নামাযে হাত খোলা নাকি বাঁধা? (পর্ব-১)

নামাযে হাত খোলা এবং বাঁধা এটা এমন একটি প্রশ্ন যা সব সময় অনেক মানুযের মস্তিষ্কে ভেসে ওঠে সেটি হল এই যে, নামাযে হাত বাঁধা কি জায়েয?, নাকি জায়েয নয়?

খেলাফ, গুনিয়া, এবং দুরুস এই সমস্ত পুস্তক গুলিতে বর্ণিত হয়েছে যে, শিয়া মতানুযায়ী নামাযে হাত বাঁধা জায়েয নয়।

সৈয়দ মুর্তাযা নিজস্ব পুস্তক আল ইন্তেসারে দাবী করেছেন যে, হাত বাঁধা জায়েয নয় এবং এ বিষয়ে এজমা রয়েছে। অনুরুপভাবে উক্ত বিষয়ের উপর আহলে বায়েত(আ:) থেকে অনেক রেওয়ায়েতও বর্ণনা করা হয়েছে। আহলে সুন্নাতের মধ্যেও ইমাম মালিক এবং কিছু ফকিহ হাত বাঁধাকে মাকরুহ বলে জানতেন। শুধু তাই নয় তাবেইন এবং কিছু সাহাবা থেকে বর্ণনা হয়েছে যে, তাঁরা নামাযে হাত খোলার পক্ষে বিশ্বাস পোষণ করতেন। (বেদায়াতুল মুজতাহিদ ১:১৩৬)

আহলে সুন্নতের মধ্যে উক্ত বিষয় সম্পর্কে মতভেদের মূল কারণ হল: পাওয়া যায় যে, হযরত মুহম্মাদ(স:) এর নামায সম্পর্কে সঠিক রেওয়ায়েত আছে যেমন, ইবনে রোশদ এই সত্যতার দিকে ইশারা করেছেন। যে, হযরত মুহম্মাদ(স:) নামাযের সময় হাত বাঁধতেন না।

ইবরাহিম নাখঈ (যিনি আহলে সুন্নাতের চারজন খলিফার পরে ৯৬ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেছেন) হাত খুলে নামায পড়ার পক্ষপাতি ছিলেন।

একইভাবে তাবেয়ী হাসান বাসরী যাকে আহলে সুন্নতের অনুসারীগন ‘শিক্ষা ও আমলে’ সেই যুগের সরদার হিসেবে গ্রহণ করতেন তিনিও হাত ছেড়ে নামায পড়তেন। ইবনে সিরিন, লেইস বিন সা‘দ, আব্দুল্লাহ ইবনে যোবায়ের যারা সাহাবী ও মালেকী মাযহাবে বিখ্যাত ব্যক্তিগন এবং পশ্চিমা বাসীরাও (হাত ছেড়ে নামায পড়া) এই মতের বিশ্বাসী ও এই মতের উপর আমল করতেন। (সায়রে আলামুল নাবলা ৪:৫৭১)                        

আহলে সুন্নতের তিনটি মতামত

আহলে সুন্নতের মধ্যে নামাযে হাত বাঁধার সম্পর্কে তিনটি ভিন্ন মতামত পাওয়া যায়:

১- হাত বেঁধে নামায পড়া মাকরুহ। ২- হাত বেঁধে নামায পড়া অপছন্দ কর্ম নয় এবং হাত না বাঁধাও মুসতাহাব নয়। ৩- মুসতাহাব।(আল বায়ান ওয়াততাহসিল খ:১ পৃ:৩৯৪) এখনও পযর্ন্ত আমরা আহলে সুন্নতের এমন কোনো পুস্তকের সন্ধান পাইনি যার মধ্যে লেখা আছে যে হাত বেঁধে নামায পড়া ওয়াজিব। এখানে ওয়াজিবের সম্পর্ক শুধু মাত্র আহলে সন্নতের সাধারণ অনুসারীদের মতামত হিসেবে বর্ণনা করা হয়ে থাকে। (আল ফিকুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাতেহ খ:৪ পৃ:৮৭৪, আল মাজমু খ:৩ পৃ:৩১৩, আল মাবসুত সারাখসী খ:১ পৃ:২৩)

