মহররম মাস ও ইমাম হুসাইন (আ.)

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

মহররম মাস ও ইমাম হুসাইন (আ.)

আলহাজ্জ ডক্টর মো. সামিউল হক

ভূমিকা

সারা বিশ্বের সকল মুসলমানই মহররম মাসের ইতিহাস সম্পর্কে কম-বেশি অবগত আছেন। ইসলামের ইতিহাসে কারবালার ঘটনার চেয়ে বড় কোন হৃদয়বিদারক ঘটনা ও মুসিবত রয়েছে বলে আমার জানা নেই। আর তাই কোন এক  মনীষী প্রশ্ন করেছেন :

Is there any event in the history of Islam more than the martyrdom of Karbala?

আশুরা দিবসের যিয়াতেও বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে, আর তা এরূপ:

يا ابا عبد الله لقد عظمتِ الرزيّة، و جلّت وعظمت المصيبة بك علينا و علی جميع أهل الاسلام و جلت و عظمت مصيبتك في السماواتِ علی جميع أهل السماوات.

 

‚হে আবা আব্দিল্লাহ নিঃসন্দেহে (সমগ্র বিশ্বে) আপনার শোক-ক্রন্দন ব্যাপক আকার ধারণ করেছে এবং আপনার উপর পতিত মুসীবত আমাদের কাছে এবং সমূদয় মুসলিম উম্মাহর কাছে অতি কষ্টদায়ক ও শোকাবহ হয়েছে। এমনকি তা আকাশসমূহ এবং সমগ্র আকাশবাসীদের কাছেও ব্যাপক আকার ও অতি কষ্টকর শোকাবহ এবং বেদনাদায়ক হয়েছে।“

মধ্যপ্রাচ্যের ইরান, ইরাক, কুয়েত, বাহরাইন, তুরস্ক, লেবানন,  ইয়েমেন, আজারবাইজান, তাজিকিস্তান, পাকিস্তান আফগানিস্তানসহ অনেক দেশেই পহেলা মহররম থেকেই শোকনষ্ঠান শুরু হয় এবং বিরতিহীনভাবে তা ১০ই মহররম পর্যন্ত চলতে থাকে। এ কারণে অনেক দেশেই ৯ম ও ১০ই মহররম জাতীয় শোক দিবস ও সরকারী ছুটি থাকে। ভারত ও বাংলাদেশসহ অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোতে ১০ই মহররম জাতীয় শোক দিবস ও সরকারী ছুটি থাকে।

আমার দেখা আশুরা[1]

মূল আলোচনা শুরু করার আগে এ দু’বছরে আশুরার দিনে আমার দেখা কয়েকটি ঘটনা পর্যালোচনা করার জন্য পাঠক মহলকে আবেদন করছি। গত বছর ও এ বছর মহররম মাসে আমি বাংলাদেশে ছিলাম। কারবালার হৃদয়বিদারক ঘটনাকে স্মরণ করে আশুরার পূর্ব রাতে কাপাসিয়াতে প্রতিবছর একটি ওয়াজ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত মাহফিলে ওয়াজ করার জন্য উক্ত দু’বছরই আমাকে দাওয়াত দেয়া হয়েছিল।

ওয়াজ মাহফিল অনেক রাতে শেষ হবার কারণে সে রাতে আমি নিজ বাড়িতে ফিরতে পারি নি। তাই পরের দিন অর্থাৎ আশুরার দিন সেখান থেকে বাড়িতে ফিরেছি। প্রথম বছর ফেরার পথে টোক বাস স্টান্ডের কাছা-কাছি আসতেই মাইকের আওয়াজ শুনতে পেলাম। আমার নিশ্চিত মনে হয়েছিল যে, সেখানে কারবালার শোকাবহ ঘটনাই আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু যতই কাছে যেতে লাগলাম মাইকের শব্দে কোন শোকের ছায়া দেখতে পেলাম না; বরং আনন্দানুষ্ঠানের শব্দের মত মনে হল। কাছে গিয়ে দেখলাম : সেখানে একজন ঔষধ বিক্রেতা আকর্ষণীয় কণ্ঠে গান গেয়ে বাজারে উপস্থিত লোকদেরকে জড় করছে, তার ঔষধ বিক্রি করার জন্য।

বাস আসতে দেরি হচ্ছিল এবং আমার সাথের কয়েকজন সঙ্গী সেখানের গ্রাম্য বাজার থেকে কিছু কেনা-কাটা করছিল। এ কারণে আমাকে প্রায় ৩০ মিনিট সেখানে অবস্থান করতে হয়েছিল এবং বাধ্য হয়েই ঐ ঔষধ বিক্রেতার গান শুনছিলাম। ঔষধ বিক্রেতার মত ভ্রাম্য ব্যবসায়ীরা কিরূপ গান গাইতে পারে তা আপনাদের সকলেরই ভালভাবে জানা আছে। আমার কাছে ঐ সময়টা খুবই বিরক্তি ভাব লাগছিল। চেয়েছিলাম কাছে গিয়ে ঔষধ বিক্রেতাকে এমন কিছু বলি : যাতে সে তার কথায় অন্তত পক্ষে দু’একটি কারবালার শোকাবহ ঘটনা তুলে ধরে। কিন্তু আমার সঙ্গীগণ আমাকে বাধা দিয়ে বললেন : কামারের বাড়িতে কি ওয়াজের শব্দ শোনা যায়? তাকে এরূপ উপদেশ দিয়ে লাভ হবে না। আর তাই তাকে কিছু না বলেই বাসে উঠে গেলাম।

ইমাম হোসাইনের(আ.) ভালবাসা প্রত্যেক মানুষের হৃদয়ে

পাক পাঞ্জাতনের সদস্য হবার কারণে ইমাম হোসাইনের ভালবাসা প্রত্যেক মুসলমানের অন্তরে সুপ্ত রয়েছে। আর ইমাম হোসাইনের কালজয়ী বিপ্লব থেকে শিক্ষা নিয়ে বিশ্বের অনেক অমুসলিম নেতারাও তাদের রাজনীতিতে সফল হয়েছেন। ভারতের জাতির পিতা মহাত্বা গান্ধি বলেছিলেন : এহেন বিপ্লবের শিক্ষা আমি ইমাম হোসাইনের কাছ থেকে পেয়েছি।[2]  

আপামর মুসলমানদের অন্তরে ইমাম হোসাইনের (আ.) ভালবাসা সুপ্ত থাকলেও কিভাবে তা প্রকাশ করতে হবে, তার ভাল পদ্ধতি সবার কাছে জানা নেই; এ কারণে তা প্রকাশের ধরন ও প্রকৃতি বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে এবং তাই বিভিন্ন স্থানে নানাভাবে আশুরা পালিত হয়ে থাকে; কোথাও হয়তো খিচুরি বিতরণ করে, আবার কোথাও শোকের গানের সভা করে, আবার কোথাও সিম্পোজিয়াম ও সেমিনার করে। তবে সিম্পোজিয়াম, সেমিনার ও আলোচনা সভায় অংশগ্রহণ করে যতটুকু আশুরা বিপ্লব থেকে শিক্ষা নেয়া সম্ভব, তা অন্যকোনভাবে সম্ভব নয়। মহররম মাসে ইমাম হোসাইন ও তার কালজয়ী বিপ্লবের শিক্ষা সংক্রান্ত আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা আমাদের সবারই কর্তব্য।

আশুরার দিন পালনে যুব সমাজকে উৎসাহিত করা

আমার নিজ এলাকার স্থানীয় যুবক মহল প্রতি বছর আশুরার দিন কারবালার শোকাবহ ঘটনা স্মরণ করে খিচুরি বিতরণ করে থাকে। গত বছর আমি তাদেরকে বলেছিলাম : আপনারাতো প্রতি বছর আশুরার দিনে ইমাম হোসাইনের (আ.) নামে খিচুরি বিতরণ করে থাকেন, আসুন এবার আমরা সবাই মিলে কারবালার শোকাবহ ঘটনাকে স্মরণ করে একটি আলোচনা অনুষ্ঠান এবং মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করি। তারা সবাই আমার কথায় সারা দিলেন। আমি কাপাসিয় থেকে ফিরে এসে দেখি যে, তারা এলাকার তিন রাস্তার মোড়ে স্টেজ করে সেখানে সারা দিন মাইকে কোরআন খতম করিয়েছেন। ঐ দিন মাগরিব নামাযের পর সেখানে আলোচনা শুরু হয়। কয়েকজন লোকের বক্তব্যের পর আমি সেখানে কারবালার শোকাবহ ঘটনা ও ইমাম হোসাইনের ফজিলত সম্পর্কিত কয়েকটি হাদিস বর্ণনা করেছিলাম। আমার আলোচনা শোনার জন্য স্থানীয় লোকজন ও অনেক পথচারী সমবেত হয়েছিলেন । তাদের অন্তরে তখন নবী বংশের মর্মান্তিক শোকের ছায়া পড়েছিল এবং তা তাদের চেহারায় অনুভুত হচ্ছিল।

