দোয়ার প্রতিফলসমূহ

মহান আল্লাহ মানুষ জাতিকে অতীব মর্যাদা দান করেছেন। তিনি বলেনঃ “নিশ্চয় আমি আদম-সন্তানকে অতি মর্যাদা দান করেছি।” [বনি ইসরাইলঃ ৭০।] এ মর্যাদার একটি হ’ল মানুষকে মহা-পরাক্রমশালী স্রষ্টা নিজের সাথে কথোপকথনের অনুমতি দিয়েছেন। প্রতিপালকের সাথে কথা বলার অনুমতি নি:সন্দেহে একটি শ্রেষ্ঠ মর্যাদা যা মানুষ লাভ করেছে। পবিত্র কুরআনে সুরা বাকারা’র ১৮৬ নম্বর আয়াতে দয়াময় প্রভু বলেন:

“আর আমার বান্দারা যখন আমার সম্পর্কে তোমার কাছে জিজ্ঞাসা করে, [তখন বল] আমি তাদের অতি নিকটে। প্রত্যেক আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দিয়ে থাকি যখন সে আমাকে ডাকে।” আমরা অতিশয় দুর্বল। প্রতিটি মূহুর্তেই প্রতিটি কাজেই তাঁর সাহায্য ও সহানুভুতির মুখাপেক্ষী। তাই তাঁকে কিভাবে ডাকলে তিনি আমাদের আহ্বানে সাড়া দিবেন তা আমাদের জানা একান্ত প্রয়োজন। আমরা বিভিন্ন প্রয়োজনে প্রায়ই মহা-মর্যাদাবান আল্লাহকে ডেকে থাকি, তাঁর কাছে অনেক মিনতি জানিয়ে থাকি কিন্তু সেসব আহ্বানের সাড়া পেয়ে থাকি কিনা সে সম্পর্কে আমরা নিশ্চিত নই। তাহলে কিভাবে প্রার্থনা করলে তিনি আমাদের দোয়ায় সাড়া দিবেন?

দোয়ার গুরুত্ব বর্ণনায় পবিত্র কুরআনের এ একটি আয়াতই যথেষ্ট যে, মহান আল্লাহ বলেন:

“[হে নবী আপনি] বলুন! বলুন, আমার পালনকর্তা পরওয়া করেন না যদি তোমরা দোয়া না কর। কিন্তু জেনে রাখ তোমরা যে মিথ্যা বলেছ সেজন্য সত্বর নেমে আসবে অনিবার্য শাস্তি।” (ফোরকান/৭৭) অতএব মানব জাতি খোদাকে ডাকার মধ্য দিয়ে তার মর্যাদা লাভ করেছে। তাই সে যদি প্রভুকে ডাকা বা তাঁর নিকট প্রার্থনা থেকে বিরত থাকে তাহলে সে এক মর্যাদাহীন অস্তিত্বে পরিণত হবে। দোয়ার ফযিলত বর্ণনা করতে মহানবী (সঃ) বলেন: সর্বোত্তম ইবাদত হল দোয়া; যখন প্রভু তার বান্দাকে দোয়া করার অনুমতি দেন সাথে সাথেই তার প্রতি রহমতের দ্বার উন্মোচিত হয়ে যায়। যে ব্যক্তি সব সময় মুনাযাত করে সে কখনো ধ্বংস হয় না। [মিযানুল হিকমাহ্, ২খন্ড, ৮৬৯পৃঃ।] মহানবী (সঃ) আরো বলেন: “সমস্ত প্রকারের কল্যাণকর কাজ সম্পূর্ণ ইবাদতের অর্ধেক আর দোয়া এককভাবেই বাকী অর্ধেক। আর প্রভু যখন কোন বান্দাকে কল্যাণ দান করতে চান তখন তার অন্তরকে মুনাযাত করার আগ্রহে উদ্বেলিত করে তোলেন ।” [কানযুল উম্মাল ২খন্ড, ৬৫ পৃঃ।]

ইমাম জাফর সাদিক (আঃ)-কে প্রশ্ন করা হ’ল, “দু’জন ব্যক্তি একই সাথে মসজিদে প্রবেশ করল এবং একই সময়ে নামায পড়া শুরু করল, অতঃপর নামায শেষে একজন কুরআন পড়া শুরু করল এবং আরেক জন দোয়া করতে শুরু করলো; সবশেষে দু’জন একই সাথে মসজিদ ত্যাগ করল। এখন তাদের মধ্যে কোন ব্যক্তি অধিক উত্তম কাজ করল?” ইমাম (আঃ) বললেন: “প্রত্যেকের কাজ ফজিলতপূর্ণ এবং উভয়ই কল্যণকর কাজ করেছেন।” তখন বলা হ’ল: “জানি, তবে প্রশ্ন হল কে অধিক উত্তম কাজ করলেন?” তিনি বললেন: “দোয়া অধিক উত্তম। তোমরা কি প্রভুর এ কথাটি শোন নি যে, ‘তোমাদের পালনকর্তা বলেন, তোমরা আমাকে ডাক আর আমি তোমাদের প্রার্থনা মঞ্জুর করব। আর যারা আমার ইবাদতে অহংকার করে তাদেরকে সত্ত্বরই লাঞ্ছিত অবস্থায় জাহান্নামে প্রবেশ করানো হবে।’ (আল-কোরআন, ৪০:৬০)। খোদার শপথ! দোয়া উত্তম। খোদার শপথ! দোয়া উত্তম। দোয়া কি ইবাদত নয়? দোয়া কি অধিক শক্তিশালী নয়? খোদার শপথ! দোয়া অধিক শক্তিশাল। খোদার শপথ! দোয়া অধিক শক্তিশালী। খোদার শপথ! দোয়া অধিক শক্তিশালী। [তাহজীবুল আহকাম, ২খন্ড, ১০৪ পৃঃ; বিহারুল আনোয়ার, ৯০ খন্ড, ২৯২ পৃঃ।]

