নূরনবী মোস্তফা (সাঃ) (৬-১০)

৬ষ্ঠ পর্ব

খাদীজা ভোরে আশ্চর্য এক স্বপ্ন দেখলেন।  তিনি স্বপ্নরাজ্যে দেখলেন যে, অন্ধকারাচ্ছন্ন শহরের আকাশের এক প্রান্তে উজ্জ্বল একটি চিহ্ন দেখা যাচ্ছে।  ঐ চিহ্নটি ধীরে ধীরে ভূপৃষ্ঠের দিকে নেমে আসছিল। তার আলো সূর্যের মতো উজ্জ্বল মনে হলো। স্বপ্নিল ঐ সূর্যটা নীচে আসতে আসতে মক্কার আকাশকে আলোকিত করে তুললো।  খাদিজা বিস্ময়করভাবে ঐ নূরে আলোকিত হয়ে গেল এবং হঠাৎ দেখতে পেলো সূর্যটা তার মাথার ওপর এসে দাঁড়িয়েছে। সূর্যটা তারপর নীচে এলো এবং খাদীজার ঘরকে উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত করে তুললো।  খাদীজার ঘুম ভেঙ্গে গেল। অভূতপূর্ব এক অজানা আনন্দে তার মনটা ভরে গেল।  খাদীজার এই মধুর স্বপ্ন তাকে আত্মনিমগ্ন করে তুললো।  স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানার জন্যে সে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লো।  সে বুঝতে পেরেছিল যে, একটা বড়ো সৌভাগ্য তার জন্যে অপেক্ষা করছে, তবে সৌভাগ্যটা যে কী, তা বুঝতে পারে নি।  কদিন হলো খাদীজার বাণিজ্য কাফেলা সিরিয়া থেকে ফিরে এসেছে এবং মুহাম্মাদ (সা) ব্যাপক লাভ বা মুনাফা এনে দিতে সক্ষম হয়েছে।  খাদীজা মনে মনে ভাবতে লাগলো, সম্ভবত আমার সৌভাগ্যটা হলো এই মুনাফা যা মুহাম্মাদ আমীন সিরিয়া থেকে এনে দিয়েছে।  আবার নিজে নিজেই বলতে লাগলো-কিন্তু, এ ধরনের স্বপ্নের ব্যাখ্যা কেবল বস্তুগত সাফল্যের মধ্যে সীমিত থাকতে পারে না।  এই স্বপ্নের অর্থ ক্ষণস্থায়ী জীবন সংক্রান্ত বিষয়াবলীর অনেক উর্ধ্বে।  খুব ভোরে খাদীজা তার বয়স্ক এক চাচাতো ভাইয়ের কাছে গেল।  এই চাচাতো ভাইটির নাম ছিল ওরাকা ইবনে নাওফাল।  আরবের মধ্যে তিনি ছিলেন বেশ জ্ঞানী একজন ব্যক্তিত্ব।  তিনি স্বপ্নের ব্যাখ্যা খুব ভালো জানতেন।  খাদীজা তাঁর কাছে বিস্ময়কর ঐ স্বপ্নের ঘটনাটা বলে ব্যাখ্যা জানতে চাইলেন।  ওরাকা স্বপ্নের ঘটনাটা অত্যন্ত মনোযোগের সাথে শুনলেন এবং বললেন: "খাদীজা! এই স্বপ্নটা তোমার জন্যে বিরাট একটা সুসংবাদ।  তুমি খুব দ্রুত এই পৃথিবীর সবচে মহান ও বিখ্যাত ব্যক্তিকে বিয়ে করবে।" খাদীজার খাদেম মেইসারা সিরিয়ায় বাণিজ্যিক সফরের পর মুহাম্মাদের ব্যাপক প্রশংসা করেছিল।  মেইসারা মুহাম্মাদের চারিত্র্যিক, আত্মিক এবং আধ্যাত্মিকতার ভূয়সী প্রশংসা করে এবং আসা-যাওয়ার পথে যা যা ঘটেছিল, খাদীজার কাছে তার বর্ণনা দেয়।  এইসব বর্ণনা শোনার পর মুহাম্মাদের মর্যাদা খাদীজার কাছে আগের চেয়ে আরো বেড়ে যায়।  খাদীজা মুহাম্মাদকে অত্যন্ত সম্মানীয় ও সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী ব্যক্তিত্ব বলে মনে করতো।  সিরিয়ায় বাণিজ্যিক সফরের কয়েকদিন পর মুহাম্মাদ তাঁর পারিশ্রমিক নেওয়ার জন্যে খাদীজার কাছে এলেন।  খাদীজা বললো: হে আমীন! এই সফরে তুমি প্রচুর মুনাফা এনে দিয়েছো,এই মুনাফায় তোমারও অংশ আছে। এখন বলো তুমি কী চাও!মুহাম্মাদ বললেন: "এই সফর থেকে তোমার যা লাভ হয়েছে,তা আল্লাহর পক্ষ থেকেই হয়েছে,এর মাঝে আমি কেবল ওসিলামাত্র ছিলাম।" খাদীজা বললো: ঠিক আছে,আমি নিজেই তোমাকে মুনাফা দিতে চাই। এখন তুমি বলো, এই টাকা দিয়ে তুমি কী করবে! মুহাম্মাদ খানিক বিরতির পর বললেন: আমার ওপর চাচা আবু তালেবের ব্যাপক অধিকার রয়েছে।  ঐ অধিকারের সামান্য অংশ আদায় করার জন্যে আমি আমার পারিশ্রমিকের পুরো টাকাটাই তাঁকে দিয়ে দিতে চাই।  বিষয়টা চাচার কাছে উত্থাপন করেছিলাম কিন্তু তিনি রাজি হলেন না।  খাদীজার কাছে মুহাম্মাদ (সা) এর মর্যাদা ও গাম্ভীর্য আরো বেড়ে যায়।  খাদীজা চেয়েছিল মুহাম্মাদকে পুরস্কার স্বরূপ কিছু টাকা দিতে, কিন্তু মুহাম্মাদ নিলেন না, তিনি শুধু পারিশ্রমিকের টাকাটাই গ্রহণ করলেন। খাদীজা ছিলো অত্যন্ত পূত-পবিত্র ও সতী-সাধ্বী এক রমনী।  মুহাম্মাদের বিশ্বাস এবং তার অমায়িক ভদ্রতার তিনি প্রশংসা করতেন।  মুহাম্মাদের মহান ব্যক্তিত্ব এবং আধ্যাত্মিক বৈশিষ্ট্য খাদীজার ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল।  তাই মনে মনে ভাবলো: সম্ভবত স্বপ্নে দেখা ঐ সূর্য এই মুহাম্মাদেরই পবিত্র ও সুমহান অস্তিত্ব।  কুরাইশদের মধ্য থেকে অনেক সম্পদশালী লোক এবং বড়ো বড়ো ব্যক্তিত্ব খাদীজাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিয়েছিল।  কিন্তু মুহাম্মাদ ছিলেন এক দরিদ্র যুবক। খাদীজা খুব ভালো করেই জানতো যে, সে যেহেতু কুরাইশদের মাঝে সবচে ধনী মহিলা, সেহেতু দারিদ্র্যের কারণে মুহাম্মাদ তাকে বিয়ে করার প্রস্তব দেবে না।  তাই স্বপ্নের ঘটনায় সে সিদ্ধান্ত নেয় যে নিজেই মুহাম্মাদের কাছে নিজের বিয়ের প্রস্তাব দেবে। সিদ্ধান্ত মোতাবেক খাদীজা এই কাজের জন্যে তার এক বান্ধবী নাফিসার সহযোগিতা কামনা করে।  নাফিসা বান্ধবীর আহ্বানে সাড়া দেয়।  সে মুহাম্মাদের কাছে যায়।  মুহাম্মাদ (সা.) নাফিসাকে চিনতেন।  সেও ছিল মক্কার একজন নামকরা রমনী। নাফিসা মুহাম্মাদের উদ্দেশ্যে বললো: হে আমীন! তোমার সততা, পবিত্রতা এবং আমানতদারীর কথা সর্বত্র শোনা যায়। মক্কার সকল মেয়েই তোমার সাথে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হতে চায়।  তোমার বয়স এখন ২৫ বছর। কেন তুমি বিয়ে করে নিজের জীবন সাজাচ্ছো না?কিছুদিন থেকে অবশ্য মুহাম্মাদ (সা.) নিজেও বিয়ের কথা ভাবছিলেন এবং ঈমানদার ও পূত-পবিত্র একজন রমনীকে স্ত্রী হিসেবে বরণ করার কথা ভাবছিলেন।  তাই নাফিসার কথা শোনার পর মাথা নিচু করে একটু ভাবলেন। নাফিসা বলতে লাগলো: আচ্ছা, আমি যদি তোমাকে এমন এক রমনীর সন্ধান দেই, যে কিনা রূপে-গুণে, ব্যক্তিত্বের মহিমায়, অর্থ-সম্পদে এবং পবিত্রতায় মক্কার মধ্যে বিখ্যাত,তাকে তুমি বিয়ে করবে? মুহাম্মাদ জিজ্ঞেস করলেন: তুমি কার কথা বলছো! নাফিসা বললো: আমি সেই নারীর কথা বলছি যাকে মক্কার সকল সম্পদশালী ব্যক্তিই বিয়ে করতে চায়। কিন্তু বিয়ের ক্ষেত্রে তার মানদণ্ড অর্থ-সম্পদ নয়, তার মানদণ্ড হলো মর্যাদা,সম্মান ও ব্যক্তিত্ব যা আজকাল কম লোকের মাঝেই দেখা যায়। এরপর নাফিসা বললো-মুহাম্মাদ! আমি খাদীজার কথা বলছি।  