আশুরার শিক্ষা থেকে বিচ্যুতি

আমার বক্তব্যের পর মিলাদ মাহফিল পরিচালনা করার জন্য স্থানীয় মসজিদের ইমামকে দাওয়াত করা হয়েছিল। মুসিবত ও শোকাবহ ঘটনার পরিবর্তে ইমাম সাহেব মিলাদের পূর্ব মূহুর্তে প্রায় ১০ মিনিট যাবৎ মহররম মাস ও আশুরার ফজিলত সম্পর্কে বয়ান রাখেন। হযরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে তার পরবর্তী অনেক নবী রাসূলদের ফজিলত লাভ ও মুক্তি পাবার ঘটনা তিনি তার আলোচনায় তুলে ধরলেন। তার মধ্যে কয়েকটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করছি :

  1.  আশুরার দিনে আল্লাহ তায়ালা হযরত আদম (আ.) ’র দোয়া কবুল করেছিলেন।
  2.  আল্লাহ তায়ালা হযরত ইউনুস (আ.) ’কে এ দিনেই মাছের পেট থেকে উদ্ধার করেছিলেন।
  3.  সেদিন হযরত নূহ (আ.) ’র কিস্তি জুদ পর্বতে স্থিরভাবে দাঁড়িয়েছিল।
  4.  হযরত মুসা (আ.) যখন বণি ইসরাইলকে নিয়ে ফেরাউনের রাজ্য থেকে চলে যাচ্ছিল, এক সময় তারা নীলনদের মুখোমুখি হয়েছিলেন  আর তাদের পেছনে ফেরাউন তার সৈন্য-সামন্ত নিয়ে ধাওয়া করছিল। ঐ দিনটি আশুরার দিন ছিল এবং আল্লাহ তায়ালা সেদিন নদীকে পৃথক করে রাস্তা তৈরি করেছিলেন এবং মুসা (আ.) তাঁর সঙ্গী-সাথীসহ তার উপর দিয়ে নীলনদ পার হয়েছিলেন।

এরূপ বর্ণনা শুধু তার মুখ থেকেই শোনা যায় না। বরং বাংলাদেশের অনেক আলেম উলামার মুখ থেকেই অনুরূপ বর্ণনা শোনা যায়। এ বছর মহররমের ৭ তারিখ বাংলাদেশে শুক্রবার ছিল। সেদিন আমি জুমআর নামায পড়ার জন্য আমার এলাকার এক মসজিদে গিয়েছিলাম। জুমআর খোতবায় ইমাম সাহেবের মুখ থেকেও সেরূপ তথ্য শুনতে পেয়েছিলাম। তাদের এসব ফজিলতের কথা শুনলে মনে হবে যে মহররম মাসেই আল্লাহ তায়ালা সব বড় বড় নেয়ামত নাজিল করেছিলেন। তাদের কথা-বার্তার ধরণ ও বাচন ভঙ্গি থেকে বোঝা  যায় যে, ইমাম হোসাইন (আ.) ’সহ নবী বংশকে হত্যা করে এজিদ ও তার সৈন্য বাহিনী কোন অপরাধ করে নি, বরং ফজিলত লাভ করেছিল। এমনকি কোন এক মাওলানার ওয়াজে শুনেছিলাম : ইমাম হোসাইন (আ.) শহীদ হবেন, এটা আল্লাহর চাওয়া ছিল এবং এ ঘটনাটি মা ফাতেমার (সালা.) অভিসাপের ফসল।[3] যে ব্যক্তি বেহেশতী সরদারকে হত্যা করবে, সে ফজিলত লাভ করবে এবং বেহেশতে যাবে, এটা কি করে সম্ভব!?

কিন্ত এসব ফজিলতের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় তা অন্য তারিখে ঘটেছিল। দৃষ্টান্তস্বরূপ মেইসাম তাম্মার (আ.) ’র বর্ণনায় দেখা যায়[4] :

  1.  আল্লাহ তায়ালা হযরত আদম (আ.) ’র দোয়া জিল হজ্ব মাসে কবুল করেছিলেন।
  2.  আল্লাহ তায়ালা হযরত ইউনুস(আ.) ’কে যিলকদ মাসে মাছের পেট থেকে বের করেছিলেন।
  3.           ১৮ ই যিলহজ্বে হযরত নূহ (আ.) ’র কিস্তি জুদ পর্বতে স্থিরভাবে দ্বাড়িয়েছিল।
  4.  রবিউল আউয়াল মাসে আল্লাহ তায়ালা নীল নদীকে পৃথক করে রাস্তা তৈরি করেছিলেন এবং মুসা (আ.) তাঁর সঙ্গী-সাথীসহ নীলনদ পার হয়েছিলেন।

আহলে বাইতের ভক্তি ভালবাসা থেকে আলেম সমাজের গাফেলতির নমুনা

উপরোক্ত শ্রেণীর বিপরীতে আরেক শ্রেণীর আলেমকে দেখা যায় যে, পুরো মহররম মাস অতিক্রম হয়ে যায়, কিন্তু তাদের বক্তব্য বিবৃতিতে মহররম মাস ও কারবালার হৃদয় বিদারক ও শোকাবহ ঘটনার একটি তথ্যও বর্ণিত হয় না। এরূপ একটি উদারহরণ পাঠক সমাজের জন্য তুলে ধরছি :

এ বছর মহররম মাসের ৭ তারিখে গাজীপুর জেলার টঙ্গীস্থ এরশাদ নগরের ৫ নং ব্লক মসজিদ ময়দানে এক ওয়াজ মাহফিল ও হাফেজদেরকে পাগড়ি পরিধানের অনুষ্ঠান পরিচালিত হয়। তাতে সভাপতিত্ব করেন উক্ত মসজিদের পেশ ইমাম মরহু আমানুল্লাহ সাহেব; প্রধান অতিথি ছিলেন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও টঙ্গী পৌরসভার তৎকালীন চেয়ারম্যান এডভোকেট আজমত উল্লাহ খান সাহেব এবং দেশের অনেক খ্যাতিমান আলেম ওলামা সেখানে ওয়াজ করেন। ওয়াজ মাহফিল শুরু হয় বিকেল ৪ টায় এবং শেষ হয় রাত প্রায় ১১ টায়।

আমি আশায় বুক বেধেছিলাম যে, আজকে হয়তো আমার এলাকায় মহররম মাস ও ইমাম হোসাইন সম্পর্কে কিছু কথা ও বয়ান শুনতে পাব। তাই ওয়াজ মাহফিলের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ওয়াজ শুনেছি, এমনকি অনেক্ষণ আমি স্টেজের সামনে বসেছিলাম। কিন্তু যেহেতু পুরো বাজার ও এলাকার অনেক যায়গাতেই মাইক লাগানো ছিল, তাই সেখানে উপস্থিত না থেকেও ওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। বিকেল ৪ টা থেকে রাত ১০ টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত ওয়াজ শুনলাম। কিন্তু ততক্ষণে কোন একজন আলেমের মুখ থেকে একটি বাক্যও মহররম মাস ও ইমাম হোসাইন সম্পর্কে বের হয় নি। সে কারণে ব্যথিত ও ভগ্ন হৃদয়ে বাড়িতে ফিরছিলাম। এমন সময় দেখলাম কোরআনের সংখ্যা ও মুজেযা সম্পর্কিত একটি বিষয়ের আলোচনা অত্যন্ত সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছিল। আলোচনার যুক্তি দেখে মনে হচ্ছিল যে, এই বক্তা হয়তো অনেক বড় মাওলানা হবেন। তাই তার আলোচনা অত্যন্ত মনযোগ সহকারে শুনছিলাম।