আহলে সু্ন্নতের পুস্তকে উক্ত বিষয় সম্পর্কে যেসব রেওয়ায়েত ও সুত্র বর্ণনা করা হয়েছে যদিও রেওয়ায়েত গুলো দুর্বল তার সংখ্যা ২০ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে তার মধ্যে একটি রেওয়ায়েত আবুহাযিম থেকে সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে। (সহীহ বুখারী খ:১ পৃ: ১৩৫) কিন্তু যেমন ভাবে আয়নী (উম্দাতুল কারী ফি শারহে সহীহ বুখারী খ:৫ পৃ:২৮০), শৌকানী (নেইলুল আওতার খ:২ পৃ:১৭৮) এবং অন্যান্য ফকিহগণ এই বিষয়ে ব্যাখ্যা করেছেন যে, উক্ত হাদীস গুলোর মধ্যে মুরসাল ও মুনকাতে হবার সন্দেহ পাওয়া যায়।

একইভাবে দ্বিতীয় হাদীসটি সহীহ বুখারীতে আবুঅয়েল থেকে বর্ণনা হয়েছে এবং উক্ত হাদীসেও মুরসাল ও মুনকাতে হবার সন্দেহ পাওয়া যায়। তার কারণ আলকামা যে রেওয়ায়েত তার পিতার কাছ থেকে বর্ণনা করেছেন সেটা মুরসাল এবং এবিষয়ে ইবনে হাজার পরিষ্কার ভাবে নিজের মতামত প্রকাশ করেছেন। (তাহযীব আল তাহযীব খ:৮ পৃ: ৩১৪)

আর অন্যান্য রেওয়ায়েত সম্পর্কে বলা যেতে পারে যে, আহলে সুন্নাতের নিকট সেসব হাদীস দুর্বল বলে বর্ণনা করা হয়েছে এবং আসহাবে সুনান, জয়ামে ও উলামায়ে রেজাল এ বিষয় সত্যায়ন করেছেন, তাই উক্ত বিষয়ের উপর বিশ্বাস করা যায় না। একারণে নামাযে হাত বাঁধার উপর কোনো প্রমাণ ও দলিল পাওয়া যায় না।

এছাড়া এটা এমন এক ধরনের আমল যে আমল নামাযে জায়েয হবার বিষয়ে কোনো রকম প্রমাণ নেই। এ কারণে হাত বাঁধা জায়েয এবং সুন্নাত বা নামাযের আদব এই নিয়ত করে নামায আদায় করা অবশ্যই হারাম। কেননা হাত বেঁধে নামায আদায় করা জায়েয এই বিষয়ে শরিয়তে কোনো দলিল ও প্রমাণ পাওয়া যায়নি অধিকন্ত হাত বাঁধা থেকে বিরত রাখার জন্য বহু হাদীস বর্ণনা হয়েছে। (মিসবাহুল ফাকিহ খ:১ পৃ: ৪০১)

আহলে বায়েত(আ:) হতে হাত বাঁধার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। তাছাড়া নামাযে হাতের উপর হাত রাখা এটা এমন এক ধরনের আমল যা নামাযের মধ্যে জায়েয নয়। যেমন ভাবে ইবনে রুশদ্ উক্ত বিষয়ের জায়েয না হবার উপর পরিষ্কার ভাবে ইশারা করেছেন।

আর ইমামগণ এই কর্মকে (تکفیر) তাকফীর বলে নাম ধারণ করেছেন যা মাজুসিরা করে থাকতো। সুনিশ্চিত ভাবে বলা যায় যে, এই কর্ম রসূল(স:)‘র সুন্নাত নয়। (আয়নায়ে আয়ীনে মাযদিসনী পৃ:২০)

নামাযে হাত বাঁধা সম্পর্কে আহলে সুন্নতের ফকিহগনের মধ্যে বিভিন্ন মতভেদ পাওয়া যায় যে, হাত নাভির উপরে রাখা ঠিক, না নাভির নীচে? ডান হাত বাম হাতের উপর, না বাম হাত ডান হাতের উপর রাখা উচিত?

