নূরনবী মোস্তফা (সা.) (১-৫)

(১ম পর্ব)

সুপ্রিয় পাঠক! নুরনবী মোস্তফা নামক নতুন এই ধারাবাহিক আলোচনায় আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি।  এ আসরে আমরা আল্লাহর সর্বশেষ দূত হযরত মুহাম্মাদ (সা.) এর পবিত্র জীবনাদর্শ ও কর্ম নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করবো। কালের নিরন্তর পরিক্রমায় রাসূলের জীবন এবং কর্ম থেকে শিক্ষা নেয়া ক্রমশই প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ছে।  প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে তাঁর আদর্শের বাস্তবায়ন।  অত্যন্ত আনন্দের কথা যে, বিশ্বব্যাপী এখন তাঁর জীবনী ও ধর্ম নিয়ে চর্চার একটি ধারা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।  যার ফলে ইসলাম-বিদ্বেষীরাও তাদের সকল অপকৌশল প্রয়োগ করে ইসলাম ও ইসলামের নবীর বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ও বিকৃতি ছড়ানোর চেষ্টা করছে।  এরি পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহর সর্বশেষ দূতের সঠিক জীবনী সম্পর্কে সবার ধারণা থাকা জরুরী বলে আমরা মনে করি।  সেই বোধ ও উপলব্ধি থেকেই নতুন এই আসরের আয়োজন।  এ আসরে আপনাদের নিয়মিত উপস্থিতি পাবো-এই প্রত্যাশা রইলো।  বিশ্বের বুকে বিদ্যমান অসাধারণ সকল সোন্দর্যকে তুলে ধরা অত্যন্ত কঠিন কাজ। তারচেয়েও কঠিন কাজ হলো এমন কোনো মহান ব্যক্তিত্বের জীবনচিত্র আঁকা, যাঁকে সৃষ্টি করা হয়েছে বিশ্বমানবতার মুক্তির দিশারী হিসেবে।  এরকম কোনো ব্যক্তিত্বের জীবনচিত্র যিনি আঁকতে চান, তিনি আসলে অসীম সমুদ্রকে ছোট্ট একটি আয়নার মাঝেই প্রতীকায়িত করতে চান। নতুন এই আসরে আমরা আপনাদেরকে দীর্ঘরাত্রির পর সুপ্রভাতের ইতিহাস সৃষ্টিকারী বিস্ময়কর এমন এক মহান ব্যক্তিত্বের কথা শোনাবো,যিনি অসংখ্য মানুষকে তাঁর হেদায়েতের নৌকায় চড়িয়েছেন। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে হেদায়েতের ঐ নৌকা ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ তরঙ্গের মুখে বারবার পড়েছে, তারপরও আজ পর্যন্ত নৌকাটি কালের সাগরে ভাসমান রয়েছে, ডোবে নি।  আজো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর পতাকা পত পত করে উড়ছে।  আজো মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সা)র সম্মান ও মর্যাদা সুরক্ষিত এবং তাঁর হেদায়াত সমানভাবে গ্রাহ্য।তোমার নুরে সূর্য পেলো আলোকের শোভাবার্তাবাহক জিব্রাঈল হলো অপূর্ব দ্যুতিময় কোরআন তোমাকে পরিয়েছে শ্রেষ্ঠ চরিত্রের মালাখোদার কৃপায় সজ্জিত হলে শ্রেষ্ঠ এ মহিমায়ঐশীবাণী, ফেরেশ্তাদের কন্ঠে তার গান, মুমিনের জিকির আরসকলই উৎসর্গীত মুহাম্মাদ ও তাঁর আহালের পর।  আল্লাহর শেষ দূত মুহাম্মাদের ওপর নাযিল হয়েছিল মহাগ্রন্ আল-কোরআন।  কোটি কোটি মানুষ এই কোরআন অধ্যয়ন করেছে এবং মণিমুক্তোময় মহাসমুদ্র আল-কোরআন থেকে উপকৃত হয়েছে।  তবে যুগে যুগে ইসলামের শত্রুরা রাসূল (সা) এর সূর্যোদীপ্ত চেহারাকে ধূলোমলিন করে তাদের অসৎ উদ্দেশ্য হাসিল করার চেষ্টা করেছে। ইসলাম যাতে বিকশিত হতে না পারে, সেটাই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য।  তারপরও অপার রহস্যময় এই পৃথিবীতে এমন কোনো জ্ঞানী-গুণী নেই, যার কানে রাসূলের আহ্বান পৌঁছে নি।  যুগে যুগে নবী রাসূলগণ এই পৃথিবীতে প্রেরিত হয়েছেন একটিমাত্র উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে।  তাহলো সত্য ও শান্তির দিকে মানুষকে আহ্বান জানানো।  এই সত্যের আহ্বান জানাতে গিয়ে ভৌগোলিক সীমারেখার উর্ধ্বে উঠে নবী-রাসূলগণ এশিয়া-ইউরোপ-আফ্রিকা প্রভৃতি মহাদেশে দাওয়াতী কাজ চালিয়েছিলেন।  যার ফলে এই মহাদেশগুলোর মাঝে সেতুবন্ধন তৈরি হয়েছিল। পঞ্চ পয়গম্বর যাঁদেরকে একত্রে উলুল আযম বলা হয়, তাঁরা বিশ্বের কৌশলগত দ্বীপের কেন্দ্র যাকে বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য বলা হয়,সেখানে বিভিন্ন ভাষায় এক এবং অভিন্ন বার্তাই প্রচার করেছেন। তাঁদের মূল লক্ষ্যও ছিল অভিন্ন। তাহলো,এক আল্লাহর ইবাদাত করা এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন পৃথিবীতে ন্যায়-নীতি প্রতিষ্ঠা করা।নূহ (আ.) এর সময় ভয়াবহ ঝড়-তুফান হয়েছিল। তাঁর নৌকা জুদি পাহাড়ের চূড়ায় উঠে গিয়েছিল। নূহ (আ.) এবং তাঁর কজন অনুসারী ঐ নৌকায় আরোহন করেছিলেন। যাতে তাঁদেরকে দিয়ে নতুন পৃথিবী গড়া যায় এবং ইতিহাস নতুনভাবে শুরু করা যায়। তাঁর পরে ইব্রাহীম (আ.) ব্যাবিলন ভূখন্ডে তৌহিদের সেই বাণীর প্রতিধ্বনি করেন। তাঁর পরে মূসা (আ.) লাঠির মোজেযা দিয়ে তাঁর কওমকে ফেরাউনের কবল থেকে বাঁচান। এই ফেরাউন জনগণকে তার নিজের বান্দা বলে মনে করতো। মূসা (আ) এর পর ঈসা (আ.) জন্মগ্রহণ করেই খোদার অপার মেহেরবাণীতে কথা বলেন এবং সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) এর আগমনের সুসংবাদ দেন। শেষ পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রের মধ্যে যখন অসংখ্য খোদার পূজা করার ঘটনা দেখা দিল এবং সর্বত্র অজ্ঞতার আঁধার ছড়িয়ে পড়েছিল, তখন সর্বশেষ রাসূল মুহাম্মাদ (সা.) মক্কায় আবির্ভূত হন। তিনি অপূর্ব সত্যের সুস্পষ্ট বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছান। সেইসাথে মানব মর্যাদা, মানবাধিকার, স্বাধীনতা এবং ন্যায়-নীতি প্রতিষ্ঠা করেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সূরা তওবার ১২৮ নম্বর আয়াতে তাঁর সম্পর্কে বলেছেন: "তোমাদের কাছে এসেছে তোমাদের মধ্য থেকেই একজন রাসূল। তোমাদের দুঃখ-কষ্ট তার পক্ষে দুঃসহ। তিনি তোমাদের মঙ্গলকামী, মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল, দয়াময়।"মহৎ ব্যক্তিত্বের অধিকারী ইসলামের নবী সবসময় মানব সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছেন। তিনি মানুষের মাঝে অসীম ক্ষমতাময় এক আল্লাহর পরিচয় তুলে ধরে তাদেরকে শেরক, মূর্তি পূজা, যাদু-মন্ত্রসহ বিচিত্র কুসংস্কারের জিঞ্জির থেকে মুক্তি দিয়েছেন। তিনি মানব জীবনের অন্ধকার স্তরগুলোর মাঝে আলোকের জানালা খুলে দিয়ে শিখিয়েছেন যে, মানুষ যদি সত্য,জ্ঞান ও বাস্তবতার আলোকের পেছনে ছোটে, তাহলে অজ্ঞতা এবং অন্ধকার থেকে মুক্তি পেতে পারে। তিনি সবসময়ই বিরোধী পক্ষের সামনে যুক্তি তুলে ধরতেন এবং আল্লাহর আদেশ অনুযায়ী তাদেরকে তাদের দলীল-প্রমাণ দেখাতে বলতেন। যেমনটি কোরআনে বলা হয়েছে: বল! তোমাদের প্রমাণ নিয়ে আসো! আধুনিক বিশ্বের নতুন নতুন ভূখন্ডে ইসলাম বিস্তারের কারণে ভীত হয়ে কোনো কোনো স্বার্থবাদী মহল ইসলামের এই মহান নবী সর্বশেষ রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সা.) এর নিষ্কলুষ চরিত্রের ওপর কলঙ্ক লেপনের অপপ্রয়াস চালাচ্ছে।