বক্তব্যের শুরুতে তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে, পূর্বোক্ত আলেম উলামাদের ওয়াজ ও বক্তব্য খন্ডন করা আমার উদ্দেশ্য নয়, কিন্তু কোরআন হাদীস থেকে যুক্তিযুক্ত আলোচনা করা উচিত। তারপর তিনি কোরআনের সংখ্যা বিষয়ক মুজেযার বিভিন্ন দিক তিনি তুলে ধরেছিলেন। তার গলায় ওয়াজের মত শুর শোনা যাচ্ছিল না, কিন্তু তার বক্তব্যের ভাষা ও যুক্তি থেকে বোঝা যাচ্ছিল যে, তিনি হয়তো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামিক স্টাডিজের উপর উচ্চ ডিগ্রি লাভ করেছেন। আমি যেহেতু কোরআনের তাফসীর নিয়ে গবেষণা করি, তাই তার আলোচনার গুরুত্ব ভালভাবে অনুধাবন করতে পেরেছিলাম। ফলে তার বক্তব্যের প্রতি আমার মনযোগ আরো বৃদ্ধি পেলো। তার আলোচনায় কোন ভুল আমার কাছে ধরা পরে নি; তবে আরবী একটি শব্দের অর্থ তিনি সঠিক বলতে পারেন নি। তিনি আয়াত শব্দের অর্থ করে বলেছিলেন যে, আয়াতের অর্থ বাক্য। কিন্তু আপনারা আরবী বাংলা অভিধান খুললে দেখতে পাবেন যে, তার অর্থ হয় : চিহ্ন বা নিদর্শন। এ থেকে বুঝা গেল যে তিনি হয়তো আলেম নন বা ইসলামিক স্টাডিজের ছাত্র নন। কিন্তু তার যুক্তিযুক্ত আলোচনার প্রশংসা না করে পারছি না। পরে বুঝতে পেরেছিলাম যে, তিনি ছিলেন ওয়াজ মাহফিলের প্রধান অতিথি টঙ্গী পৌরসভার তৎকালীন চেয়ারম্যান এডভোকেট আজমত উল্লাহ খান সাহেব। আর কারো কারো মুখ থেকে শুনেছিলাম যে, তিনি বক্তব্যের শুরুতে মহররম মাসের তাৎপর্য্য সম্পর্কে কিছু বলেছিলেন। একজন রাজনীতিবিদ, এডভোকেট ও চেয়ারম্যানের কাছ থেকে এটুকুই অনেক বেশী।

গণযোগাযোগের ফলাফল ও সচেতনতা সৃষ্টি

পরের দিন আমি যখন বিষয়টি এলাকার গণ্য-মান্য লোকদের কাছে উত্থাপন করে বলছিলাম যে, মহররম মাসের ৭ তারিখে বিরাট এক ওয়াজ মাহফিল হল অথচ এক জন আলেমও কারবালা ও নবী বংশের উপর আপতিত মুসিবত ও ইসলামী ইতিহাসের সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা থেকে কিছু বললেন না। তখন অনেকেই স্বীকার করেছিলেন যে, সত্যিই তো এটা কেমন হল যে, মহররম মাসের ৭ তারিখে বিরাট এক ওয়াজ মাহফিল হল অথচ একটি বাক্যও ইমাম হোসাইন সম্পর্কে বলা হল না: যে মসজিদের ময়দানে সে ওয়াজ মাহফিলটি হয়েছিল, তার সভাপতি শ্রদ্ধেয় শিক্ষক শফি হুজুর বললেন, “সত্যিই দুঃখজনক ও আপত্তিকর যে, এমন একটা দিনে এত বড় ওয়াজ মাহফিল হল অথচ একটি বাক্যও ইমাম হোসাইন সম্পর্কে বলা হল না।”

তবে প্রতিটি যুগেই এমন কিছু আলেম উলামা নিশ্চয়ই থেকে থাকে যারা কারবালার হৃদয় বিদারক ও শোকাবহ ঘটনা তুলে ধরেন এবং তার মাধ্যমে ইমাম হুসাইন ও আওলাদে রাসূলের ভালবাসা মানুষের অন্তরে জাগিয়ে তুলেন। বাংলাদেশের এমনই একজন আলেম হাফেজ মাওলানা মোফাজ্জল হোসেন খান সাহেবের ওয়াজের কথা আমি কখনোই ভুলব না। তিনি মহররম মাসের ওয়াজে কারবালার হৃদয় বিদারক ও শোকাবহ ঘটনা তুলে ধরতে কুণ্ঠাবোধ করেন না। ইমাম হোসাইনের ভালবাসার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন : আমরা বেহেশতে যেতে চাইব অথচ বেহেশতের সর্দারকে ভালবাসব না এটা কি করে হয়? আল্লাহ তার হায়াত দারাজ করুন, আমিন।[5] আমি তার কথার সাথে সুর মিলিয়ে বলতে চাই : যদি ইমাম হোসাইনকে (আ.) ভালবাসি তাহলে কি এজিদকেও ভালবাসা সম্ভব? নিশ্চয়ই না। কারণ কোন বিবেকবান লোকই তার প্রিয়পাত্রকে এবং তার হত্যাকারীকে একই সাথে ভালবাসতে পারবেন না। আর এজিদকে যদি কোন মুমিন ব্যক্তি ভালবাসে, তার অর্থ দাড়াবে : তার দৃষ্টিতে এজিদও বেহেশতে যাবে। এখন প্রশ্ন: যে ব্যক্তির নির্দেশে বেহেশতের সর্দারকে হত্যা করা হল সে কি করে বেহেশতে যেতে পারে? আর যদি বেহেশতের সর্দারকে হত্যা করে বেহেশতে যাওয়া যায়, তাহলে দোজখ ভর্তি হবে কাদের দ্বারা? আল্লাহ তায়ালা যদি এজিদের মত লোককেও ক্ষমা করেন, তাহলে তিনি কেন দোজখ সৃষ্টি করেছেন? নিশ্চয়ই এজিদকে ক্ষমা করলে দোজখ সৃষ্টির অর্থ হয় না।   

এখন আমরা মূল আলোচনায় ফিরে আসছি:

কোরআন ও হাদীস মুসলমানদের দু’টি মূল সম্পদ

মুসলামানদের দুটি মূল সম্পদ কোরআন ও হাদীস। আর কোরআন বিকৃত করা কারো পক্ষেই সম্ভব না, কারণ আল্লাহ তায়ালা নিজেই কোরআন নাজিল করেছেন এবং তিনি নিজেই তা সংরক্ষণ করবেন। যেমন :

إِنَّا نحَْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَ إِنَّا لَهُ لحََافِظُونَ  وَ لَقَدْ أَرْسَلْنَا مِن قَبْلِكَ فىِ شِيَعِ الْأَوَّلِينَ

 

অর্থ : নিশ্চয়ই আমরা[6] ¯^qs এ কোরআন নাজিল করেছি এবং আমরাই তার সংরক্ষক। আর একইভাবে আমি আপনার পূর্বে প্রথম শ্রেণীর অনুসারীদের[7] মধ্যেও (রাসূল) প্রেরণ করেছি।[8]

কিন্তু ইসলামের ইতিহাসে যদি আমরা হাদীস সঙ্কলণের ইতিহাস পর্যালোচনা করি, তাহলে দেখতে পাব যে, আমাদের শেষ নবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মদ মুসত্মফা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম) ’র ওফাতের পর থেকে প্রায় এক শত বছর হাদীস লিপিবদ্ধ ও প্রচার করা নিষিদ্ধ ছিল। এ কারণে আমাদের কাছে আজকে যেসব হাদীস গ্রন্থ রয়েছে তার বড় একটা অংশ জাল হাদীস।[9] যে কারণে জাল হাদীসের মাঝে সহীহ হাদীস প্রায় হারিয়ে গেছে এবং বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের অনেক দেশেই জাল হাদীসের ছত্র ছায়ায় আহলে বাইতের (আ.) ফজিলত সংক্রান্ত সহীহ হাদীস খুজে পাওয়া যায় না। আর যদিও পাওয়া যায় তা শুধু আরবী খোৎবা বা গ্রন্থের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আল্লাহ তায়ালার মহান অনুগ্রহে শিয়া ও সুন্নি উভয় সমপ্রদায়ের মূল হাদীস গ্রন্থের বিরাট একটা অংশে এখনো সহীহ হাদীস পাওয়া যায়।

জুমআর খোতবা ও ইমাম হোসাই(আ.)

আর তাই বাংলাদেশসহ অনেক সুন্নি অধ্যুসিত মুসলিম দেশের জুমআর খোতবাতেও আহলে বাইতের প্রশংসা বাণী শুনতে পাওয়া যায়। জুমআর দ্বিতীয় খোতবায় বরাবরই বলা হয় :

الفاطمة سَیدة نساء اهل الجنة ... الحسن والحسین سیّدا شباب اهل الجنّة    

 

অর্থ : ফাতেমা বেহেশতী নারীদের সর্দার[10] ... আর হাসান ও হোসাইন বেহেশতী যুবকদের সর্দার।

এই প্রবন্ধটি যেহেতু ইমাম হোসাইন(আ.) সম্পর্কিত তাই আমাদের আলোচনা শুধু দ্বিতীয় হাদীসটির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখব।

সুনানে তিরমিযিতে হাদীসটি এভাবে বর্ণিত হয়েছে[11] :

حدثنا محمود بن غيلان أخبرنا أبو داود الحفرى عن سفيان عن يزيد بن أبى زياد عن أبن أبى نعم عن أبى سعيد قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : " الحسن والحسين سيدا شباب أهل الجنة " .