এখানে একটা প্রশ্ন ভেসে ওঠে যে, এমন একটা কর্ম যার গুণ বা পদ্ধতি নির্দিষ্ট নয়, সেই কর্ম কিভাবে সুন্নাতে মুয়াক্কেদা হতে পারে? এবং এটা কিভাবে হতে পারে যে, যে সাহাবীগণ মুস্তাহাব নামায, জানাযার নামাযে, ঈদের নামায ও পাঁচ ওয়াক্তের নামায রসূল(স:)‘র ইক্তেদায় আদায় করতেন, সেই সাহাবীদের কাছে (হাত বেঁধে নামায আদায় করা) এই পদ্ধতি কিভাবে গোপন থাকতে পারে?

এই সমস্ত সাক্ষ্য ও প্রমাণ থেকে বোঝা যায় যে, এরূপ বিষয় রসূল(স:)‘র যুগে ছিল না। একারণে বলা যেতে পারে যে, নামাযে হাত বাঁধা,  ‘তারাবি নামায’ জামাতের সঙ্গে আদায় করা, আযানে  ‘আসসালাতো খায়রুম মিনান নাওম’ প্রবেশ করানো,  ‘হাইয়া আলা খায়রিল আমাল’ আযান থেকে সরানো,  ‘মুতয়াতুল হজ্’ ও  ‘মুতয়াতুন নিকাহ’ হারাম করা এবং হাদীস লেখা থেকে নিষেধ করা এই সমস্ত বিষয় রসূল(স:)‘র যুগে ছিল না বরং পরবর্তীকালে এসব বিষয় গুলোকে সৃষ্টি করা হয়েছে।

আহলে বায়েত(আ:)‘র রেওয়ায়েত

আহলে বায়েত(আ:) থেকে বহু রেওয়ায়েত বর্ণিত হয়েছে যেখানে নামাযে হাত বাঁধাকে নিষেধ করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, এরুপ কাজ অগ্নিপুজারীদের:

 (عن احدهما علیهما السلام قلت: الرجل یضع یده فی الصلاة ،وحکی الیمنی علی الیسری؟ فقال: ذلک التکفیر، لا تفعل.)                                                                             

 

১- অর্থ: রাবী বলছেন: আমি ইমাম বাকের অথবা সাদিক(আ:)‘র কাছে প্রশ্ন করলাম যে, এক ব্যক্তি নামাযে হাত বাঁধে এবং ডান হাত বাম হাতের উপর রাখে। ইমাম বললেন: এটা একটি অবিশ্বাসী কর্ম একর্ম করো না। (ওসায়েলুশিয়া খ:৭ পৃ: ২৬৬ বাব ১৫, মুয়াস্সেসায়ে আহলে বায়েত; মিরাতুল উকুল খ: ১৫ পৃ:৭৪)  

আল্লামা মাজলিসী এই হাদীস বর্ণনা করার পর বলছেন: এই হাদীস  ‘হাসান’ এবং সহীহ’র সমতুল্য। আর ‘তাকফির’ এর অর্থ হচ্ছে হাতের উপর হাত রাখা যা আহলে সুন্নাতেরা করে থাকে এবং এ কাজ নিষেধ করার কারণ হল এটাকে হারাম করা হয়েছে যেমন ভাবে আমাদের বেশির ভাগ আলেমদের বিশ্বাস এটাই।

(عن ابی جعفرعلیه السلام: وعلیک بلاقبال علی صلاتک...ولاتکفّرفانّما یفعل ذلک المجوس)

২- অর্থ: ইমাম বাকের(আ:) বলছেন: নামাযের সময় কিবলার দিকে মুখ কর এবং নামাযে হাত বেঁধো না কারণ এটা অগ্নিপুজারীদের কর্ম। (ওসায়েলুশিয়া খ:৫ পৃ: ৫১১ বাব ১৭,হাদীস ২ পৃ:৪৬৩; মিরাতুল উকুল খ: ১৫ পৃ:৭৪)

