বিবাহ কী

বয়ঃপ্রাপ্তি ও প্রবৃদ্ধিতে উপনীত হওয়া প্রত্যেক ছেলে ও মেয়ের সর্ব বৃহৎ আকাঙ্খা হচ্ছে বিবাহ। দাম্পত্য জীবন গঠনের মাধ্যমে অধিকতর স্বাধীনতা ও অর্জন করতঃ গোপন ভেদের একজন সহযোগী ও সহচর পেতে চায়। তারা বিবাহকে নিজ সৌভাগ্যবান জীবনের সূচনা মনে করে এবং এজন্যে উৎসবের ব্যবস্থা করে থাকে।

      যুগোল নির্বাচন ও পারিবারিক যৌথ জীবনের ভিত্তি স্থাপন করা একটি প্রাকৃতিক চাহিদা যা প্রত্যেক মানুষের অস্তিত্বে স্থাপন করা হয়েছে যা মহান আল্লাহর বৃহৎ অনুগ্রহ। সত্যিই, পারিবারিক আনন্দের সংঘ ছাড়া কি এমন কোনো স্থান খুঁজে পাওয়া যাবে যা যুবকদের জন্যে এক নিশ্চিত আশ্রয় কেন্দ্র হতে পারে? পরিবারের প্রতি অনুরাগই মানুষকে ছিন্নভিন্ন চিন্তা-ভাবনা ও অভ্যন্তরীণ দোদুল্যতা হতে মুক্তি দিতে পারে। সেখানেই একজন বিশ্বস্ত ও দয়ালু বন্ধু ও সহচর খুঁজে পাওয়া যেতে পারে এবং বিভিন্ন দুঃখ-কষ্ট ও সমস্যায় পরস্পরের সহযোগী ও সমব্যথী হতে পারে। দাম্পত্য জীবনের চুক্তি এমনই এক ঐশী সম্পর্ক যা অন্তরসমূহকে পরস্পরের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে, বিষাদক্লিষ্ট অন্তরসমূহকে শান্ত করে এবং ছিন্নভিন্ন চিন্তা-ভাবনাগুলিকে এক উদ্দেশ্যের দিকে কেন্দ্রিত করে। গৃহ হল প্রেম-ভালবাসার স্থান, সখ্যতা ও অনুরাগ এবং সর্বোত্তম বিশ্রামকেন্দ্র।

    

মহান আল্লাহ কুরআনে বলছেন:

«وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِّتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِّقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ»

‘তোমাদের মাঝ হতেই তোমাদের জন্যে তিনি যুগোল সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমরা তাদের সহিত সখ্যতা গড়তে পার এবং মানসিক প্রশান্তি পেতে পার। আর তিনি তোমাদের পরস্পরের মাঝে ভালবাসা ও দয়া স্থাপন করেছেন। নিশ্চয় এ বিষয়ের মাঝে চিন্তাবিদদের জন্যে একাধিক নিদর্শন বিদ্যমান রয়েছে।’ (সূরা রূম, আয়াত নং ২১)

      ইসলামের নবি (সা.) বলেন: ‘যে লোকের স্ত্রী নেই সে একজন মিসকিন ও উপায়হীন, যদিও বিত্তশালী হয়। আর যে মহিলার স্বামী নেই, সেও একজন মিসকিন ও উপায়হীনা, যদিও তার অর্থ থাকে।’ (মাজমাউয যাওয়ায়েদ, খন্ড ৪, পৃ ২৫২)

      তিনি অপর এক জায়গায় বলেন: ‘আল্লাহর নিকট বিবাহের চেয়ে অধিক প্রিয়, আর কোনো ভিত্তিই ইসলামে স্থাপিত হয় নি।’ (বিহারুল আনোয়ার, খন্ড ১০৩, পৃ: ২২২)

      হজরত ইমাম সাদেক (আ.) এক লোককে জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তোমার কি স্ত্রী রয়েছে?’ সে বলল: ‘না।’ তিনি বললেন: ‘আমি যদিও সমগ্র পৃথিবীর মালিক হই তবুও স্ত্রী ব্যতীত একটি রাতও অতিবাহিত করা পছন্দ করি না।’ (প্রাগুক্ত, ২১৭)