২০০৬ সালে কলঙ্ক লেপনের এই ধারা নবরূপ ধারণ করেছে। পশ্চিমা কিছু গণমাধ্যম তাদের সরকারগুলোর সহযোগিতায় সম্পূর্ণ পরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মহানবী এবং ইসলাম বিকৃতির চেষ্টা চালিয়েছে। তাদের এইসব বিকৃতি ও অপপ্রচারের কারণে মুদ্রার একপিঠে যদিও মুসলমানরা হিংস্র এবং চরমপন্থী বলে পরিচিত হয়েছে, অপরপিঠে কিন্তু ইসলাম এবং নবীজী সম্পর্কে জানতে জনমনে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে।  ইংরেজী ভাষী একজন অমুসলিম গবেষক মিসেস কার্ন আর্মস্ট্রং তাঁদেরই একজন। তিনি নবীজীর বিরুদ্ধে অপবাদ আর অভিযোগের মাত্রা বৃদ্ধির ফলে বিশেষ করে সালমান রুশদীর অপবাদের কারণে মুহাম্মাদ নামক গ্রন্থটি লেখেন।  এই গ্রন্থটি লেখার কারণ সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, প্রকৃত ইসলামকে তুলে ধরা এবং ইসলামের নবীর ব্যাপারে পাশ্চাত্যের খ্রিষ্টানদের স্মৃতিশক্তিকে জাগিয়ে তোলাই ছিল এই গ্রন্থ রচনার মূল উদ্দেশ্য। তিনি লিখেছেন,পশ্চিমাদের উচিৎ রঙীন এই পৃথিবীর গোলকধাঁধায় সত্য ও সঠিক পথে পরিচালিত হবার জন্যে হযরত মুহাম্মাদ (সা.) এর শিক্ষা গ্রহণ করা।  ২০০১ সালের সেপ্টেম্বরে আমেরিকার বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইসলাম ও মহানবীর শানে আঘাত হানার ঘটনা বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে মিসেস আর্মস্ট্রং তাঁর পূর্বলিখিত ‘মুহাম্মাদ বইটির ভূমিকা পুনরায় লেখেন। নতুন করে লেখা ভূমিকায় তিনি লিখেছেন, বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রে হামলার মতো সহিংস ঘটনা ইসলাম এবং মুহাম্মাদের আত্মা ও স্বভাব চরিত্রের সম্পূর্ণ বিরোধী। তাঁর ভাষায়-ইসলাম শব্দটির অর্থ হচ্ছে আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পিত ও অনুগত। শব্দটি সালাম অর্থাৎ শান্তি থেকে এসেছে। রাসূলের বাস্তব জীবনপদ্ধতিও এই নীতির ওপরেই প্রতিষ্ঠিত ছিল। রাসূলের যুগে রক্তপাত, প্রতিহিংসা, প্রতিশোধ পরায়নতার মতো জাহেলী যুগের বদ অভ্যাসগুলো সমূলে অপসারিত হয়ে গিয়েছিল। যে-কোনো পরিস্থিতি বা ঘটনাকে তিনি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বিশ্লেষণ করতেন এবং তাঁর সমকালীন অন্যান্য ব্যক্তিদের তুলনায় অনেক বেশী উন্নত ও যুক্তিপূর্ণ সমাধান দিতেন। মিসেস আর্মস্ট্রং বলেন: ]"হযরত মুহাম্মাদ (সা.) এর সমগ্র জীবন প্রমাণ করে যে, সবকিছুর আগে আমাদের উচিত আমাদের মাঝ থেকে স্বার্থপরতা, ঘৃণা, অন্যদের চিনন্তা ও বিশ্বাসকে উপেক্ষা করার প্রবণতাগুলো দূর করা। আর তা সম্ভব হলে আমরা বিশ্ববাসীর জন্যে একটি সুন্দর, দৃঢ় ও নিরাপদ পৃথিবী গড়তে সক্ষম হবো। যেই পৃথিবীতে মানুষ সুখে শান্তিতে বসবাস করবে। যেখানে থাকবে না কোনো জুলুম-নির্যাতন কিংবা কোনোরকম বৈষম্য।"বিশ্ববাসীর পক্ষে আজ তাঁকে চেনার ও বোঝার সময় এসে গেছে। তাঁর শিক্ষাকে কাজে লাগানো আজ বিশ্ববাসীর জন্যে খুবই প্রয়োজন। আল্লাহ আমাদেরকে এই শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তিত্বের জীবনাদর্শ থেকে উপকার লাভ করবার তৌফিক দিন। #

নূরনবী মোস্তফা (২য় পর্ব)

ইরানী বাদশাহ খসরু আনুশিরভন তাঁর নিজস্ব প্রাসাদ ফিরোযা প্রাসাদে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। কিয়নী রাজবংশের হরিণা নক্সার সোনার মুকুট তাঁর সিংহাসনের পাশেই রক্ষিত ছিল। হঠাৎ যুদ্ধের দামামা বা রণবাদ্য বেজে উঠলো। রণবাদ্যের ধ্বনির ফলে তাঁর বিশ্রামে বিঘ্ন ঘটলো। মর্মর পাথরের টুকরো প্রাসাদ থেকে ঝরে পড়তে লাগলো।  প্রাসাদের বিভিন্ন কোণ থেকে রক্ষীদের চীৎকার শোনা যাচ্ছিল: ভেঙ্গে গেল, কেস্রার দ্বারমনন্ডপ ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল। প্রাসাদের দেওয়াল ধ্বসে পড়লো ইত্যাদি। বাদশাহ খসরু ঘুম থেকে হঠাৎ জেগে উঠে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করতে লাগলো। একবার যায় বাগানের দিকে, একবার যায় বারান্দায়। কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মতো বিস্ময়ের সাথে চারদিকে চোখ ফেরাতে লাগলো।  হঠাৎ দেখতে পেলো বোযোর্গমেহের পন্ডিতকে। তাঁকে বললো: হে পন্ডিত কী এক অদ্ভুত রাত্রি। দুই দুটি আশ্চর্য ঘটনা ঘটে গেল। একটা হলো-আমি একটা স্বপ্ন দেখেছি। দ্বিতীয়টা হলো আমার প্রাসাদ ধ্বসে পড়েছে। স্বপ্নে দেখলাম এই অন্ধকার রাতে হেজাযের দিক থেকে সূর্য উঠেছে। ঐ সূর্যের আলোয় চারিদিক আলোকিত হয়ে পড়েছে। কেবল আমার প্রাসাদের আঁধার দূরীভূত হয় নি।  আমি ঐ আঁধার দেখে ভয় পেয়ে যাই।  হঠাৎ আমার প্রাসাদ ভেঙ্গে পড়ার শব্দে ঘুম থেকে জেগে উঠি। এই সূর্য ওঠার ব্যাপারটা কী বলুন তো? বোযোর্গমেহের বললেন, "একজন মানুষের আবির্ভাব ঘটবে যাঁর ক্ষমতা বাদশাহদের চাইতে অনেক অনেক বেশী, তাঁর জ্ঞানও সকল পন্ডিতের চেয়ে অনেক অনেক বেশী।  