(علی بن جعفر قال: قال اخی: قالعلی بن الحسین علیه السلام: وضع الرجل احد یدیه علی الاخری فی الصلاة عمل، ولیس فی الصلاة عمل)                                                   

৩- অর্থ: আলী ইবনে জাফর বলেছেন আমার ভাই ইমাম মুসা কাযিম(আ:) বললেন যে, ইমাম যায়নুল আবেদিন(আ:) বলেছেন: নামাযে এক হাতকে অপর হাতের উপর রাখা একটি আমল আর নামাযে অন্য কোনো আমল করা জায়েয নয়। (ওসায়েলুশিয়া খ:৫ পৃ: ৫১১ বাব ১৭,হাদীস ২ পৃ:৪৬৩; মিরাতুল উকুল খ: ১৫ পৃ:৭৪);;

 (علی بن جعفر(عن اخیه موسی بن جعفر)وسالته عن الرجل یکون فی صلاته ایضع احد یدیه علی الاخری بکفّه او ذراعه؟ قال:لایصلح ذلک، فان فعل فلایعود له)                             

৪- অর্থ: আলী ইবনে জাফর তার ভাই ইমাম মুসা কাযিম(আ:)‘র সম্পর্কে বলেছেন যে, আমি তার কাছে এমন এক ব্যক্তির সম্পর্কে প্রশ্ন করলাম যিনি নামাযের অবস্থায় আছেন সে কি নিজের হাতকে কুনই বা বাহুর উপরে রাখতে পারে? ইমাম বললেন: এই কাজ ঠিক নয় যদি তা করে থাকে তাহলে যেন পুনরাবৃত্তি না করেু। (ওসায়েলুশিয়া খ:৫ পৃ: ৫১১ বাব ১৭,হাদীস ২ পৃ:৪৬৩; মিরাতুল উকুল খ: ১৫ পৃ:৭৪)

(عن علی علیه السلام فی حدیث اربعماة:قال: لا یجمع المسلم یدیه فی صلاته و هو قائم بین یدی الله عزّوجلّ ، یتشبّه باهل الکفر یعنی المجوس)                                                

৫- অর্থ: ইমাম আলী(আ:) হাদীসে ‘আরবায়ামেয়া’ নামক গ্রন্থে বলেছেন: মুসলমানদের জন্য জায়েয নয় যে, যখন তারা নামাযের জন্য আল্লাহর দরবারে দাঁড়াবে নিজের হাতকে গুটিয়ে নেবে, কারণ তারা নিজেদের এই কর্মের দ্বারা আহলে কুফর অর্থাৎ অগ্নিপুজারীদের মতো হয়ে যাবে। (ওসায়েলুশিয়া খ:৫ পৃ: ৫১১ বাব ১৭,হাদীস ২ পৃ:৪৬৩; মিরাতুল উকুল খ: ১৫ পৃ:৭৪)

(عن ابی عبدالله علیه السلام فی حدیث: انّه لمّا صلّی قام مستقبل القبلة، منتصبا، فارسل یدیه جمیعا علی فخذیه قد ضمّ اصابعه)                                                                  

৬- অর্থ: ইমাম সাদিক(আ:)‘র সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে যে, যখন ইমাম নামাযের জন্য দাঁড়াতেন তখন কিবলার দিকে মুখ করে নিজের হাতকে রানের উপরে রাখতেন আর আঙ্গুলগুলোকে জড়ো করে নিতেন। (ওসায়েলুশিয়া খ:৫ পৃ: ৫১১ বাব ১৭,হাদীস ২ পৃ:৪৬৩; মিরাতুল উকুল খ: ১৫ পৃ:৭৪)

 (عن ابی جعفر علیه السلام: قال: اذا قمت الی الصلاة فلا تلصق قدمک بالاخری...واسد منکبیک وارسل یدیک ولا تشبّک اصابعک ولیکونا علی فخذیک قبالة رکبتیک... لا تکفّر فانما یفعل ذلک المجوس)                                                                                  

৭- অর্থ: ইমাম বাকের(আ:) বলেছেন: যখন নামাযের জন্য দাঁড়াবে তখন নিজের পা কে মিলাবে না, কাঁধকে সোজা করে নাও, হাত খুলে রাখো, আঙ্গুল গুলোকে একটি আরেকটির উপরে রাখবে না এবং নিজের হাতকে রানের উপরে রাখো এবং হাত বেধো না তার কারণ তা অগ্নিপুজারীদের নিয়ম। (ওসায়েলুশিয়া খ:৭ পৃ:২৬৭ বাব ১৫ হাদীস ৭)

(المجلسی عن الجامع البزنطی عن ابی عبدالله علیه السلام:فاذا قمت فی صلاتک فاخشع فیها...ولا تکفّر)                                                                                        

৮- অর্থ: আল্লামা মাজলিসী জামেয় বাযানতী থেকে ইমাম জাফর সাদিক(আ:)‘র সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন যে, ইমাম বললেন: যখন নামায আদায় করার ইচ্ছে হবে তখন মনোযোগ ও বিনয়ের সাথে নামায আদায় করবে আর হাত বেধো না। (বিহারুল আনওয়ার খ:৮৪ পৃ:১৮৬ হাদীস ১; মুসতাদরাকুল ওসায়েল খ:৫ পৃ:৪২০)

(القاضی نعمان المصری عن جعفر بن محمد علیه السلام انّه قال: اذا کنت قائما فی الصلاة فلا تضع یدک الیمنی، فانّ ذلک تکفیر اهل الکتاب، ولکن ارسلهما ارسلا ، فانّهاحری ان لایشغل نفسک عن الصلاة)                                                                                     

৯- অর্থ: কাযী নমান মিসরী ইমাম সাদীক(আ:)’র থেকে বর্ণনা করেছেন যে, ইমাম বললেন: যখন নামাযের জন্য দাঁড়াবে সেসময় নিজের ডান হাতকে বাম হাতে বা বাম হাত ডান হাতের উপর রাখবে না, কারন এটা আহলে কিতাবদের কাজ তোমরা হাত খুলে রাখো। সুতরাং তোমাদের জন্য এটাই ভাল যে, তোমরা নিজেকে নামায ছাড়া অন্য আমলের দিকে নিয়ে যেয়ো না। (দায়ায়েমুল ইসলাম খ:১ পৃ:১৫৯; মুসতাদরাকুল ওসায়েল খ:৫ পৃ:৪২০)

(عن ابی جعفرعلیه السلام قال: قلت له (فصلّ لربک ونحر)؟ قال: النحرالاعتدال فی القیام ان یقیم صلبه و نحره . وقال: ولا تکفّر ، فانّما یصنع ذلک المجوس)

১০- অর্থ: ইমাম বাকের(আ:) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, ইমামের কাছে প্রশ্ন করা হল যে, (فصلّ لربک ونحر) এর উদ্দেশ্য কি? ইমাম বললেন: (نحر) এর অর্থ হল কিয়ামের সময় ভারসাম্যকে বজায় রাখা ঠিক এমন ভাবে যেন পিঠ আর গলা সোজা হয়ে থাকে, আরও বললেন: হাত বাঁধা থেকে দুরে থাকো কারণ এটা অগ্নিপুজারীদের নিয়ম। (উসুলে কাফী খ:৩ পৃ:৩৩৭)

শিয়া ফকিহদের মতামত

১- শেখ মুফীদ(র:) বলেছেন: নামাযে হাত ছেড়ে রাখার বিষয়ে শিয়ারা এক মত। আর শিয়ারা আহলে কিতাবদের মতো (تکفیر) আমল অর্থাৎ এক হাতকে অন্য হাতের উপর রাখাকে জায়েয মনে করেন না। শুধু তাই নয় যারা এরুপ বিদআত করে থাকে তারা রসূল এবং আহলে বাইতের ইমামগনের সুন্নাতকে অস্বীকার করে। (কিতাবুত তাযকেরা খ:৩ পৃ:২৫৩)

২- সৈয়দ মুর্তাযা(র:) বলেছেন: যে সমস্ত কর্ম সম্পর্কে ধারণা করা হয় যে, তা শিয়াদের জন্য নির্ধারিত হয়েছে। তার মধ্যে থেকে একটি হল নামাযে হাত না বাঁধা কারণ তারা ছাড়া অন্য ফির্কাদের বিশ্বাস হল নামাযে হাত বাঁধা মাকরুহ। তহাভি  ‘ফকিহদের’ মতভেদকে বর্ণনা করে বলেছেন: ইমাম মালিকের দৃষ্টিতে যদি মুসতাহাব নামাযে কেরাত পড়তে বা কিয়াম দীর্ঘ হয়ে যায়, তাহলে ওই সময় হাত বাঁধা জায়েয কিন্তু আমার দৃষ্টিতে হাত না বাঁধা উত্তম। (আল ইনতেসার পৃ:২২)

৩- শেখ তুসী(র:): নামাযে ডান হাত বাম হাতের উপর বা বাম হাত ডান হাতের উপর রাখা জায়েয নয়। ইমাম মালিক থেকে দুটি রেওয়ায়েত বর্ণিত হয়েছে যার মধ্য থেকে একটি হল ইমাম শাফেয়ীর কথা অনুযায়ী নামাযে ডান হাত বাম হাতের উপর রাখা জায়েয এবং ইবনে কাসিম থেকে যে রেওয়ায়েত এসেছে তাতে হাত খুলে রাখাকে উত্তম বলা হয়েছে।

আর ইমাম মালিকের কথা অনুযায়ী মুসতাহাব নামাযে যখন কিয়াম দীর্ঘ হয়ে যাবে তখন হাত বাঁধা জায়েয, আর যদি দীর্ঘ না হয় তাহলে জায়েয নয়। কিন্তু ওয়াজিব নামাযে তা জায়েয নয়। একইভাবে লায়েস বিন সায়াদেরও এই উক্তি যে, যদি ক্লান্তবোধ হয় তাহলে হাত বাঁধা ঠিক, আর যদি ক্লান্তবোধ না হয় তাহলে হাত বাঁধা ঠিক নয় এবং ইমাম মালিকেরও একই উক্তি।

আমাদের প্রমাণ: ইমামিয়া মাযহাবের ইজমা আছে যে, নামাযে হাত বাঁধা যা নামাযকে বাতিল করে দেয় এই উক্তিতে ইমামিয়া ফিরকাদের মধ্যে কোনো মতভেদ নেই। তাছাড়া নামাযের কোনো অংশকে প্রমাণ করার জন্য শরীয়তি প্রমাণের দরকার হয় আর নামাযে হাত বাধার প্রমাণ শরীয়তে নেই, তাই সতর্কতামুলক নামাযে হাত বাঁধা থেকে বিরত থাকা উত্তম। কারণ এতে সন্দেহ নেই যে, যে নামাযে হাত বাঁধা হয়নি তা সম্পূর্ণ ঠিক এবং দ্বিতীয় কথা এই যে, নামায সঠিক হয়েছে কি না তা নিশ্চিত হওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন।(আল খেলাফ খ:১ পৃ:১০৯)

৪- শেখ বাহায়ী(র:): (تکفیر) তাকফীর‘র অর্থ হচ্ছে ডান হাত বাম হাতের উপর রাখা যা আহলে সুন্নতের অনুসারীগন করে থাকেন এবং আমাদের বেশির ভাগ ফকিহরা এ কাজ হারাম হবার কারণে নিষেধ করেছেন।

প্রশ্ন: তাকফীরের দ্বারাই কি নামায বাতিল হয়ে যায়?

 আমাদের বেশীর ভাগ আলেমগণ বলেছেন তাকফীরের দ্বারাই নামায বাতিল হয়ে যায় শুধু তাই নয় এই বিষয়ের উপর ইজমা রয়েছে বলে শেখ তুসী ও সৈয়দ মুর্তাযা নিজেদের মত প্রকাশ করেছেন। (আল হাবলুল মাতিন পৃ:২১৪; মালাযাল আখিয়ার খ:৩ পৃ:৫৫৩)

সম্পর্কিত বিষয়বস্তু