বিয়ের উদ্দেশ্যসমূহ

বিয়ে হচ্ছে প্রত্যেক মানুষের প্রাকৃতিক প্রয়োজন। এর বহুবিধ গুরুত্বপূর্ণ উপকার ও ভূমিকা রয়েছে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে:

১। পেরেশানি ও আশ্রয়হীনতা হতে মুক্তি

যে মানুষ বিয়ে-শাদি করেন নি, তিনি হচ্ছেন নীড়বিহীন কবুতরের মত। তিনি বিয়ে-শাদির মাধ্যমে নিজের গৃহ, নীড় ও আশ্রয়স্থল খুঁজে পান। তিনি জীবনের একজন সঙ্গিনী, সহচরী, গোপনভেদের রক্ষাকারিনী, সমব্যথিনী, প্রতিরক্ষাকারিনী এবং সহযোগিনী লাভ করেন।

২। জৈবিক চাহিদার সন্তুষ্টি লাভ

মানব সত্তার মাঝে জৈবিক চাহিদা, একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও মূল্যবান সহজাত প্রবণতা। এ কারণে, প্রত্যেক মহিলার জন্য এমন একজন ব্যক্তি ও স্বামীর প্রয়োজন রয়েছে যার কাছ থেকে একটি নিরাপদ ও শান্ত পরিবেশে, প্রয়োজনীয় মুহূর্তে উপকৃত হবেন ও স্বাদ উপভোগ করবেন। লিঙ্গগত সহজাত প্রবণতার সঠিক সন্তুষ্টি একটি প্রাকৃতিক প্রয়োজন এবং তার ডাকে স্বারা দেয়া জরুরি। অন্যথা শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক নেতিবাচক ফলাফল নিজের উপর পরতে পারে। যারা বিয়ে-শাদি করতে অস্বীকৃতি জানান তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানসিক ও শারীরিক বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকেন।

৩। বংশধরের ধারাবাহিকতা রক্ষা

বিয়ে-শাদির ফলে সন্তান-সন্ততির জন্ম হয় যা পারিবারিক ভিত্তি সুদৃঢ় এবং স্বামী-স্ত্রীর প্রশান্তি ও মনোরঞ্জনের কারণ হয়। এ কারণেই কুরআন ও হাদিসে বিয়ে-শাদির ব্যাপারে বহুবিধ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

মহান আল্লাহ কুরআনে বলছেন:

«وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِّتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِّقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ»

‘তোমাদের মাঝ হতেই তোমাদের জন্যে তিনি যুগোল সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমরা তাদের সহিত সখ্যতা গড়তে পার এবং মানসিক প্রশান্তি পেতে পার। আর তিনি তোমাদের পরস্পরের মাঝে ভালবাসা ও দয়া স্থাপন করেছেন। নিশ্চয় এ বিষয়ের মাঝে চিন্তাবিদদের জন্যে একাধিক নিদর্শন বিদ্যমান রয়েছে।’ (সূরা রূম, আয়াত নং ২১)

ইসলামের সম্মানিত নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া লিহি বলেন: ইসলামে এমন কোনো ভিত্তিই প্রতিষ্ঠিত হয় নি যা বিবাহ হতে শ্রেয়তর হয়।

অপর এক স্থানে তিনি বলেন: যে কেউই আমার সুন্নতের অনুসরণ করতে চাইলে তাকে অবশ্যই বিবাহ করতে হবে। বিবাহের মাধ্যমে সন্তান জন্মদান করবে (এবং মুসলমানদের সংখ্যার বৃদ্ধি ঘটাবে) যাতে আমি কিয়ামত দিবসে তোমাদের আধিক্যতার মাধ্যমে অপর উম্মতদের উপর গর্ব  করতে পারি।

আমিরুল মোমেনিন (আ.) বলেন: তোমরা বিবাহ কর, কেননা তা আল্লাহর রসুলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া লিহি) সুন্নত।

ইমাম রেজা (আ.) বলেন: কেউই এমন কোনো উপকারই অর্জন করতে পারে না যা উপযুক্ত স্ত্রী থেকে শ্রেয়তর হতে পারে। একজন উপযুক্ত স্ত্রী এমন যে, যখন তার দিকে তার স্বামী দৃষ্টি দিবে তখন আনন্দিত হবে এবং স্বামীর অনুপস্থিতিতে নিজেকে ও স্বামীর অর্থকে সংরক্ষণ করবে।

