বিশ্বব্যাপী ঐক্য সপ্তাহ-১ম পর্ব

বিশ্বব্যাপী মুসলমানরা এখন ঐক্য সপ্তাহ পালন করছে। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর শুভ জন্মদিন ঠিক কোনটি সে নিয়ে ঐতিহাসিকদের মাঝে কিছুটা মতপার্থক্য রয়েছে। কেউ বলছেন, ১২ই রবিউল আউয়াল হচ্ছে নবীজীর জন্মদিন। বিশেষ সুন্নি আলেমগণ এই মতে বিশ্বাস করেন। আবার কেউ কেউ মনে করেন ১৭ ই রবিউল আউয়াল নবী কারিম (সা) পৃথিবীতে এসেছিলেন। তো ১২ থেকে ১৭ তারিখের মধ্যে ব্যবধান খুবই কম। সেজন্যে বিতর্কের উর্ধ্বে উঠে এই কটা দিনকেই মতানৈক্যের বিপরীতে ঐক্যের সেতু বন্ধন রচনার আহ্বান জানিয়েছেন ইরানের ইসলামী বিপ্লবের রূপকার ইমাম খোমেনী (রহ)। সেই থেকে ইরানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ১২ ই রবিউল আউয়াল থেকে ১৭ই রবিউল আউয়ালকে ঐক্য সপ্তাহ হিসেবে পালন করা হচ্ছে।

তো এই ঐক্য সপ্তাহ উপলক্ষ্যে আপনাদের সবার প্রতি আন্তরিক সম্প্রীতিময় শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। আসলে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানব জাতিকে ঐক্যবদ্ধ জাতি এবং সমান মর্যাদাবান করে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। যেমনটি কবি ইকবাল বলেছিলেন-

আসলে হুজ্জাত এবং স্বত্ত্বাধিকার একই

আমাদের তাঁবুগুলো আলাদা যদিও অন্তরগুলো একই

আমরা যদিও হেজাজি, চীনী কিংবা ইরানী

আমরা হাস্যোজ্জ্বল প্রভাতের অভিন্ন শিশির

আল্লাহর কাছে মুসলমানের পরিচয় আলাদা আলাদা নয়। সেজন্যে তিনি বহুভাবে মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ থাকার কথা বলেছেন। মুসলমানদের সবাই এ ব্যাপারে নিশ্চিত হবার পরও আজকের বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যাবে মুসলমানদের মাঝে বিভাজন রয়েছে। এই বিভাজন যতোটা সম্ভব কাটিয়ে ওঠার জন্যেই ঐক্য সপ্তাহের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসলামী চিন্তাবিদ এবং উলামা মাশায়েখদের ব্যাপক চেষ্টা-প্রচেষ্টার ফলে মুসলমানদের মাঝে ঐক্যের বন্ধনটি কিছুটা মজবুত হয়ে উঠেছিল। কিন্তু ষড়যন্ত্রের জাল ব্যাপকভাবে বি¯তৃত হওয়ায় এখনো বিচ্ছিন্নতার ধ্বনি কানে বাজে। সেই ধ্বনি কানের ভেতর দিয়ে অন্তরে প্রবিষ্ট হয়ে বেদনার সৃষ্টি করে। গেল ক'সপ্তায় নিশ্চয়ই লক্ষ্য করে থাকবেন, ইরাক এবং পাকিস্তানে মুসলমানদের ভাইদের শহীদ করা হয়েছে। প্রতিহিংসা পরায়ন একদল সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠির হাতে তারা শহীদ হয়েছেন। এটা মুসলিম উম্মাহর সাথে খেয়ানত করা বৈ ত নয়। এর কিছুদিন আগেও আপনারা শুনে থাকবেন হয়তো, পাকিস্তানের একটি শোকানুষ্ঠানে সেদেশের ৭০ জন শিয়া মুসলমানকে শহীদ করা হয়েছে।