 

অনুবাদ : ... রাসূল বলেছেন : হাসান(আ.) ও হোসাইন(আ.) বেহেশতী যুবকদের সর্দার।

সুনানে ইবনে মাজাহতে হাদীসটি এভাবে বর্ণিত হয়েছে :

حدثنا محمد بن موسى الواسطي . ثنا المعلى بن عبد الرحمن . ثنا ابن أبى ذئب ، عن نافع ، عن ابن عمر ، قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم " الحسن والحسين سيدا شباب أهل الجنة . وأبوهما خير منهما" .

 

অনুবাদ : ... রাসূল সা. বলেছেন : হাসান ও হোসাইন আ. বেহেশতী যুবকদের সর্দার। আর তাদের পিতা তাদের চেয়েও উত্তম।[12]

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের অনুসারী পাক-ভারতের দেশগুলোতে জুমআর খোতবায় আহলে বাইতের প্রশংসা সমৃদ্ধ স্পষ্ট বাণী শোনা যায়। কিন্তু ওহাবী মতাবলম্বী আরব দেশগুলোতে আলেম ওলামাদের বক্তব্য বিবৃতি এমনকি জুমআর খোতবায় পর্যন্ত সেরূপ কথা শোনা যায় না। অথচ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত সিহাহ সিত্তার সব হাদীসকেই সহীহ হাদীস বলে স্বীকার করে থাকেন। আর তাই আমার এই আলোচনায় উক্ত হাদীসের মূল বর্ণনা সিহাহ সিত্তার দুটি গ্রন্থ থেকে উল্লেখ করেছি। অতএব হাদীসটি সহীহ হবার ব্যাপারে কোন সন্দেহের অবকাশ থাকে না।

উল্লেখিত হাদীসটি বাংলাদেশের প্রতিটি জুমআর খোতবায় বলা হয় আরবীতে। কিন্তু আমরা যারা বাংলা ভাষাভাষী তারা কয়জন আরবী বুঝি? আমাদের মধ্যকার প্রায় শতকরা ৯৫ ভাগ লোক অথবা প্রায় ৯৯ ভাগ লোকই আরবী বুঝি না। আর তাই জুমআর মূল দু’টি খোতবা আরবীতে বলা হলেও মূল খোতবার আগে তার বাংলা ব্যাখ্যা খতিব সাহেবগণ বাংলায় দিয়ে থাকেন। অথচ আমার জানা মতে আহলে বাইতের প্রশংসা তাদের সে ব্যাখ্যায় শোনা যায় না। সারা বছরতো দুরের কথা মহররম মাসেও আহলে বাইতের(আ.) প্রশংসা এমনকি ইমাম হোসাইনের(আ.) শান ও মর্যাদার কথা শুনতে পাওয়া যায় না।

স্থান, কাল ও পাত্র ভেদে বক্তব্য দেয়ার গুরুত্ব

নিঃসন্দেহে যদি স্থান, কাল ও পাত্র ভেদে বক্তব্য দেয়া না হয়, তবে তার গুরুত্ব ও মূল্য অনেক কমে যায়। কিন্তু জুমআর খোতবা কি সাধারণ কোন খোতবা বা বক্তব্যের চেয় কম গুরুত্বহীন? নিশ্চয়ই না। আর যদি জুমআর নামাযের থোতবার গুরুত্ব বেশি হয়ে থাকে, তাহলে আমাদের দেশের জুমআর নামাযের খতিবরা কেন মহররম মাসেও ইমাম হোসাইন ও নবী বংশ বা আওলাদে রাসূলের শান ও মর্যাদা বর্ণনা করেন না? পাঠক মহলের কাছে প্রশ্ন :

 এটা কি গাফেলতি?

 নাকি অজ্ঞতা?

 অথবা আহলে বাইতের সাথে হিংসার বশবর্তী হয়ে কি এরূপ কর হচ্ছে?

 নাকি ইমাম হোসাইনের(আ.) প্রশংসা করা হলে এজিদের ভাব-মূর্তি ড়্গুন্ন হবে?

আমরা যদি স্বীকার করি যে, ইমাম হাসান ও হোসাইন বেহেশতী যুবকদের সর্দার আর মা ফাতেম(আ.) বেহেশতী মহিলাদের সর্দা; তবে কেউ হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন : তাহলে বেহেশতী বৃদ্ধদের সর্দার কে হবে? কিন্তু বেহেশ্‌ত সম্পর্কে নুন্যতম জ্ঞান যার রয়েছে সে এরূপ প্রশ্ন করতে পারেন না। কারণ বেহেশতে কেউ বৃদ্ধ বা বৃদ্ধা থাকবেন না।

হাদীস জাল করার ইতিহাস ও আহলে বাইতের দুশমনি

হাদীসের ইতিহাসে দেখা যায় যে, হাদীস জালকারীগণ আহলে বাইতের(আ.) ফজিলতে বর্ণিত সব হাদীসকে তারা অন্যদের নামে চালাতে শুরু করেছিল। কিন্তু এই প্রবন্ধে আলোচিত হাদীসটি এতই মশহুর হয়ে গিয়েছিল যে, তা জাল করা সম্ভব ছিল না বা তা অন্য কারো নামে চালানো সম্ভব ছিল না। তাই এ হাদীসের মোকাবেলা না করে তার সাথে যোগ করে বলা হয়েছিল :

وفيه ان الحسن والحسين سيدا شباب اهل الجنة وان فاطمة سيدة نساء اهل الجنة و فلان سید شیخ اهل الجنة... و هکذا 

 

কিন্তু এরূপ হাদীস সাধারণ মানুষের কানে পৌঁছার সাথে সাথেই প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল এবং ধ্বণিত হচ্ছিল যে, সাহাবী ও তাবেঈনদের কাছ থেকে সারা জীবন শুনে আসছি যে, বেহেশতে কোন বৃদ্ধও থাকবে না এবং কোন শিশুও থাকবে না। বরং সেখাসে সবাই থাকবে যুবক ও যুবতী। আর তাই উক্ত হাদীসের বারতি সংযোজন বাদ দেয়া হয় এবং আজো আমাদের আলোচিত হাদীসটি সহীহভাবে আমাদের হাতে রয়েছে। ফলে প্রতি জুমআর খোতবায় আমরা তা শুনতে পাই।

এজিদী চক্রকে সমর্থন ও ইমাম হোসাইনের ভালবাসায় বৈপরীত্ব

এ বছর আমার এলাকায় মহররম মাসের এক থেকে ১০ তারিখ পর্যন্ত বিভিন্ন গোষ্ঠীর উদ্দোগে ইমাম হোসাইনের(আ.) শোকানুষ্ঠান পালিত হয়। আর ১০ তারিখে সারাদিন ব্যাপী ইমাম হোসাইনের মর্সিয়া ও জারিগান মাইকে প্রচারিত হয় এবং মাগরিবের নামাযের পর আশুরা দিবসের বিশেষ যিয়ারত ও আলোচনা অনুষ্ঠান পরিচালিত হয়। আমিসহ আরো এমন কয়েকজন লোক অনুষ্ঠানে আলোচনা রেখেছিলাম, যারা কারবালা ও ইমাম হোসাইনের(আ.) ইতিহাসের উপর গবেষণা করে আসছেন।

 আমাদের আলোচনা সকল উপস্থিত শ্রোতারা মনযোগ সহকারে শুনছিলেন, কিন্তু উপস্থিত এক বয়োবৃদ্ধ হাজি সাহেব আমাদের আলোচনার প্রেক্ষাপটে কিছু আলোচনা করার ইচ্ছা প্রকাশ করছিল। তাই সভার উপস্থাপক আমাদের বক্তব্যের শেষে তাকে ১০ মিনিট বক্তব্য দেয়ার জন্য ঘোষণা করলেন। বৃদ্ধ লোকের বক্তব্য এভাবে শুরু হচ্ছিল :

‚অনুষ্ঠানের বক্তাদের আলোচনা শুনলাম, তারা শুধু এজিদের বিরোধিতা করে ইমাম হোসাইনের প্রশংসা গীতি গাইলেন। কিন্তু আমরা সবাই ভাল করে জানি যে, এজিদের পিতা আমির মুয়াবিয়া অনেক বড় সাহাবী ছিলেন, তিনি রাসূলের (সাঃ) প্রিয় ভাজন ও কাতেবে ওহি ছিলেন। ... ”

আমার কাছে তার বক্তব্য অযৌক্তিক মনে হচ্ছিল, তাই উপস্থাপককে বললাম, ‚মুরুব্বির বক্তব্য শেষ হলে আমাকে পাঁচ মিনিট সময় দিলে খুশি হব।” উপস্থাপক জবাবে বলল, “না আপনাকে আর সময় দেয়া হবে না, কারণ আপনি ও আপনার সাথের লোকদেরকে দুই ঘন্টা সময় দেয়া হয়েছে।” আমি মনে মনে বলতে লাগলাম : যদি এই বৃদ্ধের দেয়া এরূপ বক্তব্যের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শেষ হয়, তবে ইমাম হোসাইনের(আ.) পক্ষে আমাদের এ চেষ্টা তো বিফলে যাবে। তাই আমি স্টেজ থেকে নামতে লাগলাম ও বললাম : যেখানে আমরা ১০-১৫ বছর যাবৎ ইসলামের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করছি, সেখানে আমাদের বক্তব্যের শেষে এমন একজনকে বক্তব্য দিতে দেয়া হচ্ছে যিনি ইসলাম সম্পর্কে গবেষণা করাতো দূরের কথা সামান্য লেখা-পড়াও করেন নি!

আমাকে এভাবে নামতে দেখে উপস্থিত অনেকেই লজ্জিত হয়েছিলেন এবং উপস্থাপককে চাপ প্রয়োগ করছিল, যাতে আমাকে পুনরায় সময় দেয়া হয়। ইতোমধ্যে আমি অনুষ্ঠান ত্যাগ করে চলে আসছিলাম। দেখলাম কিছুক্ষণ পরেই উপস্থাপক আরো কয়েকজন লোকসহ আমার কাছে আসলেন এবং আমাকে অনুরোধ করলেন, অনুষ্ঠানের স্টেজে যাবার জন্য। আমি তাকে বললাম : আপনারা কি এজিদের বংশকে খুশি করার জন্য আজকের অনুষ্ঠান করেছেন নাকি ইমাম হোসাইনকে ভালবেসে? যদি এজিদের বংশকে ভালবেসে অনুষ্ঠান করে থাকেন, তাহলে সেখানে আমি যাব না এবং সেরূপ অনুষ্ঠানে যাতে আল্লাহ তায়ালা আমাকে কখনোই না নেন। আমাকে সেখানে পুনরায় নেয়ার জন্য তারা জোর অনুরোধ করতে লাগল এবং আমাকে আশ্বাস দিলেন যে, আপনাকে আবার সময় দেয়া হবে, আপনিই অনুষ্ঠানের শেষ বক্তা। ইমাম হোসাইনকে(আ.) ভালবেসে আবার স্টেজে গেলাম। বৃদ্ধ ব্যক্তির বক্তব্যের শেষে আমাকে পুনরায় ৫ মিনিট সময় দেয়া হল।

আমি পুনরায় কথা বলার সুযোগ পেয়ে বললাম : আমি মানছি মুয়াবিয়া অনেক বড় সাহাবী ছিলেন এবং মুসলিম জাহানের খলিফা ছিলেন। কিন্তু তার খেলাফত কি ইসলামী উম্মাহর কাছে আদৌ গ্রহণযোগ্য হয়েছে? আজ পর্যন্ত কোন আলেম বা ঐতিহাসিক কি তার খেলাফতের বৈধতার কথা স্বীকার করছেন? উপস্থিত জনতাকে উদ্দেশ্য করে বললাম : প্রিয় দিনদার, মুত্তাকি ও মুমিন ভায়েরা, যদি মুয়াবিয়ার খেলাফত গ্রহণযোগ্য হতো, তাহলে তো খুলাফায়ে রাশেদীনের মেয়াদকে ৫০ বছর ধরা হতো, কারণ চতূর্থ খলিফা হযরত আলীর(আ.) শাহাদাতের পর থেকে মুয়াবিয়া ২০ বছর খলিফা ছিলেন। যদি তার খেলাফতের বৈধতা থাকত, তাহলে তো খুলাফায়ে রাশেদীনে মেয়াদকে ৩০ বছরের পরিবর্তে ৫০ বছর ধরা হতো!

আমার এলাকায় আশুরা উপলক্ষে এরূপ আলোচনা অনুষ্ঠান এটাই প্রথম ছিল, তাই আর বেশি কিছু বলি নি। ঐ বৃদ্ধ লোকটি তৎক্ষণাৎ আমার বিরোধিতা করেছিল, কিন্তু তার অন্তরে ইমাম হোসাইনের (আ.) ভালাবাসা থাকার কারণে আশুরার তিন দিন পরে আমার কাছে এসে তার ভুল স্বীকার করেছিল। এতটুকু বলার প্রভাবেই যদি এরূপ হতে পারে, তাহলে ভেবে দেখুন : আমরা যদি আশুরা সংস্কৃতি আমাদের নিজ নিজ এলাকায় চালু করতে পারি তা কতটা ফলপ্রসূ হবে! এরূপ আরেকজন বৃদ্ধ লোকের সাথে ইমাম জয়নুল আবেদীনের(আ.) কথোপকথোন আমরা পরবর্তীতে বর্ণনা করব, যারপর বৃদ্ধ লোক হেদায়াত পেয়েছিল এবং নবী বংশকে ভালবাসতে শিখেছিল; যদিও সে কারণে তাকে এজিদ হত্যা করার আদেশ দিয়েছিল। যদি সময় ও সুযোগ থাকতো, তাহলে আমার পরবর্তী বক্তব্য এভাবে বাড়িয়ে বলতাম :

এজিদ ও তার পূর্ব পুরুষের সাথে ইমাম হোসাইন(আ.) ও তার পূর্ব পুরুষের চিরায়ত বিরোধ

আমরা যদি ইমাম হোসাইনের (আ.) পূর্ব পুরুষ ও এজিদের পূর্ব পুরুষের জীবন ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখি, তাহলে দেখতে পাব যে, এই দুই বংশের মধ্যে চিরায়ত শত্রুতা ছিল। আমরা জানি ইমাম হোসাইনের (আ.) পিতা হযরত আলী (আ.) এবং এজিদের পিতা মুয়াবিয়া, ইমাম হোসাইনের (আ.) নানা আমাদের শেষ নবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম) এবং এজিদের দাদা আবু সুফিয়ান, এজিদের দাদী হিন্দ এবং ইমাম হোসাইনের দাদী ফাতেমা বিনতে আসাদ। আর এই চার জন ব্যক্তির মোকাবেলায় অন্য চার জনকে তুলনা করলেই তাদের মাঝে চিরায়ত শত্রুতার বিষয়টি প্রমানিত হবে। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম) ’র পূর্ব পুরুষরা হাশেমী বংশোদ্ভুত ছিল আর আবু সুফিয়ানের পূর্ব পুরুষরা উমাইয়া বংশোদ্ভুত ছিল, যাদের মাঝেও দীর্ঘ দীনের শত্রুতা ছিল। কিন্তু আলোচনার কলেবর সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষে শুধু এই চার ব্যক্তির সাথে অপর চার ব্যক্তির তুলনা ও পর্যালোচনা করব।

ইসলামের ইতিহাসে হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম) ’র নবুওতি জীবন থেকে মক্কা বিজয় পর্যন্ত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখতে পাব যে, আবু সুফিয়ান রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম) 'কে এক মুহূর্ত শান্তিতে থাকতে দেন নি, তিনি হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম) ’র বিরুদ্ধে ২৭ টি যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

ইমাম হোসাইনের(আ.) পিতা হযরত আলী (আ.) যখন থেকেই খেলাফতের পদে অধিষ্ঠিত হলেন, তখন থেকেই এজিদের বাবা মুয়াবিয়া তৃতীয় খলিফা হযরত ওসমান (রাঃ) হত্যার অজুহাতে হযরত আলীর (আ.) বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করলেন এবং নিজেকে স্বতন্ত্র খলিফা ঘোষণা করলেন। হযরত আলীর (আ.) পাঁচ বছরের খেলাফতকে তিনি এক মুহূর্তের জন্যও মেনে নেন নি এবং তাকে স্বীকৃতি দেন নি। বরং তিনি হযরত আলীর (আ.) খেলাফতের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন এবং সিফফিন যুদ্ধে হযরত আলীর(আ.) বিরুদ্ধে মোকাবেলা করতে না পেরে, ছল-চাতুরী ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং কোরআনকে বর্শার মাথায় তুলে হযরত আলীর (আ.) যুদ্ধকে কোরআনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। হযরত আলী (আ.) যুদ্ধ না থামানোর কারণে তখনই তাঁর (আ.) বিরুদ্ধে খারেজীদের উৎপত্তি হয়। মুয়াবিয়াই প্রতারণা ও অপকৌশলের আশ্রয় নিয়ে ইমাম হাসান  (আ.) 'কে বিষ পান করিয়ে হত্যা করেছিল।[13]