আমরা এ যাবৎ যা কিছু আলোচনা করলাম তা হল বিবাহের বস্তুগত ও পশুসুলভ অবদান ও উপকার। কেননা পশুরাও এই উপকারগুলোর অনেকগুলো দ্বারা উপকৃত হয়ে থাকে। এই ধরনের উপকারসমূহকে, মানুষ হওয়ার দৃষ্টিকোণ হতে মানুষের বিবাহের প্রকৃত উদ্দেশ্য বলা যেতে পারে না। মানুষ এই উদ্দেশ্যে পৃথিবীতে আসে নি যে, সে কিছু সময় যাবৎ পানাহার করবে, ঘুমাবে এবং যৌন কামনা চরিতার্থ করবে ও স্বাদ উপভোগ করবে; অতঃপর মৃত্যুবরণ করতঃ নিশ্চিহ্ণ হয়ে যাবে। মানুষের পদমর্যাদা, এসব বিষয়ের অনেক উর্ধে। মানুষ আগমন করেছে যাতে জ্ঞান, সৎকর্ম ও উত্তম চরিত্রের মাধ্যমে স্বীয় আত্মাকে লালন-পালন করবেন এবং মনুষত্বের পূর্ণতা ও সঠিক পথের পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন যাতে বিশ্বের প্রতিপালকের নৈকট্য অর্জন করতে পারেন। মানুষ এমনই এক সত্তা যিনি আত্মার পরিশুদ্ধতা ও সংশোধন, চারিত্রিক শ্রেষ্ঠত্ব ও উন্নত নৈতিক গুণাবলী অর্জনের মাধ্যমে এবং খারাপ আচরণসমূহ হতে বিরত থেকে এমনই এক উচ্চ স্তরে আসিন হবেন যে, ফেরেস্তারাও সেই স্তরে পৌঁছতে পারেন না। মানুষ চিরন্তন এক সত্তা, আর এ জগতে এসেছেন যাতে নবিগণের পথনির্দেশনার মাধ্যমে এবং ধর্মীয় আইন-কানুন ও কর্মসূচী বাস্তবায়নের মাধ্যমে নিজের ইহকাল ও পরকালের কল্যাণ নিশ্চিত করেন এবং পরজগতে স্রষ্টার পাশে চিরন্তন আনন্দ ও আরামে জীবন যাপন করেন।

সুতরাং, মানুষের বিবাহের প্রকৃত উদ্দেশ্যকে এই কর্মসূচির মধ্যে অনুসন্ধান করা উচিত। একজন ধার্মিক লোকের বিবাহের উদ্দেশ্য এই হওয়া উচিত যে, তিনি স্বীয় স্ত্রীর সাহায্য ও সহযোগিতায় নিজ আত্মাকে পাপ, খারাপ কাজ ও কুচরিত্র হতে বিরত রাখবেন এবং সৎকর্ম ও উন্নত নৈতিক গুণাবলী দ্বারা লালন-পালন করবেন যাতে মানবতা ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের উচ্চ পর্যায়ে আসিন হতে পারেন। এ কারণে, এরূপ গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্যে উপনীত হওয়ার জন্যে একজন উপযুক্ত ও ভাল স্ত্রী থাকা জরুরি।

দুইজন মোমিন ব্যক্তি যারা বিবাহের মাধ্যমে পরিবার গঠন করেন তারা সখ্যতা, প্রেম-ভালবাসা, প্রশান্তি ও বৈধ জৈবিক চাহিদা পুরণ করে থাকেন। ফলে বিচ্যুতি, অবৈধ কামোপভোগ, পাপাচার ও বিপদজনক মাদকাসক্তের কেন্দ্রসমূহে গমন, ভবঘুরেমি ও ধ্বংসকারী নৈশ গল্পগুজবের আসর হতে নিরাপদে থাকবেন। এ কারণেই, সম্মানিত রসুল ও পবিত্র ইমামগণ (আ.) বিবাহের ব্যাপারে ব্যাপক গুরুত্বারোপ করেছেন।

আল্লাহর রসুল (সা.) বলেন: ‘কেউ বিবাহ করলে সে যেন নিজের অর্ধেক ধর্মকে রক্ষা করল।’ 

ইমাম সাদেক (আ.) বলেন: ‘অবিবাহিত লোকের সত্তর রাকাত নামাজের চেয়ে বিবাহিত লোকের দুই রাকাত নামাজই উত্তম।’

ধার্মিক ও সফল স্ত্রীর উপস্থিতি, দায়িত্ব বাস্তবায়ন, ওয়াজিব ও মুস্তাহাব অনুসারে আমল, হারাম ও মকরুসমূহ পরিত্যাগ, উন্নত নৈতিক গুণাবলী দ্বারা সজ্জিত হওয়া এবং দুশ্চরিত্র হতে বিরত থাকার ক্ষেত্রে  অতিব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যদি স্বামী ও স্ত্রী উভয়েই ধার্মিক হন এবং প্রতিপালন ও আত্মার পরিশুদ্ধতার ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণ করেন, তাহলে এই দুরূহ পথ অতিক্রমের ক্ষেত্রে পরস্পরের সহযোগী ও উৎসাহদাতা হয়ে থাকবেন। আল্লাহর পথের একজন মুজাহিদ কি নিজ স্ত্রীর অনুমোদন ও সম্মতি ছাড়া যুদ্ধের ময়দানে ভালভাবে যুদ্ধ করতে ও বিপ্লব সৃষ্টি করতে পারবেন? মানুষ কি নিজ স্ত্রীর সম্মতি ছাড়া আয়-উপার্জন, জীবিকা অর্জন, শরয়ি ও চারিত্রিক যাবতীয় বিষয়কে মেনে চলতে পারবেন? আর্থিক ওয়াজিব অধিকার প্রদান করতে পারবেন? অপব্যয় ও অপচয় হতে বিরত থেকে স্বীয় জরুরি খরচপাতির অতিরিক্ত অংশকে জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করতে পারবেন?

ধার্মিক ও মোমিন ব্যক্তি নিজ স্ত্রীকে কল্যাণ ও সংশোধনের প্রতি আহ্বান জানান। আর বেপরওয়া ও দুশ্চরিত্রবান লোক নিজ স্ত্রীকে পাপাচার ও দুশ্চরিত্রের প্রতি টানে এবং মানবতার পবিত্র উদ্দেশ্য হতে দূরীভূত করে। এ কারণে, স্বামী ও স্ত্রীর প্রতি গুরুত্ব সহকারে বলা হয়েছে যে, তারা যেন যুগোল নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিবাহের সময় ইমান, ধার্মিকতা ও চরিত্রকে মৌলিক শর্ত নির্ধারণ করেন।

ইসলামের সম্মানিত নবি (সা.) বলেন: মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি কোনো মুসলমান লোকের জন্যে দুনিয়া ও আখেরাতের যাবতীয় কল্যাণকে একত্রিত করতে চাইলে, তাকে একটি বিনয়ী অন্তর, একটি স্মরণকারী জিহ্বা এবং বিপদ-আপদে ধৈর্য ধারণকারী একখানা দেহ দান করি। আর এমন একজন মোমেন স্ত্রী তাকে দান করি, যাকে সে দেখলেই আনন্দিত হয় এবং স্বামীর অনুপস্থিতিতে তার মাল ও নিজের আত্মার সংরক্ষণ করে।’

জনৈক লোক আল্লাহর রসুলকে (সা.) সবিনয়ে বললেন: ‘আমার একজন স্ত্রী রয়েছে, আমি গৃহে প্রবেশকালে সে আমাকে স্বাগত জানাতে এগিয়ে আসে, আর আমি গৃহ হতে বাইরে যাবার কালে সে আমাকে বিদায়সম্ভাষণ জানায়। আমাকে দুঃখভারাক্রান্ত দেখলে সে আমার মনোরঞ্জনের জন্যে বলে, ‘তুমি যদি খাদ্য ও আহারের জন্যে চিন্তা-ভাবনা কর, তাহলে বিষণ্ন হয়ো না! কেননা, আল্লাহ হচ্ছেন আহারের দায়িত্বশীল। আর যদি পরকালের চিন্তা-ভাবনা কর, তাহলে আল্লাহ যেন তোমার চিন্তা-ভাবনা ও গুরুত্বারোপকে আরও অধিক করেন!’ তখন আল্লাহর রসুল (সা.) বললেন: ‘এই পৃথিবীতে মহান আল্লাহর প্রতিনিধি ও কর্মীবৃন্দ রয়েছেন; আর এই নারী হচ্ছেন আল্লাহর সেই কর্মীবৃন্দের সদস্য। এই ধরনের স্ত্রীই একজন শহিদের অর্ধেক বিনিময় পাবেন।’

আমিরুল মোমেনিনেরও (আ.) এরূপ মহৎ উদ্দেশ্য দৃষ্টিতে ছিল। কেননা তিনি হজরত জাহরার (আ.) বিষয়ে বলেন: ‘সে আল্লাহর আনুগত্যের পথে আমার জন্য সর্বোত্তম সাহায্যকারিনী।’

ইতিহাসে এরূপ এসেছে যে, হজরত আলি ও হজরত জাহরার (আ.) বিবাহ উৎসবের পরের দিন আল্লাহর রসুল (সা.) তাঁদেরকে মোবারকবাদ দেয়ার জন্যে ও হাল-হকিকত জিজ্ঞাসা করার জন্যে তাঁদের গৃহে গমন করেন। হজরত আলিকে (আ.) জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তোমার স্ত্রীর ব্যবহার কেমন দেখলে?’ তিনি বললেন: ‘আল্লাহর আনুগত্যের ক্ষেত্রে হজরত জাহ্‌রাকে সর্বোত্তম সহযোগিনী হিসেবে পেয়েছি।’ অতঃপর তিনি (সা.) হজরত জাহ্‌রাকে জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তোমার স্বামীর ব্যবহার কেমন দেখলে?’ তিনি বললেন: ‘সর্বোত্তম সাহায্যকারী।

আমিরুল মোমেনিন (আ.) এই ছোট বাক্যটিতে, একদিকে উপযুক্ত স্ত্রী ও ইসলামের দৃষ্টান্তকে পরিচিত করিয়েছেন এবং অপরদিকে বিবাহের মৌলিক ও প্রকৃত উদ্দেশ্যকে বর্ণনা করেছেন।