জ্ঞানীদের দৃষ্টিতে বিশ্বনবী (সা.) -২

সঙ্কলনে: ড. মো . সামিউল হক

সুত্র: রেডিও তেহরান

পবিত্র কুরআনে সুরা আম্বিয়ার ১০৭ নম্বর আয়াতে বিশ্বনবী হযরত  মুহাম্মাদ (সা.)-কে বিশ্ববাসীর জন্য রহমত বা মহাকরুণা হিসেবে  উল্লেখ করে বলা হয়েছে:

আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্যে রহমত হিসেবেই পাঠিয়েছি।

সূর্য যেমন বিশ্বকে আলোকিত করে তেম্নি নবী-রাসূলরা আলোকিত করেন মানুষের মন, চিন্তা ও আচরণ। মানব-সভ্যতা মূলত তাদের মাধ্যমেই এগিয়ে যাচ্ছে পূর্ণতার দিকে। মানব সভ্যতার বিকাশ, সমৃদ্ধি ও মানুষের জ্ঞানগত উন্নয়নে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)’র রেখে যাওয়া আলোকিত ঐশী-শিক্ষা। তাঁর মহতী ও আলোকিত শিক্ষার গুণে কুসংস্কারাচ্ছন্ন, বেদুইন এবং রুক্ষ প্রকৃতির আরব জাতি সভ্য, উদার, দয়ালু ও শিক্ষানুরাগী জাতিতে পরিণত হয়।

কোনো এক যুদ্ধে একদল আহত মুসলমান পিপাসা-কাতর অবস্থায় মাটিতে পড়েছিল।  কোনো এক মুজাহিদ আহত সহযোদ্ধাদের জন্য পানি নিয়ে আসলে প্রত্যেকেই পানি পান করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ওই পানি অন্য কোনো আহত ভাইকে দিতে বলে। ফলে তাদের সবাই তৃষ্ণার্ত অবস্থায় শহীদ হন।

ইসলাম জ্ঞান চর্চার ওপর অশেষ গুরুত্ব দেয়ায় মুসলমানরা জ্ঞান-বিজ্ঞানে শীর্ষ স্থান অধিকার করেছিল। ইসলামের সেই সোনালী সভ্যতা নির্মাণে ইরানের  মুসলিম জ্ঞানী-গুণীরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। পূর্ব ও দক্ষিণ ইউরোপও মুসলিম বিজয়ের সুবাদে  উচ্চতর জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোকিত কেন্দ্রে পরিণত হয়। বিশ্বনবী (সা.)’র আলোকিত শিক্ষায় ও পবিত্র কুরআনে জ্ঞান শিক্ষার ওপর ব্যাপক গুরুত্ব আরোপের কারণেই ওই সোনালী সভ্যতা গড়া সম্ভব হয়েছিল।

অথচ মানবতার মুক্তির দূত ও মানবীয় চরিত্রের সর্বোত্তম আদর্শ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)’র অবমাননার ঘটনাও ঘটতে দেখা গেছে যুগে যুগে। কিন্তু অজ্ঞতা ও অন্ধকারের শক্তিগুলোর শত বিরোধিতা ও ষড়যন্ত্র সত্ত্বে বিশ্বনবী (সা.)’র খ্যাতি ও মর্যাদা  দিনকে দিন বাড়ছে এবং তাঁর চির-উজ্জ্বল গুণগুলোর প্রভাবও মানুষের মধ্যে ক্রমেই বাড়ছে।

এমনকি নিরপেক্ষ অমুসলিম বিশ্লেষক, বিশেষজ্ঞ ও পণ্ডিতরাও একবাক্যে বিশ্বনবী (সা.)’র অতুল মহত্ত্বের কথা দ্বিধাহীনভাবে ও মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করেছেন যুগে যুগে।

ঊনবিংশ শতকের বিশিষ্ট জার্মান লেখক, কবি ও রাজনীতিবিদ গ্যাটে বিশ্বনবী (সা.)’র অসাধারণ নানা সাফল্য ও মর্যাদার প্রাচুর্যে বিমুগ্ধ হয়ে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলেছেন,

“আমরা ইউরোপীয়রা আমাদের সব ধ্যান-ধারণা নিয়েও এখনও সেইসব বিষয় অর্জন করতে পারিনি যা অর্জন করেছেন মুহাম্মাদ এবং কেউই তাঁকে কখনও অতিক্রম করতে পারবে না। আমি ইতিহাসে অনুকরণীয় মানুষের সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত খুঁজতে গিয়ে এ ক্ষেত্রে কেবল নবী মুহাম্মাদকেই খুঁজে পেয়েছি; আর এভাবেই সত্য অবশ্যই বিজয়ী হবে ও সর্বশ্রেষ্ঠ আসন গ্রহণ করবে, কারণ, মুহাম্মাদ সারা বিশ্বকে বশ করেছেন স্বর্গীয় বা ঐশী একত্ববাদের বাণীর মাধ্যমে ।”

পাশ্চাত্যের বিশিষ্ট খ্রিস্টান ঐতিহাসিক আর.এফ বুদলি বিশ্বনবী (সা.)’র প্রতি একদল ব্যক্তির নানা অপবাদের নিন্দা জানিয়ে“ মুহাম্মাদ (সা.)’র জীবনী” শীর্ষক বইয়ে লিখেছেন,

