কেন হজরত সকিনা (সা.আ.)'র লাশকে পুণরায় কবর থেকে বের করা হয়?

এস, এ, এ

সম্পাদনা: আলহাজ্জ ড. মো. সামিউল হক

মরহুম আয়াতুল্লাহ মোল্লা মোহাম্মাদ হাশেম খোরাসানি লিখেছেন যে, নাজাফ-এ আশরাফের একজন প্রখ্যাত আলেম “শাইখ মোহাম্মাদ আলি শামী” তিনি আমাকে বলেছেন: আমার মায়ের দাদা যার নাম ছিল সৈয়দ ইব্রাহিম দামেস্কি। তাঁর পূর্ব পুরুষ ছিলেন সৈয়দ মোতর্যা। তাঁর বয়স ছিল ৯০ বছর। তাঁর তিনটি কন্যা ছিল। এক রাতে তাঁর বড় কন্যা ইমাম হুসাইন (আ.)'র  কন্যা সকিনা (সা.আ.)কে স্বপ্নে দেখেন। তিনি তাকে বলছিলেন: তুমি তোমার বাবাকে বল তিনি দামেস্কের শাষককে আমার কবরে পানি জমে যাওয়ার বিষয় সম্পর্কে যেন অবগত করেন। কেননা আমার শরির উক্ত পানির কারণে কষ্ট পাচ্ছে এবং দামেস্কের শাষক যেন আমার কবরটিকে সংষ্করণ করে।

সৈয়দ ইব্রাহিমের কন্যা স্বপ্নটি দেখার পরে তার বাবাকে অবগত করে। কিন্তু সৈয়দ ইব্রাহিম আহলে সুন্নাতের ভয়ে স্বপ্নটিকে গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু পরের রাতে তাঁর দ্বিতীয় কন্যা উক্ত স্বপ্নটি দেখে। সেও তার বাবাকে স্বপ্নটি সম্পর্কে অবগত করে। কিন্তু সৈয়দ ইব্রাহিম তারপেরও আহলে সুন্নাতের কথা চিন্তা করে স্বপ্নটিকে গুরুত্ব দেয়নি। পরের রাতে তাঁর কনিষ্ঠ কন্যা একই স্বপ্নটি দেখে এবং তার বাবাকে স্বপ্নটির বিষয়টি সম্পর্কে অবগত করে। অবশেষে চতূর্থ রাতে স্বয়ং সৈয়দ ইব্রাহিম স্বপ্নে দেখেন যে, হজরত সকিনা (সা.আ.) তাকে বলছেন: কেন তুমি দামেস্কের শাষককে আমার কবরে পানি জমার বিষয়টি সম্পর্কে অবগত করছো না?!

সৈয়দ ইব্রাহিম সকালে ঘুম থেকে উঠে দামেস্কের শাষকের কাছে যেয়ে বিষয়টি সম্পর্কে তাকে অবগত করেন। তখন দামেস্কের শাষক শিয়া এবং সুন্নি উভয় মাযহাবের আলেম এবং সৎকর্মশীল লোকদের একত্রিত করে। তিনি নির্দেশ দেন তারা যেন সকলে গোসল করে, পরিষ্কার পোষাক পরিধান করে এবং যার মাধ্যমে মাজারের তালা খুলবে সেই ব্যাক্তি হজরত সকিনা (সা.আ.)এর কবরকে খনন করবে এবং তাঁর পবিত্র লাশকে কবর থেকে বাহির করবে যেন কবরটিকে পুণঃনির্মাণ করা যায়।

উক্ত নির্দেশের পরে শিয়া এবং সুন্নি উভয় মাযহাবের আলেম এবং সৎকর্মশীল লোকজন সকলেই গোসল করে, পরিষ্কার পোষাক পরিধান করে মাজারের কাছে যায়। কিন্তু কেউই মাজারের দরজায় লাগানো তালাটি খুলতে পারে না। অবশেষে সৈয়দ ইব্রাহিম তালাটি খুলতে সক্ষম হন। কিন্তু অন্যান্যরা যখন কবরটি খনন করতে চায় তখন কবরটি কেউ খনন করতে পারে না অবশেষে সৈয়দ ইব্রাহিম কবরটিকে খনন করেন।

অবশেষে মাজারকে চারিদিক থেকে সংরক্ষণ করার পরে কবর কে খনন করা হয়। সৈয়দ ইব্রাহিম দেখেন যে, হজরত সকিনা (সা.আ.)এর পবিত্র লাশ অক্ষত অবস্থায় রয়েছে কিন্তু কবরে অনেক পানি জমে গেছে।

সৈয়দ ইব্রাহিম কবরের মধ্যে নামেন, তিনি কবরের উপরে রাখা পাথরকে সরানোর পরেই তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন। লোকজন তাকে ধরে তোলে। যখন তিনি আবার সংজ্ঞা ফিরে পান। তখন  তিনি ক্রন্দন করে বলতে থাকেন যে, আমরা এতো দিন শুনেছি যে, এজিদ হজরত সকিনা (সা.আ.) এর জন্য গোসল প্রদানকারি নারিদের প্রেরণ করেছিল, তাঁকে কাফন দিয়েছিল এ সবই ছিল মিথ্যা। কেননা হজরত সকিনা (সা.আ.) কে তাঁর পরিহিত পোষাক দ্বারাই দাফন করা হয়েছে। আমি এ লাশকে স্থানান্তর করতে পারবো না কেননা হয়তো পরে বলা হবে যে এটা সকিনা বিনতে হুসাইন (সা.আ.) এর লাশ না। এর দ্বায়িত্ব আমি নিতে পারবো না।

সৈয়দ ইব্রাহিম বলেন: হজরত সকিনা (সা.আ.) লাশ দেখে স্পষ্ট হয় যে তিনি প্রাপ্ত বয়ষ্ক ছিলেন না এবং তাঁর পিঠ এজিদি বাহিনির শতাধিক আঘাতের কারণে কালো হয়ে গিয়েছিল। অবশেষে সৈয়দ ইব্রাহিম হজরত সকিনা (সা.)এর লাশকে একটি কাপড়ে আবৃত করেন এবং তাঁর পবিত্র লাশকে কবরের বাহিরে নিয়ে আসেন। তিনি তিনদিন পর্যন্ত হজরত সকিনা (সা.আ.)এর লাশকে নিজের কোলে আগলে ধরে রাখেন এবং ক্রন্দন করতে থাকেন।

কবর তৈরি না হওয়া পর্যন্ত যখনই নামাজের সময় হতো তখন সৈয়দ ইব্রাহিম হজরত সকিনার লাশকে একটি পবিত্র স্থানে রেখে নামাজ পড়তেন এবং পুণরায় নিজের কোলে আগলে ধরে রাখতেন। হজরত সকিনা (সা.আ.)'র  কারামতের কারণে সৈয়দ ইব্রাহিম তিনদিন পর্যন্ত ক্ষুদা ও তৃষ্ণা অনুভব করেন নি এমনকি তার ওযুও ভঙ্গ হয় নি। সৈয়দ ইব্রাহিম উক্ত তিনদিনে আল্লাহর কাছে দোয়া করেন: আল্লাহ যেন তাকে একটি পুত্র সন্তান প্রদান করেন। আল্লাহ বৃদ্ধ বয়সে তাঁর দোয়া কবুল করেন এবং তিনি এক পুত্র সন্তানের জনক হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন। তিনি তাঁর সন্তানের নাম রাখেন “সৈয়দ মোস্তফা”।

উক্ত ঘটনা সম্পর্কে দামেস্কের শাষক সুলতান আব্দুল মজিদ উসমানিকে অবগত করেন। সুলতান হজরত সকিনা, উম্মে কুলসুম ও রুকাইয়া (সা.আ.)এর মাজারের সংরক্ষণের দ্বায়িত্বে সৈয়দ ইব্রাহিমকে নিয়োজিত করেন।

হজরত সকিনা (সা.আ.)'র কবর খননের ঘটনাটি ১২৪২ হিজরিতে সংঘটিত হয়। সৈয়দ ইব্রাহিম দামেস্কি-এর সন্তানদেরকে “মুস্তাজাবুদ দোয়া” নামে অভিহিত করা হতো। তাঁর সন্তান যখন কোন ব্যাথ্যার স্থানে হাত রাখতো তার হাতের পরশের কারণে ব্যাথ্যা ভাল হয়ে যেত। আর উক্ত বরকতটি তার সন্তানেরা হজরত সকিনা (সা.আ.)এর কারণে অর্জন করেন।