তাঁর যে আলো, তা আল্লাহ প্রদত্ত। তাঁর কথার নূরে সারা পৃথিবী আলোকিত হবে। প্রাচীন ধর্মগুলো গাছের হলুদ পাতা ঝরে পড়ার মতো মনর হয়ে যাবে। বারান্দা ভেঙ্গে পড়া মানে সেই মহামানবের জন্ম হয়েছে। চল্লিশ বছর পর তাঁর ব্যাপারে জানা যাবে।" ঐদিন সকালবেলা,আনুশিরভনের মাথা থেকে তখনো গতরাতের দুর্ঘটনার চিন্তাযায় নি। এমন সময় একজন ঘোড় সওয়ার এসে বললো: "হে বাদশাহ! আশ্চর্য এক ঘটনা ঘটেছে। হাজার বছর ধরে জ্বলন্ত ফার্সের অগ্নিমন্দিরের আগুন গতরাতে নিভে গেছে।  অগ্নিমন্দির ঠান্ডা হয়ে গেছে। তারচেয়েও আশ্চর্য ঘটনা হলো গতরাতে ক্বাবা কেঁপে উঠেছিল এবং তারফলে কাবার ভেতরের মূর্তিগুলো মাটিতে পড়ে গেছে।" এমন সময় আরেক দূত এসে বললো: "বাদশাহ! গতরাতে সভে হ্রদটি শুকিয়ে গেছে। ফলে যারা সভে হ্রদের পূজা করে, তারা বিস্মিত ও বিহ্বল হয়ে পড়েছে।  মনে হয় বড়ো ধরনের কোনো ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে।" বাদশা আনুশিরভন স্বপ্নব্যাখ্যাকারী এবং পূর্বাভাসকারীদের ডেকে পাঠালেন। তাদের সবাই মক্কার আকাশে এক তারকার উদয়ের কথা বললেন। যেই তারকা বিশ্বব্যাপী পরিবর্তন ঘটাবে। এভাবেই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর সর্বশেষ প্রেরিত দূতের জন্মমুহূর্তে বিশ্বকে তাঁর বরকতপূর্ণ পদক্ষেপের জন্যে প্রসত করলেন।ঐ রাতে মা আমেনার আশ্চর্যরকম এক অনুভূতি হয়েছিল। বেশ কয়েকমাস গত হয়ে গেল তাঁর স্বামী আব্দুল্লাহ মারা গেছেন, তিনি দিন-রাত স্বামীর মৃত্যু ভাবনায় ভারাক্রান্ত ছিলেন। এখন তাঁর সন্তানের জন্মলগ্ন এসে গেছে। সুবেহ সাদেকের সময় মা আমেনা যখন তীব্র বেদনা অনুভব করছিলেন তখন স্বগতোক্তি করছিলেন: আব্দুল্লাহ যদি এই সময় জীবীত থাকতেন! যদি তাঁকে একা রেখে না যেতেন! ঠিক এ সময় আল্লাহর মেহেরবাণীতে আমেনার ঘর আলোয় আলোকিত হয়ে গেল। তিনি যা দেখলেন, তা বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তাঁর মনে হলো যেন আকাশের সব তারা তাঁর ঘরে অবতরণ করছে। তাঁর বিস্ময় না কাটতেই আলোকোজ্জ্বল কয়েকজন নারী এসে তাঁর শিয়রে বসলেন। নারীদের একজন বললেন: আমি আসিয়া! ফেরাউনের স্ত্রী! অন্যজন বললেন: আমি মারিয়াম, ইমরান (আ.) এর মেয়ে। কিছুক্ষণ পর একটি পুত্র সন্তনের জন্ম হলো। শিশুটির আগমনের সাথে সাথে সারা পৃথিবী যেন আলোকিত হয়ে গেল। এই অবস্থায় আমেনা একটি আওয়াজ শুনতে পেলেন: তোমার এই সন্তানের মাঝে বিগত নবীদের উন্নত বৈশিষ্ট্যগুলো একত্রীভূত হয়েছে। যেমন, তাঁর সত্ত্বায় রয়েছে নূহ (আ.) এর বীরত্ব ও সাহস, রয়েছে ইব্রাহীম (আ.) এর আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ নির্ভরতার বৈশিষ্ট্য, রয়েছে ইউসূফ (আ.) এর আকৃতি-প্রকৃতি। আরো আছে মূসা (আ.) এর যথার্থ বাকপটুত্ব ও অবিচল দৃঢ়তা এবং হযরত ঈসা (আ.) এর পরহেজগারী এবং দয়া-দাক্ষিণ্য।ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, মুহাম্মাদ (সা.) এর জন্মের পর থেকে তাঁর নবুয়্যতি লাভ করা পর্যনন্ত একের পর এক ঘটনাবলীর ধারা বিদ্যমান ছিল। আরবের প্রাচীন প্রথা অনুযায়ী মরুধাত্রীদের অনেকেই তাদের জীবিকার অন্বেষণে মক্কায় আসতো দুগ্ধপোষ্য বাচ্চাদেরকে নেওয়ার জন্যে। তারা দুগ্ধপোষ্য বাচ্চাদেরকে নিয়ে ধাইমা হিসেবে দুধ খাওয়াতো।  কিন্তু মুহাম্মাদ যেহেতু ইয়াতিম এবং গরীব ছিলেন, সেজন্যে তাঁকে মরুনারীদের কেউই গ্রহণ করতে চাইলো না।  হালিমা নামের দুর্ভিক্ষ কবলিত এক মরুনারীর ভাষ্য ছিল এ রকম: কোনো ধনী পরিবারের সন্তান আমার ভাগ্যে জুটলো না। মুহাম্মাদ নামের এক নবজাতক আমার ভাগ্যে জুটলো। তার মা কিংবা দাদা আমাদেরকে কোনো উপহার পর্যন্ত দিতে পারলো না। কিন্তু আমরা মক্কা থেকে খুব বেশি দূরে যেতে না যেতেই আশ্চর্যরকমভাবে উপলব্ধি করলাম,আমার শুষ্ক বুক দুধে পরিপূর্ণ হয়ে গেল। এই পরিমাণ দুধ এলো, যাতে আমার নিজের সন্তান এবং মুহাম্মাদ উভয়েরই ক্ষুধা মেটে। যখন ঘরে পৌঁছলাম, আমার স্বামী ব্যাকুল হয়ে বললো: হালিমা দেখ! দুর্ভিক্ষ সত্ত্বেও আমাদের উষ্ট্রীগুলো কেমন দুগ্ধপূর্ণ হয়ে উঠেছে! সেই থেকেই আমরা বুঝতে পেরেছি, এই সন্তানটি কল্যাণ এবং বরকতপূর্ণ। এই সন্তান নিশ্চয়ই আমাদেরকে সুখি ও সৌভাগ্যশালী করে তুলবে। মুহাম্মাদ (সা.) পাঁচ বছর বনী সাদ গোত্রে তাঁর শৈশবকাল কাটিয়েছেন। সেখানেই তিনি বেড়ে ওঠেন। এই সময়ে নবীজীর শিশুসুলভ আচার-ব্যবহার অন্যান্য শিশুদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা বা স্বতন্ত্র ছিল। একদিন মুহাম্মাদ হালিমার কাছে এসে অন্য একটি শিশুর সাথে মরুভূমিতে যাবার অনুমতি চাইলো। হালিমা অনুমতি দিল ঠিকই, তবে বেশ উৎকণ্ঠিত হলো। হালিমা মুহাম্মাদকে সাজিয়ে গুজিয়ে দিলো। গলায় একটা হার পরিয়ে দিল। মুহাম্মাদ জিজ্ঞেস করলো-এটা কী? হালিমা উত্তর দিলো-এটা তোমাকে হেফাজত করবে এবং তোমাকে বদনজর থেকে মুক্ত রাখবে। শিশু মুহাম্মাদ তখন তার ছোট্ট দুটি হাত দিয়ে মালাটা টেনে ছিঁড়ে ফেলে বললো-আমার এমন কেউ আছেন যিনি আমাকে রক্ষা করবেন। এই বলে মরুভূমির দিকে চলে গেল। কিন্তু হালিমার আর পলক পড়লো না। গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে ভাবলো-এই শিশু কীকরে এরকম পন্ডিতের মতো কথা বলে! যাই হোক, এভাবে কিছুদিন মরুতে বসবাস করবার পর শিশু মুহাম্মাদ মক্কায় ফিরে আসে এবং মায়ের অতুলনীয় ভালোবাসা আর স্নেহ-প্রেমের উষ্ণ ছোঁয়ায় কাটাতে থাকে।  মাত্র ছয় বছর বয়সেই মুহাম্মাদ তাঁর মোহনীয় দৃষ্টি, চমৎকার চেহারা আর বিচক্ষণ কথাবার্তার জন্যে সবার কাছে প্রিয় হয়ে ওঠেন। একদিন মদীনার কোনো এক আত্মীয়ের সাথে দেখা করবার জন্যে মা আমেনা পুত্র মুহাম্মাদকে নিয়ে রওনা দেন।  কিন্তু ফেরার সময় মাঝপথে এসে মা আমেনা অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ইহলীলা ত্যাগ করেন। তারপর থেকে আব্দুল মোত্তালেব শিশু মুহাম্মাদের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। আব্দুল মোত্তালেব এই শিশুর উজ্জ্বল ভবিষ্যতের অপেক্ষায় ছিলেন।  সেজন্যে তার ব্যাপারে বেশ সতর্ক ছিলেন এবং যথাসাধ্য তার যত্ন নিতেন। মুহাম্মাদের প্রতি তাঁর স্নেহ দিনদিনই বৃদ্ধি পেতে লাগলো। কিন্তু আট বছর বয়সেই শিশু মুহাম্মাদ তার পৃষ্ঠপোষক আব্দুল মোত্তালেবকেও হারায়।এই ছিল মুহাম্মাদের শৈশব।  পিতৃ-মাতৃহীন, অভিভাবকহীন এই শিশুর ভাগ্যে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কী লিখে রেখেছেন, আগামী পর্বে সে কাহিনী আপনাদের মাঝে তুরে ধরার চেষ্টা করবো । #

