তথাকথিত আহলে কোরআন সম্পর্কে সাবধান!!

আহলে কোরআন বা কোরআনিস্ট নামে একটি গোষ্ঠী বেশ আগে থেকেই ভারত উপমহাদেশে সক্রিয় ছিলো।  বিংশ শতাব্দীর আশি ও নব্বই-এর দশকে বাংলাদেশের পত্রপত্রিকায়ও এদের কিছু লেখালেখি দেখা যায়।  দৃশ্যতঃ এদের কথাবার্তায় কিছু ভালো দিক আছে।  তাদের কথা হচ্ছে, শুধু কোরআন মানতে হবে; হাদীছ মানা যাবে না, কারণ, হাদীছ অনেক পরে সংকলিত এবং তা কোরআনের মতো অভ্রান্ত নয়।  আমি ঐ সময়ও এদের চরমপন্থী ও একদেশদর্শী অবস্থানের ভুল ধরিয়ে দিয়ে সংশোধনের চেষ্টা করেছি।  আমি বলেছি যে, প্রায়োগিক বিধি-বিধান এবং ছোটখাট বিষয়ে হাদীছের দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই, কারণ, কোরআন মজীদে এ ধরনের বিষয় নেই এবং হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)কে কোরআনের মৌলিক বিধি-বিধানের ব্যাখ্যা ও প্রয়োগেরি এবং প্রায়োগিক বিধি প্রণয়নের দায়িত্ব দেয়া হয়, তবে কোরআনের সাথে সাংঘর্ষিক হাদীছ গ্রহণযোগ্য নয়, তাই বলে ঢালাওভাবে হাদীছ প্রত্যাখ্যান করাও ঠিক নয়।  এরপর অনেক দিন আর পত্রপত্রিকায় এদের তৎপরতা আমার চোখে পড়ে নি।

কিন্তু ফেসবুকের যুগ শুরু হলে এরা ফেসবুকের মাধ্যমে ব্যাপক তৎপরতা শুরু করে।  দৃশ্যতঃ এ গোষ্ঠীটির কোরআন মজীদের কোনো মৌলিক জ্ঞান নেই; তাদের কোরআনের জ্ঞান অন্যদের কৃত অনুবাদ নির্ভর।

এখানে বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার যে, এ গোষ্ঠীটি অত্যন্ত সুচতুরভাবে তাদের উদ্দেশ্য সাধনের অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।  তারা অনেক বিষয়ে কোরআন মজীদের বিভিন্ন বিধি-বিধান বা বিষয়ের সপক্ষে অত্যন্ত জোরালোভাবে লেখালেখি করে অজ্ঞ মুসলমানদের মধ্যে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে এবং এ ধরনের কতোগুলো সঠিক খেদমতের মাঝে তাদের বিভ্রান্তিকর মতগুলো ছেড়ে দেয় যার লক্ষ্য মুসলমানদের মধ্যে ইসলাম সম্পর্কে বিদ্যমান মতপার্থক্য দূরীকরণ তো নয়ই, বরং মতৈক্যের বিষয়গুলোকেও বিতর্কিত করা।  এভাবে তারা জ্ঞাতসারেই হোক বা অজ্ঞাতসারেই হোক, ইসলামের দুশমনদের উদ্দেশ্য সাধনে নিয়োজিত রয়েছে।

ফেসবুকের তৎপরতায় এদের বক্তব্যে কতোগুলো নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে।  তা হচ্ছে, এরা ঢালাওভাবে হাদীছ অস্বীকার করেই ক্ষান্ত থাকে নি, বরং কোরআন মজীদের বিভিন্ন আয়াতের এমন মনগড়া ব্যাখ্যা করছে যা শিয়া-সুন্নী নির্বশেষে সমগ্র মুসলিম উম্মাহর অভিন্ন মতের সাথে সাংঘর্ষিক।

