নারীর অধিকার

-সংকলনে: আলহ্জ্ব ড. মো. সামিউল হক

সূত্র: রেডিও তেহরান

নারী অধিকার বিষয়টি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বেশ আলোচিত বিষয়। নারী তার অধিকার এবং অবস্থানের ক্ষেত্রে ছিল অনেক পিছিয়ে। বর্তমান সময়ে বহু সমাজে নারীরা বহু রকম সমস্যার শিকার এমনকি নির্যাতনের শিকার। সে জন্যে আমরা একটি পরিবারে নারীর মৌলিক অধিকার সম্পর্কে ইসলাম কী দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে সে বিষয়ে খানিকটা আলোকপাত করার চেষ্টা করবো।

বিয়ে এবং পরিবার গঠন মানব সভ্যতার একটি জরুরী প্রয়োজন। পরিবারের ছত্রচ্ছায়ায় নারী–পুরুষ এবং সন্তানেরা উন্নয়ন ও পূর্ণতায় পৌঁছে। আসলে পরিবার হচ্ছে মানব উন্নয়নের সবচেয়ে উপযোগী ক্ষেত্র। কেননা সমাজকে একটা জীবন্ত কাঠামোর সাথে তুলনা করা যায় যার বিভিন্ন অঙ্গ রয়েছে, নারী পুরুষ হচ্ছে এই সমাজ কাঠামোর মূল অঙ্গ। এদের সবারই যেমন নিজ নিজ দায়িত্ব রয়েছে তেমনি সামষ্টিক কিছু দায়-দায়িত্বও রয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিতে পারিবারিক কাঠামো আইনের উর্ধ্বে উঠে প্রেম ভালোবাসা এবং ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল। কেননা এ ক্ষেত্রে দুটি মানব-মানবী তাদের জীবনের সবোর্ত্তম বছরগুলো একে অপরের খুব কাছে থেকে ঘনিষ্টতার মধ্য দিয়ে কাটায়। ইসলামের শিক্ষা হলো পরিবারের সদস্যরা নৈতিক গুণাবলির এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাবে যাতে প্রত্যেকেই প্রত্যেকের অধিকার সম্পর্কে আন্তরিক ও সচেতন হয়।

ইসলামের অধিকার আইনে পরিবারের ভরণ-পোষণ বা অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব ন্যস্ত রয়েছে পুরুষের ওপর। নারী যেহেতু পরিবারের এই গুরুত্বপূর্ণ ঝামেলা থেকে দায়িত্বমুক্ত, সে জন্যে সাংসারিক রান্না-বান্না এবং সন্তান-সন্ততিকে লালন-পালন করা, তাদের শিক্ষা-প্রশিক্ষণের দায়িত্ব ইত্যাদি বর্তায় নারীর ওপর। বিয়ের (আকদের) পর নারী, পুরুষের কাছ থেকে সম্পদের অধিকার লাভ করে, অর্থাৎ পুরুষ তার মালামাল এবং অর্থ-সম্পদের একটা অংশ তার স্ত্রীকে দেয়ার ব্যাপারে সম্মতি দেয়, যাকে মোহরানা বলা হয়। অবশ্য মোহরানা পুরুষের সামর্থের ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়া উচিত।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সূরা নিসা’র ৪ নম্বর আয়াতে পুরুষদেরকে মোহরানা পরিশোধের দায়িত্ব দিয়ে বলেছেন,

নারীদের মোহরানাকে পরিপূর্ণভাবে প্রদান করো,তবে যদি তারা সন্তুষ্টচিত্তে তার কিছু অংশ ছেড়ে দেয়, তোমরা তা স্বাচ্ছন্দে ভোগ করবে।'

 বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে মোহরানা নারীর প্রতি পুরুষের সততার প্রমাণ। বিশিষ্ট ইসলামীচিন্তাবিদ শহীদ মোতাহহারী নারী-পুরুষের সমান অধিকার এবং মোহরানা বাতিল করাসংক্রান্ত বিতর্কের জবাবে বলেছেন,