নূরনবী মোস্তফা (৩য় পর্ব)

সুপ্রিয় পাঠক! ‘নুরনবী মোস্তফা নামক ধারাবাহিকের গত পর্বে আমরা রাসূল (সা.) এর জন্মকালীন ঘটনাবলীর দিকে নজর দিয়েছিলাম। সেইসব ঘটনা থেকে নিশ্চয়ই প্রমাণিত হয়েছে যে আল্লাহর সর্বশেষ দূত হযরত মুহাম্মাদ (সা.) এর স্থান ও মর্যাদা কতো উচ্চে। আজকের পর্বে আমরা রাসূলের যুবক বয়সের বৈশিষ্ট্যের প্রতি নজর দেবো। মুহাম্মাদ তরুণ বয়সে পৌঁছলেন। তাঁর বিশেষ যেসব বৈশিষ্ট্য ছিল, সেসবের জন্যে তিনি তাঁর সমবয়সীদের মাঝে ছিলেন স্বতন্ত্র। প্রায়ই তিনি চিন্তর সাগরে নিমজ্জিত হয়ে যেতেন। পিতা-মাতা এবং দাদা মারা যাবার পর চাচা আবু তালেব পরম আদর যত্নে তাঁকে লালন পালন করেন।  আবু তালেব মুহাম্মাদকে ভীষণ ভালবাসতেন। তাঁর সহৃদয় ভালোবাসার কারণে এতিম এই বালকটির স্বজন হারানোর কষ্ট অনেকটাই লাঘব হয়েছিল। আবু তালেব ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। একদিন মুহাম্মাদ শুনতে পেলেন যে, চাচা সিরিয়া সফরে যাচ্ছেন, তার মানে তাঁর চাচা কিছুদিন তাঁর কাছ থেকে দূরে থাকবেন। একটু চিন্তায় পড়ে গেলেন মুহাম্মাদ। মনে মনে বললেন, চাচা যদি আমাকেও তাঁর সফরসঙ্গী করতেন। ছয় বছর হয়ে গেছে মক্কার বাইরে যান নি মুহাম্মাদ। তাঁর মন ছিল ভীষণ কৌতূহলী। অজানাকে জানার জন্যে তাঁর মন সবসময় সফরে যেতে চাইতো। কারণ সফর তাঁর এই কৌতূহলী মনের চাহিদা কিছুটা মেটাতো। সিরিয়া সফরের জন্যে তাঁর আকুলতা এতোই ছিল যে, তিনি তাঁর চাচার কাছে গিয়ে কাফেলার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলেন। কাফেলা সফর শুরু করার জন্যে প্রস্তত ছিলো।  আবু তালিব উটের পিঠে বসা ছিলেন আর কাফেলাকে বিভিন্ন সামগ্রী বা মাল-সামানা দিচ্ছিলেন। মুহাম্মাদ একটু সামনে এগিয়ে গিয়ে চাচার উটের লাগামটা হাতে নিলেন এবং বললেন: চাচাজান! এমন কী হতো আমাকেও যদি আপনার সাথে নিয়ে যেতেন! মুহাম্মাদের চেহারা দেখে আবু তালিবের মনে ঝড় বয়ে গেল। তিনি উটের পিঠ থেকে নেমে এলেন এবং মুহাম্মাদকে জড়িয়ে ধরে বললেন: মুহাম্মাদ! প্রিয় আমার! তুমি কি জানো, তোমার ভারাক্রান- চেহারা দেখাটা আমার জন্যে কতো কষ্টের! এই বলে আবু তালিব তাঁর স্নেহভরা দুহাত দিয়ে মুহাম্মাদকে আদর করে দিলেন এবং সফরের কষ্টের কথা চিন্তা না করেই সিদ্ধান্ত নিলেন, তাঁকে সাথে নিয়ে যাবেন। এই খবর শুন মুহাম্মাদ ভীষণ খুশি হয়ে গেলেন। কাফেলা মক্কার উত্তরের পাহাড়গুলোকে পেছনে ফেলে চলে গেল। মক্কার সুপরিচিত শহর ধীরে ধীরে মুহাম্মাদের দৃষ্টির আড়াল হয়ে গেল। তিনি তাঁর আশেপাশের সবকিছু দেখতে লাগলেন। বিসতৃত মাঠ-প্রান-র, প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী দেখে তিনি বেশ উৎফুল্ল বোধ করতে লাগলেন। এ সময় মুহাম্মাদের বয়স ছিল বারো। তরুণ বয়সের সফর বলে তাঁর কাছে এটি ছিল সুখকর ও স্মৃতিময়। মুহাম্মাদ নীরবতা এবং একাকীত্ব ভীষণ ভালোবাসতেন এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে তিনি বেশ অভিভূত হতেন। কাফেলা অনেক দূর পেরিয়ে সামুদ জাতির বসবাসের উপভোগ্য আবহাওয়াময় অঞ্চলে গিয়ে পৌঁছলো। আবু তালিব তখন আল্লাহর নাফরমানীর কারণে ধ্বংসপ্রাপ্ত ঐ ধনী সমপ্রদায়টির গল্প মুহাম্মাদকে শোনালেন। বিচিত্র এলাকা, শহর, মানুষ, আইন-কানুন, বৈচিত্র্যময় প্রকৃতি, পাহাড়ের পর পাহাড়, উপত্যকা আর তারাভরা মরুভূমির আকাশ দেখে আনন্দিত যেমন হলেন, তেমনি তাঁর জন্যে শিক্ষণীয়ও ছিল অনেক কিছু। কয়দিনের মধ্যেই কাফেলা সিরিয়ায় গিয়ে পৌঁছলো।  মুহাম্মাদ কৌতূহলী ও সূক্ষ্মদৃষ্টি দিয়ে সবকিছু দেখতে লাগলেন, মূল্যায়ন করতে লাগলেন এবং স্মৃতিভান্ডারকে সমৃদ্ধ করতে লাগলেন।  এইসব মিষ্টি অভিজ্ঞতার কারণে তাঁর সফরের ক্লানি- যেন অনুভূতই হলো না। তাছাড়া চাচাজানের সঙ্গে থাকার কারণে অন্যরকম মজা পাচ্ছিলেন।  অনেকটা পথ পাড়ি দেবার পর কাফেলার মাঝে ক্লান্তির ছাপ সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাঁরা বসরা নামক এলাকায় পৌঁছলেন।  মুহাম্মাদ উটের পিঠে বসে ছিলেন। আবু তালিবের আদেশে কাফেলার সবাই একটি টিলার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। টিলার চূড়ায় ছিল একটা গির্জা।  এটা ছিল বুহাইরার গির্জা। এই গির্জাটি সে সময় খুব নামকরা ছিল। বুহাইরা ছিল বেশ জ্ঞানী ও পন্ডিত ব্যক্তি। তাওরাত-ইঞ্জিলসহ আগের সকল বিষয় সম্পর্কেই তিনি জানতেন।  সেজন্যে দূরের এবং কাছের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বুহাইরাকে দেখতে তার গির্জায় আসতো।  যাই হোক, কিছু সময় পর এই বুহাইরার দূত কাফেলার নেতার কাছে এলো। আবু তালিবের কাছে গিয়ে সে বললো: বুহাইরা আপনাদেরকে মধ্যাহ্ন ভোজের দাওয়াত দিয়েছেন। আবুতালিব এবং তাঁর সঙ্গী-সাথীরা এই খবর শুনে বেশ বিস্মিত হলেন। তাঁদের একজন বলে উঠলেন-"বছরের পর বছর এই এলাকা অতিক্রম করেছি, অথচ এই প্রথমবারের মতো বুহাইরা আমাদেরকে এভাবে দাওয়াত করলেন।" আবু তালিব বুহাইরার দাওয়াত গ্রহণ করলেন এবং ঠিক হলো যে, মুহাম্মাদ কাফেলার জিনিসপত্র দেখাশোনার দায়িত্বে থাকবেন আর বাকি সবাই বুহাইরার আমন্ত্রণে যাবেন।গির্জায় বিচিত্র খাবারের আয়োজন করা হলো।  