‘ইসলামী জ্ঞানচর্চার নতুন বিন্যাস’ শিরোনামে আমার একটি প্রবন্ধ ইতিপূর্বে ফেসবুকে নোট আকারে প্রকাশিত হয়।  প্রবন্ধটির বিষয়বস্তু আরও আগে আমার কতক লেখায় ও বিভিন্ন সময় আলোচনায় বিক্ষিপ্তভাবে উপস্থাপিত হয়েছিলো, তবে উক্ত প্রবন্ধে সংক্ষেপে সুবিন্যস্তভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করি।  এতে আমি যা বলেছি তার সংক্ষিপ্তসার হচ্ছে এই যে, ইসলামের অকাট্য জ্ঞানসূত্র চারটি, তা হচ্ছে সর্বজনীন সুস্থ আক্বল্, কোরআন মজীদ, মুতাওয়াতির্ হাদীছ ও ছ্বাহাবীদের যুগ থেকে চলে আসা উম্মাহর সর্বসম্মত মত ও আমল; আক্ব্বাএদের মূলনীতি ও শাখা-প্রশাখা সমূহ এবং ফরয ও হারাম সমূহ এ চার সূত্র থেকে গ্রহণ করতে হবে, অতঃপর প্রায়োগিক বিষয়াদি এবং মুস্তাহাব ও মাকরূহ সম্পর্কে উপরোক্ত চার দলীলের কোনোটির সাথে সাংঘর্ষিক না হওয়া সাপেক্ষে কম সূত্রে বর্ণিত (খবরে ওয়াহেদ) হাদীছ থেকে গ্রহণীয়। এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, অমুসলিমদের কাছে তাওহীদ, আখেরাত ও নবুওয়াতে মুহাম্মাদী (ছ্বাঃ)-এর দাওআত কেবল সর্বজনীন সুস্থ বিচারবুদ্ধি (‘আক্বলে সালীমে ‘উমুমী)-এর আলোকেই দেয়া প্রয়োজন (এবং কোরআন মজীদেও এভাবেই দাওআত দেয়া হয়েছে)।

আমি তথাকথিত আহলে কোরআন বা কোরআনিস্টদের সামনে এ বিষয়টি পেশ করে তাদের ভুল সংশোধনের চেষ্টা করি। কিন্তু এ পর্যায়ে তাদের জবাব থেকে জানা যায় যে, তারা কেবল হাদীছই অস্বীকার করে না, সর্বজনীন সুস্থ আক্বল-কেও অস্বীকার করে – যার সাহায্যে তারা কোরআন মজীদের সম্পূর্ণ মনগড়া ব্যাখ্যা করার পথ উন্মুক্ত রাখার অপচেষ্টা চালায়।

বস্তুতঃ সর্বজনীন সুস্থ ‘আক্বল্ এবং মুতাওয়াতির্ বর্ণনা বা সর্বসম্মত বর্ণনা গ্রহণ না করলে কোরআন মজীদেরই গ্রহণযোগ্যতা থাকে না। কারণ, এতদ্ব্যতীত কোরআনের আল্লাহর কিতাব হওয়া সম্পর্কে ইয়াক্বীন্ হওয়া তো দূরের কথা, এটি যে, আল্লাহর কিতাব্ হিসেবে দাবী করে হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ) রেখে গিয়েছেন সে ব্যাপারেই ইয়াক্বীন্ সৃষ্টি হওয়া সম্ভব নয়। কারণ, ঐ ব্যক্তিদের হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ হয় নি এবং তারা তাঁর কাছ থেকে কোরআন কপি করে নিয়ে আসে নি।

