ইসলামে মানবাধিকার ও জীবনের অধিকার

পবিত্র কোরআন জীবনের অধিকারকে মানুষের প্রধান অধিকার বলে মনে করে। মানুষের দু’ধরনের জীবন রয়েছে। ক- দৈহিক জীবন ও খ- আধ্যাত্মিক জীবন। কোনভাবেই দৈহিক বা আধ্যাত্মিক জীবন হরণের কোন অধিকার মানুষের নেই। দৈহিক জীবন হরণ হত্যার মাধ্যমে সংঘটিত হয়। কোরআনের দৃষ্টিতে এ কর্ম সমগ্র মানব জাতিকে হত্যার শামিল। তাই বলা হয়েছে,

مَنْ قَتل نفساً بغير نفسٍ أو فسادٍ في الأرض فكأنَّما قتل الناس جميعاً

“যে কেউ প্রাণের বিনিময় (কেসাস) ছাড়া প্রাণ হত্যা অথবা পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করার জন্য কাউকে হত্যা করে সে যেন সব মানুষকেই হত্যা করল।” (-সূরা মায়েদাহ্ : ৩২।)

মানুষের আধ্যাত্মিক জীবন হরণ মানুষকে পথভ্রষ্ট করার মাধ্যমে ঘটে থাকে। যদি কোন ব্যক্তি কাউকে কোনভাবে পথভ্রষ্ট করে, সে তার আধ্যাত্মিক জীবনের বিনাশ সাধন করেছে।

কোরআনের দৃষ্টিতে জীবনের অধিকার আল্লাহর পক্ষ হতে মানুষকে দেয়া হয়েছে। তাই একমাত্র তিনিই এর ওপর অধিকার রাখেন এবং তাঁর অনুমতি ব্যতিরেকে নিজেকে অথবা অন্যকে দৈহিক বা আধ্যাত্মিকভাবে হত্যার অধিকার কেউ রাখে না। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে,অন্যান্য অধিকারের মত জীবনের অধিকারও নিঃশর্ত নয়। মানবাধিকারের দাবিদার প্রায় সকলেই এটি স্বীকার করেন। মানুষের জীবন ততক্ষণ পর্যন্ত সম্মানিত বলে বিবেচিত যতক্ষণ না সে অন্যের জীবনকে হুমকির সম্মুখীন করে। এ কারণেই যদি কোন ব্যক্তি কাউকে হত্যার চেষ্টা করে (উদ্যত হয়),তবে ঐ ব্যক্তিকে হত্যা করা বৈধ বলে সকলেই বিশ্বাস করে। ইসলামে ‘কেসাস’-এর বিধানও মানুষের জীবন রক্ষার জন্য প্রণীত হয়েছে। কোরআন বলেছে,

و لكم في القصاص حياة يا أولي الألباب

“হে বুদ্ধিমানগণ! কেসাসের মধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে জীবন।” (-সূরা বাকারাহ্ : ১৭৯।)

‘কেসাস’-এর শাব্দিক অর্থ হলো সমপরিমাণ বা অনুরূপ। পরিভাষিক অর্থে ‘কেসাস’ হলো বিশেষ অপরাধের ক্ষেত্রে (হত্যা, অঙ্গহানি বা আহত করা) অপরাধীকে অনুরূপ শাস্তি প্রদান করা; যাতে করে যার ওপর অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, আহত বা অঙ্গহানির ক্ষেত্রে স্বয়ং সে এবং হত্যার ক্ষেত্রে তার রক্তের দাবিদার নিকটাত্মীয়গণ আন্তরিক সান্ত্বনা পান এবং তার হৃত অধিকারের এভাবে ক্ষতিপূরণ হয়।

কেসাসের বৈশিষ্ট্যবলী

কেসাসের বৈশিষ্ট্যবলী নিম্নরূপ:

১. কেসাসের বিধানকে ইসলাম ব্যক্তিকেন্দ্রিক হিসেবে ঘোষণা করেছে: ইসলাম-পূর্ব আরবে কেসাসের কোন বিধান ছিল না। তাই যে ব্যক্তির ওপর অপরাধ সংঘটিত হতো তার নিকটাত্মীয়গণ শুধু অপরাধী ব্যক্তিকেই নয়, তার পরিবার, এমন কি গোত্রের ওপর হামলা করত। ফলে এক ব্যক্তির রক্তের বিপরীতে দশ বা শত ব্যক্তির রক্ত ঝরত ও নিহত হতো। এরূপ সমাজে কেসাসের বিধান প্রণয়ন করে ইসলাম শাস্তিকে একমাত্র অপরাধীকেন্দ্রিক ঘোষণা দেয় এবং শত ব্যক্তির জীবন রক্ষা করে। এজন্যই মহান আল্লাহর কথায় কেসাসকে মানুষের জন্য জীবন হিসেবে উল্লিখিত হয়েছে।

