মহানবী (স.) এর দৃষ্টিতে হযরত ফাতেমা যাহরা (সা. আ.)

মহানবী (স.) এর দৃষ্টিতে হযরত ফাতেমা যাহরা (সা. আ.)

সংগ্রহে: ডক্টর মো. সামিউল হক

হযরত আদম (আ.) এর আগমন হতে অদ্যাবধি অসংখ্য মহীয়সী নারী’র আগমন এ পৃথিবী’র বুকে ঘটেছে। যারা নিজেদেরকে আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে এতটাই মর্যাদার সুউচ্চ পর্যায়ে নিতে সক্ষম হয়েছে যে, মহান আল্লাহ তাদেরকে বিশ্বের নারীদের সর্দার হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। হযরত ফাতেমা যাহরা (সা. আ.) তাদেরই একজন বরং তাদের সকলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ।

শুধুমাত্র শিয়া মাযহাবের অনুসারীরাই হযরত ফাতেমা (সালামুল্লাহি আলাইহা) এর মহান মর্যাদার বিষয়ে বিশ্বাসী নয়, হযরত ফাতেমা যাহরা (সা. আ.) এর শানে যে বিভিন্ন আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে এ বিষয়ে সুন্নি মাযহাবের অনুসারীরাও বিশ্বাসী। আর অনেক ক্ষেত্রে শিয়া ও সুন্নি আলেমদের বিশ্বাস ও ইজমা এ বিষয়ে কোন সন্দেহের অবকাশ রাখে না। আর এ মহীয়সী নারীর প্রশংসা ও বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কথা স্বয়ং হযরত মুহাম্মাদ মুস্তাফা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়অ সাল্লাম) এর মুখে উচ্চারিত হয়েছে; যা শিয়া ও সুন্নি রাবীদের (বর্ণনাকারী) মারফত আমাদের পর্যন্ত পৌঁছেছে।

শুধুমাত্র তাঁর কন্যা হওয়ার কারণে মহানবী (স.) হযরত ফাতেমা যাহরা (সা. আ.) সম্পর্কে এ সকল হাদীস বলেননি। কারণ পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট ভাষায় বলা হচ্ছে যে, আল্লাহর ওহী ব্যতীত মহানবী (স.) কোন কথা বলেননা, পবিত্র কুরআনে বলা হচ্ছে :

وما ینطق عن الهوی إن هو إلا وحیٌ یوحی.
 

অনুবাদ: আর তিনি প্রবৃত্তির তাড়নায় কথা বলেন না। (তার কথা) ওহী যা প্রত্যাদেশ হয় তা ব্যতীত নয়।” (সূরা নাজম : ৩ ও ৪)

যা কিছু মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (স.) হযরত ফাতেমা (সা. আ.) সম্পর্কে বলেছেন তা তাঁর অন্যান্য বাণীর ন্যায় ওহী হতে সংগৃহীত। আমরা মহানবী (স.) কর্তৃক হযরত ফাতেমা (সা. আ.) এর সম্পর্কে বর্ণিত এমন কিছু হাদীস এখানে উল্লেখ করবো যেগুলো সুন্নি ও শিয়া মাযহাবের গ্রন্থসমূহে প্রসিদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য হাদীস হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে:

(১) হাম্বালী মাযহাবের ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বাল (মৃত্যুকাল ২৪১ হিজরী) নিজস্ব সনদে বর্ণনা করেছেন যে,

 نظر النبى صلی الله علیه و (آله) و سلم الى علی و الحسن و الحسین و فاطمة فقال: «انا حرب لمن حاربکم و سلم لمن سالمکم»‏.
 

অনুবাদ : “নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি [ওয়া আলিহি] ওয়া সাল্লাম, আলী, হাসান, হুসাইন ও ফাতেমার (তাদের উপর আল্লাহর দরুদ বর্ষিত হোক) দিকে তাকিয়ে বললেন : যে ব্যক্তি তোমাদের সাথে যুদ্ধ করবে সে আমার সাথেও যুদ্ধে লিপ্ত, আর যে ব্যক্তি তোমাদের সাথে সন্ধী ও শান্তি স্থাপন করবে আমিও তাদের সাথে সন্ধী ও শান্তি স্থাপন করবো”।