অন্যদিকে এজিদ ক্ষমতায় এসে দেখুন ইমাম হোসাইনকে(আ.) কিভাবে বিরক্ত করেছে, ইমাম হোসাইনকে সে এক মুহূর্ত শান্তিতে থাকতে দেয় নি। ইমাম হোসাইনকে(আ.) মদীনাতে কতল করার নির্দেশ দিয়ে এজিদ মদীনার গভর্ণরের কাছে চিঠি দিয়েছিল। তারপর ইমাম হোসাইন(আ.) মক্কায় এসে হজ্ব করতে চাইলে সেখানেই তাকে হত্যা করার জন্য এজিদ গুপ্তচর প্রেরণ করেছিল। অবশেসে কারবালার প্রান্তরে ইমাম ইমাম হোসাইনকে(আ.) তাঁর সঙ্গী-সাথী ও নবী বংশের সকল পুরুষ লোকদেরকে হত্যা করেছিল। তবে আল্লাহ তায়ালা নবী বংশকে পৃথিবীর বুকে টিকিয়ে রাখার জন্য ইমাম জয়নুল আবেদীনকে(আ.) কৌশলে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। ইমাম হোসাইনকে(আ.) হত্যা করে, নবী বংশকে ধ্বংশের দারপ্রান্তে নিয়েও এজিদ ক্ষান্ত হয় নি। তারপর নবী বংশের মহিলাদেরকে বন্দী করে তাদের মাথার কাপর খুলে বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষকে দেখিয়ে নিয়ে বেড়ায়, যাতে করে তথাকথিত যুগের খলিফা এজিদের হাতে বাইয়াত না করা কত বড় অপরাধ তা মানুষ বুঝতে পারে এবং এসব বন্দীদেরকে মানুষ ধিক্কার দেয়। আর কারবালার ইতিহাস পড়লে দেখা যায় যে, এজিদি গোষ্ঠীর প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে এবং স্বল্প জ্ঞানের কারণে কেউ কেউ ঐ বন্দীদেরকে ধিক্কার দিচ্ছিল। এমনই একটি ঘটনা পরবর্তীতে বর্ণনা করব ইনশা আল্লাহ।

এজিদের দাদী হিন্দ (আবু সুফিয়ানের স্ত্রী ও মুয়াবিয়ার মা) কলিজা ভক্ষণকারিনী[14] হিসেবে ইতিহাসে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল, কারণ সে ওহুদ যুদ্ধে রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম) প্রাণপ্রিয় চাচা আমির হামজা নিহত হবার পর তার বুক ফেরে কলিজা বের করে চিবিয়ে খেয়েছিল। এ ঘটনার কারণ হিসেবে বর্ণিত আছে যে, আমির হামজা বদর যুদ্ধে হিন্দের বাবাকে হত্যা করেছিল।[15]

অন্যদিকে ইমাম হোসাইনের (আ.) দাদী ফাতেমা বিনতে আসাদ পৃথিবীর সর্ব প্রথম ঘর বায়তুল্লাহ শরীফের খাদেমের স্ত্রী ও সেখানে আলী কারামুল্লাহ ওজহাহুকে জন্মদান করার গৌরব অর্জন করেছিলেন।[16]

এ আলোচনা থেকে হাশেমী ও উমাইয়া বংশের চিরায়ত বিরোধের কথা প্রমাণিত হয়। এ পর্যায়ে আমরা একটি ঘটনা বর্ণনা করব যা থেকে মুয়াবিয়া ও এজিদের অপপ্রচারের ফল বুঝা যাবে, যেরূপ প্রভাব আজো মুসলিম সমাজে দেখা যায়:

 

এক বৃদ্ধের সাথে ইমাম সাজ্জাদের(আ.) কথোপকথোন এবং তাকে হেদায়াত প্রদান

কারবালার সেই হৃদয় বিদারক ঘটনার পরে যখন ইমাম সাজ্জাদ (আঃ) ও তাঁর পরিবারবর্গকে বন্দী করে দামেস্কে আনা হচ্ছিল তখন শামের অধিবাসী এক বৃদ্ধ ইমামের নিকটবর্তী হয়ে বললঃ ‘সমসত্ম প্রশংসা একমাত্র আল্লাহ্‌ তা’য়ালারই জন্যে যে, তিনি তোমাদেরকে ধ্বংস করেছেন এবং তোমাদের শহরের জনগণকে তোমাদের হাত থেকে রক্ষা করেছেন, সাথে সাথে আমিরুল মু’মিন ইয়াযিদকে তোমাদের উপর কর্তৃত্বশালী করেছেন’।

ইমাম সাজ্জাদ(আ.) এই বৃদ্ধকে (যে ইসলাম ও নবী বংশের মর্যাদা সম্পর্কে অজ্ঞ ছিল) এরূপ বললেন: ওহে মুরুব্বি কোরআন পড়েছেন কি?

বয়োবৃদ্ধ: পড়েছি।

ইমাম: এই আয়াতের অর্থটি কি খুব ভালভাবে বুঝেছেন? যেখানে আল্লাহ্‌ তায়ালা বলছেন:

( قُل لاَ اَسئَلُكُم عَلَيهِ اَجراً اِلاّ المَوَدَّةَ فِي القُربَى)

 

অনুবাদ : বলুন ওহে রাসূল, তোমাদের কাছে আমার রিসালাতের বিনিময়ে নিকটাত্মীয়ের ভালবাসা ব্যতীত অন্য কোন পারিশ্রমিক চাই না)[17]

          বয়োবৃদ্ধ: হ্যাঁ,পড়েছি। 

ইমাম: এই আয়াতে উল্লেখিত রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম) নিকটাত্মীয় আমরাই।

          বয়োবৃদ্ধ: তাই নাকি!

ইমাম: ওহে মুরুব্বি এই আয়াতটি পড়েছেন কি? যেখানে বলা হচ্ছে:

( اتِ ذا القُربَى حَقَّهُ )

 

(পরিবারবর্গের যে অধিকার আছে তাদেরকে তা দাও) [18]

বয়োবৃদ্ধ: হ্যাঁ পড়েছি।

ইমাম: আমরাই সেই পরিবার, আল্লাহ্‌ তা’য়ালা তাঁর নবীকে যাদের অধিকার দিতে বলেছেন।

বয়োবৃদ্ধ: তাই নাকি!

ইমাম: খোমছের আয়াতটি পড়েছেন কি?

 وَ اعلَمُوا اَنَّماَ غَنِمتُم مِن شَييءٍ فاَنَّ لِلَّهِ خُمُسَهُ وَلِلرَّسُولِ وَلِذِى القُربَى

 

অনুবাদ : আর জেনে রাখ যে, যা কিছু (জিহাদ বা অন্য কোন উপার্জন থেকে) গনীমত হিসেবে পাবে তার এক পঞ্চমাংশ আল্লাহ্‌ ও আল্লাহ্‌র নবী এবং তাঁর নিকটাত্মীয়ের... জন্য।[19]

বয়োবৃদ্ধ: হ্যাঁ পড়েছি।

ইমাম: এই আয়াতে উল্লেখিত রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম) নিকটাত্মীয় আমরাই।

বয়োবৃদ্ধ: তাই নাকি!

ইমাম: তাত্‌হীরের এই আয়াতটি পড়েছেন কি?

( اِنَّماَ يُريِدُ اللَّهُ لِيُذهِبَ عَنكُم الرِّجسَ اَهلَ البَيتِ وَ يُطَهِّرَكُم تَطهِيراً )

 

( হে আহ্‌লে বাইত আল্লাহ্‌ কেবল চান তোমাদেও থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে পূর্ণরূপে পূত পবিত্র রাখতে)[20]

বয়োবৃদ্ধ: হ্যাঁ পড়েছি।

ইমাম: এই আয়াতে উল্লেখিত রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম) আহলে বাইত আমরাই।

বয়োবৃদ্ধ: তাই নাকি! এভাবে বয়োবৃদ্ধ লোকটি হতভম্ব হয়ে গেল এবং সত্যকে উপলব্ধি করতে পেরে অতীত ব্যবহারের জন্য লজ্জায় তার মুখ লাল হয়ে গেল। কিছু সময় চুপ করে থেকে ইমামের কাছে জিজ্ঞাসা করলো যে, ‘সত্য সত্যই কি তোমরা তারা’?