তুমি তো তার পূত-পবিত্রতার খ্যাতির কথা জানোই। খাদীজাও তোমার মতোই, মূর্তিপূজা করে না এবং এই কাজকে মিথ্যা বা অন্যায় বলে মনে করে।   সে-ও চিরসত্যের অনুসারী। আভ্যন্তরীণ কোনো এক বোধশক্তি তাকে অন্যায় বা নোংরা কাজ থেকে বিরত রাখে।  মুহাম্মাদ নাফিসার কথা শুনে খানিকটা চিন্তা করলেন যে, তাঁর পক্ষে তো মূর্তিপূজক কোনো নারীকে বিয়ে করা সম্ভব নয়। তাই তিনি নাফিসাকে বললেন:খাদীজা মক্কার একজন সম্মানিত ও সম্পদশালী মহিলা! সে কি আমার মতো এক দরিদ্র যুবককে বিয়ে করবে?নাফিসা মুহাম্মাদের কথা শুনে আনন্দিত হয়ে বললো: বিয়ে করবে কি করবে না,সে দায়িত্ব তুমি আমার ওপর ছেড়ে দাও!-এই বলে নাফিসা খাদীজার ঘরের দিকে চলে গেল। এর কদিন পর মুহাম্মাদ নাফিসাকে নিয়ে খাদীজার ঘরে গেল।  এটা ছিল তাঁদের দুজনের মাঝে বিয়ের প্রাথমিক সাক্ষাৎ।  মুহাম্মাদ সবসময়ের মতোই শান্ত এবং বিনত মস্তক ছিলেন।  ভাগ্য নির্ধারণী এ মুহূর্তে দুজনই দুজনের কথা শোনার জন্যে উদগ্রীব ছিলেন।  খাদীজা কথা শুরু করলেন এভাবে:"হে মুহাম্মাদ! আরবের মধ্যে বংশ-মর্যাদার দিক থেকে তোমার চেয়ে উচ্চস্থানীয় কেউ নেই। তুমি নিশ্চয়ই জানো যে, বহু সম্পদশালী লোক আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু আমি তোমার সম্পর্কে অনেক শুনেছি। নিজেও তোমার বহু মাহাত্ম্য বা অলৌকিক কর্মকাণ্ড দেখেছি।  তোমার সততা,আমানতদারী এবং পবিত্রতায় মুগ্ধ হয়ে আমি তোমার স্ত্রী হবার বাসনা পোষণ করছি। আমিও যে তোমার সততার ব্যাপারে আস্থাবান তুমি সে ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকো।" কে জানে, পবিত্র ঐ মুহূর্তে মুহাম্মাদের মনের ভেতর কেমন করছিল।  কিন্তু মুহাম্মাদ তাঁর স্বভাবসিদ্ধ বিনয় ও ভদ্রতার সাথে বললেন: এ ব্যাপারে আমার চাচার সাথে পরামর্শ করা প্রয়োজন।  এরপর দুপক্ষীয় অভিভাবকদের মাঝে একটা বৈঠক অনুষ্ঠানের কথা ধার্য হলো।  সিদ্ধান্ত অনুযায়ী খাদীজার বাসায় একটা জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলো। আসরে সর্বপ্রথম মুখ খুললেন আবু তালেব।  আল্লাহর নাম নিয়ে তিনি তাঁর ভাতিজাকে সবার সামনে পরিচিত করালেন এভাবে:"আমার ভাতিজা মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ কুরাইশ যুবকদের সবার মধ্যে শ্রেষ্ঠস্থানীয়।  সে অবশ্য অর্থ-সম্পদের দিক থেকে বঞ্চিত। তবে একথা জেনে রেখো, সম্পদ হলো ছায়ার মতো,ছায়া একসময় বিলীন-বিলুপ্ত হয়ে যায়। কিন্তু সম্মান-মর্যাদা এবং বিশ্বাসের মতো মৌলিক জিনিসগুলো থেকে যায়।"আবু তালিবের কথা শেষ হবার পর খাদীজার চাচাতো ভাই ওরাকা ইবনে নাওফাল দাঁড়িয়ে বললেন: কুরাইশদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে তোমাদের সম্মান-মর্যাদার কথা অস্বীকার করে। আমরাও আন্তরিকভাবেই তোমাদের এই সম্মান মর্যাদায় গর্বিত। আমরা তাই তোমাদের সাথে আত্মীয়তাসূত্রে আবদ্ধ হতে চাই।  এরপর বিয়ের মোহরানা ধার্য হলো এবং তাদের দুজনের মাঝে বিয়ের আকদ হলো।  এভাবেই পৃথিবীর দুই বিখ্যাত নর-নারী স্বামী-স্ত্রীর মহান সম্পর্কে আবদ্ধ হলো। কয়েক মুহূর্ত পর খাদীজা (সা.) তাঁর স্বামী মুহাম্মাদ (সা.) এর চেহারার প্রতি অর্থপূর্ণ দৃষ্টিনিক্ষেপ করলেন।  তিনি তাঁর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে তাঁর এবং মুহাম্মাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে তাকালেন এবং তাঁদের বিয়ের বরকতপূর্ণতা দেখতে পেলেন। খাদীজার স্বপ্ন এভাবেই বাস্তবে পরিণত হয়।খাদীজা তাঁর স্বামীর আধ্যাত্মিকতার বিষয়টি খুব ভালো করেই জানতেন। আর এ কারণেই তিনি তাঁর স্বামীর প্রতি বেশী আকৃষ্ট হন।  তিনি তাঁর সকল ধন-সম্পদ স্বামীর হাতে সোপর্দ করলেন। মুহাম্মাদ (সা.) তাঁর দয়ালু চাচার ঘর থেকে খাদীজা (সা.)র ঘরে এলেন।  বিত্তবান জীবনে আসার পরও কিন্ত তাঁর আচার-আচরণে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন আসে নি।  তিনি সহজ-স্বাভাবিক বা অনাড়ম্বর জীবন-যাপন করতেন।  সাধারণ খাবার খেতেন।  যে-কোনো অভাব-অভিযোগ বা প্রয়োজনে তিনি একমাত্র আল্লাহর ওপর নির্ভর করতেন।  বঞ্চিত, আর অভাবগ্রস-দের প্রতি তিনি ছিলেন সবসময়ই সদয়। তাদের চিন্তা ছিল তাঁর সার্বক্ষণিক একটা বিষয়। কিন্তু অন্ধকার সে সময়কার লোকজন যে মূর্তিপূজা করতো,সে বিষয়টি তাঁর বিনীত অন্তরকে সারাক্ষণ আহত করতো,কষ্ট দিতো। তিনি মক্কার গোলোযোগ এবং দাঙ্গাপূর্ণ পরিবেশ থেকে দূরে থাকতেন। মুহাম্মাদের অন্তরাত্মা ধীরে ধীরে বৃহৎ দায়িত্ব পালনের জন্যে প্রস্তত হচ্ছিল, যার অপেক্ষায় তিনি ছিলেন। #

নূরনবী মোস্তফা (সাঃ) (৭ম পর্ব)

মুহাম্মাদের বয়স যতোই বাড়তে লাগলো, তাঁর চেহারায় নূরের ঔজ্জ্বল্যও বৃদ্ধি পেতে লাগলো।  ইব্রাহীম (আ.) প্রবর্তিত বিধি-বিধানের একটা ম্লান রূপ ইতিহাসের পাতায় তখনো অবশিষ্ট ছিল।  ঈসা (আ.) এর জন্মের কয়েক শতাব্দী কেটে গেল।  তাঁর শিক্ষার আলোও নিষ্প্রাণ হয়ে গেল। পাশ্চাত্যে নির্দয় রোমান সভ্যতা সর্বত্র ছায়া বিস্তার করেছিল। ইরানে শাহের শক্তি ছিল অসীম, জনগণ তার কাছে প্রজা হিসেবে গণ্য ছিল।  এই দুই সাম্রাজ্য অর্থাৎ রোমান সাম্রাজ্য এবং পারস্য সাম্রাজ্যে তখন যরাথুস্ত্র এবং ঈসা (আ.) এর জয় জয়কার ছিল ঠিকই কিন্ত তাঁদের প্রবর্তিত বিধি-বিধানের সাথে দূরত্ব ছিল প্রচুর।  এই দুই সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রীয় এবং রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে গ্রামের পর গ্রাম শহরের পর শহর রক্তাক্ত হয়েছিল।  