“এটা বর্তমান যুগের অন্যতম অদ্ভুত ব্যাপার যে কোনো যুক্তি বা কারণ ছাড়াই বিশ্বের একদল মানুষ মুহাম্মাদ (সা.) সম্পর্কে একই ধরনের কিছু নেতিবাচক সন্দেহ পোষণ করছেন। অথচ মুহাম্মাদ (সা.)’র জীবন খুবই স্পষ্টও স্বচ্ছ। আমি মুহাম্মাদ (সা.)-কেনিয়ে লিখিত একটি বই পড়েছি যেখানে তাঁর বিরুদ্ধে নানা বক্তব্য লেখা হয়েছে। লেখক বইটির বেশকিছু পৃষ্ঠায় অযৌক্তিক ও অন্যায্য বক্তব্য রেখে সেই পৃষ্ঠাগুলোকে কালিমা লিপ্ত করেছেন। অথচ তিনি আমাদেরকে এ ব্যাপারে কী ব্যাখ্যা দেবেন যে এমন একজন মানুষ কিভাবে মানুষের উন্নতির জন্য এমন উন্নত ও  কার্যকর বিধান আনতে পেরেছেন? কিভাবে তিনি একদল মানুষকে এমনভাবে প্রশিক্ষিত করতে পেরেছেন যে তারা খুব কম সময়ের মধ্যেই এমন বিশাল ও গৌরবময় ইসলামী সভ্যতার ভিত্তি গড়ে তুলতে সক্ষম হন এবং প্রাথমিক কিছু পদক্ষেপের সুবাদেই বড় বড় জাতিগুলোকে এই সভ্যতার অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হয়?”

পাশ্চাত্যের বিশিষ্ট খ্রিস্টান ঐতিহাসিক আর.এফ বুদলি আরো বলেছেন, “মরুচারী আরবদেরকে অনুগত করা ছিল মুহাম্মাদ (সা.)’র বড়ধরনের সাফল্যগুলোর মধ্যে অন্যতম। তাঁর এই সাফল্যকে সবচেয়ে বড় অলৌকিক ঘটনাগুলোর সমতুল্য বলা যায়। তিনি এইসব গোত্র ও জাতির মধ্যে বিস্ময়কর একতা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। মুহাম্মাদ (সা.)’র জীবনী নিয়ে চিন্তা করতে গেলে মানুষ তাঁর প্রজ্ঞা বা দূরদৃষ্টি ও বিচক্ষণতা সম্পর্কে অভিভূত হয় এবং তারা মুহাম্মাদ (সা.)-কে এমন এক জীবন্ত মানুষ বলে মনে করেন যাঁর মৃত্যু হবে না কোনো যুগেই ।”

ব্রিটেনের বিখ্যাত ঐতিহাসিক থমাস কার্লাইল মুহাম্মাদ (সা.)’র পবিত্রতা সম্পর্কে একদল গোঁড়া বা অন্ধ-বিদ্বেষী ব্যক্তির অবমাননাকে তাদের যুক্তির দুর্বলতার ফসল বলে মনে করেন। কার্লাইল বলেছেন,

“আজকের যুগের সভ্য মানুষের জন্য এটা খুব বড় রকমের বিচ্যুতি যে, মুহাম্মাদ (সা.) প্রতারক ছিলেন-এমন কথা বিশ্বাস করা। এ ধরনের লজ্জাজনক ও অর্থহীন কথার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার সময় হয়েছে আজ। কারণ, তিনি যে বাণী ও ধর্ম এনেছেন তা শত শত বছর ধরে অত্যুজ্জ্বল প্রদীপের মত আলো বিকিরণ করছে। আমার প্রিয় ভায়েরা! আপনাদের কেউ কি কখনও দেখেছেন একজন মিথ্যাবাদী এমন পরিপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ ধর্ম গড়তে এবং তা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম। স্রস্টার শপথ করে বলছি এ ধরনের অভিযোগ খুবই অদ্ভুত। কারণ, একজন অজ্ঞ ব্যক্তি একটি ঘর নির্মাণেরই ক্ষমতা রাখেন না। আর এমন ব্যক্তি কিভাবে ইসলামের মত একটি ধর্ম মানব সমাজের কাছে উপহার দিতে পারেন?”

কার্লাইল আরো লিখেছেন,

“এটা খুবই বড় ধরনের সমস্যা ও যন্ত্রণাদায়ক ব্যাপার যে বিশ্বের জাতিগুলো যুক্তি ও বুদ্ধিমত্তার ওপর ভর না করেই এ ধরনের বোকামীপূর্ণ অভিযোগ মেনে নিচ্ছেন! আমি বলব, এটা অসম্ভব যে এই মহান ব্যক্তি তথা মুহাম্মাদ (সা.) অবাস্তব কোনো কথা বলেছেন। তাঁর জীবন ইতিহাস থেকেই জানা যায়  তিনি যৌবনকালেই জ্ঞানী ও চিন্তাশীল ছিলেন। মুহাম্মাদের (সা.) জীবনের ভিত্তি ও তাঁর সব কাজ এবং পছন্দনীয় গুণগুলো সত্য ও পবিত্রতা-ভিত্তিক। আপনারা তাঁর বক্তব্যগুলো লক্ষ্য করুন, তাতে কি ঐশী বাণী ও অলৌকিকতা দেখা যায় না? এই মানুষ অস্তিত্বের অসীম উতস (তথা আল্লাহর কাছ) থেকে মানুষের জন্য বাণী বয়ে এনেছেন।  মহান আল্লাহই এই মহান ব্যক্তিকে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা শিখিয়েছেন।”