দোয়া কবুল হওয়ার প্রতিবন্ধকতাসমূহ

এমন অনেক বিষয় রয়েছে যা দোয়ার ফল প্রাপ্তির পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে থাকে। তাই আমাদের লক্ষ্য রাখা উচিত যাতে সেগুলোকে অপসরণ করে দোয়াকে মহান প্রভুর মনঃপুত করা যায়। দোয়া কবুল হওয়ার শর্তাবলীর মধ্য থেকে বেশ কয়েকটির কথা এখানে উল্লেখ করা হচ্ছে। যারা প্রভু প্রেমিক তারা যেন সেগুলোকে মেনে তাদের দোয়াকে প্রভুর মনঃপুত করে তুলতে পারেন।

১. শুধু বিপদের সময় দোয়া করা

মহান আল্লাহ্ পবিত্র কুরআনে এমন এক শ্রেণীর মানুষের পরিচয় দিয়েছেন যারা শুধুমাত্র বিপদে পতিত হ’লেই প্রভুর পানে দোয়ার হাত তোলে। এই জাতীয় লোকদেরকে সুরা ইউনুসের ১২ নম্বর আয়াতে তিরস্কার করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন: “আর যখন মানুষ কষ্টের সম্মুখীন হয়, শুয়ে বসে, দাড়িয়ে আমাকে ডাকতে থাকে। তারপর আমি যখন তা থেকে মুক্ত করে দেই, সে কষ্ট যখন চলে যায়, তখন মনে হয়, কখনো কোন কষ্টেরই সম্মুখীন হয়ে যেন আমাকে ডাকেইনি।” অতএব যদি কেউ তার দোয়া কবুল হওয়ার প্রতি আস্থাবান হ’তে চায় তাহলে তার উচিত হবে সর্বাবস্থায় স্রষ্টাকে ডাকা। সুখের দিনে তার কৃতজ্ঞতা স্বীকার করা এবং দু:খের দিনেও তার কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করা – নীতিতে চলতে হবে। তবেই মহান প্রভু হয় তো আমাদের দোয়ার প্রতি মনযোগ দিবেন।

২. পাপকাজ থেকে বিরত না থাকা

দোয়া কবুল হওযার আরেকটি শর্ত হ’ল পাপাচার থেকে দূরে থাকা। গোনার কারণেই অনেক মানুষের দোয়াই প্রভুর কাছে পৌছায় না। এ প্রসঙ্গে ইমাম বাকির (আঃ) বলেন: “যখন কোন বান্দা আল্লাহর কাছে কোন কিছুর আবেদন করে তখন প্রভু প্রার্থনা অতি নিকট সময়ে অথবা একটু দেরীতে পূর্ণ করতে মনস্থ করেন। কিন্তু যখনই সে বান্দা কোন গোনার কাজ ক’রে ফেলে তখন প্রভু তাঁর ফেরেশতাদের ব’লে দেন যে তার দোয়া মঞ্জুর ক’রো না, তাকে বঞ্চিত কর, কেননা সে সীমা লঙ্ঘন করেছে। তাই তাকে বঞ্চিত করাই বাঞ্ছনীয়।” [ওসাইলুশ্ শীয়া ৭খন্ড, ১৪৫পৃঃ; আল্ ইখতিসাস, ৩২পৃঃ; এবং মিশকাতুল আনোয়ার ২৭২ পৃঃ] দোয়া-ই-কুমাইল-এ আমিরুল মুমিনীন ইমাম আলী (আঃ) বলেন:

হে আল্লাহ! আমার ঐ সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দাও যা দোয়া কবুল হওয়ার পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায় ।

৩. অন্তরিকভাবে দোয়া না করা

দোয়া কবুল হওয়ার আরেকটি শর্ত হ’ল, অন্তর দিয়ে দোয়া করা। আবেদনকারীর মুখের ভাষার সাথে তার অন্তরের আকাঙ্খার মিল থাকতে হবে। কোন কোন ব্যক্তি আছে দোয়া শুধু পাঠ ক’রে যায় কিন্তু সে কি বলে তা নিজেও বোঝে না। আবার কখনো কখনো মুখে আবেদন করছে এক জিনিসের, আর সে চিন্তায় ও মনে মুশগুল হয়ে আছে অন্য বিষয় নিয়ে। সে কি চাচ্ছে নিজে যদি না জানে, না বোঝে, তাহলে আজীবন এভাবে দোয়া করলেও তার দোয়া তার জন্যে কোন ফল বয়ে আনবে না। এ প্রসঙ্গে ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) বলেন: ‘মহান প্রভু অন্যমনস্ক অন্তরের প্রার্থনা কবুল করেন না। তাই যখন তোমরা কোন দোয়া ক’রবে, অন্তর থেকে তা বের ক’রবে, অতঃপর কবুল হওয়ার প্রতি আস্থাবান হবে।’ [ ওসাইলুশ্ শীয়া ৭খন্ড, ৫৪পৃ.।]