রোমে গোলাম বা দাসদেরকে কঠিন কাজে ব্যবহার করা হতো। যেমন প্রাসাদ তৈরীর কাজ, প্রার্থনালয় ইত্যাদি কাজে তাদেরকে ব্যবহার করা হতো।  দাসেরা যদি ছোটোখাটো কোনো প্রতিবাদও জানাতো,তাহলে তাদেরকে দেওয়াল বা পিলারের ফাঁকে জীবিত সমাহিত করা হতো।  যুদ্ধ,নিষ্ঠুরতা এবং হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি প্লেগ আর দুর্ভিক্ষও সমানভাবে বিরাজ করছিল। অন্যদিকে জঙ্গলাকীর্ণ দক্ষিণ আফ্রিকায় তখনো সভ্যতার কোনো ছোঁয়াই লাগে নি।  সুদূর প্রশান্ত মহাসাগরের তীরভূমি কিংবা আমেরিকার হারানো উপমহাদেশ সম্পর্কে কারো কোনো ধারণাই ছিল না।  ফলে বলা যায়, রোমান সভ্যতার ওপর দিয়ে খ্রিস্টান ধর্মের সুশীতল বায়ুপ্রবাহ যদি বয়ে না যেত, তাহলে পাশ্চাত্য ভূমিতে কারো মনেই খোদার প্রতি প্রেম বা ভালোবাসার অনুভূতিই জাগতো না। যাই হোক, তৎকালীন বিশ্ব জুলুম-অত্যাচার আর অজ্ঞতার আঁধারে একেবারে ছেয়ে গিয়েছিল। হযরতের নবুয়্যত লাভ করার আগে অর্থাৎ ঈমান ও জ্ঞানের আলো বিকিরিত হবার আগে চিন্তা বা যুক্তিমার্গ থেকে মানুষ বহুদূরে অবস্থান করতো। তবে চন্দ্র, সূর্যের মত নানা জড়বস্তুর পূজা-অর্চনা, বলখে অবস্থিত বৃহৎ নওবাহার মন্দির এবং পারস্যে অসংখ্য অগ্নিমণ্ডপ ও বিশাল বৌদ্ধ মন্দিরের অবস্থান এই প্রমাণ বহন করে যে, সৃষ্টিকর্তা বা উপাসকের অন্বেষন মানুষের সহজাত প্রবণতা এবং এই প্রবণতা সার্বজনীন ও সর্বকালীন। ফলে মানুষ কোনো না কোনো কিছুর পূজা-অর্চনা করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে।  এই প্রবণতা বা প্রয়োজনীয়তার কারণেই ঐশী গ্রন্থগুলোও মানুষের অনুচিত হস্তক্ষেপ থেকে রেহাই পায় নি।  যেমন, তৌরাতে আল্লাহর অস্তিত্ব মানুষের দৈহিক গঠনের মতো রূপ নেয়।  এমনকি তৌরাতে মানবরূপী এই খোদা মানুষের সাথে কুস্তি খেলে হেরে যায়।  আরবের বিভিন্ন গোত্রের লোকজন বছরের ৩৬০ দিনে তিন শ ষাট দেবতা বা মূর্তির পূজা করতো।  তারা লাত-মানাত-ওয্যার মতো বড়ো বড়ো মূর্তিগুলোকে খোদার মেয়ে বলে মনে করতো।  রোমেও এ ধরনের খোদাদের বাজার বেশ ভালোই জমেছিল।  এসবই রাসূলের নবুয়্যত লাভের পূর্বেকার ঘটনা। সে সময় মানুষ বিচিত্র ধারণা-কল্পনা আর কুসংস্কারে নিমজ্জিত ছিল।  কোনো ঘটনা বা পরিস্থিতিকে যুক্তি দিয়ে বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা তাদের ছিল না।  মার্কিন ইতিহাসবিদ বিল ডুরান্টের ভাষ্য অনুযায়ী, তখনকার দিনে মানুষ হরিণের হাঁড় আর কচ্ছপ পুড়িয়ে ভবিষ্যত বাণী করতো।  অন্যভাবে বলা যায় রাসূলের নবুয়্যত লাভের আগে সমাজে মানুষের প্রকৃত কোনো অবস্থান জানা ছিল না।  অন্যদের ওপর নিজস্ব মালিকানা সত্ত্ব এতটাই প্রবল হয়ে উঠেছিল যে একজন পিতা ইচ্ছে করলেই পরিবারের সবাইকে বিক্রি করে ফেলতে পারতো কিংবা পরিবারের সবাইকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে পারতো। এই মালিকানা অধিকার একজন পিতার ছিল। স্ত্রীর প্রতিও পুরুষদের একইরকম অধিকার ছিল।  আরবে নারীরা অন্যান্য মালামালের মতো লুট হতো। পুরুষরা অন্য কোনো পুরুষকে মেরে তার স্ত্রীকে অধিকার করতে পারতো।  জাপানী পরিবারে বাবা তার নিজস্ব সন্তান-সন্ততিকে গোলাম হিসেবে যেমন বিক্রি করতে পারতো, তেমনি ইচ্ছে করলে পতিতালয়েও বিক্রি করতে পারতো।  জাহেলী যুগের সমাজে সর্বপ্রকার নোংরামী আর নিষ্ঠুরতা বিরাজ করছিল।  রুক্ষ ও নির্দয় মানুষগুলোর অন্তর ছিল পাথরের মতো কঠিন।  বংশে-বংশে, গোত্রে-গোত্রে মারামারি-হানাহানি আর রক্তপাত ছিল নিত্যদিনের ঘটনা।  রক্তপাত কে কতো বেশী ঘটাতে পারলো, তা নিয়ে গর্ব অহঙ্কার করতো তারা।  আরব ভূখণ্ডে তখন জাহেলী চিন্তা আর অবৈধ কর্মকাণ্ড অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। হযরত আলী (আ.) বলেন: "হে আরব জাতি! তোমরা সর্ব নিকৃষ্ট ধর্ম বা আচার-কুসংস্কারের অনুসারী ছিলে! সর্ব নিকৃষ্ট পরিবেশের মধ্যে দিনযাপন করছিলে! প্রস্তর আর কঙ্করময় ভূমিতে বিষাক্ত সাপের মাঝে-যেসব সাপ কোনো শব্দকেই ভয় করতো না -সে রকম পরিবেশে তোমরা বসবাস করছিলে।  তোমরা দূষিত পানি পান করতে এবং রুক্ষ ও শুষ্ক সব খাবার-দাবার খেতে।  তোমরা পরস্পরের খুন বইয়ে দিতে এবং আত্মীয়-স্বজনের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে। তোমরা মূর্তিকে খোদা বলে দাবী করতে এবং তোমাদের মাঝে অন্যায়-পাপাচার ছিল নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার।" এইসব বিশৃঙ্খল ঘটনা দেখে রাসূলের পবিত্র অন্তর ভীষণভাবে আহত হতো। তিনি বন্দীত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ কোনো ব্যক্তির দুঃখ-কষ্ট সহ্য করতে পারতেন না, এই জুলুমপূর্ণ পরিবেশ তিনি মেনে নিতে পারতেন না।  নিরুপায় হয়ে শহর থেকে দূরে প্রাকৃতিক কোনো পরিবেশ কিংবা মরুভূমিতে গিয়ে তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে চিন্তায় মগ্ন হয়ে যেতেন।  একদিন মুহাম্মাদ (সা.) একদল লোককে মক্কার বাজারে দেখতে পেলেন।  তিনি তাদের মাঝে গেলেন। দেখলেন একজন আরব জুয়া খেলতে খেলতে তার ঘর, উট সব হারিয়ে বিজয়ী ব্যক্তির অধীনে দশ বছরের জন্যে বন্দী হয়ে গেল। মুহাম্মাদ (সা.) ঐদিন অন্যদিনের চেয়ে অনেক বেশী দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে মরুভূমির দিকে গেলেন।  মক্কার আশেপাশের পাহাড়গুলোতে অন্যান্যদিনের তুলনায় অনেক বেশী সময় কাটালেন এবং রাতে বেশ দেরী করে বাসায় ফিরলেন। তবে জাহেলী যুগের সবচেয়ে নোংরা আচার-প্রথাগুলো দেখা যেত তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদিতে। দেবতাদের উদ্দেশ্যে মন্দিরের বলিকাষ্ঠে সাহসী সন্তানদেরকে জবাই করা হতো। বলি দেওয়া সন্তানের রক্তমাখা মাটিতে গড়াগড়ি করতো। অপরদিকে আরবরা কন্যা সন্তান থাকায় অপমানিত বোধ করে কিংবা ক্ষুধার্ত হবার ভয়ে নিজেদের কন্যা সন্তানগুলোকে জ্যান্ত কবর দিয়ে দিত। অনেক সময় দেখা যেত, অবুঝ ঐ কন্যা সন্তানটি তার জন্যে কবর খোঁড়ার কাজে বাবাকে সহযোগিতা করছে। আবার এমনও দেখা গেছে, বাবা তার কন্যা সন্তানটির সারা গায়ে লেগে থাকা ধূলোবালি পরিস্কার করে, ঘণ্টাখানেক পর নিজেই তাকে জীবিত কবর দিয়ে এসেছে।ইসলামের সর্বশেষ নবীর নবুয়্যত প্রাপ্তির আগে বর্ণ এবং শ্রেণীবৈষম্য ছিল মারাত্মক। একটা শ্রেণী ছিল সম্পদশালী,আর আরেকটি শ্রেণী ছিল গরীব। ধনীরা গরীবদের শোষণ করতো।  অপরের কাছ থেকে নিজস্ব অধিকার আদায় করে নেওয়ার শক্তি কারো ছিল না। অবস্থা এমন বেগতিক ছিল যে, মুহাম্মাদ (সা.) কতিপয় যুবককে নিয়ে সংগঠন প্রতিষ্ঠা করতে বাধ্য হন।  সংগঠনভুক্ত সবাই শপথ নেন যে,তাঁরা মজলুম বা বঞ্চিতদের অধিকার রক্ষায় সকল প্রকার চেষ্টা চালাবেন।  সে সময় দাস বেচা-কেনাও একটা লাভজনক ব্যবসা ছিল।  যে দাসদের বেচা-কেনা করা হতো,তারা সাধারণত আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ ছিল অথবা ছিল যুদ্ধবন্দী।  একদিন খাদীজার ভাতিজা হাকীম সিরিয়া থেকে বেশ কজন দাসকে খাদীজার কাছে নিয়ে এলো।  তাদের মাঝে বনু কেলাব গোত্রের একটি শিশুও ছিল।  শিশুটির নাম ছিল যায়েদ।  খাদীজা ঐ শিশুটিকে কিনে নিলেন।  মুহাম্মাদ (সা.) ঐ শিশুটিকে দেখে অন্তরে খুব ব্যথা পেলেন,তাঁর চেহারা ম্লান হয়ে গেল।  হযরত খাদীজা ঐ শিশুটিকে তাঁর স্বামীর খেদমতে হাজির করলেন। মুহাম্মাদ (সা.) দ্রুত শিশুটিকে আযাদ করে দিলেন।  তারপর এই নিরাশ্রয় শিশুকে নিজেদের পরিবারের সন্তান হিসেবে বরণ করে নিলেন।  অত্যাচার আর অজ্ঞানতার বিস্তৃতি যতোই বৃদ্ধি পেতে লাগলো,বিশ্ব একটা বিপ্লব বা বিশাল পরিবর্তনের জন্যে ততোই প্রস্তুত হতে লাগলো।  ঐ নিঝুম অন্ধকারের মাঝেও হঠাৎ একটা আলোর ঝলকানি দেখা দিল। সত্য সুনির্মল এক জ্যোতি মুহাম্মাদ (সা.) এর অন্তরকে আয়নার মতো আলোকোজ্জ্বল স্বচ্ছ করে দিল।  উজ্জ্বল ঐ আলো অন্ধকার পৃথিবীকে আলোকিত করে তুললো।

নূরনবী মোস্তফা (সাঃ) (৮ম পর্ব)

মুহাম্মাদ (সা.) এখন চল্লিশ বছর বয়সে পা রেখেছেন। ছোটোবেলা থেকে যে প্রকৃতির সাথে তাঁর নিবীড় সখ্যতা ছিল,সেই সখ্যতা এখনো অটুট রয়েছে। শহরের কোলাহল থেকে দূরে প্রকৃতির কাছাকাছি চলে যেতেন এবং অপেক্ষমাণ কৌতূহলী দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতেন।  মুহাম্মাদ (সা.) সূক্ষ্মদর্শী ছিলেন বলে প্রকৃতির গ্রন্থে শিক্ষণীয় অনেক কিছু খুঁজে পেতেন। রাতের আকাশ ছিল তাঁর জন্যে বিস্ময়কর ও রহস্যময় শিক্ষার আধার।  হেরা গুহা এখনো তাঁর নিঃসঙ্গতার পরম সহচর। নূর পাহাড়ের এই চূড়া থেকে তিনি লক্ষ্য করতেন মানুষের আদর্শহীন চিন্তাধারা আর আচার-আচরণ। মুর্খ লোকেরা অশালীন সব নিয়ম-কানুন পালন করেই সন্তুষ্ট ছিল।  নিজেদের তৈরি মূর্তিগুলোকে তারা সেজদা করতো। সাধারণ কোনো ঘটনার জের ধরে খোনাখুনিতে লিপ্ত হতো। মোটকথা, সমগ্র বিশ্ব তখন আশ্চর্য এক অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল। মানুষের জীবনবৃক্ষ সবুজ-শ্যামলিমা হারিয়ে ঝরা পাতার মতো হলুদ হয়ে গিয়েছিল। মুহাম্মাদ (সা.) এসব দেখে দেখে দুঃখ করতেন, কষ্ট পেতেন।  মুহাম্মাদ (সা.) এখন আগের চেয়েও বেশি বেশি হেরা গুহায় যান। দিনের পর দিন তিনি হেরা গুহায় কাটান। খাদীজা (সা.) এরকম দেরী দেখলে রাসূলের চাচাতো ভাই আলীর সাথে খাদ্যসামগ্রি, পানি ইত্যাদি নিয়ে গুহায় যেতেন।  অনেক দিন স্বামীর সাহচর্য থেকে বঞ্চিত হবার কারণে খাদীজা তাঁর এবং তাঁর সন্তানদের বিষন্নতা নিয়ে কথা পাড়েন।  চাচাতো ভাই আলীও রাসুলের প্রতি তার ভালোবাসার কথা ব্যক্ত করলেন। কিন্তু হযরত তাঁদের কথার জবাবে বললেন: হ্যাঁ, সবই জানি আমি এবং আমিও যে তোমাদেরকে কতোটা ভালোবাসি, তোমরাও সে ব্যাপারে সচেতন। কিন্তু ঘটনাক্রমে এই কটা দিন আশ্চর্যরকমভাবে বিশ্বস্রষ্টার স্মরণ ছাড়া অন্য কোনো কিছুতে মন বসছে না।  অবশেষে সেই রহস্যময় রাত এলো। নূর পাহাড়ের ওপর এবং তার দক্ষিণ প্রান্তরে চাঁদ যেন তার কোমল জ্যোৎস্না বিছিয়ে রেখেছিল। মক্কা এবং তার আশেপাশের পরিবেশ যেন গভীর নিদ্রায় অচেতন। চারদিকে সুনসান নিরবতা।  পৃথিবী এবং কাল যেন ঐ রাতে বিশাল কোনো ঘটনার অপেক্ষায় ছিল।  মুহাম্মাদ (সা.) অধিকাংশ রাতই জেগে কাটিয়ে দিতেন। ঐ রাতে পর্বতের কোথাও কোনো সাড়া-শব্দ ছিল না। এই নিরবতা, এই শান্ত-নিবীড় মুহূর্তের একটা প্রতীয়মান অর্থ ছিল।  রহস্যময় ঐ মুহূর্তে হঠাৎ আকাশে অচেনা এক বিদ্যুচ্ছটা দেখা গেল। হযরতের স্থির দৃষ্টি সেদিকে পড়লো। তিনি তাঁর দেহমনে একধরনের কম্পন অনুভব করলেন।  তাঁর বিনম্র অন্তরাত্মা যেন বিশালত্ব খুঁজে পেল।  তিনি জ্বলজ্বলে এক বিশাল কিছুর অস্তিত্ব দেখতে পেলেন।  তিনি প্রথমত ভেবেছিলেন যে হয়তো স্বপ্ন দেখছেন,কিন্তু না, এখন আরো স্পষ্টভাবে দেখতে পেলেন সেই বিশাল অস্তিত্ব। তার বাহ্যিক আকৃতিতে একধরনের গাম্ভীর্য ও আকর্ষণ ছিল।  মুহাম্মাদ (সা.) আকাশের যে দিকেই তাকালেন ঐ বিশাল অস্তিত্ব তাঁর মাথার উপরে দেখতে পেলেন। এই অস্তিত্বটি আর কেউ নন,স্বয়ং ওহীবাহক জিব্রাঈল। জিব্রাঈল ফেরেশতা কাছে এসে মুহাম্মাদ (সা.) কে বললেন: হে মুহাম্মাদ! পড়ুন! মুহাম্মাদ মনোযোগের সাথে দেখলেন তাঁর সামনে কিছু একটা লেখা প্রদর্শিত হচ্ছে। পুনরায় শব্দ হলো- পড় তোমার খোদার নামে। মুহাম্মাদ (সা.) বিচলিত কণ্ঠে বললেন: কী পড়বো! তারপর ফেরেশতা জিব্রাইল বললেন: পড়ো তোমার প্রভুর নামে,যিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন! যিনি আলাক বা জমাট রক্ত থেকে মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। পাঠ কর সেই মহান প্রভুর নামে,যিনি কলমের সাহায্যে মানুষকে সেইসব বিষয়ে শিক্ষা দিয়েছেন,যেসব বিষয় তারা জানতো না! হযরতের সকল অসি-ত্বে ঐশীপ্রেম যেন উপচে পড়ছিল।  