রবিউল আওয়াল মাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি

এস, এ, এ

পহেলা রবিউল আওয়াল

১- রাসুল (সা.)এর দাফন: পহেলা রবিউল আওয়ালের মধ্যে রাতে রাসুল (সা.)এর পবিত্র দেহকে হজরত আলি (আ.) দাফন করেন। কেননা অন্যান্য ব্যাক্তিরা রাসুল (সা.)এর পবিত্র দেহকে ফেলে রেখে খেলাফত নির্বাচনের জন্য বণি সাকিফায় একত্রিত হয়েছিল। (তাবাকাত ইবনে সাআদ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৭৮)

শেইখ মুফিদ (রহ.) বলেন: অনেকেই রাসুল (সা.) এর জানাযায় অংশগ্রহণ করেননি কারণ তখন তারা খলিফা নির্বাচনের জন্য বণি সাকিফাতে উপস্থিত ছিল। (তাকরিবুল মাআরেফ, পৃষ্ঠা ২৫৬)

২- লাইলাতুল মাবিত: পহেলা রবিউল আউয়ালের রাতটি ইসলামের ইতিহাসে ‚লাইলাতুল মাবিত“ নামে পরিচিত। রাসুল (সা.)এর বেসাতের ১৩ তম বর্ষে হিজরতের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি সংঘটিত হয়। রাসুল (সা.) উক্ত রাতে মদিনা থেকে মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা হন এবং পথিমধ্যে ‚সউর“ নামক গুহায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। অপর দিকে হজরত আলি (আ.) শত্রুদের ষড়যন্ত্রকে নস্যাত করার লক্ষ্যে রাসুল (সা.)এর বিছানায় নিদ্রা যান। তখন তাঁর সম্পর্কে সুরা বাকারা’এর ২০৭ নং আয়াত নাযিল হয়। (বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ১৯, পৃষ্ঠা ৩৯)

৩- রাসুল (সা.) এর হিজরত: বেসাতের ১৩ তম বর্ষে উক্ত তারিখের রাতে রাসুল (সা.) মক্কা থেকে মদিনার উদ্দেশ্যে হিজরত করেন। (শাওয়াহেদুত তানযিল, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ১২৩)

৪- হিজরি বর্ষের সূচনা: হিজরত ইসলামের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। বিশ্বের ইতিহাসেও সবচেয়ে তাৎপর্যবহ, সুদূরপ্রসারী ঘটনা এটি। এটি দ্বীন ও মানবতার বৃহত্তর স্বার্থে ত্যাগ, বিসর্জনের এক সাহসী পদক্ষেপ। মুসলমানরা মক্কার কাফেরদের পাশবিক নির্যাতন-নিপীড়ন, অব্যাহত অমানবিক আচরণ, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবরোধ নীরবে সহ্য করার পর তাদের স্পর্ধা আরো বেড়ে যায়। তারা মহানবী (সা.)-কেও হত্যার ষড়যন্ত্র করে। আল্লাহ তায়ালা তাদের সব ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দেন। মহানবী (সা.) ও মক্কার নির্যাতিত মুসলমানদের মদিনায় হিজরত করার নির্দেশ দেন। হিজরতের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের দ্বার উন্মোচিত হয়। সশস্ত্র যুদ্ধে তাগুতি শক্তির মোকাবিলার শুভ সূচনা হয়। উদিত হয় মক্কা বিজয়সহ ইসলামের বিশ্বজয়ের রঙিন সূর্য। হিজরতের ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মারক বানিয়ে হজরত উমরের যুগে ইমাম আলি (আ.) হিজরি নববর্ষের গোড়াপত্তন করেন। মুসলমানদের জন্য পৃথক ও স্বতন্ত্র চান্দ্রমাসের পঞ্জিকা প্রণয়ন করেন। (আস সহিহ মিন সিরাহ, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ১৭৪- ২০৬)

৫- হজরত আলি (আ.) এর ঘরে আক্রমণ: সন ১১ হিজরির উক্ত তারিখের রাতে রাসুল (সা.) দাফন কার্য সম্পাদন হওয়ার পরে যারা বণি সাকিফাতে অংশগ্রহণ করেছিল। তারা দিনে হজরত আলি (আ.)এর কাছে জোরপূর্বক বাইয়াত নেয়ার জন্য তাঁর ঘরে হামলা করে। কিন্তু হজরত আলি (আ.) রাসুল (সা.) এর ওসিয়ত অনুযায়ি কোরআন সংঙ্কলনের কাজে নিমগ্ন ছিলেন। তিনি হামলাকারিদের বলেন: মহান আল্লাহর শপথ আমি সম্পূর্ণ কোরআন একত্রিত করার পূর্বে ঘর থেকে বাহির হব না। (এহতেজাজ, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৯৮, ২৮১)