৪. হালাল জীবিকা আহার না করা

দোয়া গৃহীত হওয়ার আরেকটি শর্ত হ’ল হালাল খাবার খাওয়া। তাই যারা হারাম অর্থ সঞ্চয় ক’রে তা থেকে জীবিকা নীর্বাহ করে বা হারাম খায় তাদের দোয়া আল্লাহ্ কবুল করেন না। এ প্রসঙ্গে ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) বলেন: “তোমাদের মধ্য থেকে যদি কেউ চায় যে আল্লাহ তার দোয়া কবুল করুন, তাহ’লে তার উচিত সে যেন হালাল অর্থ উপার্জন করে এবং নিজকে ঋণ মুক্ত করে। কেননা যার পেটে হারাম খাবার থাকে বা, যে অন্যের অধিকারকে ফিরিয়ে দেইনি তার দোয়া আল্লাহ কখনো কবুল করেন না।” [ মুসতাদরাকুল ওসাইল ১৩খন্ড, ২৭ পৃঃ]। আরো বলা হয়েছে এক লুকমা হারাম আহার কারো পেটে গেলে তা তাকে ৪০ দিন পর্যন্ত দোয়া কবুল হওয়া থেকে বঞ্চিত করে।

৫. দোয়ার সাথে কর্ম ও প্রচেষ্টার সংযোগ না থাকা

দোয়া কবুল হওয়ার আরেকটি শর্ত হল দোয়া করেই বসে থাকলে চলবে না। বরং তাকে ঐ লক্ষ্য প্রতিফলিত হওয়ার উপযুক্ত কর্ম ও প্রচেষ্টা চালতে হবে। কেননা প্রভু তার এ প্রচেষ্টার মধ্যেই বরকত ও রহমত দিবেন। তাই কেউ যদি দোয়া করেই অলসভাবে বসে থাকে তাহলে আল্লাহ্ তার দোয়া কবুল করবেন না। এ প্রসঙ্গে ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) বলেন: “‘চার ব্যক্তির দোয়া আল্লাহ কবুল করেন না । এদের প্রথম ব্যক্তি হল যে নিজ গৃহে বসে থেকে বলে ‘প্রভু আমাকে জীবিকা দান কর’; প্রভু তাকে বলেন: ‘আমি কি তোমাকে নির্দেশ দেইনি যে তুমি তার সন্ধানে যাবে?'” … [আল ক্বাফী ২খন্ড, ৫১১ পৃঃ]

৬. দোয়া গ্রহণে বিশেষ কোন সমস্যা থাকা

দোয়া কবুল না হওয়ার আরো একটি কারণ হ’ল উক্ত বিষয়ে তার জন্য ক্ষতির কারণ থাকতে পারে। কেননা আমরা মহান প্রভুর কাছে অনেক কিছু আবেদন করে থাকি কিন্তু তার প্রতিফল সম্পর্কে আমরা অবগত নই। অনেক সময় আমরা এমন কিছু আবেদন করি যা আমাদের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে সুরা বাকারা’র ২১৬ নম্বর আয়াতে বলেন: “তোমাদের কাছে হয় তো একটা বিষয় পছন্দসই নয়, অথচ তা তোমাদের জন্যে কল্যাণকর। আর হয় তো বা কোন একটি বিষয় তোমাদের কাছে পছন্দনীয় অথচ তা তোমাদের জন্যে অকল্যাণকর। বস্তুত আল্লাহ্ জানেন, তোমরা জান না।” এ বিষয়ের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্তমূলক উদাহরণ ইতিহাসে রয়েছে যা হ’ল ‘সা’লাবেহ্ বিন হাতেব’ এর ঘটনা। সে মহানবী (সঃ)-এর কাছে এসে অনুনয় বিনয়ের সাথে বলল, “আমার জন্য দোয়া করেন যাতে আমি একজন ধনী ব্যক্তি হ’তে পারি।” সে মহানবী (সঃ)-এর সাথে অঙ্গিকার করেছিল যে, সে ধনী হ’লে কখনো সীমালঙ্ঘন করবে না। কিন্তু মহানবী (সঃ)-এর দোয়ার পর যখন সে সম্পদশালী হ’য়ে গেল তখন সে মহানবীকে দেয়া তার প্রতিশ্রুতি কেবল ভঙ্গই করেনি বরং সে যাকাত প্রদানের মত একটি ফরয দায়িত্ব থেকেও বিরত থাকে। [ সিমায়ে শিয়া, ৪৮৫পৃ.]

কীওয়ার্ড: