মুসলিম ইবনে আওসাজা এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

-এস, এ, এ

সম্পাদনা: আলহাজ্ব ড. মো. সামিউল হক।

হজরত মুলিম হচ্ছেন আওসাজার পুত্র। (আবসারুল আয়ন, পৃষ্ঠা ১০৭) তিনি ছিলেন কুফাবাসী এবং হজরত ইমাম  আলী ও হুসাইন (আ.) এর সাহাবী (মাক্বতালুল হুসাইন মোকাররাম, পৃষ্ঠা ১৭৭) এবং বণী আাসাদ গোত্রের একজন ব্যাক্তিত্ব সম্পন্ন ইবাদতকারী ও দানশীল ব্যাক্তি। (রেজালে শেইখ তুসী, পৃষ্ঠা ৮০)

ঐতিহাসিকগণ এবং জীবনচরিত লেখকবৃন্দ লিখেছেন যে, মুসলিম ইবনে আওসাজা ছিলেন সেই ব্যাক্তি যে ইমাম হুসাইন (আ.) কে চিঠি লেখেছিলেন এবং যখন মুসলিম বিন আক্বিল কুফাতে আসেন তখন তিনি লোকজনদের কাছ থেকে ইমাম হুসাইন (আ.) এর বাইয়াত গ্রহণের কাজে তাকে সাহায্যে করেন। (আবসারুল আয়ন, পৃষ্ঠা ১০৭)

কুফাতে মুসলিম ইবনে আওসাজা

যখন মুলিম ইবনে আক্বিল কুফা থেকে বাহির হন তখন মুসলিম ইবনে আওসাজাও তার সাথে ছিলেন এবং মাযজাহ, আসাদ গোত্রের এক চতূর্থাংশ জনগণের সাথে একমত হন যে তারা এজিদের সাথে লড়াইয়ে তাদেরকে সাহায্যে করবে। তাঁরা উক্ত গোত্রের সাহায্যে বিদ্রোহ গোষণা করে এবং ইবনে যিয়াদকে কুফার প্রাসাদে বন্দি করে। কিন্তু ইবনে যিয়াদ তার ছলনার সাহায্যে সকলকে প্রাসাদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিতে সফল হয়। মুসলিম ইবনে আক্বিল মুখতারের ঘর থেকে বাহির হয়ে হানী বিন উরওয়ার ঘরে আশ্রয় নেন। ইবনে যিয়াদ মুসলিম ইবনে আক্বিলকে ধরার জন্য তার গোলাম মাআকাল’ কে ব্যাবহার করে। মুসলিম ইবনে আক্বিলের সন্ধানের জন্য সে তাকে তিন হাজার দিরহাম দেয়। মাআকাল মসজিদে প্রবেশ করে মুসলিম ইবনে আওসাজার কাছে আসে; তখন তিনি মসজিদে নামাজ পড়ছিলেন। মাআক্বাল তাঁর নামাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত মসজিদে অপেক্ষা করতে থাকে। নামাজান্তে সে তাঁর কাছে যায় এবং বলেঃ আমি হচ্ছি শামবাসী এবং যি’ক্বালা নামক ব্যাক্তির দাশ। আমি জানতে পেরেছি যে আহলে বাইত (আ.) একজন প্রতিনীধি কুফা শহরে এসেছেন আমি তার কাছে এই তিন হাজার দিরহাম দিয়ে বাইয়াত করতে চাই। কিন্তু আমি কুফাতে এমন কাউকে চিনি না যে সে আমাকে তাঁর কাছে নিয়ে যাবে। আমি যখন মসজিদে বসেছিলাম তখন আমাকে একজন বলে যে আপনি হচ্ছেন আহলে বাইত (আ.) এর একজন কাছের লোক যিনি মুসলিম ইবনে আক্বিলের খোজ দিতে পারবেন, আপনি আমার উক্ত অর্থটুকু কবুল করেন এবং আমাকে মুসলিম ইবনে আক্বিলের কাছে নিয়ে যান এবং আমি যেন তাঁর কাছে বাইয়াত করতে পারি। আর আপনি যদি চান তাহলে আমি তাঁর সাথে সাক্ষাতের পূর্বেই বাইয়াত করতে প্রস্তুত। তখন মুসলিম ইবনে আওসাজা তাকে বলেনঃ আমি সত্যিই আনন্দিত হয়েছি যে তুমি আহলে বাইতের সদস্যর কাছে বাইয়াত করতে প্রস্তুত। মুসলিম ইবনে আওসাজা তাকে মুসলিম ইবনে আক্বিলের কাছে নিয়ে যাওয়ার পূর্বে তাকে কসম দেয় যে সে যেন কাউকে উক্ত স্থানের কথা না বলে। তুমি আমার কাছে কয়েকদিন আস যেন আমি তোমার জন্য সাক্ষাতের অনুমতি নিতে পারি। মাআক্বাল মুসলিম ইবনে আওসাজার কাছে যাতায়াত করতে থাকে যেন তিনি সাক্ষাতের অনুমতি নিতে পারে। যখন সে মুসলিম ইবনে আক্বিলের সাথে সাক্ষাত করে তখন সে তাঁর লুকিয়ে থাকার স্থান সম্পর্কে ইবনে যিয়াদ কে অবগত করে। (আল আখবারুল তাওয়াল, পৃষ্ঠা ২৩৫, আল কামেল ফিত তারিখ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৫৩৭, আল ইরশাদ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৫, মাকাতেলুত তালেবীন, পৃষ্ঠা ৯৭)