বুহাইরা মেহমানদের অভ্যর্থনা জানালেন আর গভীরভাবে মেহমানদের চেহারাগুলো লক্ষ্য করে বললেন: তোমরা মনে হয় তোমাদের একজন সাথীকে সঙ্গে আনো নি। তাঁরা বললো: হ্যাঁ, একটা শিশুকে আমরা আমাদের মালামাল দেখাশোনা করার জন্যে রেখে এসেছি। বুহাইরা বললো: তাকেও নিয়ে আসো। মুহাম্মাদ যখন গির্জায় এলেন, বুহাইরা তখন গভীর দৃষ্টিতে মুহাম্মাদকে দেখতে লাগলেন এবং নিজের পাশে বসিয়ে ভীষণ আদর-যত্ন করতে লাগলেন। খাওয়া-দাওয়া সারবার পর ঘণ্টাখানেক বিশ্রাম নিয়ে কাফেলার লোকজন যেতে উদ্যত হলো। বুহাইরা মুহাম্মাদ এবং আবু তালিবকে রেখে অন্য সবাইকে যেতে দিলো। সবাই চলে যাবার পর বুহাইরা নিরিবিলি আবু তালিবকে জিজ্ঞেস করলেন: "তোমার এবং এই যুবকের মাঝে কি কোনো সম্পর্ক আছে "? আবু তালিব বললেন: ও আমার সন্তান। বুহাইরা বললো: না, তার তো বাবা-মা থাকার কথা নয়। অল্পবয়সেই সে তার বাবা-মাকে হারিয়েছে।  আবু তালেব বললো: হ্যাঁ, আমি তার চাচা এবং তার অভিভাবক। বুহাইরা মুহাম্মাদের দিকে তাকিয়ে তার নাম জিজ্ঞেস করলো।  মুহাম্মাদ তাঁর নাম বললেন।  বুহাইরা জবাব দিলো: হ্যাঁ, এরকমই তো। মুহাম্মাদ অথবা আহমাদ। হে আমার সন্তান! তোমাকে লাত-ওয্যার শপথ দিচ্ছি। মুহাম্মাদ সাথে সাথে বললেন: লাত-ওয্যা নিয়ে আমার সাথে কোনো কথা বলো না। এই পৃথিবীর বুকে তাদের চেয়ে ঘৃণিত আর কোনো বস্তু আমার কাছে নেই। বুহাইরা সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে বললো: তোমাকে তোমার খোদার শপথ দিয়ে বলছি, আমার প্রশ্নগুলোর সঠিক জবাব দাও! আবু তালিব তখন বললেন: নিশ্চিত থাকুন হে পাদ্রি! আজ পর্যন্ত তার কাছ থেকে কেউই সত্য ব্যতীত অন্য কিছু শোনে নি। বুহাইরা আনন্দের সাথে মুহাম্মাদকে জিজ্ঞেস করলো: হে মুহাম্মাদ! আমাকে বলো! কোন জিনিস তুমি বেশী পছন্দ করো। মুহাম্মাদ বললেন: একাকীত্ব। বুহাইরা আবার জিজ্ঞেস করলেন: একাকী কী চিন্তা কর বা কী নিয়ে ভাবো! মুহাম্মাদ বললেন: স্রষ্টা ও সৃষ্টিজগত নিয়ে, জন্ম-মৃত্যু নিয়ে, সত্ত্বা নিয়ে, অন্যভূবন নিয়ে। বুহাইরা জানতে চাইলো: বিশ্বে যা কিছু দেখ, তার মধ্যে সবচে বেশী পছন্দ করো কী? মুহাম্মাদ বললো: প্রকৃতি, আর প্রকৃতির মধ্যে আকাশ এবং তারকারাজি বেশী পছন্দ করি।  বুহাইরা জানতে চাইলো: তুমি কি স্বপ্ন বেশি দেখো? জবাবে মুহাম্মাদ বললেন: হ্যাঁ! এবং তারপর সেগুলোকে বাস্তবেও লক্ষ্য করি।  বুহাইরার মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো।  বিস্ময়ের সাথে আবু তালেবের কাছে মুহাম্মাদের কাঁধ দুটি দেখতে চাইলো।  আবু তালেব মুহাম্মাদের দিকে তাকিয়ে অসম্মতি জানাবার মতো কিছু দেখলেন না।  তাই দেখালেন।  বুহাইরা মুহাম্মাদের দুই কাঁধের মাঝখানে তিল দেখতে পেয়ে কেঁদে ফেললো।  তার চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো।পেরেশান হয়ে সে বললো: ঐশীগ্রন্থ এবং পূর্ববর্তীগণ যেরকম বলে গেছেন হুবহু সব মিলে যাচ্ছে।  সে মুহাম্মাদ এবং আহমাদ।  তোমার ওপর দরুদ হে ঐশীগ্রনসমূহের রহস্য! তোমার ওপর দরুদ! হে খোদার অনুগ্রহের প্রকাশসল।  তুমি তো সে-ই, তাওরাত ইঞ্জিলে যাঁর আগমনের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে এবং পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণ যাঁর লক্ষণগুলো বর্ণনা করে গেছেন। বুহাইরা আবু তালিবের দিকে তাকিয়ে বললো: তোমার ভাতিজার মাধ্যমে বিশাল বিশাল ঘটনা ঘটবে।  সে মূর্তিগুলোকে নিশ্চিহ্ন করবে। মানুষের চোখের সামনে থেকে শেরক এবং কুফুরির পর্দা ছিন্ন করবে। সে সর্বশ্রেষ্ঠ আদম সন্তান এবং সর্বশেষ ঐশীদূত। এই শিশুর ভবিষ্যত উজ্জ্বল।  তার ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক থেকো। আমি বিভিন্ন গ্রন্থে পড়েছিলাম যে একদিন সে এই ভূখন্ড অতিক্রম করবে।  এই বলে বুহাইরা উঠে গেলো। আকাশের দিকে তাকালো। তারপর মুহাম্মাদের পবিত্র চেহারার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো: আহা! আমার জীবনটা যদি এতোটুকু দীর্ঘ হতো যে, তোমার দাওয়াতী কাজের জমজমাট অবস্থাটা দেখে যেতে পারতাম! #

নূরনবী মোস্তফা (৪র্থ পর্ব)

সিরিয়ায় বাণিজ্যিক সফরের পর বেশ কয়েক বছর কেটে গেল।  মুহাম্মাদ (সা.) এখন যুবক।  এই সময়টায় চাচা আবু তালিবের জীবন বেশ কষ্টে কাটছিল।  আবু তালিবের বয়স তখন পঞ্চাশের উপরে। পাঁচটি সন্তান ছিল তাঁর। সিরিয়ায় যে সফরকালে মুহাম্মাদ (সা.)ও সাথে গিয়েছিলেন, ঐ সফরের পর আবু তালিব আর বাণিজ্যিক সফরে সিরিয়া যেতে পারেন নি।  মুহাম্মাদ (সা.) সবসময়ই চেষ্টা করতেন, যে-কোনো উপায়ে চাচাকে সঙ্গ দিতে বা সহায়তা করতে। তাই তিনি প্রায়ই চাচার দুম্বাগুলোকে মরুভূমিতে চরাতে নিয়ে যেতেন। মুহাম্মাদের দয়া-দাক্ষিণ্যের কথা ছিল সবার মুখেমুখে।  যতোই দিন যাচ্ছিল, জনগণের মাঝে তাঁর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেতে লাগলো। তাঁর দৃষ্টি ছিল সদয়, সলজ্জ ও বিনয়ী। তাঁর কথাবার্তা ছিল বসন্তের বৃষ্টির মতো সতেজতাপূর্ণ এবং হৃদয়গ্রাহী। তাঁর কথাবার্তা অন্তরে যেন প্রাণের সঞ্চার করতো। তাঁর আচার-ব্যবহার ছিল তাঁরি নিষ্কলুষ মন ও মননের অকৃত্রিম দর্পন।  অথচ এই আচার-ব্যবহার বা চারিত্র্যিক এই শিক্ষা তিনি তাঁর মুরুব্বিদের কাছে পান নি। তাঁর আচার-ব্যবহার, তাঁর স্বভাব-চরিত্রের সৌন্দর্য ছিল সহজেই দৃষ্টিগ্রাহ্য।পঁচিশ বছর বয়সেই তাঁর সততা ও সত্যবাদিতার কথা ছিল মক্কার জনগণের মুখে প্রবাদতুল্য। কুরাইশ গোত্রের ঘরে ঘরে তাঁর মতো সচ্চরিত্র ও সাহসী আর কোনো যুবক ছিল না।  তাঁর আধ্যাত্মিকতা ও ব্যক্তিত্বের সুষমা সবাইকে তাঁর প্রতি আকৃষ্ট করতো। সত্যকথা বলা এবং সঠিক ও যথার্থ কাজটি করার ব্যাপারটি এমন পর্যায়ের ছিল যে, জনগণ তাঁকে "আমিন" অর্থাৎ বিশ্বস- বা আস্থাভাজন উপাধিতে ভূষিত করে। তাঁর বিশ্বস-তা সম্পর্কে আবিল হামিসা চমৎকার একটি ঘটনা বলেছেন।  ঘটনাটি তাঁর ভাষায় এ রকম: আমি একদিন মুহাম্মাদের (সা.) কাছে একটি জিনিস বিক্রি করেছিলাম। জিনিসটার দাম সামান্য বাকি ছিল।  