তিনি ফেরেশতার সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে পড়তে শুরু করলেন। শূন্যে আবারো ধ্বনিত হলো:হে মুহাম্মাদ! তুমি আল্লাহর রাসূল এবং আমি তাঁরি ফেরেশতা জিব্রাঈল।  ফেরেশতা জিব্রাঈল (আ.) এর এই গুরুগম্ভীর উচ্চারণ হযরতের কানে যেন প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো।  হ্যাঁ, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আবারো তাঁর বান্দাদের সাথে কথা বলতে চেয়েছেন এবং তাঁর সমগ্র সৃষ্টিকূলের মধ্য থেকে মুহাম্মাদকেই তাঁর অহীর বার্তা গ্রহণ করার উপযুক্ত মনে করলেন। মুহাম্মাদ নিজেই মানুষকে সকল গোমরাহী আর বিচ্যুতি থেকে রক্ষা করার চিন্তায় এতোদিন ব্যস্ত ছিলেন, এখন বিশাল একটি দায়িত্ব্ই তাঁর ওপর ন্যস্ত হলো।  তাঁর সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে বিস্ময়কর এক অনুভূতি জাগ্রত হলো।  ভীষণ এক উষ্ণতায় তাঁর সমস্ত শরীর যেন পুড়ে যাচ্ছিল। এক ধরনের উত্তেজনায় তাঁর পবিত্র কাঁধ দুটি কাঁপছিলো।  তিনি উঠতে চাইলেন কিন্ত ওঠার মতো শক্তি তাঁর ছিল না। মাটিতে কপাল রেখে কাঁদলেন।  আবেগময় ঐ মুহূর্তে মুহাম্মাদ (সা.) নবুয়্যতির দায়িত্বে অভিষিক্ত হলেন।  কঠিন এই পরিস্থিতির কিছুক্ষণ পর মুহাম্মাদ (সা.) কম-বেশি আনুভূতিক শক্তি ফিরে পেলেন।  হেরা গুহা থেকে এবার বাইরে পা রাখলেন তিনি। তারাভরা আকাশ, সরু নতুন চাঁদ আর মক্কার শান্ত শহর তাঁর সামনে দেখতে পেলেন।  কিন্ত ঐ নিরবতার পর সমগ্র বিশ্ব যেন পুনরায় প্রাণস্পন্দন ফিরে পেল। বিশ্বব্যাপী নতুন করে প্রাণ সঞ্চারিত হলো। চারদিকে আবেগময় এক গুঞ্জরণ সৃষ্টি হলো।  পাহাড়-পর্বত, মরুভূমি এককথায় আকাশ আর যমীনে যা কিছু ছিল সবাই ফিসফিস করে বললো: হে খোদার মনোনীত নবী! তোমার প্রতি সালাম! মুহাম্মাদ (সা.) অত্যন্ত ধীরে সুস্থে চিন্তা-ভাবনা করে পদক্ষেপ ফেলছিলেন। বিস্ময়কর ঐ ওহীর বাণী তাঁর কানে একটা বিশেষ সুর সৃষ্টি করছিল: পড় তোমার প্রভুর নামে! এভাবে তাঁর অন্তর প্রশান্তি পেলো।  এক সমুদ্র অনুভূতি আর আবেগ নিয়ে তিনি তাঁর একান্ত সহচর খাদীজার কাছে রহস্যময় ঘটনাটি বলে আবেগ প্রশমিত করতে চাইলেন।  খাদীজা (সা.) যখন দরোজা খুললেন, মুহাম্মাদ (সা.) এর কালো চোখে একটা বিশেষ ঔজ্জ্বল্য দেখতে পেলেন।  চেহারার এই ঔজ্জ্বল্য দেখে খাদীজা বুঝতে পেরেছেন যে কিছু একটা ঘটেছে।  মুহাম্মাদ (সা.) কয়েক মুহূর্ত বিশ্রাম নিয়ে খাদীজাকে পুরো ঘটনা খুলে বললেন।  ঘটনা শুনে খাদীজার অন্তর অপূর্ব এক আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়লো।  অশ্রুজড়িত কণ্ঠে তিনি বললেন: "হে মক্কার আমীন! তুমি ছিলে সবার বিশ্বস্ত ও আস্থাভাজন, সৎ ও ন্যায়বান এবং সত্যভাষী! তুমি ছিলে মজলুম ও অত্যাচারিতদের ডাকে সাড়াদানকারী এবং সত্য-ন্যায়ের পৃষ্ঠপোষক! তোমার দয়ার কথা, তোমার উত্তম স্বভাব চরিত্রের কথা, আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক স্থাপনে তোমার প্রচেষ্টার কথা সবার মুখে মুখে।  এ কারণেই সমগ্র বিশ্বের স্রষ্টা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তোমাকে তাঁর নবী হিসেবে মনোনীত করেছেন।  তুমি শান্ত হও! খোদার শপথ, এটা তোমার দুঃখ-কষ্ট আর পরহেজগারীর পুরস্কার। হে আল্লাহর রাসূল! তোমার প্রতি সালাম!"এভাবেই খাদীজা (সা.) সর্বপ্রথম রাসূলের প্রতি ঈমান এনে গৌরবান্বিত হন।  যাই হোক,এরপর মুহাম্মাদ (সা.) একটু ঘুমালেন। খাদীজা (সা.) দৃঢ় বিশ্বাসী অন্তর নিয়ে তাঁর মনে জাগ্রত কয়েকটি বিষয়ে জানার জন্যে বিজ্ঞ চাচাতো ভাই ওরাকা বিন নাওফালের কাছে গেলেন।  তিনি ওরাকার কাছে ঘটনাটা খুলে বললেন এবং এই ঘটনা একান্ত নিজের মনে লুকিয়ে রাখতে বললেন।  খাদীজা ওরাকার কাছে জিব্রাঈল ফেরেশতা সম্পর্কে জানতে চান। ওরাকা বললেন: "জিব্রাঈল হলো আল্লাহর একজন বড়ো ফেরেশতা।  আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলগণের মাঝে সম্পর্ক বা যোগাযোগের মাধ্যম।  এই ফেরেশতাই হযরত মূসা এবং ঈসা (আ.) এর কাছে ওহী নিয়ে আসতেন।  তিনি যেখানেই যান সেখানেই জনগণের জন্যে একটা বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়।" খাদীজা আনন্দ ঝলমল চোখে বললেন: জিব্রাঈল হেরা গুহায় আমার স্বামী মুহাম্মাদের কাছে এসেছিল। ভাইজান! বলুন তো, মুহাম্মাদ সম্পর্কে পূর্ববর্তী কিতাবগুলোতে কী বলা হয়েছে? ওরাকা খাদীজার কথায় কিছুটা বিস্মিত হয়ে বললেন: আমি পূর্ববর্তী কিতাবগুলোতে পড়েছি যে, মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ একজন নবী পাঠাবেন যিনি ইয়াতিম,তিনি আশ্রয় দেবেন এবং কারো মুখাপেক্ষী হবেন না। তিনি হবেন সর্বশেষ নবী।  তাঁর পরে আর কোনো নবী আসবেন না। আমার কাছে যে ঘটনাটা তুমি বলেছো তা যদি ঘটে থাকে, তাহলে জিব্রাঈল যা বলেছে তা আল্লাহর ওহী।  আর মুহাম্মাদ হলো আল্লাহর নবী। তুমি মুহাম্মাদকে বলো সে যেন তার কাজে দৃঢ় ও সুস্থির থাকে।  খাদীজা (সা.) অপূর্ব এক আনন্দঘন চিত্তে নিজের ঘরের দিকে রওনা দিলেন।  তিনি আশাপূর্ণ হৃদয়ে হযরতের কাছে গেলেন এবং আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া ও কৃতজ্ঞতা আদায় করলেন।

নূরনবী মোস্তফা (সাঃ) (৯ম পর্ব)

আল্লাহর রাসূলগণ হচ্ছেন সমগ্র বিশ্বমানবতার জন্যে এমন পথপ্রদর্শক, যাঁরা সঠিক দিক-নির্দেশনা দিয়ে মানুষকে তাদের প্রকৃত লক্ষ্য বা গন্তব্যে নিয়ে যায়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, যেখানেই কোনো সম্প্রদায় পথের দিশা হারিয়েছে কিংবা প্রকৃত গন্তব্যে যেতে অক্ষম হয়ে পড়েছে, তাদের সহযোগিতা করার জন্যে আল্লাহ কোনো না কোনো পয়গাম্বরকে পাঠিয়েছেন।  আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত ঐ নবী পথের দিশাহীন জনপদটিকে মুক্তি বা গন্তব্যের নতুন নতুন পথের দিশা দিয়েছেন। এই নবী-রাসূলদের মাঝে যিনি সর্বশ্রেষ্ঠ, তিনি হলেন আমাদের প্রিয়নবী আল্লাহর সর্বশেষ রাসূল হযরত মুহাম্মাদদ (সা.) ।  নবীদের আগমনের পরম্পরায় দেখা গেছে যে, একজন নবী তাঁর পরবর্তী নবীর আগমনের সুসংবাদ দিয়েছেন। যদিও অধিকাংশ নবীরই দাওয়াতী কাজের ক্ষেত্র ও সময় ছিল নির্দিষ্ট।  একইভাবে ইসলামের নবী অর্থাৎ আল্লাহর সর্বশেষ রাসূল, যাঁর দাওয়াত ছিল বিশ্বজনীন, তাঁর ব্যাপারে ধর্মীয় গ্রন্গুলোতে সুস্পষ্টভাবে সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। ইহুদি জাতি তাদের ধর্মগ্রন্থের ভিত্তিতে এবং তাদের নবীদের বক্তব্য অনুযায়ী সর্বশেষ নবীর অপেক্ষায় ছিল।  হযরত মূসা (আ.) ইহুদি সম্প্রদায়কে তাঁর মতো আরেক নবী আসার সুসংবাদ দিয়েছেন। তাওরাতে বলা হয়েছে-তোমাদের খোদা তোমাদের মাঝে তোমাদেরই ভাইদের মধ্য থেকে আমার মতো একজন নবী পাঠাবেন।  তোমাদের উচিত তাঁর কথা মনযোগ দিয়ে শোনা এবং তাঁর আনুগত্য করা।  আল্লাহ বলেছেন, আমি তাদের মধ্য থেকে তোমার মতো একজন নবী পাঠাবো এবং তাঁর মুখে আমার বাণী প্রেরণ করবো।  এইসব সুসংবাদের পরিপ্রেক্ষিতে ইহুদিদের অনেকেই সর্বশেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ নবীর আবির্ভাব উপলব্ধি করার জন্যে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সৌদিআরবে গেছেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তাদের অনেকেই রাসূলে খোদার নবুয়্যত লাভের পর তাঁকে অস্বীকার করেছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে অসংখ্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে।  দাউদ (আ.) র প্রার্থনায় এমন কিছু বক্তব্য এসেছে, মুফাস্সিরদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী তা হযরত মুহাম্মাদ (সা.) এবং তাঁর পরিবার ও সন্তানদের সাথে বেশ সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাঁর প্রার্থনায় এ রকম কিছু বক্তব্য আছে: তুমি সকল আদম সন্তানের মধ্যে সুন্দরতম, তোমার বাচনভঙ্গি অলঙ্কার সমৃদ্ধ, তোমার ঠোঁট থেকে দয়া আর অনুগ্রহ বর্ষিত হয়, খোদা তোমাকে অনন্তকালের জন্যে পবিত্র করেছেন। তোমার সকল পোশাকে সুগন্ধি মিশিয়ে দিয়েছেন। হে বাদশাহ! তুমি বহু সন্তানের অধিকারী হবে, তারাও তাদের পূর্বপুরুষদের মতো দায়িত্বভার মাথায় তুলে নেবে এবং তুমি তাদের বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন শাসনকার্যে নিযুক্ত করবে। তোমাকে সকল প্রজন্মের কাছে বিখ্যাত করে তুলবে।  সকল মানুষ চিরকাল তোমার কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে। ইতিহাসের বিভিন্ন বর্ণনায় দেখা যায় যে, হযরত ঈসা (আ.)ও তাঁর বিভিন্ন বক্তব্যে তাঁর পরে একজন নবীর আবির্ভাবের সুসংবাদ দিয়েছেন।  যিনি নিজেই ছিলেন আল্লাহর এক বিশাল মোজেযা, তিনিই আরবে আল্লাহর সর্বশেষ দূতের আগমণ সম্পর্কে কথা বলতেন। তাঁর আগমণের বিভিন্ন নিদর্শন ব্যাখ্যা করতেন এবং জনগণের অন্তরে তাঁর প্রতি ভালোবাসার অগ্নিশিখা জ্বালিয়ে দিতেন।  যতদূর পর্যন্ত ঈসা (আ.) এর ধর্মীয় অনুশাসন চালু ছিল ততদূর পর্যন্ত তাঁর এই সুসংবাদগুলোও প্রচারিত হয়েছিল। মসীহ নামক গ্রনে জার্মানীর বিখ্যাত দার্শনিক ও মনোবিজ্ঞানী কার্ল ইয়াসেপ্রস বলেছেন: মসীহ সম্পর্কে যা কিছু বেশি জানি, তাহলো তাঁর সুসংবাদ বার্তা।  এ কারণেই খ্রিষ্টিয় সপ্তম শতাব্দীতে সর্বশেষ নবীর জন্যে অপেক্ষমানরা আরব্য উপদ্বীপের উল্লেখযোগ্য অংশে বসবাস করছিল।   ইয়েমেন থেকে সিরিয়া এবং ফিলিস্তিন থেকে মিশর পর্যন্ত বিসতৃত ভূখণ্ডের খ্রিষ্টানরা সর্বশেষ নবীকে দেখার জন্যে ব্যাকুল হয়ে গিয়েছিল। এমনকি ইরানেও অপেক্ষমান এই দর্শনার্থীদের একটি ছোট্ট দলের অস্তিত্ব ছিল।  তাদের মধ্যকার পরিচিত একজন হলেন সালমান ফারসী।  সালমান তাঁর জীবনেতিহাসের একাংশে বলেছেন:খ্রিষ্টান থাকাকালে যখন আমুরিয়াতে ছিলাম, তখন ধর্মীয় কাজের জন্যে পাদ্রীর কাছে যাওয়া-আসা করতাম।  পাদ্রী তখন দিবারাত্রি নিষ্ঠার সাথে আল্লাহর ইবাদাত করতো। কিছুদিন পর পাদ্রী অসুস্থ হয়ে পড়লো।  শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত সে আমাকে বললো: আমি এমন কাউকে চিনি না, যার কাছ থেকে ফয়েজ হাসেল করার জন্যে তোমাকে বলতে পারি। কিন্তু শেষ যমানার নবীর আবির্ভাবের সময় ঘনিয়ে এসেছে।  ইব্রাহীমের বংশধর আরবদের মধ্য থেকে আসবেন তিনি।  মক্কায় তিনি আবির্ভূত হবেন। তিনি উপহার গ্রহণ করবেন কিন্তু সদকা গ্রহণ করবেন না।  তাঁর কাঁধে নবুয়্যতির চিহ্ন থাকবে। তাঁকে যদি চিনতে পারো, উপলব্ধি করতে পারো তাহলে প্রত্যয়ন করো এবং তাঁর প্রতি ঈমান এনো। আমি বললাম: সে যদি তোমার ধর্মকে ত্যাগ করার আহ্বান জানায়, তারপরও কি তাঁকে প্রত্যয়ন করবো? পাদ্রি বললো: হ্যাঁ! কেননা, তাঁর কথাই সত্য-সঠিক এবং তাঁর বিজয়ের মধ্যে রয়েছে আল্লাহর সন্তষ্টি। সালমান তাঁর স্মৃতিকথায় আরো বলেন: এই পাদ্রীর মৃত্যুর পর আমাকে আরবের বনী কেলাব গোত্রের একটি বাণিজ্য কাফেলার সাথে আরব্য উপদ্বীপে পাঠানো হলো।  সেখানে এক ইহুদির দাস হিসেবে কাজ করতাম। একদিন ঐ ইহুদি লোকটিকে অপর এক লোকের সাথে কথা বলতে শুনলাম। সে লোকজনকে গালিগালাজ করতে করতে বলছিল, জনরব উঠেছে যে, কোনো এক ব্যক্তি নাকি নিজেকে নবী বলে দাবী করছে। এই কথা শুনে হঠাৎ মনে হলো, বছরের পর বছর ধরে অভিবাসী আর উদ্বাস জীবন যাপনের পর বুঝি শেষ পর্যন্ত সুফল এলো। আমার অন্তরে কম্পন সৃষ্টি হয়ে গেল। অত্যন্ত আগ্রহের সাথে আমি ঐ লোকটির কাছে গেলাম এবং ঐ পয়গম্বর সম্পর্কে জানতে চাইলাম। আমার মনিব এ ব্যাপারে আমার আগ্রহের কথা জানতে পেরে আমার সামনে এলো এবং আমার গালে সজোরে থাপপড় মারলো।  সালমান সর্বশেষ নবীকে ভালোবাসার কারণে যতো অত্যাচার-নিপীড়ন ভোগ করেছিল,এই চপেটাঘাত ছিল তার সূচনা। ইহুদি এবং খ্রিষ্টান ধর্মগ্রন্থগুলো যদিও এখন বিকৃত হয়ে পড়েছে, তারপরও সর্বশেষ নবীর ব্যাপারে দেওয়া সুসংবাদ বা ইঙ্গিতগুলো এখনো দেখতে পাওয়া যায়। ইঞ্জিলে এসেছে-এবং আমি তার কাছে আবেদন জানাবো, আর তিনি তোমাদের জন্যে আরেকজন সান্ত্বনাদাতা পাঠাবেন যাতে তোমাদের সাথে সবসময় থাকে।