২. ইসলামের কেসাস ত্রিবিধানের একটি : রক্তের দাবিদার আত্মীয়গণকে অবশ্যই কেসাস গ্রহণ করতে হবে, তবে তা তিন প্রকার: ক- রক্তের রক্ত গ্রহণ অর্থাৎ এক প্রাণের বিনিময়ে এক প্রাণ গ্রহণ বা যে অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অনুরূপ অংশ হরণ করা। খ-‘দিয়াত’ (রক্তের বিনিময়ে অর্থ বা রক্তপণ) গ্রহণ গ- এমন কি অনেক ক্ষেত্রেই ইসলামী শরীয়তে রক্তের দাবিদারদের অপরাধীকে ক্ষমা করতে উৎসাহিত করা হয়েছে। সূরা বাকারার ১৭৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে :

“...অতঃপর তার ভাইয়ের তরফ থেকে যদি কাউকে কিছুটা মাফ করে দেয়া হয় (এবং কেসাসের বিধান রক্তপণে পরিণত হয়) পছন্দ পথে যেন তার অনুসরণ করে এবং (হত্যাকারী) যেন ভালভাবে তা (রক্তপণ) প্রদান করে (দাবিদারকে)।”

৩. কেসাস ইচ্ছাকৃত হত্যার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যেকোন হত্যার ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয় : মহান আল্লাহ্ কোরআনে বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোন মুসলমানকে ভুলক্রমে হত্যা করে, সে একজন মুসলমান ক্রীতদাস মুক্ত করবে এবং রক্ত বিনিময় সমর্পণ করবে তার স্বজনদেরকে, কিন্তু যদি তারা ক্ষমা করে দেয় তবে তা কতইনা উত্তম। আর যদি নিহত ব্যক্তি তোমাদের শত্রু সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং সে মুসলমান হয়, তবে মুসলমান ক্রীতদাস মুক্ত করবে।”

সুতরাং বোঝা যায়, ভুলক্রমে হত্যার ক্ষেত্রে কোন কেসাস নেই, বরং ভিন্ন বিধান রয়েছে এবং কেসাস ইচ্ছাকৃত হত্যার ক্ষেত্রেই শুধু প্রযোজ্য।

কেসাসকে সহিংস মনোবৃত্তির পরিচায়ক মনে করা চরম ভুল। কারণ কেসাসের বিধান না থাকলে বা কার্যকর না হলে গুরুতর অপরাধীরা নিরাপত্তা বোধ করবে এবং সহস্র ব্যক্তির জীবনকে হুমকির মুখে ঠেলে দেবে,যার প্রমাণ আমরা অহরহ লক্ষ্য করছি। এজন্যই হযরত আলী (আ.) বলেছেন, “আল্লাহ্পাক কেসাসের বিধান প্রণয়ন করেছেন এজন্য যে, এর মাধ্যমে সমাজের মানুষদের জীবন রক্ষিত হয়।”

ইসলামী আইনে আরো কিছু ক্ষেত্রে জীবন নাশের অধিকার দিয়েছে, যেমন (১) সমকামিতা ও কয়েক ধরেনের ব্যভিচার (২) ধর্মত্যাগ।

১. অবৈধ যৌনাচার (সমকামিতা ও ব্যভিচার) : অবৈধ যৌনাচারের অপরাধের মৃত্যুদণ্ডের আইনটি ইসলামী শরীয়তে এ লক্ষ্যে প্রণীত হয়েছে যাতে সামাজিক পবিত্রতা রক্ষিত হয় এবং সমাজ সুস্থভাবে বিকাশ লাভ করতে পারে। বিষয়টির গুরুত্ব পাশ্চাত্য সামাজের দিকে লক্ষ্য করলে আমরা বুঝতে পারব। লক্ষ লক্ষ অবৈধ সন্তান তাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে বর্তমানে একটি বড় সমস্যা।

২. ধর্মত্যাগ : ইসলামে ধর্মত্যাগ একটি বড় অপরাধ হিসেবে পরিগণিত। ধর্মত্যাগ শরীয়তের দৃষ্টিতে ইসলাম ও এর সমাজের প্রতি একটি বিশ্বাসঘাতকতা বা খেয়ানত। এ কর্ম মুসলিম সমাজে ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তিকে দুর্বল করে বিধায় এরূপ ব্যক্তির বিরুদ্ধে রাসূল (সা.) কঠোর নীতি গ্রহণ করে হত্যার নির্দেশ দিয়েছেন। ধর্মত্যাগ যেমন ঘোষণা দানের মাধ্যমে হতে পারে তেমনি ইসলামের প্রতিষ্ঠিত কোন বিধি বা মৌল বিশ্বাসকে অস্বীকারের মাধ্যমেও হতে পারে। ধর্মত্যাগী ব্যক্তিকে ইসলামী পরিভাষায় ‘মুরতাদ’ বলা হয়।