১. ভাগ্যের পরিবর্তন

দোয়ার প্রতিফলসমূহের মধ্যে একটি হ’ল মহান প্রভু কোন ব্যক্তির জন্য যে ভাগ্য নিধারণ করেছেন তার পরিবর্তন। উদাহরণ স্বরূপ যদি কোন বান্দার আয়ূ ৩০ বছর লিপিবদ্ধ হয়ে থাকে, দোয়ার বরকতে ঐ আয়ূ ৬০ বছর অথবা তার অধিক বছরে পরিবর্দ্ধিত হ’তে পারে। অথবা কোন ব্যক্তির নাম নি:সন্তান ব্যক্তির খাতায় অথবা গরীবদের খাতায় লিপিবদ্ধ ছিল। সে তার দোয়ার বরকতে প্রভুর ঐ নির্ধারিত হুকুম পরিবর্তন করতে পারে। এ ক্ষমতা মহান প্রভুই মানুষকে দিয়েছেন। অবশ্য জেনে রাখা দরকার যে, প্রতিটি মানুষের ভাগ্য তিনটি স্তর পার হয়। স্তর তিনটি হ’ল, (এক) কারো জন্যে ভাগ্যের (কাদ্র) পরিমাণ নির্ণয় করা, (দুই) তার জন্যে ভাগ্য নির্ধারণ (ক্বাদা) করা এবং (তিন) তাতে প্রভুর স্বাক্ষর (আমদা) দান। উল্লেখিত তিনটি ক্রমপর্যায়ের দ্বিতীয় স্তর পর্যন্ত পরিবর্তন করা সম্ভব। তাই রেওয়ায়েতে ক্বাদা নামক ভাগ্য পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। [উসূলে ক্বাফী, ২খন্ড, ৪৬৯ পৃঃ।]

২. বিপদ থেকে রক্ষা

প্রার্থনার প্রতিফলসমূহের আরেকটি হ’ল বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া। মানুষ তার কর্মের ফলে যেসব বিপদাপদ নিজের জন্য নির্ধারণ করে অথবা অন্য কোন কারণে তার উপর যে বিপদ আসে, দোয়ার মাধ্যমে তা থেকে সে রক্ষা পেতে পারে। এ প্রসঙ্গে মহানবী (সঃ) বলেন: “তোমাদের উচিত দোয়া করা। কেননা আল্লাহর দরবারে বিপদ মুক্তির প্রার্থনা, ঐসব বিপদ যা তার জন্য নির্ধারিত হয়েছিল শুধু স্বাক্ষর বাকী ছিল, তা পরিবর্তন করে। তাই যখনই প্রভুর কাছে বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য দোয়া করা হয় তখন তিনি একবারেই তা পরিবর্তন করে দেন।” [ আল্ ক্বাফী ২খন্ড, ৪৭০পৃঃ।]

৩. জীবিকার পরিবৃদ্ধি

মহান আল্লাহর হাতেই পৃথিবীর সকল প্রাণীর জীবিকা। তাই একমাত্র তিনিই পারেন কোন জীবের জীবিকা কম বেশী করতে। এ প্রসঙ্গে মহানবী (সঃ) বলেন: “‘তোমাদেরকে এমন কোন হাতিয়ারের কথা জানাব যা শত্রুর বিপদ থেকে রক্ষা করে এবং জীবিকা বাড়িয়ে দেয়?’ তারা বললেন: ‘বলুন।’ তিনি বললেন: ‘রাত-দিন দোয়া কর কেননা মুমিন ব্যক্তির হাতিয়ার হ’ল দোয়া।'” [বিহারুল আনোয়ার ৯০ খন্ড, ২৯১ পৃ.।]

৪. রোগমুক্তি

ইমাম বাকির (আঃ) মুহাম্মদ বিন মুসলিমকে বলেন: “‘তোমাকে কি এমন এক মহৌষধের সংবাদ দেব যা সকল ব্যাথার নিরাময়কারী, এমন কি মৃতু্যরও?’ বললাম: ‘জ্বী।’ হযরত বললেন: ‘দোয়া।'” [বিহারুল আনোয়ার ৯০ খন্ড, ২৯৯পৃঃ।]

কীওয়ার্ড: