঐক্যের পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করার চেষ্টা চালান। তাঁর এই চেষ্টার ক্ষেত্রে দুটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। একটি হলো সাংস্কৃতিক ও মননশীল আন্দোলন এবং দ্বিতীয়টা হলো রাজনৈতিক আন্দোলন। যাই হোক এ বিষয়গুলো নিয়ে আমরা আরো কিছু কথা বলার চেষ্টা করবো আজকের আসরে। আপনারা আমাদের সাথেই আছেন যথারীতি এ প্রত্যাশা রইলো। ইমাম খোমেনী (রহ) এর চিন্তাধারা অনুযায়ী ইসলামী সমাজে পরিবর্তন আনা এবং বিচ্ছিন্নতা থেকে জাতিকে মুক্তি দেওয়া এমন সহজ কোনো বিষয় নয় যে সুচিন্তিত এবং মৌলিক কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই তা সম্ভব হয়ে যাবে। কেননা মুসলিম বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে।মুসলমানদের সাংস্কৃতিক ও চিন্তাদর্শগত অবক্ষয় এবং মুসলিম দেশগুলোতে উপনিবেশবাদী এবং স্বৈরাচারী শক্তিগুলোর শাসন ব্যবস্থার মতো বিষয়গুলো এক্ষেত্রে দায়ি। এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে হলে মুসলিম দেশ ও সরকারগুলোর সামগ্রিক তৎপরতা এবং সুনির্দিষ্ট কৌশল অবলম্বন করা উচিত। যেহেতু মুসলিম দেশগুলোর অভিন্ন ঐতিহ্য ও সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ইতিহাস রয়েছে,সেহেতু তাদের উচিত তাদের সেই সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ও মৌলিক সাংস্কৃতিক ইতিহাসের দিকে প্রত্যাবর্তন করা, সেইসাথে ধর্মীয় পরিচিতির স্মারক বই পুস্তকগুলোর সাথে ভালোভাবে পরিচিত হওয়া। এ কারণেই ইমাম খোমেনী (রহ) ইসলামের মৌলিক সংস্কৃতির দিকে প্রত্যাবর্তন করার ব্যাপারে বলেছেনঃ ‘আমাদের মুসলমানদের খুবই সমৃদ্ধ সংস্কৃতি রয়েছে।মুসলমানদের উচিত নিজেদের পরিচয় সম্পর্কে সচেতন হওয়া।অর্থাৎ বুঝতে হবে যে তারা একই সংস্কৃতির অধিকারী...অসহায় এবং দুর্বল জাতিগুলো পরাশক্তিগুলোর সাথে যে সম্পর্ক সৃষ্টি করেছে, অভ্যন্তরীণ এবং চিন্তাগত সম্পর্ক তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কেননা অন্যসব নির্ভরতামূলক সম্পর্ক তা থেকেই প্রেরণা লাভ করে। চিন্তার স্বাধীনতা লাভ করতে হলে নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে উপলব্ধি করতে হবে। ইমাম খোমেনী (রহ) মুসলমানদের মাঝে অভিন্ন বিশ্বাস ও মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় ইসলামী চিন্তাদর্শগুলোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। এ বিষয়টিকে তিনি ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী বলে উল্লেখ করেছেন। ইমামের দৃষ্টিতে ইসলাম হচ্ছে মানষের চিন্তাদর্শ ও ব্যবহারিক জীবনের জন্যে একটি পূর্ণ ও সামগ্রিক বিধান। মানুষের সামগ্রিক জীবনের জন্যে তাই ইসলামের রয়েছে সামগ্রিক কর্মসূচি। মুসলিম সমাজে বিশ্বাসগত গভীরতার কারণে এবং মুসলমান জনগোষ্ঠির সংখ্যাগত দিক থেকেও তাদের যথেষ্ট গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে,যদি এ বিষয়গুলোকে যথার্থভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হয় তাহলে মুসলিম বিশ্বের সম্মান পুনরায় ফিরে আসতে পারে।