মুরতাদ দু’ধরনের হয়ে থাকে। যথা : মুরতাদে ফেতরী ও মুরতাদে মিল্লী। মুরতাদে মিল্লী হলো যে অন্য ধর্ম হতে ইসলামে প্রবেশ করে পুনরায় সে ধর্মে ফিরে যায় এবং মুরতাদে ফেতরী হলো যে জন্মগতভাবে মুসলিম ছিল,পরবর্তীতে ধর্মত্যাগ করে কাফির হয়েছে। অধিকাংশ ফকীহর মতে এ উভয় ধরনের মুরতাদের জন্য ইসলামের প্রসিদ্ধ নীতি হলো তাদের তওবা করে ইসলামে ফিরে আসার সুযোগ দান করা। কিন্তু ধর্মত্যাগ বা ধর্মের ভিত্তিকে অস্বীকারের তীব্রতা যদি এতটা অধিক হয় যে,ফিরে আসার পথ রুদ্ধ হয়ে যায় তবে সেক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড ভিন্ন পথ থাকে না। এ ধরনের ঘটনার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো সালমান রুশদী যে তার ‘স্যাটানিক ভার্সেস’ গ্রন্থ রচনার মাধ্যমে পবিত্র নবী (সা.)-এর প্রতি চরম অসম্মান দেখিয়েছে। এরূপ ক্ষেত্রে তওবা গ্রহণযোগ্য নয়,বরং ইসলামের অন্যান্য শাস্তি বিধির ন্যায় (যেমন যেনার অপরাধ স্বীকার ও তওবা করার পরও তার হতে বিধি রহিত হয় না) তা অবশ্যই কার্যকর করতে হবে।

মৃত্যুদণ্ডের বিধান : ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে মৃত্যুদণ্ডের বিধানকে অমানবিক বলে রহিত করা হয়েছে। তাদের মতে হত্যাকে হত্যার মাধ্যমে জবাব দান সহিংসতার মাধ্যমে সহিংসতার জবাব দেয়ার শামিল যা কাঙ্ক্ষিত নয়। এ জন্যই ইউরোপীয় দেশগুলোতে এ বিধান নেই,এমন কি আন্তর্জাতিক বিচারালয়ও বসনিয়া,রুয়ান্ডা বা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের যুদ্ধাপরাধীদের (যারা লক্ষ লোকের প্রাণহানির কারণ হয়েছিল) বিচারের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার অধিকারপ্রাপ্ত নয়। তাদের অপর একটি যুক্তি হলো অপরাধীকে সংশোধন করতে হবে,হত্যার মাধ্যমে সংশোধনের পথ রুদ্ধ করা হয়। এর জবাবে বলা যায় যে,প্রথমত মৃত্যুদণ্ড সহিংসতার মাধ্যমে সহিংসতার উত্তর দেয়া নয়। কারণ মানুষখেকো নেকড়ে হত্যা করাকে সহিংসতা বলা যায় না। দ্বিতীয়ত আমরা অপরাধীকে সংশোধিত করব অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পূর্বে,অপরাধ সংঘটিত হবার পর নয়। আমাদের সমাজে সঠিক নৈতিক প্রশিক্ষণের পর্যাপ্ত অভাব রয়েছে,এমন কি কোন কোন ক্ষেত্রে নৈতিক প্রশিক্ষণ তো নেইই;বরং এর বিপরীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী উপাদানসমূহ পর্যাপ্ত পরিমাণে বিদ্যমান। এরূপ সমাজে অপরাধপ্রবণতা হ্রাসের জন্য কঠোর বিধান না থাকলে তা অপরাধীদের গুরুতর অপরাধে উদ্বুদ্ধ করাই স্বাভাবিক। যদি ধরেও নিই আমাদের সমাজে পর্যাপ্ত নৈতিক প্রশিক্ষণ রয়েছে,তদুপরি সমাজে সকল সময়ই একদল জন্মগত অপরাধী (এ অর্থে যে অপরাধপ্রবণতা তাদের মজ্জাগত) রয়েছে যারা এভাবে সংশোধিত হবার নয়। তাই অপরাধীকে সংশোধিত করতে হবে-এ কথা বলে এরূপ অপরাধীদের অপরাধের সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়া যুক্তিযুক্ত নয়,বরং যদি তা করা হয় তাহলে এ ধরনের অপরাধীদের অপরাধে উৎসাহিত করা হবে।

(সূত্র:জ্যোতি,২য় বর্ষ,১ম সংখ্যা)

(চলবে)