মোহরানার বিধান আসলে প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটা আরো প্রমাণ করে যে প্রেম পুরুষের পক্ষ থেকে শুরু হয় আর নারী তার প্রেমে সাড়া দেয়। নারীর সম্মানে পুরুষ তাকে একটি উপহার প্রদান করে। সেজন্যে মোহরানার বিধান নারী-পুরুষের সমান অধিকারের নামে বাতিল করা বা রহিত করা উচিত নয়।'
ইসলামের আবির্ভাবের আগে মোহরানা ছিল নারী কেনা-বেচার মূল্য। জাহেলিয়াতের যুগে নারীদের কোনো মূল্যই ছিল না। আবার যেই মোহরানাটা পুরোপুরিই ছিল নারীর প্রাপ্য তা বাবা এবং ভাইয়ের অধিকারে দেয়া হতো। ইসলাম জাহেলী এই বিশ্বাসকে বাতিল করে দিয়ে মোহরানাকে নারীর অধিকার বলে ঘোষণা করে বলেছেঃ পুরুষের পক্ষ থেকে তা আন্তরিকভাবে নারীকে প্রদান করতে হবে। পরিবারে নারীর ভরণ-পোষণও তার প্রাপ্য অধিকার। আজকের সমাজে নারীর ভরণ পোষণ বলতে মৌলিক প্রয়োজনীয়তা যেমন অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-চিকিৎসাসহ নারীর জীবনযাপনের জন্যে অন্যান্য বস্তু। স্ত্রীর এইসব মৌলিক প্রয়োজনীয়তা পূরণ করা স্বামীর অবশ্য কর্তব্য।

আজকাল ফ্যামিনিস্টরা এবং বহু পশ্চিমা মতবাদ নারীকে প্রদেয় মোহরানা এবং ভরণ-পোষণকে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের সাথে বৈষম্যের সমার্থক বলে মনে করে। অথচ মোহরানা এবং ভরণ-পোষণের বিধানটি নারী-পুরুষের বৈশিষ্ট্য এবং তাদের ভূমিকাগত তারতম্যের কারণেই দেয়া হয়েছে। প্রজন্ম উৎপাদন এবং অন্তসত্ত্বার বোঝা বহনের দায়িত্বটি প্রাকৃতিকভাবেই নারীর কাধেঁ অর্পিত হয়েছে। অধ্যাপক শহীদ মোতাহহারীর মতে সন্তান ধারণ এবং শিশুকে দুধ খাওয়ানোর মতো কঠিন দায়িত্ব যেহেতু নারীর ওপর অর্পিত হয়েছে, সে জন্যে তার ভরণ-পোষণ প্রাপ্তির অধিকারটি যথার্থ এবং উপযুক্ত। শারীরিক শক্তি-সামর্থের পার্থক্য থাকার কারণেই নারীর পক্ষে পুরুষের মতো অর্থনৈতিক কঠিন কাজগুলো আঞ্জাম দেয়া সম্ভব নয়। পুরুষ ভারি কাজগুলো করার সামর্থ বেশি রাখে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন নারীদের অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পুরুষের ওপর অর্পন করেছে আবার পুরুষকে তার আত্মিক দিক থেকে নারীর মুখাপেক্ষী করে সৃষ্টি করা হয়েছে।

স্ত্রী এবং মায়ের ভূমিকা পালন করার জন্যে নারীর নিরাপত্তা এবং প্রশান্তির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। যদি একজন নারী শক্ত কাজ করে দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে তাহলে স্বামী-সন্তানের ব্যাপারে করণীয় দায়িত্বগুলো পালন করতে পারবে না। শহীদ মোতাহহারীর মতে, নারীকে যেহেতু প্রফুল্ল থাকতে হয় তাই তার প্রশান্তির প্রয়োজনীয়তা পুরুষের তুলনায় অনেক বেশি। সৃষ্টি প্রক্রিয়ার বিধানটাই এমন যে, নারী-পুরুষের মাঝে স্বাভাবিকভাবেই কিছু তারতম্য রেখে পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে। এজন্যে ইসলামের বিধান হলো পরিবারের জন্যে কিংবা নিজের জন্যে নারী কাজ করতে বাধ্য নয় বরং নারীর ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করার ভার পুরুষের ওপর বিধিবদ্ধ করা হয়েছে। নারীর দেহ ও মনকে প্রশান্ত রাখার স্বার্থে ইসলাম কাজ করাকে তাদের জন্যে অভিষ্ট্য করে দেয় নি, তবে তাদের মেধা বিকাশ এবং সামাজিক চাহিদা নিশ্চিত করার স্বার্থে চাকুরি করা অগ্রাহ্য নয়।