ইঞ্জিলের কয়েক জায়গায় ঈসা (আ.) তাঁর পরে প্যারাকলিত্ অর্থাৎ আহমদ এর আসার কথা সুস্পষ্টভাবে বলেছেন।  হযরত ঈসা (আ.) বলেন: আমি না যাওয়া পর্যন্ত তিনি আসবেন না। যদি আমাকে তোমরা ভালোবাসো, তাহলে আমার ওসিয়তগুলো সংরক্ষণ করো।  আমি আবেদন জানাবো তোমাদের প্রতি যেন অন্য কোনো প্যারাকলিত্ কে পাঠানো হয়, যাতে তিনি তোমাদের সাথে সবসময় থাকেন। তিনি আল্লাহর সেই পবিত্র আত্মা যিনি তোমাদেরকে সকল সত্যতা এবং বাস্তবতার সাথে পরিচিত করাবেন। ইথিওপিয়ার বাদশাহ নাজ্জাশির হাতে যখন ইসলামের নবীর দাওয়াতী পত্র পৌঁছলো, তখন নাজ্জাশি বলেছিল: খোদার কসম! ইনিই সেই নবী, আহলে কেতাব বা খ্রিষ্টানরা যাঁর অপেক্ষায় রয়েছে।তৌরাত এবং ইঞ্জিলে পূর্ববর্তী নবীগণ যে সর্বশেষ নবীর আগমণের সুসংবাদ দিয়েছেন, কোরআনের অসংখ্য আয়াতে সে ব্যাপারে সুস্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। এখন প্রশ্ন জাগে যে, এরকম সুস্পষ্ট আয়াত থাকা সত্ত্বেও বহু সমপ্রদায় কেন সর্বশেষ রাসূলকে অস্বীকার করলো? সূরা সাফ এর ছয় নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: স্মরণ করো! যখন মারিয়াম পুত্র ঈসা (আ.) বললো, হে বনী ইসরাইল! আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর প্রেরিত রাসূল, আমি আমার পূর্ববর্তী তৌরাতের সত্যায়নকারী এবং আমি এমন একজন রাসূলের সুসংবাদদাতা যিনি আমার পরে আসবেন।  তাঁর নাম আহমাদ।  অবশেষে যখন তিনি সুস্পষ্ট প্রমাণাদি নিয়ে এলেন, তখন তারা বললো-এটাতো এক সুস্পষ্ট যাদু।সূরা আরাফের ১৫৭ নম্বর আয়াতেও সর্বশেষ পয়গাম্বরের গুণাবলীর বর্ণনা দেওয়া হয়েছে এবং তাঁর প্রতি ঈমান আনার কথা বলা হয়েছে।  আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন: যারা আল্লাহ প্রেরিত এমন এক নিরক্ষর নবীর আনুগত্য করছে, যাঁর গুণাবলীর বর্ণনা তাদের নিজেদের কাছে রক্ষিত তৌরাত এবং ইঞ্জিলেই রয়েছে।  যেমন তাঁর গুণাবলী হচ্ছে-তিনি সৎ কাজের আদেশ দেন এবং অসৎ কাজ করতে নিষেধ করেন।  তিনি যাবতীয় পবিত্র বস্তু তাদের জন্যে হালাল ঘোষণা করেন এবং অপবিত্র বস্তুগুলোকে হারাম ঘোষণা করেন।  তিনি তাদের ওপর বিদ্যমান সকল বোঝা এবং বন্দীত্বের জিঞ্জীর অপসারণ করেন। সুতরাং যারা তাঁর প্রতি ঈমান এনেছে, তাঁকে সমর্থন ও সহযোগিতা করেছে এবং তাঁর সাথে অবতীর্ণ নূর তথা কোরআনের অনুসরণ করেছে, তাঁরাই সাফল্য অর্থাৎ মুক্তি লাভ করতে পেরেছে।

নূরনবী মোস্তফা (সাঃ) (১০ম পর্ব)

 সুপ্রিয় পাঠক! আশা করি আপনারা ভালোই আছেন।  নবী-রাসূলগণ হলেন বিশ্বমানবতার জন্যে সর্বোত্তম ঐশী উপহার, তাঁদের নূরের আলোয় মানুষ জীবনের সরু এবং বক্র পথেও সাফল্য ও সুখ সমৃদ্ধির পথ খুঁজে পেতে পারে। আল্লাহর এই দূতদের আবির্ভাবের বৃহৎ লক্ষ্য হলো মানুষকে তার অস্তিত্বের পূর্ণতায় পৌঁছানো।  আল্লাহর সৃষ্টি ব্যবস্থার প্রতি গভীরভাবে মনোযোগী হলে আমরা দেখতে পাবো যে, আল্লাহ তাঁর সকল সৃষ্টির মধ্যেই উন্নতির সকল উপাদান বা সাজ-সরঞ্জাম এবং তার পরিপূর্ণতার ব্যবস্থা রেখে দিয়েছেন। পরিপূর্ণতার প্রতি আভ্যন্তরীণ প্রেরণার কারণেই প্রত্যেক সৃষ্টবস্তু বিশেষ গন্তব্যের দিকে ধাবমান। ফলে বাধমুক্ত অনুকূল পরিবেশে প্রত্যেক সৃষ্টির সুপ্ত প্রতিভা ও সামর্থের বিকাশ ঘটে থাকে। মাটির নিচে রোপিত গমের দানা বা ফলের বীজ বেড়ে ওঠা বা পূর্ণতা লাভের ক্ষেত্রে বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করে থাকে। সূরায়ে ত্বা-হার পঞ্চাশ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: আমাদের প্রতিপালক এমন এক সত্ত্বা যিনি তাঁর প্রতিটি সৃষ্টিকে তার যোগ্য আকৃতি ও প্রয়োজনীয় সকল উপাদান দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, তারপর নিজস্ব পথপ্রদর্শন করেছে এই পরিচালনার বিষয়টি সকল সৃষ্টির ক্ষেত্রেই একটা সাধারণ ব্যাপার।  অর্থাৎ একেবারে সূক্ষ্ম অণু থেকে শুরু করে বৃহৎ গ্যালাক্সি পর্যন্ত বিশ্বের প্রতিটি সৃষ্টিই আল্লাহর এই অনুগ্রহ লাভে সমৃদ্ধ। কিন্তু আল্লাহ যাঁকে সৃষ্টির সেরা করে সৃষ্টি করেছেন, সেই মানুষের জন্যে কি প্রাকৃতিক এই পর্যায়গুলো অতিক্রম করাই যথেষ্ট? অবশ্যই না। কারণ মানুষের জীবন বস্তগত জীবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ অন্যান্য প্রাণীকূল-বা জড় বস্তর মতো নয়। মানুষের চিন্তাগত এবং আধ্যাত্মিক পূর্ণতায় উপনীত হবার জন্যে সঠিক দিক-নির্দেশনা ও সুষ্ঠু পরিকল্পনা খুবই জরুরি। মানুষের প্রবৃত্তি ও প্রবণতা যেহেতু বিচিত্র,তাই আল্লাহ রাব্বুল আলামীনও এমন উত্তম হাতিয়ার বা উপকরণে তাকে সমৃদ্ধ করেছেন, যার সাহায্যে মানুষ সঠিকভাবে তার আভ্যন্তরীণ প্রবৃত্তিগুলোকে শৃঙ্খলাবদ্ধ ও নিয়মানুবর্তী করতে পারে। ফলে আল্লাহ মানুষের পথপ্রদর্শনের জন্যে দুই ধরনের উপকরণ দিয়েছেন।  একটি মানুষের আভ্যন্তরীণ সত্ত্বা অর্থাৎ বিবেক-বুদ্ধি, অপরটি হলো আল্লাহর নবী-রাসূল।একথা তর্কাতীতভাবে সত্য যে, জ্ঞান-বুদ্ধি অনেক সময় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে অক্ষম হয়ে পড়ে, কিংবা অনেক সময় আবেগ দ্বারা প্রভাবিত হয়। আবার কখনো কখনো সঠিক চিন্তাশক্তি হারিয়ে স্বার্থান্বেষী হয়ে পড়ে।  এ কারণেই এমন ধরনের দিক-নির্দেশনার প্রয়োজন যাতে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক সৃষ্টির মাধ্যমে মানুষের বুদ্ধি এবং উপলব্ধি ঐশী আলো বা অন্তর্র্দৃষ্টি লাভ করতে পারে এবং ঐ অন্তর্র্দৃষ্টি মানুষকে তার মেধা ও জ্ঞানের সঠিক বিকাশ ঘটাতে সহযোগিতা করে। চিন্তাবিদ বা গবেষকরা মানুষের অসি-ত্বকে এমন পাহাড়ের সাথে তুলনা করেছেন, যার ভেতরে গুপ্ত রয়েছে মূল্যবান সব পাথর।  