আসলে মুসলমানদের মাঝে সংহতি ও ঐক্যের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখতে পারে যে বিষয়টি তাহলো,রাসূলে খোদার সুন্নাত অর্থাৎ তাঁর কার্যক্রম ও কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করা। কেননা তিনি কোটি কোটি মুসলমানের অন্তরাত্মায় জ্বলজ্বলে সূর্যের আলোর মতো ঔজ্জ্বল্য ছড়ান। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে বিভিন্ন সময় মুসলমানদের মাঝে বিচ্ছিন্নতা রোধকল্পে নবীজীর ঐক্যগঠন প্রক্রিয়া বা পদ্ধতিকে কাজে লাগানো হয়েছে। এই পদ্ধতি বা নিদর্শন সুস্পষ্ট হবার পর অনৈক্য থাকা ঠিক নয়। যেমনটি পবিত্র কোরআনে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

"তোমরা তাদের মতো হয়ো না যাদের সামনে আল্লাহর সুস্পষ্ট নিদর্শন আসার পরও বিচ্ছিন্ন হয়েছিল এবং পরস্পরের মধ্যে মতানৈক্য সৃষ্টি করেছিল। ( সূরা আল-ইমরান,আয়াত : ১০৫)

ইসলামের নবী ( সা ) মদীনায় হিজরতের পর বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠির মাঝে চুক্তিপত্র করেন। সামাজিক ঐক্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এটা ছিল সে সময়কার খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা পদক্ষেপ বা কর্মকৌশল। নবীজীর প্রথম চুক্তিটি হয়েছিল মদীনার বিভিন্ন গোত্র ও জাতির সাথে। ঐ চুক্তিটিকে অনেকেই বিশ্বের সর্বপ্রথম লিখিত সংবিধান বলে মনে করেন। ধর্মীয় সংহতি এবং জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় এই পদক্ষেপ ছিল সবচেয়ে বেশি কার্যকর। কেননা এই চুক্তির ফলে দ্বন্দ্বপীড়িত গোত্রগুলোর মধ্যে সৃষ্ট ঐক্য মুসলমানদের সামাজিক অধিকারকে নিশ্চিত করেছিল এবং শাসন বা হুকুমাত প্রতিষ্ঠাসহ রাজনৈতিক সংহতি প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল।

মদীনায় রাসূলে খোদার গুরুত্বপূর্ণ একটি অবদান হলো মুসলমানদের মাঝে সামাজিক সম্পর্ক ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করা। এই ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্কের ফলে গোত্রগত বিভাজন চিন্তা দূর হয় এবং অভিন্ন ঈমানের ভিত্তিতে সামাজিক সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। রাসূলে খোদা (সা) মক্কা থেকে হিজরত করে আসা প্রত্যেক মুহাজিরের সাথে মদীনার একজন অধিবাসীর ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক সূত্র তৈরী করেন। এক্ষেত্রে ঐতিহাসিক একটি ঘটনা হলো ইমাম আলী (আ) কে নবীজী দুনিয়া এবং আখেরাতে নিজের ভাই বলে অভিহিত করেন। যাই হোক এই ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক সৃষ্টির বিষয়টি ছিল সামাজিক ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি কালজয়ী পদক্ষেপ। রাসূল (সা) মুসলিম উম্মাহকে হুশিয়ার করে দিয়ে বলেছিলেন-মানুষেরা! আমার কথা শুনুন! জানি না, এরপর হয়তো এখানে আপনাদেরকে আর না-ও দেখতে পারি! মানুষেরা! আপনাদের একজনের জান-মাল আরেকজনের জন্যে হারাম! জেনে রাখুন! প্রত্যেক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই এবং মুসলমানরা পরস্পর ভাই-ভাই!

এই ঘোষণার মধ্যেই ইসলামের মানদণ্ড প্রকাশ পায়। তা হলো,গোত্র কিংবা বংশ নয় ভ্রাতৃত্বের বন্ধনটি নির্ভর করে ঈমানের ওপর। শ্বাশ্বত এই সত্যটিকে কাজে লাগিয়ে আজো কি সামাজিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা যায় না! নবীজী মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের জন্যে সকল প্রকার অন্যায়-বৈষম্য,গোত্র ও বংশপ্রীতির নেতিবাচকতা তুলে ধরেছেন। জাহেলি জুলুম ও মূল্যবোধগুলোকে রহিত করে বিভিন্ন গোত্র ও বংশের লোকজনকে তৌহিদের পথে আহ্বান জানিয়ে বা নতুন দ্বীনের মাঝে দাওয়াত দিয়ে সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। এই সাম্য প্রতিষ্ঠা ও বংশগত বৈষম্য দূর করে তিনি যায়েদ বিন হারেসার মতো ব্যক্তিকে ইসলামের সেনা কমান্ডার বানিয়েছেন। কৃষ্ণাঙ্গ দাস বেলাল হাবশি'কে বিশেষ মুয়াজ্জিন বানালেন এবং ইরানের অধিবাসী সালমান ফারসি'কে সম্মানিত করেছেন। এভাবেই তিনি বিদ্যমান সামাজিক অন্যায় মূল্যবোধ ও বৈষম্যগুলোকে দূর করে নতুন এক সামাজিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করেন।

আজকের পৃথিবীতে আমরা মুসলমান হিসেবে গর্বিত যে হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর মতো ইসলামের শ্রেষ্ঠনবীর উম্মাত আমরা। সেইসাথে দুঃখিত এবং উদ্বিগ্ন এ কারণে যে,মুসলিম উম্মাহর মাঝে এখন যেরকম বিচ্ছিন্নতা আর বিভাজন লক্ষ্য করা যাচ্ছে,তাতে নাজানি নবীজী কতোটা ব্যথিত। তাই আমাদের উচিত নবীজীর কর্মসূচি,তাঁর দিক-দর্শন এবং কোরআনের শিক্ষার আলোকে পুনরায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা পুনপ্রতিষ্ঠা করা। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর এবং বিশিষ্ট চিকিৎসক ওবায়েদ রাহমানীর একটি উদ্ধৃতি দিয়ে শেষ করবো আজকের আলোচনা।

ওবায়েদ রাহমানী বলেছেন-মুসলমানদের মাঝে শক্তিশালী ঐক্য গড়ে তোলার জন্যে বিশেষ করে শিয়া এবং সুন্নিদের মাঝে ঐক্য আরো মজবুত করার জন্যে উভয় পক্ষকেই যথার্থ এবং যৌক্তিক চিন্তা করতে হবে। সকল মুসলমানকে তথা সামগ্রিকভাবে সকল মানুষকে বিশেষ কোনো কায়দায় বা কোনো চিন্তাদর্শ কিংবা নীতির আদলে ফেলে তাদের মাঝে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করে ফেলার ধারণাটা অযৌক্তিক। এই সুন্নি ডাক্তার আরো বলেছেন-সকল মুসলমান চাই শিয়া কিংবা সুন্নি,সবার উচিত সর্বপ্রকার মতপার্থক্য পরিহার করে সুচিন্তিত ও যৌক্তিক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করা এবং উদার চিন্তা ও মন-মানসিকতা নিয়ে আলোচনা করা। সম্প্রতি বিভিন্ন মুসলিম দেশে ধর্মীয় এবং মাযহাবগত যে সংকট দেখা দিয়েছে, তার কারণ সুচিন্তার অভাব এবং যথার্থ যুক্তিহীনতা। তাই মুসলমানদের মাঝে বাস্তব ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্যে এখন প্রয়োজন নবীজীর সিরাতের দিকে ফিরে যাওয়া। আল্লাহ আমাদেরকে সেই তৌফিক দিন। আমিন!