বলা হয় যে মুসলিম ইবনে আক্বিল এবং হানী বিন উরওয়ার বন্দি হওয়ার পরে মুসলিম ইবনে আওসাজা তার পরিবারসহ লুক্কায়িত থাকে এবং কারবালাতে ইমাম হুসাইন (আ.) এর সাথে মিলিত হয় এবং শাহাদত বরণ করেন। (আবসারুল আয়ন, পৃষ্ঠা ১০৯)

আশুরার রাত্রি ও মুসলিম ইবনে আওসাজা

ইমাম হুসাইন (আ.) আশুরার রাতে তাঁর সকল সাহাবীদেকে একত্রিত করেন এবং নিজের অন্তিম ইচ্ছা প্রকাশ করেন এবং সকলের কাছ থেকে নিজের বাইয়াতকে তুলে নেন। তখন মুসলিম ইবনে আওসাজা বলেনঃ আমরা আপনাকে কোন বাহানা এবং অজুহাতে ছেড়ে দিব?! খোদার শপথ আমি কখনই আপনাকে নিঃসঙ্গ হতে দিব না এবং যতক্ষণ আমার কাছে তরবারি থাকবে আমি ততক্ষণ শত্রুদের বিরূদ্ধে যুদ্ধ করে যাব এবং তাদেরকে হত্যা করব। আর যদি আমার হাতে অস্ত্র না থাকে তাহলে আমি পাথর দ্বারা যুদ্ধ করব। (তারিখুল উমাম ওয়াল মুলুক, খন্ড ৫, পৃষ্ঠা ৪১৯, আল ইরশাদ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৯২, আল কামেল ফিত তারিখ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৫৫৯,)

আশুরার দিন সকাল

মরহুম শেইখ মুফিদ বর্ণনা করেনঃ যখন ইমাম হুসাইন (আ.) নল খাগড়া দ্বারা তাবুর পিছনে খোঁড়া পরিখায় আগুন প্রজ্বলিত করছিলেন তখন শিমার ইমাম (আ.) এর কাছে এসে বলেঃ হে হুসাইন! কেয়ামতের পূর্বেই তুমি কি নিজেকে আগুনে পুড়াবার চিন্তা করছ। তখন ইমাম (আ.) তাকে বলেনঃ হে রাখালের ছেলে! তুমিই স্বয়ং জাহান্নামের আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার উপযোগি। (তারিখুল উমাম ওয়াল মুলুক, খন্ড ৫, পৃষ্ঠা ৪২৪, আবসারুল আয়ন, পৃষ্ঠা ১০৯)

তখন মুসলিম ইবনে আওসাজা তীর কামান দ্বারা তাকে হত্যা করার জন্য নিশানা লাগায় তখন ইমাম (আ.) তাকে বাধা দেন। তখন মুসলিম ইবনে আওসাজা বলেনঃ সে হচ্ছে একজন ফাসেক ব্যাক্তি। ইমাম (আ.) তাকে বলেনঃ আমি চাই না যে আমার পক্ষ থেকে যুদ্ধ শুরু হোক। (আবসারুল আয়ন, পৃষ্ঠা ১০৯, )