কথা ছিল, বাকী দামটা পরের দিন মক্কার বাজারের পাশে তার কাছ থেকে নেবো। কিন্তু আমি যে তাকে কথা দিয়েছিলাম, তা বেমালুম ভুলে গেলাম। অন্য একটা কাজে আমি মক্কার বাইরে চলে গেলাম। সেখানে তিনদিন থাকতে হয়েছিল আমাকে। তৃতীয় দিবসে অবশ্য মক্কায় প্রবেশ করলাম এবং যে স্থনটায় থাকবো বলে মুহাম্মাদকে কথা দিয়েছিলাম, ঐ স্থানে গিয়ে পৌঁছলাম। দেখলাম মুহাম্মাদ (সা.) উঁচু একটা জায়গায় বসে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে। তাঁকে দেখেই আমার মনে পড়ে গেল তাকে কথা দেওয়ার ব্যাপারটি। তার দিকে এগিয়ে গেলাম। কথা বলে বুঝলাম, সততা এবং পবিত্রতার পরাকাষ্ঠা এই যুবক তিনদিন হলো নির্ধারিত সময়টাতে এখানে এসে আমাকে আমার দেনা পরিশোধ করবার জন্যে অপেক্ষা করেছে। তার বিশ্বস্ততায় আমি বিস্মিত হলাম আর আপন ভুলের জন্যে অর্থাৎ কথা দিয়ে কথা রাখতে না পারার কারণে লজ্জিত হলাম। সেই থেকে বুঝলাম জনগণ কেন তাঁকে বিশ্বস্ত উপাধি দিয়েছে এবং এই বয়সে তাঁকে কেন মানুষ এতো বেশী শ্রদ্ধা-সম্মান করে।মরুপ্রান্তরের প্রতি মুহাম্মাদের ছিল অন্যরকম আকর্ষণ।  বিশেষ করে রাতের বেলা তারাভরা মরুর আকাশ তাঁকে ভীষণভাবে টানতো।  তিনি রাতের আকাশকেই বেশি পছন্দ করতেন। রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে তিনি চিন্তার সাগরে ডুবে যেতেন।  ভাবতেন: আকাশ এবং তার অগণিত তারা কতো সুন্দর এবং উজ্জ্বল। নিশ্চয়ই এগুলোকে নির্দিষ্ট কোনো উদ্দেশ্যেই সৃষ্টি করা হয়েছে।  সত্যিই, কেবল অনন্য ক্ষমতার অধিকারী মহান আল্লাহই পারেন বিস্ময়কর সুন্দর এই বিশাল পৃথিবী সৃষ্টি করতে।  চাঁদ-সূর্য, পাহাড়-পর্বত,মরু-প্রান্তর, মানুষ, সকল চতুষ্পদী এবং বিবেক-বুদ্ধি সম্পন্ন প্রাণীসহ সমগ্র সৃষ্টিকুল একমাত্র আল্লাহই সৃষ্টি করার মতো ক্ষমতা রাখেন । এই ধরনের চিন্ত মুহাম্মাদের (সা.) অন্তরাত্মাকে অন্তর্মুখি বা ধ্যানী করে তুলতো।এই অন্তর্মুখি চিন্তাই তাঁকে নুর পাহাড়ের অপার রহস্যময় নীরব-নিঃসঙ্গ স্থানে নিয়ে যেত, যাতে শহুরে শোরগোলের বাইরে গিয়ে প্রয়োজনীয় গোপণ ইবাদাতে মশগুল হওয়া যায়। নুর পাহাড়ের দক্ষিণ উপত্যকার "হেরা গুহা" ছিল তাঁর এই নিঃসঙ্গ ও গোপন ইবাদাতের জন্যে সবচে প্রিয় স্থান।  হেরা গুহায় যাবার পার্বত্য পথটি ছিল দুর্গম-বন্ধুর ও কঙ্করময়। কিন্তু বারবার যাওয়া-আসা করতে করতে দুর্গম ঐ পথ অতিক্রম করা তাঁর জন্যে আর কষ্টকর ছিল না।  নুর পাহাড়ের দক্ষিণ পাদদেশে গর্তের মতো দেখতে এই গুহাটিকে দেখলে মনে হয় যেন কতোগুলো পাথর একটার পর একটা স্থাপন করা।  এগুলোর নীচেই গুহার মতো জায়টাটি রয়েছে। এই জায়গাটির প্রতিই ছিল মুহাম্মাদের (সা.) অনন্তরের গভীর টান।  হেরা গুহার অবস্থানটা ছিল এমন যে, মুহাম্মাদ (সা.) যদি দাঁড়াতেন কিংবা বসতেন, তাহলে তাঁর প্রিয় কাবা শরীফকে দেখতে পেতেন। মুহাম্মাদ (সা.) ঘণ্টার পর ঘণ্টা মক্কামুখি হয়ে বসে গুহার ছিদ্রপথে মক্কা শহরটাকে ভালো করে দেখতেন। এই শহরটাকে তিনি ভীষণ ভালবাসতেন। কিন্তু এই শহরে প্রচলিত জাহেলি কর্মকান্ড আর অপসংস্কৃতির কারণে তিনি ভীষণ মর্মাহত ছিলেন। গোত্রে গোত্রে দাঙ্গা-হাঙ্গামা, মূর্তি পূজা,কন্যা সন্তানকে জীবীত কবর দেওয়া, নিরীহ মানুষকে বিপদে ফেলে স্বার্থোদ্ধার করা ইত্যাদি অমানবিক কর্মকান্ডে তিনি খুবই দুঃখ পেতেন। তিনি সবসময় কামনা করতেন, এমন যদি হতো-যে জীবন প্রবাহ মানুষকে নোংরামি আর কষ্টের দিকে ঠেলে দেয়, সেরকম পরিস্থিতি আর না থাকতো! নিরীহ ও অত্যাচারিতদের সাহায্যার্থে তাঁর অন্তরাত্মা অস্থির হয়ে পড়তো। তিনি একটা তরুণ সঙ্ঘে যোগ দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে এই সংগঠনটি বিখ্যাত হয়ে পড়ে। বিখ্যাত হবার কারণ প্রসঙ্গে একটা ঘটনার অবতারণা করা যেতে পারে। একদিন মধ্যবয়সী,স্লিমদেহী এক লোক কাবার পাশের একটা উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে চীৎকার করে বললো: হে কুরাইশবাসী! একজন নিরীহ লোক মক্কার মতো শহরে তার মাল-সামানা সব হারিয়েছে। ঐ ব্যক্তি বনী যুবাইদ গোত্রের বাসিন্দা।  সে মক্কায় এসেছে তার মালামাল বিক্রি করতে। কিন্তু "আস ইবনে ওয়ায়েল" তার কাছ থেকে মালামাল কিনে মূল্য পরিশোধ করে নি।  মুহাম্মাদ (সা.) এই কথা শুনে ভীষণ কষ্ট পেলেন এবং সিদ্ধান্ত নিলেন অত্যাচারিত এই নিরীহ লোকটির অধিকার যে-কোনো উপায়েই হোক আদায় করিয়ে দেবেন।  অনেক চিন্তা-ভাবনা করে শেষপর্যন্ত চাচা যুবায়েরের কাছে ব্যাপারটা খুলে বলাকেই তিনি শ্রেয় মনে করলেন। যুবায়ের এই ঘটনা শুনে শহরের কয়েকজন যুবককে একত্রিত করলেন এমন একটা উপায় খুঁজে বের করবার জন্যে যাতে এ ধরনের ন্যাক্কারজনক কোনো ঘটনা আর না ঘটে। তাঁরা শেষ পর্যন্ত নিরীহ-অসহায় ও অত্যাচারিতদের সহযোগিতা এবং তাদের সমস্যা সমাধানকল্পে একটা সংগঠন দাঁড় করালেন। এই সংগঠনে মুহাম্মাদ (সা.) নিজেও যোগ দিলেন। এই তরুণ সঙ্ঘের খবর মক্কার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লো। মক্কার জনগণ যুবকদের এই মহতী উদ্যোগকে সাধুবাদ জানায়। পরদিন এই সঙ্ঘের পক্ষ থেকে আস ইবনে ওয়ায়েলকে একটি বার্তা পাঠালেন যেন আগনক ব্যক্তিকে তার মালামালের দাম বুঝিয়ে দেওয়া হয়। আস এই বার্তা পেয়ে সাংঘাতিক ভয় পেয়ে যায় এবং ঐ ব্যক্তিকে তার প্রাপ্য টাকা বুঝিয়ে দেয়। এই তরুণ সঙ্ঘটিই প্রথম কোনো সংগঠন যার সাথে মুহাম্মাদ (সা.) যোগ দিয়েছিলেন। অত্যাচারিতদের অধিকার রক্ষার বিষয়টি তিনি কখনোই ভোলেন নি।  এই ধরনের মহতী কাজে তিনি এতো বেশী খুশি হতেন যে, নিজেই বলতেন: "এই প্রত্যয়ী ও মহতী কাজে আমি এতোবেশি খুশি যে এর পরিবর্তে আমাকে যদি কেউ লাল পশমি উটও দান করতো তাহলেও আমি ততোটা খুশি হতাম না।" মুহাম্মাদ (সা.) প্রতিদিন আবু তালিবের মেষগুলোকে মরুভূমিতে চরাতে নিয়ে যেতেন। চাচার খেদমত বা সহযোগিতা করার কথা তিনি মুহূর্তের জন্যেও ভুলতেন না। একদিন মুহাম্মাদ (সা.) মরুভূমিতে যাবার জন্যে প্রসতি নিচ্ছিলেন। এমন সময় আবু তালিব তাঁকে ডেকে বললেন:বাবা! তোমার জন্যে একটা খবর আছে। মুহাম্মাদ (সা.) অত্যন্ত বিনয়ের সাথে চাচার পাশে বসলেন এবং আদ্যোপান- মনোযোগের সাথে চাচার কথাগুলো শুনলেন। চাচা বলছিলেন:"খোয়াইলিদের কন্যা খাদিজা তোমার জন্যে একটা প্রস্তাব পাঠিয়েছে। তুমি জানো কিনা জানি না! কিছুদিন আগে তাঁর স্বামী মারা গেছে। স্বামী তাঁর জন্যে প্রচুর ধন-সম্পদ রেখে গেছে। খাদিজা এগুলো দিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করেন। প্রতিবছর মালামাল নিয়ে সিরিয়া এবং ইয়েমেনে যান। তোমাকে তিনি ভীষণ বিশ্বস্ত ও সচেতন ব্যক্তি বলে মনে করেন। তাই চাচ্ছেন, তোমাকে নিয়ে বাণিজ্যে যেতে। "মুহাম্মাদ (সা.) খাদিজা সম্পর্কে অনেক কিছুই শুনেছেন।  শুনেছেন যে, খাদিজা একজন সম্পদশালী ও সম্ভ্রান্ত নারী।  মক্কায় তাঁর অনেক সুখ্যাতি আছে। এমনকি মদিনা এবং সিরিয়ার ব্যবসায়ীরা পর্যন্ত তাঁকে চিনতো। খাদিজা সে সময়কার অত্যন্ত পূত-পবিত্র ও মহিয়সী এক নারী ছিলেন। যে সময় সুদ-ঘুষ খাবারের প্রচলন ছিল অহরহ, সে সময় তিনি অভাবী লোকজনকে টাকা-পয়সা হাওলাত দিতেন। ফেরত দেওয়ার সময় কোনোরকম সুদ বা অতিরিক্ত পয়সা নিতেন না। গরীব-দঃখী আর অসহায়দের সাহায্য সহযোগিতা করবার ক্ষেত্রে তাঁর খ্যাতি ছিল প্রবাদতুল্য। আবু তালিব তাঁর ভাতিজাকে আরো বললেন: "মুহাম্মাদ! তুমি এখন যথেষ্ট জ্ঞান-বুদ্ধি সম্পন্ন এক সচেতন যুবক। যদিও আমি তোমার উষ্ণ সাহচর্য থেকে বঞ্চিত হতে চাই না, তবু বাস্তবতা হলো, তোমার এখন নিজের জীবনকে সাজাবার সময় এসে গেছে। আমি ভীষণ লজ্জিত যে, তোমার জন্যে কোনো সম্পদ আমি রেখে যেতে পারি নি। তবে আমি আশাবাদী যে, যদি তুমি খাদিজার প্রস্তাব গ্রহণ করে এই বাণিজ্যিক সফরে যাও, তাহলে এই সফরের আয়ের টাকা দিয়ে নিজের একটা পুঁজি গড়ে তুলতে পারবে।"মুহাম্মাদ (সা.) এতোক্ষণ মাথা নীচু করে চাচার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন। চাচার কথা শেষ হবার পর এবার মাথা তুলে চাচার দিকে স্বচ্ছ, পবিত্র ও সততার ঢেউ বহমান সদয় চোখে তাকালেন। আবু তালিব ভাতিজার ঐ দৃষ্টিতে স্বাভাবিক দৃঢ়তাসম্পন্ন আত্মসম্মান প্রদর্শনের চিত্র দেখতে পেলেন। মুহাম্মাদ (সা.) সশ্রদ্ধ বিনয়ের সাথে বললেন: চাচাজান! আমাকে একটু সময় দিন! বিষয়টা আমি একটু ভালো করে ভেবে দেখি। আবু তালিব বললেন: "ঠিক আছে, তুমি যা চাও, তা-ই হবে।" #

নূরনবী মোস্তফা (৫ম পর্ব)

সুপ্রিয় পাঠক! রাসুল (সা) এর জীবনী ভিত্তিক ধারাবাহিকের গত পর্বে আমরা বলেছিলাম যে, চাচা আবু তালেব মুহাম্মাদকে (সা.) খাদীজার ব্যবসায়িক সফরে যাবার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।  মুহাম্মাদ (সা.) ঐ প্রস্তাব ভেবে দেখার জন্যে চাচার কাছ থেকে সময় চেয়ে নেন।  আজকের পর্বে আমরা তার পরবর্তী ঘটনার বর্ণনা দেওয়ার চেষ্টা করবো। মুহাম্মাদ (সা.) শেষ পর্যন্ত সফরে যাবার জন্যে মনস্থির করলেন।  তিনি ব্যবসার জন্যে দেওয়া খাদীজার প্রস্তাবে রাজি হলেন। খাদীজা এই বাণিজ্য কাফেলায় মুহাম্মাদের সাথে তাঁর নিজের গোলাম মেইসারাকেও দিলেন। গোলামকে বলে দিলেন মুহাম্মাদের সকল আদেশ যেন মেনে চলে এবং তাঁর সিদ্ধান্তের সাথে যেন কোনোরকম বিরোধিতা না করে। একইভাবে মুহাম্মাদকেও তিনি বললেন যেন মেইসারাকে তাঁর সহযোগী হিসেবে গ্রহণ করেন, কারণ মেইসারা ব্যবসায়িক কাজে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন এবং সচেতন।  মুহাম্মাদ (সা.) মেইসারা এবং অন্যান্য গোলামদের সহযোগিতা নিয়ে ব্যবসায়িক মালামাল প্রস্তুত করলেন।  এইসব মালামালের মধ্যে ছিল, তায়েফের চামড়া, মক্কার বনৌষধি অর্থাৎ আধুনিক কালের হার্বাল মেডিসিনের বিচিত্র উপাদান, ভারতীয় ইস্পাতের তৈরী তলোয়ার, চমৎকার চমৎকার কার্পেট, রঙ-বেরঙের সিল্কের কাপড়, চীনের মেশ্ক এবং বাহরাইনের মুক্তা।  এছাড়াও ছিল ফ্রান্স এবং পারস্যের স্বর্ণ-রূপায় পূর্ণ কয়েকটি ব্যাগ।  সকালে কাফেলা রওনা দেওয়ার জন্যে প্রস্তুত হলো।  আবু তালেবের চেহারায় পূর্বরাত থেকেই কেমন যেন উদ্বেগের ছাপ পরিলক্ষিত হচ্ছিল। মুহাম্মাদও ব্যাপারটা অনুভব করলেন এবং চাচাকে বললেন: চাচাজান! আপনি এতো উদ্বিগ্ন কেন? চাচা বললেন: তুমি দূরে চলে যাচ্ছো, কেন জানি আমি মেনে নিতে পারছি না।  তোমার জীবনের ভয়ও হচ্ছে। তোমার মনে আছে, যখন তোমার বয়স বারো ছিল, তখন খ্রিষ্টান পাদ্রী বুহাইরা কী বলেছিল? বুহাইরার কথার পর এখন তেরো বছর অতিক্রান্ত হতে যাচ্ছে। তুমি এখন পরিপূর্ণ যৌবনের অধিকারী। তারপরও আমার মন কেন জানি মানছে না।  কেননা ; তুমি অপরিচিত জায়গায় যাচ্ছো, সেখানে অসৎ, ভন্ড-প্রতারকের অভাব নেই। তুমি একটু সাবধানে থেকো।  মুহাম্মাদ (সা.) আবু তালিবকে সহানুভূতি জানালেন। তারপর চাচী ফাতেমা বিনতে আসাদের দিকে তাকালেন, যিনি মায়ের মতো আদর-স্নেহ দিয়ে, মায়া-মমতা দিয়ে মুহাম্মাদকে তদারকি করেছেন। ফাতেমাও ভীষণ অস্থির হয়ে পড়েন যেন তাঁর নিজের স্নেহের সন্তান সফরে যাচ্ছে।  তবে তিনি এমন কোনো দৃশ্যের অবতারণা করেন নি, যাতে মুহাম্মাদ পথে ঐ দৃশ্যের কথা চিন্তা করে মনে কষ্ট পান। তাই তিনি অম্লান চেহারায় খুশিমনে মুহাম্মাদকে বিদায় জানান। মুহাম্মাদ (সা.) চাচার ঘরের ছোট্ট কাঠের দরোজা থেকে রাস্তায় পা রাখেন এবং আল্লাহর দরবারে এই বলে দোয়া করেন: "হে আল্লাহ! তোমার ওপর নির্ভর করে সফরে যাচ্ছি। তোমার রহমতে আশ্রয় নিচ্ছি। সকল আশা, সকল ভরসা একমাত্র তোমার উপরেই। হে আল্লাহ! আমাকে সকল প্রকার জটিলতা বা কাঠিন্য থেকে রক্ষা করো এবং সফরের জন্যে নেওয়া আমার রসদপত্রগুলোকে পবিত্রতা দান করো! আমাকে গুনাহ থেকে মুক্ত রাখো এবং যেদিকেই দুচোখ যায়, সেদিকেই নেকির ব্যবস্থা করো!"বাণিজ্য কাফেলা সামনের দিকে অগ্রসর হয়ে চললো। মুহাম্মাদ (সা.) একটি দ্রুতগামী উটের পিঠে চড়ে সবার আগে আগে যাচ্ছিলেন । মাঝে মাঝেই তিনি সামনের দিকে এবং পেছনে তাঁর কাফেলার দিকে সচেতন দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিলেন। একটা সময় কাফেলা ধীরে ধীরে দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী সরু পথ ধরে সিরিয়ার দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। এমন সময় মেইসারা সামনে এলো। আবহাওয়া ছিল ভীষণ গরম। তার কালো চেহারার ওপর ঘাম জমে বড়ো বড়ো বিচির মতো দাগ দেখা যাচ্ছিলো। অত্যন্ত সম্মান ও মর্যাদার সাথে সহাস্য কণ্ঠে সে মুহাম্মাদের দিকে তাকিয়ে বললো: বাতাস ভীষণ গরম! মুহাম্মাদ (সা.) তার কথা স্বীকার করলেন এবং আগের সফরের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বললেন: এখানে পলির প্রাচুর্য থেকে মনে হচ্ছে এই এলাকায় বন্যা বেশি হয়। ফলে এখানে যাত্রাবিরতি না করাই ভালো।  