৬- ইমাম হাসান আসকারি (আ.)কে বিষ প্রদান: রেওয়ায়েতের বর্ণনা অনুযায়ি ইমাম হাসান আসকারি (আ.) সন ২৬০ হিজরির উক্ত তারিখে বিষাক্ত খাবারের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এছাড়াও ইতিহাসে অন্যান্য তারিখের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে যেমন: ৪ঠা রবিউল আওয়াল, ৮ই রবিউল আওয়াল। (মেসবাহে কাফআমি, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৫৩৩)

৩য় রবিউল আওয়াল:

১- হজরত সালমান (রা.) এর কূটতর্ক: রাসুল (সা.)কে দাফনের তৃতিয় দিন হজরত সালমান (রা.) জনসম্মুখে এস বলেন: হে লোকেরা! তোমরা আমার কথা মনযোগ সহকারে শোন অতৎপর চিন্তা করো। এটা তোমরা এ বিষয় সম্পর্কে ভালভাবে অবগত আছ যে, আমাকে রাসুল (সা.) কর্তৃক বিশেষ জ্ঞান দান করা হয়েছে। আমি যদি আলি (আ.) এর ফযিলত বর্ণনা শুরু করি তাহলে হয়তো তোমাদের অনেকেই আমাকে পাগল বলে অভিহিত করবে অথবা বলবে যে, হে আল্লাহ! তুমি সালমানের উক্ত কথার জন্য তাঁকে ক্ষমা করে দাও। অতঃপর তিনি হজরত আলি (আ.) এর ফযিলত বর্ণনা করা শুরু করেন এবং তাদেরকে উদ্দেশ্যে করে বলেন: যারা তাঁর প্রাপ্য খেলাফতকে কেড়ে নেয়ার ষড়যন্ত্র করেছিল। বক্তব্যর পরিসমাপ্তিতে বলেন: তোমরা জেনে রাখ আমি আমার বিশ্বাসের কথাকে তোমার সামনে উপস্থাপন করলাম। আমি আমার জন্য রাসুল (সা.) এর পরে হজরত আলি (আ.) কে ইমাম স্বরূপ মেনে নিয়েছি। (গায়াতুল মারাম, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ১২০)

২- এজিদের নির্দেশে কাবা গৃহকে ভাঙ্গার চেষ্টা: সন ৬৪ হিজরির উক্ত দিনে এজিদের নির্দেশে কাবা গৃহকে মিনজানিক (দালান ভাঙ্গার গুলতি বিশেষ) দ্বারা ভাঙ্গা হয়। উক্ত ঘটনার ১১ দিন পরে এজিদ মারা যায়। (তাতেম্মাতুল মুনতাহি, পৃষ্ঠা ৬৩)

৫ই রবিউল আওয়াল

১- হজরত সকিনা (সা.)এর মৃত্যুদিবস: ইমাম হুসাইন (আ.)এর কন্যা হজরত সকিনা (সা.আ.) কারবালার ঘটনার ৫৬ বছর পরে সন ১১৭ হিজরির উক্ত তারিখে মদিনায় মৃত্যুবরণ করেন। তার মাতার নাম ছিল রোবাব তিনি তাঁর মায়ের সাথেই বন্দি অবস্থায় কুফা ও শামে যান। তাঁর স্বামির নাম ছিল হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে হাসান (আ.)যিনি কারবালাতে শাহাদত বরণ করেন। যেহেতু ইমাম হাসান (আ.)এর আব্দুল্লাহ নামে কয়েকজন সন্তান ছিল। যখন তিনি মৃত্যুবরণ করেন তখন মদিনার শাষক আব্দুল মালেক বলে: তোমরা অপেক্ষা কর তাঁর জানাযার নামাজ আমি পড়াব। কিন্তু সে ওয়াদা করে আর জানাযার নামাজ পড়াতে আসেনি। অবশেষে মোহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ ওরফে নাফসে যাকিয়া রাতে তাঁর জানাযার নামাজ পড়ান এবং তাঁকে মদিনায় দাফন করে দেন। (দালায়েলুল ইমামা, পৃষ্ঠা ৪২৪)