(২) আহমাদ ইবনে হাম্বাল ও তিরমিজীসহ সুন্নি মাযহাবের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুহাদ্দিস হুযাইফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, মহানবী (স.) তাকে বলেছেন : কিছুক্ষণ পূর্বে যে আমার নিকট এসেছিল তাকে কি তুমি দেখেছো? সে ছিল একজন ফেরেশতা; যে এর পূর্বে কখনই পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়নি। সে আমাকে সালাম ও এ সুসংবাদ প্রদানের জন্য মহান আল্লাহর নিকট আবেদন জানিয়েছে যে, ফাতেমা বেহেশতের নারীদের সম্রাজ্ঞী এবং হাসান ও হুসাইন বেহেশতের যুবকদের সর্দার।

(৩) যাহাবী বর্ণনা করেছেন যে, মহানবী (স.) বলেছেন :

 «اول شخص یدخل الجنة فاطمة بنت محمد (ص)».
 

অনুবাদ : “সর্বপ্রথম যে ব্যক্তি বেহেশতে প্রবেশ করবেন তিনি হচ্ছে মুহাম্মাদের (স.) কন্যা ফাতেমা”।

(৪) মুহীবুদ্দীন তাবারী নিজস্ব সনদে মহানবী (স.) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন :

»اربع نسوة سیدات عالمهن، مریم بنت عمران و آسیة بنت مزاحم و خدیجة بن خویلد و فاطمه بنت محمد (صلى الله علیه و آله) و افضلهن عالما فاطمه (سلام الله علیها. «
 

“চারজন নারী বিশ্বের নারীদের সর্দার, ইমরানের কন্যা মারইয়াম (সা. আ.) [হযরত ঈসা (আ.) এর মাতা], মুযাহিমের কন্যা আসিয়া (সা. আ.) [ফেরাউনের স্ত্রী], খোওয়ালাদের কন্যা খাদিজা (সা. আ.) [মহানবী (স.) এর স্ত্রী] এবং মুহাম্মাদ (স.) এর কন্যা ফাতেমা [সা. আ.], যিনি হচ্ছেন হচ্ছেন এদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ট।

(৫) সুন্নি মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস বুখারী (মৃত্যুকাল ২৫৬ হিজরী) নিজস্ব সনদে মুহাম্মাদ (স.) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন :

»فاطمه بضعة منى فمن اغضبها اغضبنى‏. «
 

অনুবাদ : “ফাতেমা আমার শরীরের একটি অংশ স্বরূপ, যে তাকে রাগান্বিত করে সে আমাকে রাগান্বিত করে”।

(৬) আহমাদ ইবনে হাম্বাল তার নিজস্ব সনদে আল্লাহর রাসূল (স.) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন :

 انما فاطمة بضعة منى یوذینى ما اذاها و ینصبنى ما انصبها.

অনুবাদ : “ফাতেমা আমার শরীরের অংশ স্বরূপ, যা তাকে কষ্ট দেয় তা আমাকে কষ্ট দেয়, আর যা কিছু তাকে অসন্তুষ্ট করে তা আমাকেও অসন্তুষ্ট করে।

(৭) হাকিম নিশাবুরীসহ সুন্নি মাহযাবের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আলেম নিজস্ব সনদে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়অ সাল্লাম) হতে গুরুত্বপূর্ণ ও আশ্চার্যজনক বিভিন্ন রেওয়ায়েত বর্ণনা করেছেন যে, তিনি (স.) বলেন :

 یا فاطمة ان الله یغضب لغضبک و یرضى لرضاک‏.
 

অনুবাদ : “হে ফাতেমা! নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ তোমার ক্রোধে ক্রোধান্বিত হন এবং তোমার সন্তুষ্টিতে সন্তুষ্ট হন”। উল্লিখিত হাদীসসমূহ হতে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয় যে, হযরত ফাতেমা (সা. আ.) কে কষ্ট দেয়ার অর্থ হচ্ছে মহানবী (স.) কে কষ্ট দেয়া ও ক্রোধান্বিত করা। আর আল্লাহর রাসূল (স.) কে কষ্ট দেয়ার অর্থ হচ্ছে স্বয়ং আল্লাহকে কষ্ট দেয়া। আর এ কারণেই ফাতেমার অসন্তুষ্টিতে মহান আল্লাহ অসন্তুষ্ট এবং ফাতেমার সন্তুষ্টিতে মহান আল্লাহ সন্তুষ্ট হন। আর আমরা এ বিষয়ে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি যে, মহানবী (স.) যেন আমাদের হতে অসন্তুষ্ট না হন। কেননা পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে :

 

 «إِنَّ الَّذِینَ یُؤْذُونَ اللهَ وَرَسُولَهُ لَعَنَهُمْ اللهُ فِی‌ الدُّنْیَاوَالاْ´خِرَةِ وَأَعَدَّ لَهُمْ عَذَاباً مُهِیناً».