আর এই পাথরের বিশাল মজুদ লাভ করতে হলে অর্থাৎ মানুষের ভেতরকার অমূল্য সম্পদ ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে নবী-রাসূলদের মতো মহাবিজ্ঞ প্রকৌশলীর প্রয়োজন। তাঁরা তাঁদের নিজস্ব শিক্ষা ও কর্মকৌশলের সাহায্যে মানুষের আভ্যন্তরীণ ও স্বভাবগত সকল যোগ্যতার বিকাশ ঘটান। হযরত আলী (আ.) তাঁর নাহজুল বালাগায় নবীদের আগমণের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেছেন: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আদম সন্তানদের মাঝ থেকেই নবী-রাসূল মনোনীত করেছেন।  আর তাদের মধ্য থেকেই ওহীর বার্তা পৌঁছানো ও রেসালাতের দায়িত্ব পালনের শপথ নিয়েছেন....যাতে মানুষের বিবেক-বুদ্ধির সম্ভারে বিদ্যমান মণি-মুক্তাগুলোকে বের করে আনা যায়।এমন ধরনের মানুষগুলো নবুয়্যতির দায়িত্ব পালনের জন্যে মনোনীত হয়েছেন, আত্মিক এবং আন্তরিক পবিত্রতার কারণে যাঁদের সাথে ওহীর উৎস তথা আল্লাহর সম্পর্ক ছিল। মানুষের মাঝে আল্লাহর হুকুম-আহকাম প্রচার বা উপস্থাপনার জন্যে তাঁরা ছিলেন সুযোগ্য। নবীগণ সত্যানুসন্ধিৎসা এবং একত্ববাদের ভিত্তির ওপর নির্ভর করে গভীর অন্ধকার সমাজেও মানব স্বভাবকে ঐশী নূরের আলোয় আলোকিত করে তাদেরকে যাবতীয় ভ্রান- আকীদা-বিশ্বাস থেকে পবিত্র করেছেন। তাঁরা জাহেলিয়াতের সকল অপচিন্তা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন এবং মানবতাকে উন্নত দৃষ্টিভঙ্গি, ন্যায়কামিতা, স্বাধীনতা বা মুক্তি কামনা এবং একত্ববাদের মতো মহামূল্যবান সম্পদগুলো উপহার দিয়েছেন।সকল নবীরই অভিন্ন লক্ষ্য ছিল জুলুমের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে সমাজে ন্যায়-নীতি প্রতিষ্ঠা করা।  এ ব্যাপারে পবিত্র কোরআনের বহু আয়াতে ইঙ্গিত করা হয়েছে।  নবী-রাসূলগণ মানুষকে পূজা-অর্চনা, কু-সংস্কার এবং শের্ক বা অংশীবাদিত্বের জিঞ্জীর থেকে মুক্তি দেওয়ার চেষ্টায় লিপ্ত ছিলেন। মানুষের হাতে-পায়ে বাঁধা এইসব জিঞ্জীর তাদের চলাফেরার শক্তি-সামর্থ কেড়ে নেয়। এইসব জিঞ্জীর কখনো বাহ্যিক আবার কখনো পরোক্ষ। পবিত্র কোরআনের সূরা আরাফের ১৫৭ নম্বর আয়াতের একাংশে এই বাস্তবতার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।  ইসলামের নবী আল্লাহর সর্বশেষ দূত হিসেবে পৃথিবীতে এসেছেন। তিনি মানুষের মাঝে বিদ্যমান বন্দীত্বের জিঞ্জীরগুলো ছিঁড়ে ফেলার জন্যেই আবির্ভূত হয়েছেন।  গর্ব-অহংকার, লোভ-লালসার মতো কু-প্রবৃত্তিগুলো মানুষের আভ্যন্তরীণ জিঞ্জীর।  এগুলো মানুষের পরিপূর্ণতার পথে সবচে বড়ো অন্তরায় হিসেবে বিবেচিত। এসব ছাড়াও সমাজের ওপর ছায়া বিস্তারকারী অমানবিক কিছু কিছু বাজে প্রথা বা রীতি-নীতি রয়েছে, যেগুলো মানুষের আধ্যাত্মিক পরিপূর্ণতার পথকে রুদ্ধ করে দেয়। নূরনবী মোস্তফা (সা.) তাঁর সুস্পষ্ট শিক্ষা এবং তৌহিদ বা একত্ববাদী চিন্তার প্রচার-প্রসারের মাধ্যমে মানবতার জন্যে যে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন তা ছিল যথেষ্ট উন্নত পর্যায়ের। ফ্রান্সের বিখ্যাত গবেষক ডার্মিংহাম বলেন: শিক্ষণ-প্রশিক্ষণ এবং সংস্কারের সর্ববৃহৎ নীতিমালা বলতে তা-ই ছিল, যা ওহী নামে পর্বে পর্বে মুহাম্মাদের ওপর অবতীর্ণ হয় এবং মানুষ যাকে আজ কোরআন নামে চেনে।  নবী-রাসূলগণ মানবতার জন্যে সবচে বড়ো যে অবদানটি রেখেছেন, তাহলো তাঁরা আল্লাহ এবং মানুষের মাঝে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সৃষ্টি করে দিয়েছেন।  নবীগণ আল্লাহর বাণীকে যথাযথভাবে মানুষের কাছে পৌঁছিয়েছেন এবং আল্লাহকে কীভাবে ডাকতে হবে তা মানুষকে শিখিয়েছেন। নবীগণ মানুষকে যে শিক্ষা দিয়েছেন, তার ফলে মানুষ নিজের ভেতরে সঠিক পথ খুঁজে বের করার শক্তি-সামর্থ অর্জন করেছে এবং সেইসাথে পৃথিবীতে কীভাবে সুখ-সমৃদ্ধিপূর্ণ জীবনযাপন করা যায়, সেই নির্দেশনাও পেয়েছে।  ধর্মের বৈশিষ্ট্যই হলো মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকা, আল্লাহর সাথে মানুষের সম্পর্ক সৃষ্টি করে দেওয়া এবং মানুষের অন্তরাত্মাকে ঐশী বাস্তবতা মেনে নেওয়ার জন্যে প্রস্তত করা।  নবীগণ জীবনের রাজপথকে উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত করে পথের দিশা দিয়ে দেন, আর মানুষ নবীদের দেখিয়ে দেওয়া ঐ পথে জীবনের জটিল অলি-গলিগুলোও পেরিয়ে যায় সহজেই।  একের পর এক নবীদের আগমন এবং শরীয়তের পুনঃ পুনঃ পরিবর্তনের পেছনে কারণ হলো যুগে যুগে মানুষের চাওয়া-পাওয়ার পরিবর্তন। মানুষের জীবন সমস্যা, মানুষের প্রয়োজনীয়তা যুগে যুগে পরিবর্তিত হয়েছে, সেইসাথে সঙ্গতি রেখে ঐশী বিধান দেওয়া হয়েছে। তবে মানুষকে দাওয়াত করার ক্ষেত্রে নবীগণ যে মূলনীতি অনুসরণ করেছেন, তা ছিল অভিন্ন। সকল নবীই মানুষকে একই লক্ষ্যের দিকে আহ্বান জানিয়েছেন। আত্মপরিপূর্ণতা প্রাপ্তির পথে মানুষ সেই কাফেলার মতো,যে কাফেলা একটা নির্দিষ্ট গন্তব্যে যাবার উদ্দেশ্যে যাত্রা করে মারাত্মক চড়াই-উৎরাইয়ের মাঝে এসে পড়েছে,অপরদিকে গন্তব্যে যাবার পথও জানা নেই।  ফলে কিছুক্ষণ পর পর একেকজনকে যাবার পথ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, আর তাদের প্রদর্শিত পথে মাইলের পর মাইল চলার পর এমন জায়গায় গিয়ে পৌঁছে, যেখান থেকে নতুন করে আবার পথের ঠিকানা নিতে হয়। এভাবে পথ চলতে চলতে শেষ পর্যন্ত এমন এক ব্যক্তির সন্ধান পায় যিনি পথের পরিপূর্ণ মানচিত্র নিখুঁতভাবে এঁকে দেন। সর্বদা এবং সকল স্থানের জন্যে প্রযোজ্য ঐ মানচিত্র অনুযায়ী কাফেলা নিশ্চিন্তে তার গন্তব্যে পৌঁছে যায়। হযরত মুহাম্মাদ (সা.) হলেন আল্লাহ প্রেরিত সর্বশেষ রাসূল যিনি মানুষকে তার জীবনের সুখ-সমৃদ্ধি আর স্বাধীনতার পরিপূর্ণ দিক-নির্দেশনা উপহার দিয়েছেন।  তিনি হেদায়েতের সর্বোচ্চ চূড়ায় অবস্থান করছেন। তাঁর শিক্ষা চিরন্তন।

-চলবে-