৮ই রবিউল আওয়াল

ইমাম হাসান আসকারি (আ.)এর শাহাদত:

রেওয়ায়েতের বর্ণনা অনুযায়ি ২৬০ হিজরিতে ইমাম হাসান আসকারি (আ.)২৮ বছর বয়সে শাহাদত বরণ করেন। মৃত্যুর পূর্ব রাতে তিনি মদনিাবাসিদের নামে একাধিক পত্র লিখেন। যখন শামেরাবাসিরা তাঁর শাহাদতের খবর সম্পর্কে অবগত হয় তখন তারা বাজারের সকল দোকান বন্ধ করে ইমাম (আ.)এর ঘরের সম্মুখে একত্রিত হয় এবং শামে তাদের ক্রন্দন এবং আহাজারির কারণে পরিবেশ শোকাবহ হয়ে উঠে। ইমাম মাহদি (আ.) তাঁকে গোসল, কাফন দেন, জানাযার নামাজ পড়ান এবং তাঁকে ইমাম হাদি (আ.) এর পাশে দাফন করে দেন। (কামাল উদ্দিন, পৃষ্ঠা ৪৭৫)

৯ই রবিউল আওয়াল

১- ইমাম মাহদি (আ.)এর ইমামতের প্রথম দিন: সন ২৬০ হিজরি ইমাম হাসান আসকারি (আ.)এর শাহাদতের পরে উক্ত দিনটি ছিল ইমাম মাহদি (আ.) এর ইমামতের প্রথম দিন এবং সেদিন থেকেই ইমাম মাহদি (আ.) এর ইমামতের স্বল্পকালিন অন্তর্ধান শুরু হয়। (মুতাদরাকে সাফিনাতুল বিহার, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ৬৭)

২- হজরত উমর ইবনে খাত্তাবের মৃত্যুদিবস: ২৩ অথবা ২৪ হিজরির উক্ত তারিখে রাতের শেষ অংশে হজরত উমর ইবনে খাত্তাব মৃত্যু বরণ করেন। কিন্তু আহলে সুন্নাতের মত অনুযায়ি তিনি রোজ বুধবার ২৬শে জিলহজ তারিখে মৃত্যুবরণ করেন। ইতিহাসে তার মৃত্যুর ঘটনা এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে, মুগাইরা বিন শোয়বার দাশ যার নাম ছিল ‘আবু লুলু’ সে হজরত উমরকে কয়েকবার চাকু দ্বারা মারাত্মকভাবে আঘাত করে এবং উক্ত কারণে তিনি মৃত্যু বরণ করেন। (তাবাকাতে কুবরা, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩৬৫)

৩- উমর ইবনে সাআদের মৃত্যুদিবস: মোখতারে সাকাফির নেতৃত্বে উমরে সাআদকে হত্যা করা হয়। (আল ইরশাদ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৩৬)

১০ই রবিউল আওয়াল:

১- রাসুল (সা.) এর সাথে হজরত খাদিজা (সা.আ.)এর বিবাহ: হজরত মোহাম্মাদ (সা.) নবুওয়াত প্রাপ্তির ১৫ বছর পূর্বে উক্ত তারিখে উম্মুল মুমিনিন হজরত খাদিজা (সা.আ.) এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। হজরত খাদিজা (সা.আ.) এর সম্পদ এতই বেশি ছিল যে ৮০ হাজার উট শুধুমাত্র তাঁর ব্যাবসার মালামাল বহণ করতো। আরবের বিভিন্ন ব্যাক্তিত্বগণ তাঁকে বিবাহের প্রস্তাব দেন কিন্তু তিনি তাদের বিবাহের প্রস্তাবে রাজি হন নি। কিন্তু তিনি রাসুল (সা.) এর সততা এবং সত্যবাদিতা দেখ মুগ্ধ হন এবং তাঁকে বিবাহের প্রস্তাব দেন। অতঃপর তাঁদের বিবাহ অনুষ্ঠিত হয়। (ইকবালুল আমাল, পৃষ্ঠা ৫৯৯)

২- মদিনার অত্যাচারি শাষক দাউদ বিন আলির মৃত্যু: সাফফাহ-এর চাচা দাউদ বিন আলি সন ১৩৩ হিজরি ১০ই রবিউল আওয়াল তারিখে ইমাম জাফর সাদিক (আ.) এর দোয়ার কারণে মৃত্যু বরণ করে। (কালায়েদুন নুহুর, খন্ড রবিউল আওয়াল, পৃষ্ঠা ৬৭)