ইমাম খোমেনী (রহ) এর মতে ইসলাম এ বিশ্বাস ও বোধকে কাজে লাগিয়ে মুসলমানদের ভৌগোলিক সীমারেখা মুছে ফেলতে পারে, পারে ব্যক্তিগত স্বার্থের সীমা পেরিয়ে গোত্র বর্ণভেদে সকল মুসলমানকে একটি কেন্দ্রে সমবেত করতে। ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্যে ইমাম খোমেনী (রহ) যেসব কার্যকরী পদক্ষেপ নিয়েছেন, সেগুলো ছিল মুসলিম বিশ্বে বিচ্ছিন্নতার মূল কারণ কেন্দ্রিক। এই বিচ্ছিন্নতার মূল কারণ হিসেবে ইমাম খোমেনী (রহ) বিদেশী শক্তির কথা উল্লেখ করেছেন যারা মুসলমানদের মাঝে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টির জন্যে মুসলমানদেরই অভ্যন্তরীণ উপাদান বা বিষয়গুলোকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে মুসলমানদের ঐক্য বিনষ্টির কাজে লিপ্ত রয়েছে। মুসলিম সমাজের ওপর বিদেশীদের এই চক্রান্তের উদ্দেশ্য হিসেবে ইমাম বলেন মুসলমানদের সম্পদ লুট করাই তাদের উদ্দেশ্য। তিনি এ সম্পর্কে আরো বলেনঃ ‘যারা মুসলমানদের ভূখণ্ড থেকে স্বার্থ উদ্ধার করতে চায়,যারা মুসলমানদের সম্পদগুলোকে আত্মসাৎ করতে চায় এবং মুসলিম সরকারগুলোকে তাদের তাবেদার বানাতে চায়,তারাই মুসলমানদের মাঝে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টির চেষ্টা চালায়। শিয়া ও সুন্নির নামে তারাই এই মতপার্থক্য প্রতিষ্ঠা করতে চায়।ইমাম খোমেনী (রহ) অপর এক ভাষণে মুসলমানদেরকে নিজেদের ভেতরে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টির জন্যে শত্রুদের মূল হাতিয়ার মাযহাবগত মতপার্থক্যের ফাদেঁ পা দিতে নিষেধ করেছেন।তিনি বলেছেন ইসলামী মাযহাবগুলোর মাঝে মতানৈক্য সৃষ্টির পরিকল্পনা একটি মারাত্মক অপরাধ, আর এই অপরাধের স্রষ্টা হলো তারাই যেসব পরাশক্তি ঐ মতপার্ধক্য থেকে ফায়দা হাসিল করে। তারাই এই মতানৈক্যের বীজ মুসলমানদের মাঝে বপন করেছে এবং নিয়মিত তার গোড়ায় পানি ঢেলে পরিচর্যা করে যাচ্ছে। যারা এই বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করতে চায় তারা না আহলে সুন্নাতের না আহলে শিয়ার অন্তর্ভুক্ত। তারা হলো পরাশক্তিগুলোর মদদপুষ্ট সরকারের কর্মকর্তা। মাযহাব এবং গোত্রগত সবধরনের মতপার্থক্যকে অসমীচিন ও অবৈধ বলে উল্লেখ করেছেন, কেননা এগুলো মুসলমানদের সংহতির পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। তিনি ইসলামের মানদণ্ড ও কোরআনকে ঐক্যের মূল মাপকাঠি বলে মনে করেন। সে জন্যে ইসলামী মাযহাবগুলোর মাঝে যেসব বিষয়ে অভিন্নতা রয়েছে যেমন আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, নবী এবং কোরআনের প্রতি বিশ্বাস ইত্যাদির মতো বিষয়গুলোর প্রতি ইঙ্গিত করে ইমাম হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেনঃ‘শিয়া এবং সুন্নিদেরকে দুটি পক্ষে দাঁড় করানোর মতো সমস্যাটির মূল নিহিত রয়েছে বিদেশীদের মূর্খতা এবং প্রচারণার মধ্যে। এখন সময় এসেছে সকল মুসলমান পরস্পরে এক্যবদ্ধ হবার। ইমাম অসহায় বঞ্চিতদের একটি দল গঠনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন এই দলে সকল বঞ্চিত জনগোষ্ঠি যোগ দেবে এবং পরাশক্তিগুলোর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে। এ প্রসঙ্গে তিনি মুসলিম জাতিগুলোর প্রতি উপদেশ দিয়ে বলেছেন তারা যেন ইরানের মুজাহিদ জাতির আদর্শ অনুসরণে এগিয়ে আসে। একইভাবে তিনি ইসলামী ঐক্য বাস্তবায়নের পন্থা হিসেবে মুসলিম দেশগুলোর কর্মকর্তাদের পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলেছেন।কারণটা হলো মুসলিম দেশগুলোর প্রধানদের হাতে ইসলামী ঐক্যের সরকার গঠন করার জন্যে প্রয়োজনীয় সকল সুযোগ সুবিধা রয়েছে। তাই তাঁরা যদি সত্যিকার অর্থেই ইসলামী ঐক্য বাস্তবায়নের চেষ্টা চালায় তাহলে তা অর্জন করা খুব একটা কঠিন হবে না। তিনি বিশ্বাস করেন মুসলিম দেশগুলোর সম্পদ বা অর্থনৈতিক বৃহৎ উৎসগুলোকে কাজে লাগালে পরাশক্তিগুলোর মোকাবেলায় মুসলমানদের বৃহৎ এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি চালিকাশক্তি হতে পারে।ইমাম খোমেনীর মতে খনিজ সম্পদের দিক থেকে সমৃদ্ধ মুসলিম দেশগুলোর মাঝে যদি ঐক্য গড়ে ওঠে তাহলে কোনো দেশ বা কোনো শক্তির কাছেই মুসলমানদের ধর্না দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। কিন্তু মূল সমস্যাটা হলো অধিকাংশ মুসলিম দেশই পরাশক্তির নীতির অনুসারী এবং ইসলামী ঐক্য গড়ে তোলার ব্যাপারে আন্তরিক নয়।এ অবস্থার অবসান ঘটুক, মুসলমানদের মধ্যকার সকল বিভেদ দূর হয়ে যাক,প্রতিষ্ঠিত হোক শিসা ঢালা প্রাচীরের মতো দৃঢ় ঐক্য। ইসলামী ঐক্য: ইসলাম বিদ্বেষ প্রতিরোধের মোক্ষম পন্থা বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)আরবী রবিউল আউয়াল মাসে জন্ম গ্রহন করেছেন । তবে ঐতিহাসকদের বড় একটি অংশ মনে করেন মহানবীর জন্ম তারিখ হচ্ছে ১২ ই রবিউল আউয়াল । আবার ঐতিহাসিকদের অনেকেই প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন বিশ্বনবী ১৭ ই রবিউল আউয়ালে আগমন করেছেন । অর্থাৎ, দুই মতের ব্যবধান প্রায় এক সপ্তাহ। তাই ইসলামী ঐক্য প্রতিষ্ঠার মহান উদ্দেশ্যে মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ) এই সপ্তাহটিকেই ইসলামী ঐক্য সপ্তাহ বলে ঘোষণা করেছেন। ইসলামী ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হলে মুসলিম দেশগুলোর সম্পদ শোষণ করা এবং তাদের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা যাবে না বলেই সাম্রাজ্যবাদীরা ইসলামী ঐক্যের পথে নানা বাধা জিইয়ে রাখছে। অন্য কথায় ইসলামের সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী ও জুলুম-বিরোধী চেতনা প্রবল বলেই সাম্রাজ্যবাদ প্রকৃত ইসলামকে খুবই ভয় পায়। মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ) এসব বিষয় উপলব্ধি করতেন। তাই তিনি ইরানে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর পরই ইসলামী ঐক্য সপ্তাহ পালনের উদ্যোগ নেন, যাতে বিশ্ববাসী এটা বুঝতে পারে যে, ইতিহাস ও আইনগত কিছু বিষয়ে মতভেদ থাকা সত্ত্বেও মুসলমানরা একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি। ঐক্য সপ্তাহ ঘোষণার পর প্রায় ত্রিশ বছর অতিবাহিত হয়েছে। ইসলামের শত্রুদের ষড়যন্ত্রগুলো ক্রমেই আরো জটিল ও কঠোর হয়ে উঠছে। ফলে এসব ষড়যন্ত্র নস্যাতের জন্য মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের গুরুত্বও দিনকে দিন বাড়ছে। পত্রপত্রিকা, সংবাদ মাধ্যম ও চলচ্চিত্রসহ পাশ্চাত্যের বিচিত্রময় গণ মাধ্যম ইসলাম সম্পর্কে পাশ্চাত্যের নাগরিকদের মনে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিতে চাইছে। এসব প্রচারণায় বলা হচ্ছে, " মানবাধিকারে বিশ্বাসী নয় অথচ সহিংসতায় বিশ্বাসী ইসলাম ধর্ম খুব দ্রুত ইউরোপ ও আমেরিকা মহাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে এবং তা এ দুই মহাদেশকে গ্রাস করবে!"অথচ ইসলামের যৌক্তিক ও উন্নত শিক্ষায় আকৃষ্ট হয়েই পাশ্চাত্যের নাগরিকরা এ ধর্মে গ্রহণ করছেন । পাশ্চাত্যের নওমুসলিমরা উচ্চ শিক্ষিত এবং তারা অনেক গবেষণা ও পড়াশুনা করেই মুসলমান হচ্ছেন। ইউরোপে মুসলমানদের জন্মের উচ্চ হার এবং অমুসলমানদের জন্মের নিম্ন হারও সাম্রাজ্যবাদী পশ্চিমা সরকারগুলোর দূর্ভাবনার একটি বড় কারণ। ফলে তারা ইসলাম আতঙ্ক ছড়ানোর পাশাপাশি ইসলামের বিরুদ্ধে আরো মারমুখো হবার কৌশল নিয়েছেন। ইসলাম আতঙ্ক ছড়ানোর প্রচেষ্টা পাশ্চাত্যের অন্যতম প্রধান কর্মসূচীতে পরিণত হয়েছে। মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির পাশাপাশি ইসলামকে হেয় করা, উপহাস করা, বিকৃত করে তুলে ধরা ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে হুমকি দেয়া তাদের রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক কৌশলের মূল কিছু দিক। ইসলামী ঐক্য ঠেকানোর জন্য মুসলিম দেশগুলোর ভেতরে জাতিগত বিভেদ উস্কে দেয়া ও সম্ভব হলে গৃহযুদ্ধ বাঁধানো পশ্চিমা সরকারগুলোর একটি পুরনো হাতিয়ার। পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোকে এসব নিকৃষ্ট কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। দৃষ্টান্ত হিসেবে ফিলিস্তিন, লেবানন ও ককেশাস অঞ্চলে জাতীয় ও ইসলামী গ্রুপগুলোর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির জন্য পশ্চিমা গণমাধ্যমের ব্যাপক প্রচেষ্টা লক্ষ্যনীয়। ইসলাম আতঙ্ক ছড়ানোর প্রচেষ্টা ও ইসলামের বিরুদ্ধে আরো মারমুখো হবার পশ্চিমা কৌশলগুলো ক্রমেই বেশি জটিল এবং মারাত্মক হয়ে ওঠায় ইসলাম বিরোধী যে কোনো তৎপরতায় মুসলিম সরকার ও জাতিগুলোর ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের কোনো বিকল্প নেই। মুসলমানদের সম্মিলিত প্রতিরোধের ফলে পশ্চিমারা যে পিছু হটতে বাধ্য হয় তার বেশ কটি দৃষ্টান্ত উল্লেখ করা যায়। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)র প্রতি অবমাননার জন্য বৃটেনের মূর্তাদ সালমান রুশদির বিরুদ্ধে মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ)র পক্ষ থেকে মৃত্যুদন্ডের ফতোয়া প্রদানের ঘটনা এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। গত শতকের আশির দশকের শেষের দিকে ওই ঐতিহাসিক ফতোয়ার প্রতিবাদে ইউরোপীয় জোটের দেশগুলো ইরান থেকে তাদের রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে। কিন্তু বস্তাপচা মিথ্যায় ভরা বই স্যাটানিক ভার্সেসের বিরুদ্ধে মুসলিম দেশগুলোর জনগণসহ ইউরোপের মুসলমানরা ব্যাপক বিক্ষোভ প্রদর্শন করে ইসলামী ঐক্যের এক আলোকোজ্জ্বোল ও গৌরবময় দৃষ্টান্ত প্রদর্শন করে। এ অবস্থায় পশ্চিমা দেশগুলো রুশদির প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয় এবং তেহরানে তাদের রাষ্ট্রদূতরা আবারো মাথা নীচু করে ফিরে আসে। দু হাজার এক সালের ১১ ই সেপ্টেম্বরের ঘটনার পরও পাশ্চাত্য নব উদ্যমে ইসলাম ও ইসলামপন্থী মুসলমানদের বিরুদ্ধে আগ্রাসী তৎপরতা জোরদার করে। ২০০৬ সালে পোপ ষোড়শ বেনিডিক্ট ইসলামের বিরুদ্ধে অবমাননাকর মন্তব্য করেন এবং ২০০৭ সালে ইউরোপের কয়েকটি দেশের পত্র পত্রিকায় বিশ্বনবী (সাঃ)র প্রতি অবমাননাকর ব্যাঙ্গাত্মক কার্টূন ছাপা হয়। এসবের প্রতিবাদে মুসলিম বিশ্বের অনেক সরকার ও সারা বিশ্বের মুসলমানরা সোচ্চার হয়েছেন। ফলে ইসলামের শত্রুরা আবারও পিছু হটে। তাই এটা স্পষ্ট ইসলাম বিরোধী যে কোনো তৎপরতায় মুসলিম সরকার ও জাতিগুলোর ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের কোনো বিকল্প নেই। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরা ইসলামের অগ্রযাত্রা ঠেকানোর জন্য সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের অংশ হিসেবে মুসলমানদের ঈমান ও ধর্মবিশ্বাসকে দূর্বল করার জন্য বিভিন্ন বিষয় প্রচার করছে। সংবাদ ছাড়াও চলচ্চিত্র, নাটক ও শিল্প-সাহিত্য এবং ক্রীড়াঙ্গনকে ব্যবহার করা হচ্ছে এসব কাজে। মুসলিম দেশগুলোর গণমাধ্যম এবং শিল্প অঙ্গন ঐক্যবদ্ধ হয়ে ও পারস্পরিক সহযোগীতার মাধ্যমে পশ্চিমাদের এইসব প্রচেষ্টা বানচাল করতে সক্ষম হতে পারেন। যেমন, সংবাদ, শিল্পী ও চলচ্চিত্র বিনিময়, বিজ্ঞানী. গবেষক ও শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং মাজহাবগুলোর মধ্যে সংলাপ এইসব সহযোগীতার কিছু দিক হতে পারে। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ ও সামগ্রীক ধর্ম। মানুষের রাজনৈতিক, সামজিক, সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক চাহিদাসহ সমস্ত মানবীয় চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম এ ধর্ম। শ্রেষ্ঠ ধর্ম হবার কারণেই এ ধর্ম মানব সভ্যতায় এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশী অবদান ও আকর্ষণ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। তাই বিশ্ববাসীর কাছে ইসলামের প্রকৃত স্বরূপ তুলে ধরা গেলে ইসলামের অগ্রযাত্রা ঠেকানো কোন শক্তির পক্ষেই সম্ভব হবে না। আর এ জন্য মুসলিম সরকার, চিন্তাবিদ ও জনগণের দৃঢ় ঐক্য এবং পারস্পরিক ও সার্বিক সহযোগীতা অপরিহার্য। বিশেষ করে আধ্যাত্মিক শুন্যতার শিকার পশ্চিমা জনগণকে মুক্তির দিশা দেয়া এবং ইহুদিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী মহলে ইসলাম বিদ্বেষী তৎপরতা মোকাবেলার জন্য ইসলামী ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।