ইমাম: ‚আল্লাহ্‌ এবং আমার পূর্বপুরুষ রাসূলে খোদার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম) কসম যে, আমরাই সেই পরিবার”।

বয়োবৃদ্ধ লোকটি তার হাত দু’টি আকাশের দিকে উচু করে তিনবার বলল: হে আল্লাহ্‌ তওবা করছি। তোমার নবী ও তাঁর পরিবারের সাথে শত্রুতার জন্য তওবা করছি। আর তাদেরকে হত্যা করাতে আমি অসন্তুষ্ট। আমি এর আগেও কোরআন পড়েছিলাম কিন্তু এই সত্যকে জানতাম না[21]

বয়োবৃদ্ধের তওবা করার এই ঘটনাটি এজিদের কানে পৌছলে সে এই ব্যক্তিকে হত্যা করার নির্দেশ দেয়। কিন্তু বৃদ্ধ লোকটি সত্যকে জেনে শাহাদত বরণ করলো[22]

এই বৃদ্ধ লোকটির কতই না সৌভাগ্য। আমাদের শেষ নবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মদ(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম)  ’র আহলে বাইতকে ভালবাসতে শিখে মৃত্যু বরণ করল। এই দুই বছর মহররম মাসে বিভিন্ন এলাকায় বক্তব্য রাখার পর অনেকের অন্তরেই ঐ বৃদ্ধের মত অনুভূতি সৃষ্টি করতে পেরেছি বলে নিজেকে ধন্য মনে করছি। কারণ যদি আমি বেহেশতে না যেতে পারি তবুও আল্লাহর কাছে গর্ব করে বলতে পারব : হে আল্লাহ, আমি দুনিয়ায় থেকে অন্তত একটি ভাল কাজ করতে পেরেছিলাম, আর তা হল : তুমি যাকে বেহেশতের সর্দার মনোনীত করেছো, পৃথিবীতে আমি তার কিছু ভক্ত সৃষ্টি করতে পেরেছিলাম। আমার বক্তব্য শ্রবনকারীদের  অনেকেই আমার কাছে বলেছেন : অন্যান্য আলেম উলামাদের বক্তব্যে কেন এরূপ সত্যনিষ্ঠ কাহিনী শুনতে পাই না!? এই ম্যাগাজিন পাঠকদেরকেই দায়িত্ব দিচ্ছি এই প্রশ্নের জবাব দেয়ার জন্য। আশা করি আপনারা সবাই এর যুক্তিযুক্ত জবাব দিতে পারবেন। আল্লাহ আপনাদের সবাইকে হেফাজত করুক।

ইমাম হোসাইনের(আ.) আশেক ও ভক্ত হৃদয়ের মর্যাদা অনেক বেশি। কিন্তু আমাদের সবারই জানা দরকার যে, শুধু ইমাম হোসাইনকে মুখে ভালবাসলেই চলবে না। বরং তার আদর্শকে মেনে চলতে হবে। আর ইমাম হোসাইনের(আ.) আদর্শ আমাদের শেষ নবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম ’র আদর্শ বৈ অন্য কিছু নয়। আর তাই দেখুন ইমাম হোসাইন আশুরার দিনে কারবালার ময়দানে তীরের সম্মুখে দাড়িয়েও জোহর নামায পড়েছেন। তাঁর অন্তরে আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছু ছিল না। তাই তাঁর বুকে তীর বিদ্ধ অবস্থায়ও নামায পড়তে দাড়ান এবং তীরের কারণে সেজদা দিতে না পারায় তিনি টান দিয়ে বুকের তীর খুলে ফেলেছিলেন তারপর আর বেশিক্ষণ তিনি বেঁচে ছিলেন না।[23] ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন। আর আমরা ইমাম হোসাইনকে(আ.) ভালবাসব অথচ নামায পড়ব না, এটা কি করে হয়।

অবশেষে সমগ্র মুসলিম জাতিকে আহ্বান করছি : আসুন আমরা সবাই ইমাম হোসাইনের আশুরা বিপ্লবের সঠিক তথ্য সম্পর্কে অবগত হই এবং তা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের ধর্মের সত্যনিষ্ঠ ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ধরে রাখার চেষ্ঠা করি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে হেদায়াত করুক এবং আমরা যারা হেদায়াত পেয়েছি তাদেরকে হেদায়াতের পথে অটল রাখুক এবং আমাদের অন্তরে ইমাম হোসাইন ও আহলে বাইতের ভালবাসা নিয়ে মৃত্যু বরণ করার তৌফিক দান করুক, আমীন ইয়া রাব্বাল আ’লামীন।

 

তথ্যসূত্র

  1.  পবিত্র কোরআনুল করীম।
  2.  আয়াতুল্লাহ জাফর সুবহানী, চিরভাস্বর মহানবী, অনুবাদ : মোহাম্মদ মুনির হোসেন খান, প্রথম প্রকাশ, ২০০৪ ইং, ঢাকা-বাংলাদেশ।
  3.  আয়াতুল্লাহ জাফর সুবহানী, ফারাজহায়ী আজ তারিখে পায়াম্বারে ইসলাম, মাশআর প্রকাশনা, ১৫ তম প্রকাশ, ১৩৭৮ ফার্সী সন, কোম-ইরান।
  4.  আবি আবদির রাহমান আহমাদ ইবনে শোয়াইব নাসায়ী, সুনানে নাসায়ী, প্রথম প্রকাশ, ১৯৯১ ইং, দারুল কুতুবুল এলমিয়্যাহ, বৈরুত-লেবানন।
  5.  বাগদাদী, আবি বাকর আহমাদ ইবনে আলী আল খতিব, তারিখে বাগদাদ, প্রথম প্রকাশ, ১৪১৭ হি:, দারুল কুতুব আল এলমিয়্যাহ, বৈরুত-লেবানন।
  6. আল্লামা সাইয়েদ মুরতাজা আসকারী, হাদীসের ইতিহাস অনুসন্ধান, অনুবাদক মুহাম্মদ মতিউর রহ্‌মান, কোম-ইরান, ২০০৭।
  7.  গোলাম রেজা গুলি জাদেহ, সারজামিনে ইসলামী, ইরান।
  8.  জহিরুল ইসলাম, রক্তে ভেজা কারবালা, সিডি নং ১ ও ২, বাশরী অডিও প্রোডাক্টস, ২৮ ও ২৯ নং পাটুয়াটুলি, ঢাকা, ১১০০, মোবাইল : ০১৭২-৫৩৬৭০২।
  9.  সুয়ুতি, জালাল উদ্দীন, দুররুল মানসুর, প্রথম প্রকাশ, ১৩৬৫ হি:, দারুল মারূফ।
  10.  মাহদী পিশওয়ায়ী, সিরেয়ে পিশওয়ায়ান, ইমাম সাদিক প্রকাশনা, এগারতম প্রকাশ, ১৩৭৯ ফার্সী সন, কোম-ইরান।
  11.  মুহাম্মদ আলাউদ্দীন আল্‌ আযহারী, আরী-বাংলা অভিধান, দ্বিতীয় পুনমুর্দ্রণ ১৯৯৯, বাংলা একাডেমী, ঢাকা-বাংলাদেশ।
  12.  কাজভিনী, মুহাম্মদ ইবনে ইয়াজিদ, সুনানে ইবনে মাজাহ, বৈরুত, দারুল ফেকর।
  13.  মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল বুখারী, সহীহ বুখারী, ইস্তাম্বুলের ১৪০১ হিজরির সংকলন থেকে দারুল ফেকর প্রকাশনা, বৈরুত-লেবানন।
  14.  মুহাম্মদ ইবনে ঈসা তিরমিযি, সুনানে তিরমিযি, দারুল ফেকর, দ্বিতীয় প্রকাশ ১৪০৩ হি:, বৈরুত-লেবানন।
  15.  শহীদ মুতাহ্‌হারি, আত্মার পবিত্রতা, অনুবাদ- আলহাজ্জ ড. মোহাম্মদ সামিউল হক।
  16. শেখ আব্বাস কোমী, মাফাতিহুল জিনান, প্রকাশক : সিমায়ে বেলায়াত, ১৩৮২ ফার্সী সন, কোম-ইরান।
  17.  সাইয়েদ তাকী ওয়ারিদী, খানেদানে এসমাত, দফতরে তাবলীগতে ইসলামীর প্রকাশনা কেন্দ্র, প্রথম প্রকাশ, ১৩৭৮ ফার্সী সন, কোম-ইরান।

 

[1]| Avïiv Aviex kã Gi evsjv A_© `k ZvwiL, Avi Bmjvgx cwifvlvq gniig gv‡mi 10 ZvwiL‡K Avïiv ejv n‡q _v‡K|

[2]| mviv we‡k¦ Bmjv‡gi cÖmvi msµvšÍ †Kvb GK eB c‡i Avwg G K_vwU †c‡qwQjvg, wKš‘ eBwUi bvg GLb k¥iY Avm‡Q bv|

[3]| Giƒc GKwU nv`xm †Kvb †Kvb mybœx Av‡jg eY©bv K‡i, GwR‡`i †`vl XvK‡Z Pvb| G nv`x‡mi ch©v‡jvPbv Avgiv c‡i Kie| wKš‘ GLv‡b ms‡ÿ‡c ej‡Z PvB : kvK w`‡q gvQ XvKv hvq bv; A_©vr mZ¨‡K KL‡bv †P‡c ivLv hvq bv| hw` Hme Av‡j‡gi K_v mZ¨ nq, Zvn‡j Zv‡`i ga¨Kvi †KD wbR mšÍv‡bi bvg GwR` ivL‡Z ivwR n‡eb? ev½vjx RvwZi BwZnv‡m wmivR‡`Šjvi cZ‡bi ci †KD Zvi mšÍv‡bi bvg gxi Rvdi iv‡Lb wb Ges Kv‡iv bvg GwR`I iv‡Lb wb; eis fwel¨‡ZI ivL‡eb bv| KviY Zviv GwR` I gxi Rvd‡ii wek¦vmNvZKZvi K_v †Kvb w`bB fyj‡eb bv| 

[4]| gvdvwZûj wRbvb, c„: 459|

[5]| Kvievjvi gg©vwšÍK BwZnvm I Avn‡j evB‡Zi dwRjZ msµvšÍ †h wmwW K¨v‡mU Zvi bv‡g †ei n‡q‡Q, Zvi bvg i‡³ †fRv Kvievjv 1 I 2| Zvi wb‡e`K, Rwniæj Bmjvg|

[6]| Avjøvn ZvÕAvjv G Avqv‡Z wb‡R‡K eûePb wn‡m‡e cÖ‡qvM Ki‡jI Zvi D‡Ïk¨ Ggb bq †h, Zuvi kwiK Av‡Q; eis Zuvi kvb I ÿgZv eySv‡bvi Rb¨ Zv e¨envi Kiv n‡q‡Q| Ab¨vb¨ fvlvi gZ Aviex fvlv‡ZI e³v Zvi wb‡Ri ev wbR c‡ÿi ÿgZv eySv‡bvi Rb¨ Avwg k‡ãi cwie‡Z© Avgiv k‡ãi cÖ‡qv‡Mi cÖPjb Av‡Q|

[7]| GB Avqv‡Z e¨eüZ شِيَعِ kãwUi evsjv A_© Abymvix hv‡K Aviex‡Z wkqv ejv nq| Avi cÖwZwU D¤§ZB †h‡nZz †Kvb bv †Kvb ivm~‡ji AvwbZ kwiq‡Zi Abymvix, ZvB wkqv kãwUi Abyev‡` D¤§Z †jLv hvq| G AvqvZ QvovI †KviAv‡b Av‡iv wZb hvqMvq wkqv kãwU GKB A‡_© e¨eüZ n‡q‡Q| m~iv Kvmv‡mi 15 bs Avqv‡Z `yB evi Ges m~iv mvd&dv‡Zi 83 bs Avqv‡Z GK evi :

وَ دَخَلَ الْمَدينَةَ عَلى‏ حينِ غَفْلَةٍ مِنْ أَهْلِها فَوَجَدَ فيها رَجُلَيْنِ يَقْتَتِلانِ هذا مِنْ شيعَتِهِ وَ هذا مِنْ عَدُوِّهِ فَاسْتَغاثَهُ الَّذي مِنْ شيعَتِهِ عَلَى الَّذي مِنْ عَدُوِّهِ فَوَكَزَهُ مُوسى‏ فَقَضى‏ عَلَيْهِ قالَ هذا مِنْ عَمَلِ الشَّيْطانِ إِنَّهُ عَدُوٌّ مُضِلٌّ مُبينٌ

وَ إِنَّ مِنْ شيعَتِهِ لَإِبْراهيمَ

A_© wbðqB Zvi (byn bexi) Abymvix‡`i GKRb nj Beivnxg| Avi GB Avqv‡Z gymwjg RvwZi wcZv nhiZ Beivnxg(Av.) '†KI byn bex(Av.) Gi wkqv ev Abymvix e‡j AwfwnZ Kiv n‡q‡Q|

Ab¨w`‡K †KviAv‡b mybœZ kãwU _vK‡jI mywbœ K_vwU †bB| Avi G †_‡K cÖgvwbZ nq †h, wkqv m¤cÖ`v‡qi DrcwË Avgv‡`i †kl bex I ivm~j nhiZ gynv¤§` gy¯Ídv (mvjøvjøvû AvjvBwn Iqv Avwjwn Iqv mvjøvg) Õi RxeÏkv †_‡KB|   

[8]| m~iv wnRi, AvqvZ bs 9 I 10|

[9]| G wel‡q mwVK Z_¨ Rvbvi Rb¨ Ônv`x‡mi BwZnvm AbymÜvbÕ MÖš’ `ªóe¨|

[10]| mnxn eyLvix, LÛ 4, c„: 209 I 219|

[11]| mybv‡b wZiwgwh, LÛ 5, c„: 321|

[12]| mybv‡b Be‡b gvRvn, LÛ 1, c„: 44| Ab¨vb¨ m~Î mg~n Giƒc : `yiiæj gvbmyi, LÛ 4, c„ : 262; Zvwi‡L evM`v`, LÛ 1, c„: 148;

[13]| Lv‡b`v‡b GmgvZ, c„ : 98|

[14]| Avm& mybvbyj †Kveivi cÂg L‡Ûi 167 c„ôvq Zvi K_v Gfv‡e ewY©Z n‡q‡Q :

اخبرنی معاوية بن صالح قال حدثنا عبد الرحمن بن صالح قال حدثنا عمرو بن هاشم الجنبي عن محمد بن إسحاق عن محمد بن كعب القرطبي عن علقمة بن قيس قال قلت لعلي تجعل بينك وبين بن أكلة الاكباد حكما قال إني كنت كاتب رسول الله صلى الله عليه وسلم يوم الحديبية فكتب هذا ما صالح عليه محمد رسول الله وسهيل بن عمرو فقال سهيل لو علمنا أنه رسول الله ما قاتلناه امحها فقلت هو والله رسول الله وإن رغم أنفك لا والله لا أمحها فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم أرني مكانها فأريته فمحاها وقال أما إن لك مثلها ستأتيها وأنت مضطر

nv`x‡m e¨eüZ أكلة الاكباد kãwUi evsjv A_© Øvivq : KwjRv fÿYKvwibx, Zvi †Q‡j gyqvweqv‡K D‡Ïk¨ K‡iB ejv n‡q‡Q, وبين بن أكلة الاكباد| Zvwi‡L BqvKzwe‡Z ¯úófv‡e †m NUbv ewY©Z Av‡Q:

، ويفتح الله عليه . فخرج وخرج المسلمون وعدتهم ألف رجل حتى صاروا إلى أحد ، ووافى المشركون فاقتتلوا قتالا شديدا ، فقتل حمزة بن عبد المطلب ، أسد الله وأسد رسوله ، رماه وحشي عبد لجبير بن مطعم بحربة ، فسقط ومثلت به هند بنت عتبة بن ربيعة وشقت عن كبده فأخذت منها قطعة فلاكتها ، وجدعت أنفه ، فجزع عليه رسول الله جزعا شديدا وقال : لن أصاب بمثلك ، وكبر عليه خمسا وسبعين تكبيرة ، وانهزم المسلمون حتى بقي رسول الله وما معه إلا ثلاثة نفر : علي والزبير وطلحة

-Zvwi‡L BqvKzwe, LÛ 2, c„: 47|

[15]| e`i hy‡×i ïiæ‡Z gjø hy× nq, G gj­hy‡× cÖ‡Z¨‡K Zuvi mgeqmxi m‡½ hy‡× wjß n‡qwQ‡jb| me‡P‡q ZiæY Avjx (Av.) gyqvweqvi gvgv Iqvwj‡`i m‡½, ga¨eqmx nvghvn& gyqvweqvi bvbv DZevi m‡½ Ges †cÖŠp DevB`vn& kvBevi m‡½ Ø›Øhy‡× AeZxY© nb| -wPifv¯^i gnvbex, cÖ_g LÛ, c„: 440

[16]| wm‡i‡q wckIqvqvb, c„ : 25|

[17]| myiv ïiv, AvqvZ - 23|

[18]| myiv Bmiv, AvqvZ - 26

[19]| myiv Avbdvj, AvqvZ - 40 |

[20]| myiv Avnhve, AvqvZ - 33 |

[21]| BnwZRv‡R Zveivmx, c„t - 167 |

[22]| ‡jvûd mvB‡q¨` Be‡b ZvDDm, c„t-177-178|

[23]| AvZ¥vi cweÎZv, c„ : 194-196| ey‡Ki Zxi †U‡b †ei Kiv n‡j wK Ae¯’v n‡Z cv‡I ej‡Z cv‡ib!