কোরআন যে হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)-এর কাছ থেকে ব্যাপকভিত্তিক পরম্পরা বর্ণনা (মুতাওয়াতির বর্ণনা) থেকে প্রাপ্ত ও এর পাঠ (Text - متن) সর্বসম্মত - এ সত্যের গ্রহণযোগ্যতা প্রত্যাখ্যান করলে কোনো প্রকাশক কর্তৃক মুদ্রিত কোরআন যে তাঁর পেশকৃত সেই কোরআনেরই কপি সে ব্যাপারে ইয়াক্বীন্ (বিশ্বাস) সৃষ্টি হওয়া সম্ভব নয়। হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ) ‘উত্তমগুলোকে’ হালাল করেন ও ‘নোংরাগুলোকে’ হারাম করেন বলে ঘোষণা করেছে, এর মানে এই যে, আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁকে কতক শর‘ঈ বিধান তৈরীর এখতিয়ার দেন, মুতাওয়াতির বর্ণনা ও উম্মাহর মতৈক্য হচ্ছে সে সব বিধানের তথা সুন্নাতে রাসূলের (ছ্বাঃ) সর্বাধিক অকাট্য সূত্র।  সুতরাং, মুতাওয়াতির্ হাদীছ ও ইজমা‘এ উম্মাহকে প্রত্যাখ্যান করে কোরআন মজীদের যথার্থ অনুসরণ ও সঠিক তাৎপর্য গ্রহণ সম্ভব নয়।

অন্যদিকে কোরআন মজীদে অমুসলিমদের নিকট ‘আক্বলী দলীলের ভিত্তিতে তথা যুক্তি উপস্থাপন করে তাওহীদ, আখেরাত, নবুওয়াতে মুহাম্মাদী (ছ্বাঃ) ও কোরআনের প্রতি ঈমান আনার জন্য দাও‘আত্ দেয়া হয়েছে, ‘আক্বল্-এর প্রয়োগের জন্য কোরআনে বার বার তাকিদ্ করা হয়েছে এবং যারা ‘আক্বল্ কাজে লাগায় না তাদেরকে চতুষ্পদ জন্তুর সাথে তুলনা করা হয়েছে।

তথাকথিত আহলে কোরআন-এর কেউ্ কেউ এ যুক্তির এক হাস্যষ্কর জবাব দিয়েছে।  তারা “‘আক্বলে কোরআনী” নামে এক অদ্ভুত পরিভাষা আবিষ্কার করেছে - যা কোরআন মজীদে নেই, যদিও তারা কোরআন মজীদের বাইরে কোনো কিছু মানার পক্ষপাতী নয় বলে দাবী করে থাকে।  তাদের বক্তব্য হচ্ছে এই যে, কোরআন মজীদে সেই ‘আক্বলের কথা বলা হয়েছে যে ‘আক্বল্ কোরআনের প্রভাবে তৈরী হয়েছে।

যখন বলা হয় যে, কোরআন যখন নাযিল হয় এবং তা লোকদের ‘আক্বল্-এর সামনে পেশ করা হয় তখন অবশ্যই তা সর্বজনীন সুস্থ ‘আক্বল্-এর সামনে পেশ করা হয়, কারণ, তখন “‘আক্বলে কোরআনী” নামে কোনো কিছুর অস্তিত্ব থাকা সম্ভব নয়, তখন জবাবে তাদের বক্তব্য হচ্ছে এই যে, “কোরআন” মানে ‘পঠনীয়’, সুতরাং অতীতে যতো কিতাব্ ও ছ্বহীফাহ্ আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিল হয়েছিলো তার সবই কোরআন, আর সেগুলোর প্রভাবে লোকদের মধ্যে যে ‘আক্বল্ গড়ে ওঠে তা-ও “‘আক্বলে কোরআনী”।

কিন্তু তাদেরকে যখন বলা হয়, আল্লাহ্ তা‘আলা তো কোরআনের পাশাপাশি তাওরাত, ইঞ্জিল্ ও যাবূর-এর নাম উল্লেখ করেছেন, সুতরাং এগুলোও যদি “কোরআন” হয়ে থাকে অর্থাৎ “কোরআন” যদি বিশেষ নাম (Proper Noun/ Name) না হয়ে সাধারণ নাম (Commom Noun/ Name) হয়ে থাকে তাহলে বর্তমানে যা কোরআন হিসেবে পরিচিত এই কোরআনে তার একটি আলাদা ‘বিশেষ নাম’ (Proper Noun/ Name) নেই কেন এবং কেন এটিকে বার বার “কোরআন” বলে উল্লেখ করা হয়েছে? তখন তারা এর জবাব এড়িয়ে যায়।