পাশ্চাত্যে নারী-পুরুষের সমানাধিকার প্রশ্নে নারীর বাইরে চাকুরি করাটা একটি মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত। এক্ষেত্রে তারা নারী-পুরুষের প্রকৃতিগত পার্থক্যের বিষয়টি বিবেচনা করছে না। ফলে নারীর মানসিক অশান্তি এবং পরিবার কাঠামো ভেঙ্গে পড়ার ঘটনা পাশ্চাত্যে এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। মার্কিন সমাজ বিজ্ঞানী গেরহার্ড লেনস্কি পশ্চিমা সমাজে তালাকের প্রবণতা বৃদ্ধির ঘটনার পেছনেও এটি দায়ী বলে মনে করেন। বহু মনোবিজ্ঞানী মনে করেন যে নারী তার শারীরিক এবং মানসিক বৈশিষ্ট্যের কারণেই স্বামী এবং মাতৃত্বের দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি নিজের পেশাগত দায়িত্ব সঠিকভাবে এবং ভালোভাবে পালন করতে পারেন না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একজন মনোবিজ্ঞানী কর্মজীবী নারীদের ওপর গবেষণা চালিয়ে দেখেছেন, আমেরিকার শতকরা ৬০ ভাগ কর্মজীবী নারী মাতা বলেছেন, তারা প্রচণ্ড মানসিক চাপে ভুগে থাকেন। নিঃসন্দেহে নারী-পুরুষের মধ্যকার পার্থক্যকে উপেক্ষা করার কারণেই এই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।

পশ্চিমা বিশ্ব অর্থনৈতিক স্বাধীনতার অজুহাতে নারীকে অর্থনৈতিক কঠিন কর্মকাণ্ডেনিয়োজিত করেছে এবং তাকে পুরুষের সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত করেছে। আর নারীওনিজেকে পুরুষের সমান অধিকার অর্জনের জণ্যে মাতৃত্ব এবং স্ত্রীর দায়িত্ব থেকে দূরে সরে গেছে। কিন্তু তারা নিজেদের যথার্থ অবস্থান অর্জন করতে পারে নি। ইসলামের দৃষ্টিতে মা এবং স্ত্রী হিসেবে পরিবারে একজন নারীর অবস্থান খুবই মূল্যবান। তবে এর পাশাপাশি সমাজেও একজন নারী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

উপরোক্ত আলোচনা থেকে এ সিদ্ধান্ত নিতে পারি যে, নারী-পুরুষভেদে ইসলামের নৈতিক এবং বিশ্বাসগত বিধি-বিধান এক ও অভিন্ন, তবে লৈঙ্গিক বিষয়ে স্বাভাবিকভাবেই পার্থক্য রয়েছে। যেমন ভরণপোষণ প্রদান করা, উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিষয়, পরিবার কাঠামোয় নারী-পুরুষের দায়িত্বের ভিন্নতা ইত্যাদি। ইতিপূর্বে আমরা আলোচনা করেছি যে, স্ত্রীর ভরণপোষণের ব্যয়ভার বহন করা স্বামীর দায়িত্ব। তবে ভরণপোষণের অধিকারটি নিঃশর্ত নয়। ভরণপোষণ পেতে হলে নারীকে কিছু শর্ত পালন করতে হবে। তাহলো দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্বামীর যথাযথ আনুগত্য তথা স্ত্রী হিসেবে স্বামীর ব্যাপারে যথাযথ দায়িত্ব পালন করা। তবে আইনগত দিক থেকে এই আনুগত্যের দুই ধরনের অর্থ রয়েছে। সাধারণত, আনুগত্য বলতে স্বামীর প্রতি তার দায়িত্ব পালন করাকে বোঝায়, তাছাড়া পরিবারের অর্থনৈতিক বিষয়ে স্বামীর পরিচালনা মেনে নেওয়াটাও আনুগত্যের পর্যায়ে পড়ে। একইভাবেস্বামীর সাথে স্ত্রীর মেলামেশা-জীবনযাপন করা এবং চলাফেরাটাও এর অন্তর্ভুক্ত। বিশেষ অর্থে আনুগত্য দাম্পত্য বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত এবং স্বামীর জৈবিক চাহিদা মেটানো। যে বিষয়টির ওপর গুরুত্বারোপ করা জরুরী তাহলো নারীরা সাধারণত মাতৃত্বের কাজসহ যেসব কাজ বাসায় আঞ্জাম দেয় সেগুলো আনুগত্যের বাইরে। কোনো কোনো মতাদর্শ বিশেষ করে ফ্যমিনিস্টরা স্বামীর আনুগত্য করাকে লিঙ্গগত বৈষম্য বলে মনে করে। তাদের দৃষ্টিতে আনুগত্যের সংজ্ঞার্থ অনুযায়ী নারী স্বামীর লৈঙ্গিক দাসে পরিণত হয়। অবশ্যপ্রাকৃতিকভাবেই নারী পুরুষের অধিকার এবং দায়িত্বের ক্ষেত্রে বিভিন্ন দিক থেকেই পার্থক্য রয়েছে।