মেইসারা বিনয়ের সাথে জড়ানো কণ্ঠে বললো: কিন্তু এই পার্বত্য পথ বেশ দীর্ঘ, সহজে শেষ হবে না। রাত্রিও প্রায় ঘনিয়ে এসেছে। মুহাম্মাদ (সা.) আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন: কালো মেঘ থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, দ্রুত বৃষ্টি হবে।  মেইসারাও জানতো যে, যেখানেই বাতাস গরম হয়, সেখানেই বৃষ্টি-বাদলে বন্যার আশঙ্কাটা বেশি থাকে। আর এই পার্বত্য পথ নিরাপদ জায়গা নয়। তারপরও সনষ্টির ভাব দেখিয়ে বললো: আপনার আদেশ! হে নেতা! আপনি যা বলবেন তা-ই হবে! মুহাম্মাদ (সা.) বললেন: এখন তো থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। তো নিরাপদ কোনো উঁচু জায়গায় গিয়ে অবতরণ করা উচিত।কাফেলা তুলনামূলক একটা উপযুক্ত স্থনে গিয়ে যাত্রা বিরতি করে। কাফেলার লোকজন কালো তাঁবু খাটিয়ে বিশ্রাম নেয়। আর মুহাম্মাদ (সা.) কাফেলার মাল-সামানা থেকে খানিকটা দূরের উঁচু জায়গায় একটা পাথরের ওপরে গিয়ে বসলেন। কাফেলার লোকজন আসে- আসে- ঘুমিয়ে গেল। রাতের মৃদু বাতাস মুহাম্মাদের চেহারা মোবারকে কোমল পরশ দিয়ে যাচ্ছিল। তিনি যথারীতি রাতের আকাশের বিস্ময়কর সৌন্দর্য আর এই পৃথিবীর রহস্যময়তার ভেতর ডুবে গেলেন।ঐ রাতে প্রচন্ড বৃষ্টিপাত হলো। কাফেলার লোকজন যে যেভাবে পেরেছে বন্যার বিপদ থেকে নিজেদের রক্ষা করেছে। পরদিন ব্যবসায়িক পণ্যগুলোকে শুকিয়ে পুনরায় যাত্রা শুরু করলো। কিন্তু অল্পপরেই ছিল পারাপারের একটা সঙ্কীর্ণ পথ।  ঐ পথে ছিল পানির প্রবাহ। গর্তটা কতোটা গভীর ছিল, তা কারো জানা ছিল না।  মেইসারা মুহাম্মাদের কাছে গিয়ে বললো: এখন কী উপায়! মুহাম্মাদ (সা.) বললেন: কাফেলাকে বলো যাত্রার প্রস্তুতি নিতে।  তিনি নিজেও উটের পিঠে সওয়ার হলেন। আল্লাহর নাম নিয়ে সিরিয়া অভিমুখে রওনা হলেন। ওমর হেশাম নামের কাফেলার একজন মুহাম্মাদের ঔদ্ধত্য দেখে ঠাট্টা করে বললোঃ নৌচালনার সরঞ্জাম আছে তো হে আব্দুল্লাহর ছেলে! কিন্ত মুহাম্মাদ তাকে কিছুই বললেন না। মেইসারা উদ্বেগের সাথে মুহাম্মাদের দিকে তাকিয়ে বললো: দেখছো তো বন্যার পানিতে রাস্তা বন্ধ হয়ে আছে! মুহাম্মাদ (সা.) মেইসারার দিকে তাকালেন। মেইসারা এই তাকানোর মধ্যে পরিপূর্ণ নির্ভরতা, আশা এবং সাহসিকতা দেখতে পেলো। সে যখনি মুহাম্মাদের দিকে তাকাতো, তখনই একটা বিশেষ প্রশান্তি পেত।  মুহাম্মাদ (সা.) মিষ্টি হাঁসি হেঁসে বললেন: মেইসারা! তোমার অন্তরে সাহস সঞ্চার করো! দয়াময় মহান আল্লাহ তাঁর অনুসারী ও অনুরক্তদেরকে নিঃসঙ্গ কিংবা নিরাশ্রিত রাখেন না। এই বলে সামনে অগ্রসর হয়ে পানি পার হয়ে গেলেন। উট নিয়ে তিনি নিরাপদে পানি পার হয়ে গেছেন দেখে কাফেলার অন্যান্য উটও তাঁর পিছু পিছু এলো এবং নিরাপদেই পানি পার হয়ে গেল।  কাফেলার মাঝে এবার আনন্দের কোলাহল দেখা দিল। মুহাম্মাদের আত্মবিশ্বাস এবং সাহসিকতা অন্যদের মাঝে এই পরিমাণ প্রভাব ফেললো যে, এই গল্প তাদের মাঝে বেশ কিছুদিন ধরে চললো। মুহাম্মাদের জন্যে এটা ছিল বেশ সফল ও সুখকর এক অভিজ্ঞতা।দীর্ঘ এই সফরে পথিমধ্যে বাণিজ্য কাফেলার অনেকেই অসুস্থহয়ে পড়ে।  মুহাম্মাদ (সা) যাত্রাবিরতি দিয়ে অসুস্থদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। মেইসারা মুহাম্মাদকে বললো: আমরা যদি দেরি করে পৌঁছি তাহলে মক্কার অন্যান্য ব্যবসায়ীরা তাদের মালামাল বিক্রি করবে,আর আমরা তাদের তুলনায় পিছে পড়ে যাবো।  কিন্তু মুহাম্মাদের দয়ালু অন্তর মানে নি। তিনি চিন্তা করেছেন দ্রুত পৌঁছাতে গেলে অসুস্থদের অবস্থা আরো গুরুতর হয়ে পড়বে।  তাঁর এই মানবতাপ্রীতির কারণে কাফেলা দুই দিন দেরি করে সিরিয়ায় পৌঁছেছিল।  সূর্য সকালের শীতলতা শহরের বুক থেকে ধীরে ধীরে দূর করে দিচ্ছিল। সিরিয়ার বিশাল বাজার হেজাজের বাণিজ্য কাফেলার আগমনে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। মানুষ তাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার জন্যে আসা-যাওয়া করতে লাগলো।  মেইসারা দামেশকের যে কজন ব্যবসায়ীর সাথে লেনদেন করতো তাদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করলো। কিন্তু তারা ইতোমধ্যেই তাদের প্রয়োজনীয় কেনা-কাটা সেরে ফেলেছে। মক্কার অনেক ব্যবসায়ী খাদীজাকে পরোক্ষে তিরস্কারের ভাষায় বলতে লাগলো: এতো বড়ো একটা কাফেলাকে অদক্ষ আর নরম মনের এক যুবকের হাতে সোপর্দ করেছে। মেইসারা তার কানে একথা পৌঁছার সাথে সাথে ভীষণ কষ্ট পেলো। সে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লো। কিন্ত মুহাম্মাদ (সা.) অশান্ত হলেন না।  তিনি আল্লাহর সাহায্যের কথা বলে মেইসারাকে সহানুভূতি জানালেন।বিকেলের দিকে বাজারের অপর প্রান্ত থেকে একটা কোলাহলের শব্দ ভেসে এলো। সবাই সেদিকে তাকালো। ফিলিস্তিনের একটা বড়ো কাফেলা সিরিয়ায় এসেছে । তারা বাজারের দিকে যাচ্ছিল। ফিলিস্তিনের এই যাত্রীদলের মধ্যে মক্কার জিনিসপত্র কেনার জন্যে ভালো ক্রেতা ছিল।  তারা মক্কার ব্যবসায়ীদের খুঁজছিল। কিন্ত সেখানে একমাত্র মুহাম্মাদের বাণিজ্য কাফেলা ছাড়া তাদেরকে মালামাল দেওয়ার মতো আর কেউ ছিল না। মেইসারার উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা এবার শেষ হলো। মুহাম্মাদের যোগ্যতা এবং উপযুক্ততায় এবার সে গর্ব করে বলতে লাগলো: "আমরা আজি প্রথম সিরিয়ায় পৌঁছেছি, অথচ আমাদের সকল মালামাল বিক্রি হয়ে গেছে, বিক্রির জন্যে কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। আমাদের ভাগ্য কতো সুপ্রসন্ন।" #

-চলবে-