অধিকন্তু অতীতের সমস্ত মানুষই যে কোনো না কোনো আসমানী কিতাবের দ্বারা প্রভাবিত ছিলো তাদের এ দাবী একটি কোরআন বিরোধী দাবী। কারণ, আল্লাহ্ তা‘আলা হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)কে সাধারণভাবে সমগ্র মানব প্রজাতিকে এবং বিশেষভাবে সেই জনগোষ্ঠীকে সতর্ক করার জন্য দায়িত্ব প্রদান করেছেন যাদের পূর্বপুরুষদেরকে সতর্ক করা হয় নি (قَوْمًا مَا أُنْذِرَ آبَاؤُهُمْ - সূরাহ্ ইয়া-সীন্ : ৬)। সুতরাং “‘আক্বলে কোরআনী’ পরিভাষা যেমন মনগড়া তেমনি তার ব্যাখ্যাও মিথ্যা।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, মানুষের সর্বজনীন সুস্থ ‘আক্ব্ল্ যে সব কাজকে করণীয় ও বর্জনীয় (ইসলামী পরিভাষা অনুযায়ী ফরয/ওয়াজিব্ ও হারাম) বলে অকাট্য রায় প্রদান করে সেগুলো অবশ্যই ফরয ও হারাম বলে পরিগণিত হবে, তা সেগুলোর ফরয/ওয়াজিব্ ও হারাম হওয়ার কথা কোরআন মজীদে উল্লেখ থাক বা না-ই থাক। উদাহরণস্বরূপ, সর্বজনীন সুস্থ ‘আক্ব্ল্ পিতা-মাতাকে প্রহার করাকে গুরুতর ধরনের বর্জনীয় কাজ বলে গণ্য করে। সুতরাং কোরআন মজীদে তা উল্লেখ না থাকা সত্ত্বেও ইসলামে তা হারাম বলে পরিগণিত।  অবশ্য কোরআন মজীদে পিতা-মাতাকে ধিক্কার দিতে ও তাঁদের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করতে (যেমন : বিরক্তিসূচক “উফ্” শব্দও উচ্চারণ করতে) নিষেধ করা হয়েছে, তবে এ নিষেধ থেকে কেউ হারাম অর্থ গ্রহণ না করে মাকরূহ্ অর্থও গ্রহণ করতে পারে, কিন্তু ‘আক্বলের কাছে নিন্দনীয় ও নিষিদ্ধ হওয়ায় তার পক্ষে কোরআনে না থাকার যুক্তিতে পিতামাতাকে প্রহার করাকে স্রেফ্ মাকরূহ্ গণ্য করা সম্ভব নয়।  আর পিতা-মাতার প্রতি বিরক্তিসূচক শব্দ উচ্চারণকে হারাম গণ্য করে তার ভিত্তিতে যদি বলা হয় যে, যেহেতু মন্দ কাজটি হারাম সেহেতু একই ক্ষেত্রে অধিকতর মন্দ কাজটি অবশ্যই হারাম, তাহলে তা বিচারবুদ্ধি (‘আক্ব্ল্)-এর দ্বারা হারাম প্রমাণের যথার্থতাকেই প্রমাণ করে, কারণ, যুক্তি হচ্ছে ‘আক্বল্-এর হাতিয়ার এবং যা কোরআনে নেই কোরআনের আয়াতের ভিত্তিতে যুক্তি প্রয়োগ করে তা-ই উদ্ঘাটন করা হলো।  এ থেকে কোরআনের ব্যাখ্যায় ‘আক্বল্-এর ভূমিকার গ্রহণযোগ্যতাও প্রমাণিত হলো।

এ কারণে সুস্থ ‘আক্ব্ল্-কে শর‘ঈ বিধানের আবিষ্কারক বলেও অভিহিত করা হয়। বিশেষ করে যাদের কাছে নবুওয়াতের দাও‘আত্ ইতমামে হুজ্জাত্ পর্যায়ে পৌঁছে নি, তাদের জন্য ‘আক্বলের হুকুম অনুযায়ী আমল ও আচরণ করা ফরয (সুতরাং তাদেরকে এই ‘আক্ব্ল্-এর মানদণ্ডেই বিচার করা হবে) - এ বিষয়টি কোরআন মজীদ থেকেও প্রমাণিত হয়।