অনুবাদ : “যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দেয়, আল্লাহ তাদের প্রতি ইহকালে ও পরকালে অভিসম্পাত করেন এবং তাদের জন্যে প্রস্তুত রেখেছেন অবমাননাকর শাস্তি”। (সূরা আহযাব : ৫৭)

(৮) ফুরাত বিন ইব্রাহিম তার তাফসির গ্রন্থে মহানবী (স.) হতে বর্ণনা করেছেন :

 تدخل فاطمة ابنتى الجنة و ذریتها و شیعتها، و ذاک قوله تعالى: (لا یحزنهم الفزع الاکبر) (و هم فى ما اشتهت انفسهم خالدون) هى و الله فاطمة و ذریتها و شیعتها.
 

অনুবাদ : “আমার কন্যা ফাতেমা (আ.), তার সন্তান ও অনুসারীদের সাথে বেহেশতে প্রবেশ করবে। আর এ বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেন : ‘মহাত্রাস তাদেরকে চিন্তান্বিত করবে না...’ [সূরা আম্বিয়া : ১০৩], ‘তারা তাদের মনের বাসনা অনুযায়ী চিরকাল বসবাস করবে’। [সূরা আম্বিয়া : ১০২] আল্লাহর কসম: সে হচ্ছে ফাতেমা, তাঁর সন্তানরা এবং তাঁর অনুসারীরা”। উল্লিখিত হাদীসে ফাতেমার বংশধর বলতে হাসান ও হুসাইন (আ.) এবং নিস্পাপ ইমামগণকে (আলাইহিমুস সালাম) বোঝানো হয়েছে। আর তার অনুসারী বলতে ঐ সকল লোকদেরকে বোঝানো হয়েছে যারা হযরত ফাতেমার প্রকৃত অনুসারী এবং যেভাবে তিনি মহান আল্লাহর ইবাদত করতেন এবং তার রাসুলের অনুসরণ করতেন সেভাবে তারাও ইবাদত ও অনুসরণ করে। এক কথায় যারা কর্মের মাধ্যমে নিজেদেরকে ফাতেমা (সা. আ.) এর অনুসারী হিসেবে গড়ে তুলতে পারবে তারাই সেদিন তাঁর সাথে থাকবে, নামধারী শিয়াদেরকে এ হাদীসে উদ্দেশ্য করা হয়নি।

(৯) হাকিম নিশাবুরী ও ইবনে মাগাযেলীসহ অন্যান্য সুন্নি আলেমগণ নিজস্ব সনদে মহানবী (স.) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন :

 اذا کان یوم القیمة نادى مناد من تحت الحجب یا اهل الجمع غضوا ابصارکم و نکسو روسکم فهذه فاطمة بنت محمد (صلى الله علیه و آله) ترید ان تمر على الصراط‏.
 

অনুবাদ : “কেয়ামতের দিন আহ্বানকারী পর্দার আড়াল হতে আহবান জানাবে হে হাশরে উপস্থিতগণ নিজেদের চোখ বন্ধ করে নাও এবং মাথা অবনত কর, ফাতেমা বিনতে মুহাম্মাদ (স.) [পুলে] সিরাত অতিক্রম করবেন।

(১০) প্রখ্যাত সুন্নি আলেম খতিব বাগদাদী (মৃত্যুকাল ৪৬৩) নিজস্ব সনদে ইবনে আব্বাস হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসুল (স.) বলেন :

 لیله عرج بى الى السماء رایت على باب الجنة مکتوبا لا اله الا الله محمد رسول الله ، على حبیب الله، فاطمة الحسن و الحسین صفوة الله، على باغضیهم لعنة الله‏.
 

অনুবাদ : “আসমানের প্রতি মে’রাজের রাতে আমি দেখলাম বেহেশতের দরজায় এ বাক্যগুলো লিপিবদ্ধ করা হয়েছে যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মা’বুদ নেই, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল, আলী আল্লাহর বন্ধু এবং ফাতেমা, হাসান ও হুসাইন মহান আল্লাহ কর্তৃক মনোনীত। যারা তাদের সাথে শত্রুতা ও বিদ্বেষ পোষণ করে তাদের উপর আল্লাহর লানত (অভিসম্পাত)। -সূত্র: আবনা ওয়েব সাইট