      হ্যাঁ, দয়াবান আল্লাহ এই ধরনের মূল্যবান একটি নেয়ামত মানুষকে দান করেছেন। কিন্তু শত অনুতাপের শহিত বলতে হয় যে, মানুষ এই অনুগ্রহের তেমন মূল্যায়ন করে না। অনেক ক্ষেত্রে এমনও হয় যে, মুর্খতা ও স্বেচ্ছাচারিতার কারণে, সখ্যতা ও প্রেমের এই সংঘকে এমন এক অন্ধকার জেলখানায়, বরং জ্বলন্ত এক জাহান্নামে রূপান্তর করে যে, পরিবারের অপর সদস্যরা বাধ্য হয়েই সেই অন্ধকার জেলখানায় জীবনের শেষ অবধি ভোগান্তি পোহাতে থাকে কিংবা দাম্পত্য জীবনের পবিত্র চুক্তিকে ছারখার হয়ে যায়।

      কিন্তু যদি স্বামী-স্ত্রী নিজ নিজ দায়িত্বসমূহ সম্পর্কে জ্ঞাত হন এবং তদানুযায়ী আমল করেন, তাহলে গৃহের পরিবেশ জান্নাতের মত স্বচ্ছ ও প্রিয় হবে।

      পারিবারিক মতানৈক্য সৃষ্টি হওয়ার বিভিন্ন কারণ রয়েছে যেমন- অর্থনৈতিক বিষয়, পারিবারিক লালন-পালন ও শিক্ষা-প্রশিক্ষণ, জীবন যাপনের পরিবেশ এবং অন্যদের অযথার্থ হস্তক্ষেপ ইত্যিাদি। কিন্তু লেখকের মতে, অভ্যন্তরীণ অসমঝোতা ও মতপার্থক্যের সর্বাধিক বড় কারণ হচ্ছে: দাম্পত্য জীবনের দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে স্বামী-স্ত্রীর অপরিচিতি এবং যৌথ জীবন সৃষ্টির নিমিত্তে অপ্রস্তুতি। যে কোনো দায়িত্ব গ্রহণ ও যে কোনো কাজ বাস্তবায়নের জন্যে পরিচিতি ও প্রস্তুতি হচ্ছে মৌলিক শর্ত। কারও যথেষ্ট তথ্য ও প্রাক প্রস্তুতি না থাকলে, কোনো কাজই কাঙ্খিত রূপে বাস্তবায়ন করতে পারবেন না। এই প্রেক্ষাপট হতেই, প্রত্যেক দায়িত্বের দায়িত্বশীলতার জন্যে ব্যবহারিক ক্লাস রাখা হয়।

      দাম্পত্য যৌথ জীবনের জন্যেও অভিজ্ঞতা, প্রস্তুতি ও যথেষ্ট তথ্যের প্রয়োজন রয়েছে। পুরুষকে অবশ্যই তার স্ত্রীর চিন্তা-ভাবনা ও তার অভ্যন্তরীণ চাহিদাসমূহের ধরন, দাম্পত্য জীবনের সমস্যাদী এবং সেসবের মুখোমুখি ও সমাধানের পদ্ধতি, সামাজিক শিষ্টার প্রভৃতি সম্পর্কে যথেষ্ট তথ্য রাখতে হবে। তাকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যে, স্ত্রী গ্রহণের অর্থ দ্রব্য ক্রয় কিংবা গৃহ পরিচারিকা গ্রহণ নয়, বরং এর অর্থ বিশ্বস্ততা রক্ষা, সত্যবাদিতা, ভালবাসা প্রদর্শন এবং পারিবারিক যৌথ জীবনে পারস্পরিক সহযোগিতা ও অংশ গ্রহণের চুক্তি স্বাক্ষর করা।

      স্ত্রীকেও স্বীয় স্বামীর চিন্তা-ভাবনা ও তার অভ্যন্তরীণ চাহিদাসমূহের ধরনের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে। আর তাকে অনুধাবন করতে হবে যে, স্বামী গ্রহণের অর্থ চাকর গ্রহণ ও নিঃশর্তভাবে অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও আকাঙ্খাসমূহ পূরণ নয়; বরং সহযোগিতা ও প্রচেষ্টার অংশীদারিত্বের চুক্তিপত্র স্বাক্ষর এবং এই পবিত্র উদ্দেশ্যে উপনীত হওয়ার জন্যে পারস্পরিক ক্ষমা, আত্মোৎসর্গ, সহযোগিতা ও সমঝোতার আবশ্যক রয়েছে।

      মানুষের বিধিলিপি নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিবাহ অপরিসীম ভূমিকা রাখা সত্ত্বেও এবং এই গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্যে আবশ্যক তথ্য ও আত্মিক-চারিত্রিক প্রস্তুতির প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও; দুঃখজনক যে, আমাদের সমাজ, জীবনের এই বিকাশমূলক গুরুত্ববহ বিষয়ের জন্যে শিথীলতা দেখায়। যৌতুক, মোহরানা এবং পিতা-মাতার ব্যক্তিত্ব ও সৌন্দর্যের প্রতি যতটা গুরুত্ব দেয়, ততটা স্ত্রী পরিচালনা ও স্বামীল দেখাশুনা এবং যৌথ জীবন বিনির্মাণের প্রস্তুতির প্রতি গুরুত্ব দেয় না। আর এ বিষয়গুলোকে শর্ত মনে করে না। কন্যাকে নিয়তির গৃহে প্রেরণ করছে, অথচ সে স্বামীর দেখাশুনা করা ও গৃহিনী হওয়ার কোনো নিয়ম-পদ্ধতি শিখে নি। ছেলের বিবাহ দিচ্ছে, অথচ সে স্ত্রী পরিচালনা ও পারিবারিক অভিভাবকত্ব সম্পর্কে কোনো তথ্যই রাখে না।

      স্বল্প তথ্য সমৃদ্ধ ও অভিজ্ঞতাহীন দুইজন যুবক-যুবতি একটি নতুন জীবনে প্রবেশ করছে। এই প্রেক্ষাপট হতে, প্রচুর সমস্যা সৃষ্টি হবে। বিভিন্ন মতানৈক্যতা, অসমঝোতা, রাগ ও তর্কবিতর্ক আরম্ভ হবে। পিতা-মাতার হস্তক্ষেপ যেহেতু বুদ্ধিমত্তা ও পরিকল্পিত নয়, সেহেতু কোনো সমস্যার সমাধান তো করবেই না, বরং মতানৈক্যকে আরও গভীরতর ও বদ্ধমূল করবে। বিবাহের প্রথম পর্বগুলো, একটি গোলযোগপূর্ণ ও সংকটপূর্ণ পর্ব। বহু পরিবারই, এই পর্বে পৃথক হয়ে যায়। তাদের অনেকেই আবার যৌথ জীবনের বাহ্যিক অবস্থা রক্ষা করার মাধ্যমে, জীবনের শেষ অবধি বাকবিতণ্ডা ও শক্তি পরীক্ষায় রূপ নেয়। কতক পরিবার কিছু সময় -অল্প কিংবা বিস্তর- পর, পারস্পরিক চরিত্র ও আচার-ব্যবহারের সঙ্গে পরিচিত হয় এবং তুলনামূলক আরাম ও সোয়াস্তি খুঁজে পায়।

      হায়, যেসব যুবক-যুবতি বিবাহ করার উদ্যোগ নিচ্ছে তাদের জন্যে যদি বিবাহের বিষয়বস্তু শিক্ষার ক্লাস অনুষ্ঠিত হত এবং তারা পারিবারিক যৌথ জীবনের জন্যে প্রস্তুত হত, অতঃপর বিবাহ করত!

      সামাজিক এই প্রয়োজনের দিকে লক্ষ্য রেখে এবং তার প্রয়োজন অনুভব করে লেখক এই বক্ষমান পুস্তকখানা লিখেছেন। এই পুস্তকে, দাম্পত্য জীবনের বিভিন্ন সমস্যা ও বিষয়বস্তু পর্যালোচিত হয়েছে এবং কুরআনুল করিমের আয়াত, রসুল (সা.) ও ইমামগণের হাদিস এবং সার্বজনীন পরিসংখ্যান ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাসমূহ ব্যবহারের মাধ্যমে আবশ্যিক জ্ঞাতব্য ও পথনির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

      লেখক এটি দাবি করছেন না যে, এই পুস্তক পাঠের মাধ্যমে, পারিবারিক সমস্ত সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। তবে আশা করেন যে, এই পুস্তক পঠন ও এর বিষয়সমূহকে কাজে প্রয়োগ করলে, বহু সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে পরিবারগুলোকে সাহায্য করবে। জ্ঞানী ও হিতাকাঙ্খীদের নিকট অপেক্ষা থাকছে যে, তারা এই বিষয়ের প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করতঃ দৃঢ়চিত্ত ও ফলপ্রসূ পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে, পরিবারগুলোকে নিদারুন মর্মপীড়া ও বিশৃঙ্খলা হতে মুক্তি দিবেন!

                                     ওয়াস্‌ সালামু আলাইকুম,

                                     ইবরাহিম আমিনি,

                                     কুম, ইরান।