কোরআন ও ‘আক্ব্ল্ থেকে পথনির্দেশ গ্রহণের বেলায় কতক ক্ষেত্রে আমাদের অক্ষমতাকে মুতাওয়াতির্ হাদীছ ও ইজমা‘এ উম্মাহ্ দ্বারা পূরণ করতে হবে।

এখানে উপরোক্ত চার অকাট্য দলীলের ক্রম ও ভূমিকা সম্পর্কে উল্লেখ করতে হয় যে, যেহেতু সর্বজনীন সুস্থ ‘আক্ব্ল্ হচ্ছে আস্তিক-নাস্তিক নির্বিশেষে সমস্ত মানুষের কাছে গ্রহণীয় একমাত্র সর্বজনীন জ্ঞানসূত্র ও অন্য সমস্ত তথ্যসূত্র থেকে অর্জিত তথ্যসমূহের যথার্থতা ও অযথার্থতা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মানদণ্ড এবং ইসলামগৃহে প্রবেশের দরযাহ্, সেহেতু ক্রমের দিক থেকে এর স্থান অন্য সমস্ত জ্ঞানসূত্রের আগে। কারণ, যখন কোরআন মজীদ, এমনকি পূর্ববর্তী অন্যান্য আসমানী কিতাবও নাযিল হয় নি তখনো মানুষের মধ্যে ‘আক্ব্ল্-রূপ জ্ঞানসূত্র বিদ্যমান ছিলো। তাই ক্রমের দিক থেকে ‘আক্বলের পরবর্তী স্থান হচ্ছে যথাক্রমে কোরআন, মুতাওয়াতির্ হাদীছ ও ইজমা‘এ উম্মাহ্র।

কিন্তু প্রায়োগিক ক্ষেত্রে এ চার সূত্রের ভূমিকার ধরনের মধ্যে পার্থক্য আছে। ‘আক্ব্ল্ তার সহজাত জ্ঞান ও পর্যালোচনাশক্তির দ্বারা ‘আক্বাএদের তিন মূলনীতি সম্পর্কে অকাট্য উপসংহারে উপনীত হয় এবং সহজাত জ্ঞানের দ্বারা ভালোমন্দের (করণীয় ও বর্জনীয়) কতক বিষয় সম্বন্ধে অকাট্যভাবে অবগত হয়, কিন্তু ‘আক্বাএদের শাখা-প্রশাখা সমূহ এবং বেশীর ভাগ করণীয় ও বর্জনীয় (ফরয ও হারাম) সংক্রান্ত জ্ঞানের ক্ষেত্রে কোরআন মজীদই হচ্ছে একমাত্র জ্ঞানসূত্র। তবে কোরআন মজীদ থেকে সঠিক তাৎপর্য গ্রহণের ক্ষেত্রে ‘আক্বলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তা হচ্ছে :

প্রথমতঃ ‘আক্ব্ল্ কোরআন মজীদ থেকে এমন কোনো তাৎপর্য গ্রহণে বাধা দেয় যা তার দ্বারা গৃহীত তাওহীদ, আখেরাত্ ও নবুওয়াত্ সংক্রান্ত জ্ঞানের (যার ভিত্তিতে সে এগুলো গ্রহণ করেছে) ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে [উদাহরণস্বরূপ, নবী-রাসূলগণের (‘আঃ) পাপমুক্ততাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে]।  দ্বিতীয়তঃ ‘আক্ব্ল্ অন্যান্য ক্ষেত্রেও কোরআন মজীদ থেকে তাৎপর্য গ্রহণে সহায়তা করে, বিশেষ করে কোনো বিষয়ে তাৎপর্য গ্রহণে মতপার্থক্য ঘটলে ‘আক্ব্ল্-এর দৃষ্টিতে যে মতটি অধিকতর গ্রহণযোগ্য তা গ্রহণের পক্ষে রায় প্রদান করে।