বৈষম্য তখনই অর্থবহ হয় যখন দেখা যায় দুই বা ততোধিক ব্যক্তি একই রকম বৈশিষ্ট্যের অধিকারী,অথচ তাদের সুযোগ-সুবিধাগুলো একরকম নয়। ইসলাম মানুষ হিসেবে নারী-পুরুষকে এক সমান বলে মনে করে এবং নারী-পুরুষের মাঝে কোন রকম বৈষম্যকে গ্র্রহণ করে না। কিন্তু নারী-পুরুষের মনস্তাত্ত্বিক এবং শারীরবৃত্তীয় পার্থক্য থাকার কারণে তাদেরকাজকর্ম এবং দায়িত্বের মাঝেও পার্থক্য থাকবে-এটাই তো স্বাভাবিক। কেউই এমনকি চরম নারীবাদীরাও নারী-পুরুষের মনস্তাত্ত্বিক এবং শারীরবৃত্তীয় এই পার্থক্য থাকার কথাটি অস্বীকার করতে পারবে না। ফরাসি দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট নারী-পুরুষের শারীরিক এবং মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যেও পার্থক্য রয়েচে বলে মনে করেন। তাঁর বিশ্বাস এই পার্থক্যের ভিত্তিতে সমাজ এবং পরিবারে সবারই সৃষ্টিশীল ভূমিকা রাখার বিষয়টি নিশ্চিত হয়।

বিয়ের অনেক লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের মধ্যে একটা হলো নারী-পুরুষের জৈবিক চাহিদা নিশ্চিতকরা। ইসলাম এই প্রয়োজনীয়তাটিকে দ্বিপাক্ষিক বলে মনে করে এবং তা নিশ্চিত করার স্বার্থে স্বামী-স্ত্রীর প্রকৃতিগত নিজ নিজ দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। বিয়ের ক্ষেত্রে এইসব দায়িত্বের ব্যাপারে পারস্পরিক সচেতনতা যথেষ্ট পরিমাণে থাকা প্রয়োজন, পরস্পরের ফিজিওলজিক্যাল এবং বায়োলজিক্যাল বৈশিষ্ট্য সম্পর্কেও জানা উচিত যাতে দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক সন্তুষ্টি বিধানের মধ্য দিয়ে জীবনের প্রশান্তি নিশ্চিত করা যায়। এদিক থেকে পরিবারে নারী-পুরুষের সম্পর্কের অর্থ নারী,পুরুষের সেবাদাসী নয়, বরং তারা উভয়েই এক এবং অভিন্ন জীবনের অধিকারী। মনোবিজ্ঞানীদের মতে স্বামীর আনুগত্য স্বীকার না করার ফলে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে। দাম্পত্য জীবনে শীতল সম্পর্ক বিরাজ করা, উশৃঙ্খলতার চর্চা,পারিবারিক ধস নেমে আসা ইত্যাদি বিচিত্র দুর্যোগ দেখা দেয়। ইরানী সমাজ বিজ্ঞানী ডঃ রহমতুল্লাহ সিদ্দিক মনে করেন স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্য জীবনে মিল না থাকাটা তালাকের নেপথ্য গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

নারীদের গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি অধিকার হলো মাতৃত্বের অধিকার। ইসলামের বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে এ সম্পর্কে। ইসলাম মায়েদেরকে সম্মান ও মর্যাদা দেয়ার জন্যে সকল মানুষকে আহ্বান জানিয়েছে। কোরআনে কারিমও মায়েদের মর্যাদা ও ব্যক্তিত্বকে ব্যাপক উঁচু পর্যায়ে স্থান দিয়েছে। সূরা লোকমানের ১৪ নম্বর আয়াতে বাবা-মায়ের সেবা-যত্ন করা বিশেষ করে মায়ের সাথে সদাচরণ করার ওপর জোর দেয়া হয়েছে। বলা হয়ে থাকে মা গর্ভকালীন অবস্থার কষ্ট, দুধ খাওয়ানোর কষ্ট এমনকি সন্তানদের লালন-পালন করা, প্রশিক্ষণ দেয়ার কষ্টগুলোকে স্নেহ-মমতাপূর্ণভাবে সহ্য করে। সে কারণেই কোরআন সন্তানদের কাছ থেকে সদয় আচরণ ও সদ্ব্যবহার প্রাপ্তিকে মায়েদের প্রাপ্য বলে মনে করে।

একজন মা তার সন্তানকে শিশুকালে দুধ খাওয়ান যাতে সন্তান বেড়ে ওঠে। কোরআন সন্তানকে মায়ের দুধ খাওয়ানোর মেয়াদ দুই বৎসর বলে ঘোষণা করেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে সন্তান-সন্ততিদের রক্ষণাবেক্ষণ করার দায়িত্ব শরীয়তের বিধান অনুযায়ী বাবার ওপরে বর্তায়। বাবার দায়িত্ব হলো সন্তানদের ভরণ-পোষণ তথা জীবিকা নির্বাহের জন্যে প্রয়োজনীয় অর্থ পরিশোধ করা যাতে মা প্রশান্তচিত্ত্বে সন্তানদের লালন পালন করতে পারে। এ কারণেই সন্তানদের প্রতিপালনের এবং তাদের জীবনে মায়েদের ভূমিকা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক। পরিবারের অঙ্গনটা হলো এমন এক সবুজ শ্যামল ও উর্বর ভূমির মতো যেখানে সন্তানেরা বেড়ে উঠবে প্রস্ফুটিত ফুলের মতো, বেড়ে উঠবে সতেজতার সাথে। এক্ষেত্রে মায়ের ভূমিকাটাই মৌলিক।

সন্তানদের প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে মায়েদের ভূমিকা দু’দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমটি হলো শিশু তার শৈশবের ব্যক্তিত্ব বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ বছরগুলো মায়ের স্নেহ-মমতার মধ্যেই কাটায়। ফলে এই বছরগুলোতে শিশু তার আচার-আচরণ ও অভ্যাস গড়ে তোলার ব্যাপারে মায়েরই মুখাপেক্ষী থাকে। দ্বিতীয়ত, সন্তান এ সময় মাকেই বিপদ-আপদে একমাত্র নিশ্চিত আশ্রয়স্থল মনে করে। সেজন্যে শিশু যখনই কোন রকম নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে,তখনই সে দৌড়ে গিয়ে মায়ের আঁচলে লুকায়। ব্রিটিশ মনোবিজ্ঞানী জন বাবলী বলেছেন,’অনেক পরে এ বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরেছি যে,মায়ের সাথে সন্তানদের আন্তরিক সম্পর্ক না থাকলে শিশুরা বিশেষ করে পুত্র শিশুরা এমন এক ব্যক্তিতে পরিনত হয় যে কিনা অন্যান্যদের সাথে যথাযথ সম্পর্ক সৃষ্টি করতে সক্ষম হয় না।'

সন্তান প্রতিপালনের ব্যাপারে মায়ের যথাযথ ভূমিকা পালনে ঔদাসীন্য পশ্চিমা সমাজে বহু সমস্যার সৃষ্টি করেছে। মার্কিন বিশিষ্ট সমাজ বিজ্ঞানী ডেভিস কিংস্‌লি লিখেছেন,’ পাশ্চাত্যে শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক একটি দিক হচ্ছে বাবা-মা‘র সাথে সন্তানদের দূরত্ব সৃষ্টি করা।' পশ্চিমা সমাজে মায়েরা তাদের সময়ের বেশিরভাগই বাসার বাইরে এবং কর্মস্থলে ব্যয় করেন আর তাদের সন্তানেরা ডে-কেয়ার সেন্টারে কাটায়। মা বাসায় ফেরার পরও ক্লান্তির কারণে সন্তানের প্রতি মাতৃত্বের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ডক্টর বার্টন ওয়ায়েট ডে-কেয়ার সেন্টারকে শিশুদের জন্যে একটা বিপর্যয় বলে মনে করেন। তিনি বলেছেন, ডে-কেয়ার সেন্টারগুলোতে মায়েদের ভালোবাসার চেয়ে বেশি ভালোবাসা উৎপন্ন করা একটা অসম্ভব ব্যাপার।

পশ্চিমা মনোরোগ চিকিৎসক ডক্টর এলিয়ট বার্কার দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে রূঢ় বা উত্তেজিত এবং হত্যাকারী ব্যক্তিদের ওপর কাজ করেছেন। এ ধরনের অপরাধী লোকদের বাবা-মা‘রা যখন তাদের সন্তানদের দেখতে আসতেন তিনি তখন তাদেরকে বলতেন, বাবা-মাকে যে সময় এই সন্তানদের প্রয়োজন ছিল সে সময় তাঁরা কোথায় ছিলেন। আমি জানি এই সন্তানেরা তাদের জন্মের অল্প পরেই তাদের মায়ের কাছ থেকে পৃথক হয়ে গেছে এবং সেবিকাদের হাতে তাদেরকে সোপর্দ করা হয়েছে। তাদের মায়েরা তাদের কাছে খুব কম সময়ই ছিল। এ কারণেই ইসলাম মাকে সন্তান প্রতিপালনের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষক বলে মনে করে। পরিবারকে মনে করে সমাজের মৌলিকতম ভিত্তি আর মাকে মনে করে ভবিষ্যত প্রজন্মের স্থপতি। ইসলাম তাই সমাজের জন্যে উপযুক্ত সন্তান উপহার দেয়ার ক্ষেত্রে মায়ের গঠনমূলক ভূমিকার ওপর ব্যাপক গুরুত্ব দিয়েছে।

পারিবারিক অধিকারের সাথে নারীর মিরাস বা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্য সম্পদের বিষয়টি জড়িত। ইসলামে মিরাসী ব্যবস্থা বা উত্তরাধিকার পরিবারের গুরুত্বের প্রতি দৃষ্টি রেখেই সংরক্ষণ করা হয়েছে। যারা নারী-পুরুষের সমান অধিকারের সমর্থক তারা দাবি করে যে ইসলামে মৌরুসি সম্পত্তির ক্ষেত্রে নারীকে উপেক্ষিত বা অবমূল্যায়িত করা হয়েছে। এ পর্যায়ে আমরা ইসলামের দৃষ্টিতে উত্তরাধিকার এবং তালাকের বিষয়টি নিয়ে খানিকটা কথা বলার চেষ্টা করবো।

মানুষ যখন থেকে মালিকানার অর্থ বুঝতে পারলো এবং সামষ্টিক জীবন যাপন করতে শুরু করলো, তখন থেকে মানুষ মালামাল ও অধিকারের ব্যাপারে সচেতন হয়। ইসলামেরআবির্ভাবের আগে এই সম্পদ ছিল বিশ্বের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রের শক্তির উৎস বা প্রতীক। আর যে-ই তুলনামূলকভাবে বেশি শক্তিশালী ছিল সে-ই অপেক্ষাকৃত কম শক্তির অধিকারী লোকদের সম্পদ নিজের কুক্ষিগত করে নিত। দুর্বলরা তাই শক্তিমানদের কারণে বঞ্চিত ছিল সে সময়। অবশ্য বিশ্বের সকল জাতি ও গোত্রেই নারীরা পৈত্রিক সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হতো। নারীরা স্ত্রী হিসেবে, মা হিসেবে, কন্যা বা বোন হিসেবে তাদের উত্তরাধিকার বা মৌরুসি সম্পত্তির অধিকার পেত না।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায় রোমানরা, গ্রিকরা, মিশরীয়রা এবং চীনারা নারীদেরকে অপরাপর মালামালের মতো নিজেদের ভোগ দখলাধীন সম্পদ বলে মনে করতো। সর্বোপরি নারী সবসময়ই ছিল মৌরুসি সম্পদ থেকে বঞ্চিত, মৌরুসি সম্পত্তির অধিকারী ছিল শুধু ছেলেরা অর্থাৎ পরিবারের পুরুষ সদস্যরা। ইউরোপের অবস্থাও ছিল একই রকম। সেখানেও যারা রক্ত-সম্পর্কের দিক থেকে খুব ঘনিষ্ট ছিল কেবল তারাই মৌরুসি সম্পত্তি পেত এবং মেয়েরা মৌরুসি সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত ছিল। ইসলামই সর্বপ্রথম কোনো বিশ্বজনীন জীবন বিধান যেখানে নারীকে মৌরুসি সম্পত্তির অধিকার দেয়া হয়েছে এবং নারীদের ব্যাপারে জাহেলী যুগের সকল মর্যাদা হানিকর নিয়ম-নীতির বিলোপ ঘটানো হয়েছে। ইসলাম সমাজ ও পরিবারে নারী-পুরুষের প্রত্যেকের ভূমিকা ও আর্থিক দায়িত্বের ভিত্তিতেই মিরাসের(উত্তরাধিকারের) বিষয়টি বিবেচনা করেছে।

আসলে মৌরুসি (উত্তরাধিকারী) আইনটি একটা অর্থনৈতিক বিষয়। ইসলামে মৌরুসি আইনটি সামাজিক ন্যায়ের ভিত্তিমূলেই স্থাপন করা হয়েছে। নারী তার অর্থনৈতিক অধিকারের ক্ষেত্রে মোহরানা, জীবিকা নির্বাহের জন্যে আবশ্যিক প্রদেয় খোরপোষসহ আরো অনেক কিছু প্রাপ্য। এমনকি নারী তার মৌরুসি সম্পদের পুরো অংশই বিনিয়োগ করার অধিকার রাখে, তার জীবন জীবিকার প্রয়োজনে তার মৌরুসি সম্পত্তির অংশ ব্যবহার করার কোনো প্রয়োজন নেই। অথচ পুরুষ নারীর মোহরানা এবং ভরণপোষণের জন্যে প্রদেয় অর্থসহ জীবনযাপনের জন্যে আরো যা যা প্রয়োজন সবকিছু পরিশোধ করতে বাধ্য। এমনকি নারী যদি বাচ্চাদের প্রতিপালনের জন্যে কোনো কিছু চায়, তাহলে পুরুষ তা দিতে বাধ্য। এদিক থেকে চিন্তা করলে দেখা যাবে পুরুষের আয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশই খরচ হয় পরিবার, স্ত্রী ও সন্তানদের পেছনে।

মৌরুসি সম্পত্তির অংশ ভাই-বোনদের গ্রহণ করা উচিত। এক্ষেত্রে ভাইয়ের অংশ বোনের অংশের দ্বিগুণ। বোনের বিয়ের পর তার জীবন-জীবিকার সমূহ ব্যয়ভার স্বামীর ওপর বর্তায়। তাই তার মৌরুসি সম্পত্তির অংশ সে বিনিয়োগ করে এবং স্বামীর সম্পত্তি ব্যবহার করে নিজের জীবন চালায়। কিন্তু ভাই তার বোনের দ্বিগুণ অংশ পেয়ে তার নিজের, স্ত্রীর, সন্তান-সন্ততির সর্বপ্রকার ব্যয় নির্বাহ করতে বাধ্য। তাই বোনের তুলনায় ভাইয়ের অংশ বেশি হলেও দেখা যায় ভাইয়ের অংশের পুরোটাই পরিবারের জন্যে ব্যয় হয়। এছাড়া লক্ষ্য করা যায় সমাজের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পুরুষেরা নারীদের তুলনায় তাদের পুজিঁ বেশি বিনিয়োগ করে থাকে যা একটি সমাজের অর্থনৈতিক ধস প্রতিরোধ করে। অবশ্য সর্বক্ষেত্রে যে মৌরুসিসম্পদের অংশ পুরুষের চেয়ে নারীর কম তা কিন্তু নয়।  কোনো কোনো ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ উভয়ের অংশ সমান। আবার কখনো কখনো নারীর অংশ পুরুষের চেয়ে বেশিও আছে।

পরিবার সংক্রান্ত আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে তালাক। মানব সমাজের যে কটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা রয়েছে তার মধ্যে পরিবার ব্যবস্থাটি অন্যতম কেন্দ্রিয় একটি বিষয়। আজ পর্যন্ত পরিবার ব্যবস্থার কোনো বিকল্প দেখতে পাওয়া যায় নি। সন্তান-সন্ততিদের আধ্যাত্মিক ও বস্তুগত চাহিদাগুলো মেটানোর ক্ষেত্রে প্রধান দায়িত্ব পালন করে থাকে পরিবার। আর পরিবার গঠনের মূল উৎস বিয়ের উপকারিতা ও কল্যাণ সম্পর্কে বিচিত্রমুখি কথা বলেছে ইসলাম। পরিবারের গুরুত্বের কারণে তালাকের নোংরা ও মন্দ দিকগুলো তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে পরিবার এবং সন্তান-সন্ততিদের ওপর তালাকের কী রকম কুপ্রভাব পড়ে-সে বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। রাসূলে আকরাম (সা) বলেছেনঃ আল্লাহর কাছে সেই ঘরই সবচেয়ে প্রিয় যে ঘরটি বিয়ের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে আর সেই ঘরের মতো ঘৃণ্য কোনো ঘর নেই যে ঘর তালাকের কারণে ধ্বংস হয়।

অনেকেই ছোটোখাটো বিষয়-আশয় নিয়ে সহজেই পারিবারিক জীবনের ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দেয়। অনেকে আবার ক্যাথলিকদের একটি গোষ্ঠীর মতো বিশ্বাস করে-কোনো দম্পতি ভীষণ রকম পারিবারিক অসংলগ্নতায় ভোগার পরও বাকি জীবন সেভাবেই কাটাতে হবে। কিন্তু ইসলাম সর্বপ্রকার চরমপন্থা ও উগ্রতা পরিহার করে তালাক এবং পরিবারসহ সকল বিষয়েই মধ্যপন্থা ও ন্যায়ের আশ্রয় নিয়েছে। সেজন্যেই ইসলাম পরিবার ব্যবস্থার প্রতি ব্যাপক গুরুত্ব দেয়ার পরও বলেছে একান্তই যদি কোনো দম্পতির মধ্যকার সম্পর্ক এমন এক তিক্ততার পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছে যা আর সমাধানের যোগ্য থাকে না, সে রকম অবস্থায় সেই দম্পতিকে চরম তিক্ততা নিয়ে জীবনযাপন করতে ইসলাম বাধ্য করে নি।

ইসলাম আসলে বোঝাতে চায় যে দাম্পত্য জীবনটা হলো একটা মানবিক এবং প্রাকৃতিক সম্পর্ক নির্ভর, এটা কিছুতেই চুক্তি ভিত্তিক সম্পর্ক নয়। অধ্যাপক মোতাহহারী এ সম্পর্কে বলেছেনঃ প্রকৃতি বিয়ের ভিত্তিকে স্থান দিয়েছে প্রেমপ্রীতিভালোবাসাএকতা এবং আন্তরিকতার ওপর। এখানে জোর-জবরদস্তির কোনো সুযোগ নেই। বলপ্রয়োগ করে কিংবা আইনের বাধ্যবাধকতা দিয়ে দু ব্যক্তিকে পরস্পরকে সহযোগিতা করতে এবং ঐ সহযোগিতা চুক্তির প্রতি উভয়কে সম্মান প্রদর্শন করতে বাধ্য করা যায়। কিন্তু জোর করে বা আইনের মারপ্যাঁচ দিয়ে পরস্পরকে ভালোবাসতে দুজনকে বাধ্য করাটা অসম্ভব।

আবার কোনো স্বামী যদি স্ত্রীকে জ্বালাতন করে তাহলে ইসলামী আদালত অভিযোগ পাবার ভিত্তিতে নারীপক্ষকে সহযোগিতা করে। মানবীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে এবং মানবীয় পূর্ণতায় পৌঁছার দিক থেকে নারী-পুরুষের মাঝে কোন রকম ভেদরেখা ইসলাম টানে নি। ইসলাম সবসময়ই নারীকে মর্যাদাবান করেছে, যথাযোগ্য সম্মান দিয়েছে।