হাবীবের কাছে মুসলিম ইবনে আওসাজার অনুরোধ

আশুরার দিন ইমাম হুসাইন (আ.) এর সাহাবীরা একের পরে এক শাহাদাতের অমৃত সুধা পান করছিলেন। মুসলিম ইবনে আওসাজা ইমাম হুসাইন (আ.) এর বাম দিকের সৈন্যদলের মধ্যে ছিলেন। তিনি শত্রুদের উপরে বীর বিক্রমে হামলা করলেন তখন “মুসলিম বিন আব্দুল্লাহ যিয়ায়ী এবং আব্দুর রহমান বিন আবি খুশকারে বাজলী” তারা উভয়ে মুসলিম ইবনে আওসাজার উপরে হামলা করে এবং তাঁকে হত্যা করার পিছনে তাদের মুখ্য ভুমিকা ছিল। মুসলিম ইবনে আওসাজা যখন তাদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয় তখন তাদের চারিদিকের পরিবেশকে ধুলা আচ্ছাদিত করে ফেলে এবং যখন আবহাওয়া স্থির হয় তখন সবাই দেখে যে মুসলিম ইবনে আওসাজা মাটিতে লুটিয়ে পড়েছেন।

হজরত ইমাম হুসাইন (আ.) তার কাছে ছুটে আসেন তখন তিনি নিজের জীবনের শেষ নিঃশ্বাস গুণছিলেন। তখন ইমাম তাঁকে বলেন হে মুসলিম ইবনে আওসাজা! খোদা তোমার উপর নিজ করুণা ও রহমত করুক। অতঃপর হাবীব ইবনে মাযাহির (রা.)মুসলিম ইবনে আওসাজার কাছে আসেন।

ইমাম হুসাইন (আ.) বলেনঃ হে মুসলিম ইবনে আওসাজা! তোমার মৃত্যু আমার জন্য অপ্রীতিকর, আমি তোমাকে বেহেস্তের সুসংবাদ দিচ্ছি। মুসলিম ইবনে আওসাজা নরম সুরে জবাব দেয়। তখন হাবীব তাকে বলেনঃ হে মুসলিম ইবনে আওসাজা! খুবভাল হতো যদি আমি তোমার আগে শাহাদত বরণ করতাম। (আল ইরশাদ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ১০৩-১০৪)

মুসলিম ইবনে আওসাজা হাবীব ইবনে মাযাহিরকে ইমাম (আ.) এর দিকে ইঙ্গিত করে বলেনঃ তুমি নিজেকে ইমাম (আ.) এর জন্য উৎসর্গ করার চেষ্টা কর। তখন হাবীব তাঁর জবাবে বলেন কাবার খোদার শপথ এমনটিই হবে। (মাক্বতালুল হুসাইন মোকারারম, পৃষ্ঠা ২৯৭)

যিয়ারতে নাহিয়’তে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইমাম হুসাইন (আ.)মুসলিম ইবনে আওসাজা’র হত্যাকারীর প্রতি লানত প্রেরণ করেন। (ইকবালুল আমাল, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ৭৬-৭৭)

মুসলিম ইবনে আওসাজার শাহাদতের খবর শুনে তার দাসী তাবুর বাইরে আসে এবং চিৎকার করে বলতে থাকে হায় শত্রুরা আমার মালিককে শহীদ করে দিয়েছে! (আবসারুল আয়ন, পৃষ্ঠা ১১০)

সে সাবআস বিন রাবী’কে উদ্দেশ্যে করে বলে তোমরা কি তাঁকে শহীদ করে উল্লাস করছ? জেনে রাখ আমি তার খোদার প্রতি ঈমান এনেছি এবং তারই অনুসরণ করি। মুসলমানদের মধ্যে যার যথেষ্ট সম্মান ছিল তাকে শহীদ করে তোমাদের কিসের এত আনন্দ? যে ব্যক্তি আযারবাইজানের সালাক্বার দিনে ছয়জন মুশরিককে হত্যা করেছিল তোমরা তার মৃত্যুতে আনন্দ উল্লাস করছ?! (তারিখুল উমাম ওয়াল মুলুক, খন্ড ৫, পৃষ্ঠা ৪৩৬, আল কামেল ফিত তারিখ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৫৬৫- ৫৬৬)

এভাবে মুসলিম ইবনে আওসাজা কারবালাতে শাহাদতের সুধা পান করেন এবং ইহলোকে ত্যাগ করেন।

সূত্র: http://www.tvshia.com/bn/content/15906