কোরআন মজীদ থেকে কোনো কোনো বিষয়ে সঠিক তাৎপর্য গ্রহণে ব্যর্থতা, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্বপূর্ণ প্রায়োগিক বিষয়াদির ক্ষেত্রে পরিপূরক হিসেবে সুন্নাতে রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ) থেকে সাহায্য নিতে হবে - এ ব্যাপারে দ্বিমতের অবকাশ নেই। আর, কোনো বিষয় রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর অনুসৃত নীতি কিনা সে সম্পর্কে অকাট্য প্রত্যয়ে উপনীত হওয়া সম্ভব যদি সে ব্যাপারে কোরআন মজীদে কোনো আভাস থাকে অথবা তা মুতাওয়াতির্ হাদীছ্ বা ইজমা‘এ উম্মাহ্ থেকে প্রমাণিত হয়। বলা বাহুল্য যে, কোনো মুতাওয়াতির্ হাদীছের ‘আক্ব্ল্ বা কোরআনের সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ার আশঙ্কা নেই।

যা-ই হোক, মোদ্দা কথা, এই তথাকথিত আহলে কোরআন বা কোরআনিস্ট গোষ্ঠী সর্বজনীন সুস্থ আক্বল্, মুতাওয়াতির হাদীছ ও ইজমাএ উম্মাহ্ প্রত্যাখ্যান করে কোরআন মজীদের মনগড়া ব্যাখ্যা করার পথ পরিষ্কার করে। এরপর তারা কোরআন মজীদ থেকে সমগ্র উম্মাহর অভিন্ন মতের বরখেলাফে এমন কতক মনগড়া ব্যাখ্যা করে যা বিস্ময়কর। এ সব মনগড়া ব্যাখ্যার মধ্যে রয়েছে : নবী-রাসূলগণ (‘আঃ) গুনাহ্ থেকে মুক্ত ছিলেন না, রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ) নিরক্ষর ছিলেন না, ‘আালামে বারযাখের শাস্তি ও পুরষ্কার মিথ্যা (মৃত্যু ও পুনরুত্থানের মাঝে আর কিছুই নেই), বাক্কাহ্ মানে মক্কাহ্ নয় ও মসজিদুল হারাম মক্কায় নয়, বরং এতদুভয় সীনাই-তে অবস্থিত, ইসরা’ (এক রাতে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আক্ব্ছ্বা পর্যন্ত সফর) করানো হয়েছিলো হযরত মূসা (‘আঃ)কে, কোরবানীর ঘটনা হযরত ইসহাক্ব্ (‘আঃ)-এর সাথে সংশ্লিষ্ট, ছ্বালাত পাঁচ ওয়াক্ত নয় বরং দুই ওয়াক্ত, কোরআনে রুকূ‘-সিজদাহর কথা থাকলেও ছ্বালাতের সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই, বা রুকূ‘-সিজদাহ্ বিহীন “ছ্বালাতে দায়েমী” (?!) ক্বায়েম করা ফরয (পাঁচ ওয়াক্তে সতর রাক্‘আত্ নয়), ...।

এ থেকেই সুস্পষ্ট যে, এ ধরনের অভিমত কোনো মুসলমানের হতে পারে না, বরং এরা সজ্ঞানে বা অজ্ঞানে ইসলামের দুশমনদের বিশ্বব্যাপী ইসলাম-বিরোধী ষড়যন্ত্রেরই বাস্তবায়নে নিয়োজিত রয়েছে।

অবশ্য এদের এ সব মতামত যখন যেখানে যা চোখে পড়েছে অকাট্যভাবে খণ্ডন করেছি এবং এখানে তার বিস্তারিত পুনরুক্তির প্রয়োজন নেই। পা ঠক-পাঠিকাগণ যাতে সহজে এদেরকে মোকাবিলা করতে পারেন সে লক্ষ্যে এখান এ সম্পর্কে সংক্ষেপে উল্লেখ করছি।

০ আল্লাহ্ তা‘আলা রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ) সম্বন্ধে এরশাদ করেছেন : يُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ - “তিনি তাদের জন্য উত্তম সমূহকে হালাল করে দেন এবং তাদের জন্য নোংরা সমূহকে হারাম করে দেন।” (সূরাহ্ আল্-আ‘রাফ্ : ১৫৭) এ থেকে সুস্পষ্ট যে, তাঁকে বিস্তারিত বিধান প্রণয়নের এখতিয়ার দেয়া হয়েছিলো এবং সে ক্ষেত্রে তাঁর প্রণীত বিধান সমূহ হাদীছ থেকে জানা যায়।

এ ক্ষেত্রে তাদের কেউ কেউ মনগড়াভাবে দাবী করেছে যে, এখানে এটাই বলা হয়েছে যে, তিনি কোরআনে বর্ণিত হালাল-হারাম ঘোষণা করেন। কিন্তু “হালাল-হারাম করেন” ও “হালাল-হারাম ঘোষণা করেন” কি এক কথা?

০ হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ) কেবল বার্তাবাহক ছিলেন না, তিনি কোরআন অনুযায়ী হুকুমাতও করেছেন। আল্লাহ্ তাআলা এরশাদ করেন : إِنَّا أَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِتَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ بِمَا أَرَاكَ اللَّهُ - “অবশ্যই আমি আপনার প্রতি এ গ্রন্থ নাযিল করেছি যাতে আপনি লোকদের মধ্যে হুকূমাত (বিচার-ফয়ছ্বালাহ্) করেন সেভাবে যেভাবে আল্লাহ্ আপনাকে প্রদর্শন করেছেন।।” (সূরাহ্ আন্-নিসা’ : ১০৫) রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ) কীভাবে বিচার-ফয়ছ্বালাহ্ করেছেন তা (যেমন : হত্যা প্রমাণের জন্য ক’জন সাক্ষী লাগবে তা) হাদীছ থেকে জানা যায়।

০ মুসলমান পুরুষদের খাতনাহর বিধান কোরআন মজীদে নেই; এটা কেবল হাদীছ থেকেই পাওয়া যায়।

০ সূরাহ্ আল্-মাএদাহর ৬ নং আয়াত অনুযায়ী পানি পাওয়া অবস্থায় (ও তা ব্যবহারে সমস্যা না থাকা অবস্থায়) পায়খানা ও যৌনসংসর্গের ক্ষেত্রে পানি দ্বারা পবিত্রতা হাছ্বিল করতে হবে। এ ক্ষেত্রে হাদীছ থেকে প্রমাণিত যে, যৌন সংসর্গের ক্ষেত্রে কেবল নাপাক বস্তু অপসারণ করে শরীরের সংশ্লিষ্ট অংশ ধৌত করাই যথেষ্ট নয়, বরং পুরো শরীর ধৌত করতে হবে।

০ মানুষের পায়খানায় পুষ্টি আছে বলেই কুকুর তা ভক্ষণ করে, কিন্তু মানুষের জন্য তা ভক্ষণ করা হারাম।  এটা আক্বলী দলীলের ও হাদীছের ভিত্তিতে হারাম, কোরআনে এর হারাম হওয়ার কথা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ নেই।

এ তথাকথিত আহলে কোরআন বা কোরআনিস্টদের মধ্যে যারা অজ্ঞতাবশতঃ এ ইসলাম-বিরোধী মিশনে নিয়োজিত রয়েছে, আমরা আশা করবো, আমাদের এ বক্তব্যের পর তারা এ পথ থেকে সঠিক পথে ফিরে আসবে, আর যারা ফিরবে না তারা যে, জ্ঞাতসারেই ইসলামের দুশমনদের ভাড়াটে এজেন্ট হিসেবে কাজ করছে সে সম্পর্কে সন্দেহের অবকাশ নেই।

লেখক: নুর হোসেন মজিদী (১৬ই নভেম্বর ২০১৭)

সম্পাদক: আলহাজ্ব ড. মো. সামিউল হক