৩- মালেক বিন আনাসের মৃত্যুদিবস: সন ১৭৯ হিজরিতে মালেক বিন আনাস আসবাহা যিনি ছিলেন মালেকি মাযহাবের কর্ণধারক। তিনি উক্ত তারিখে মৃত্যুবরণ করেন এবং তাকে জান্নাতুল বাকিতে দাফন করা হয়।  (রওযাতুল জান্নাত, খন্ড ৭, পৃষ্ঠা ২২৪)

৪- মুয়াবিয়ার খেলাফত অর্জন: ৪১ হিজরির রবিউল আউয়ালের ১০ তারিখে মুয়াবিয়া কপটতার মাধ্যমে খেলাফত অর্জন করেছিল। হজরত উসমানের পরে সে ছিল বণি উমাইয়ার খেলাফতের আরেকজন খলিফা। যার জন্য মুসলমানদের কাছ থেকে বাইয়াত গ্রহণ করা হয়। তবে ইতিহাসে মাবিয়ার খেলাফত অর্জনের বিষয় সম্পর্কে বিভিন্ন তারিখ বর্ণিত হয়েছে যেমন: ৫ই রবিউল আওয়াল, প্রথম অথবা ১৫ই  জামাদিউল আওয়াল বর্ণিত হয়েছে। তবে প্রসিদ্ধ হচ্ছে ২৫শে রবিউল আওয়াল। (মুনতাখাবুত তাওয়ারিখ, পৃষ্ঠা ৬, বেদায়া ওয়ান নেহায়া, খন্ড ৮, পৃষ্ঠা ২০)

১২ই রবিউল আওয়াল

১- রাসুল (সা.) মদিনায় প্রবেশ করেন:

উক্ত তারিখের অস্তবেলায় রাসুল (সা.) মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় পৌছায় এবং কুবা নাক স্থানে হজরত আলি (আ.)এর জন্য অপেক্ষা করেন। যখন হজরত আলি (আ.) সেখানে এসে  পৌছান তখন রাসুল (সা.) তাঁদেরকে নিয়ে মদিনায় প্রবেশ করেন। (মাশারুশ শিয়া, পৃষ্ঠা ২৮)

তবে আহলে সুন্নতের দৃষ্টিতে এই তারিখেই নবী (স.) জন্ম গ্রহণ করেন এবং এই একই তারিখে মৃত্যু বরণ করেন।

২- মোতাসিম আব্বাসির মৃত্যু: সন ২২৭ হিজরির উক্ত তারিখে রোজ বৃহঃস্পতিবারে রাতের প্রথমভাগে মোতাসেম আব্বাসি সামেরায় মারা যায়। তার মৃত্যুর কারণ হচ্ছে সে “হেজামত”  (এক বিশেষ প্রক্রিয়ায় শরিরে বদ রক্ত বাহির করা হয়) করার পরে তার জ্বর আসে এবং উক্ত জ্বরের কারণে  সে ৪৯ বছর বয়সে মারা যায়। (তাতেম্মাতুল মুনতাহি, পৃষ্ঠা ২৯৭- ৩১০)

৩- আহমাদ বিন হাম্বালের মৃত্যুদিবস: সন ২৪১ হিজরির ‍উক্ত তারিখে হাম্বালি মাযহাবের কর্ণধারক আহমাদ বিন হাম্বাল বাগদাদে মৃত্যুবরণ করে এবং সেখানেই তাকে দাফন করা হয়। ইতিহাসের অন্য এক বর্ণনা অনুযায়ি তিনি রবিউস সানি মাসে মৃত্যুবরণ করেন। (মারাকেদুল মাআরেফ, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ১২৩)

১৪ই রবিউল আওয়াল

১- এজিদ বিন মাবিয়ার মৃত্যু: সন ৬৪ হিজরির উক্ত তারিখে এজিদ ইবনে মাবিয়া বিন আবু সুফিয়ান ৩৫ অথবা ৩৭ বছর বয়সে অতিরিক্ত মদ পানের কারণে দামেস্কে মারা যায় এবং সেখানেই তাকে দাফন করা হয়। এজিদের রাজত্বকাল ছিল তিন বছর আট মাস। এছাড়াও ইতিহাসে এজিদের মৃত্যু তরিখ সম্পর্কে অন্য মতামতও বর্ণিত হয়েছে যমন: ১৫ই রবিউল আওয়াল। (ফেইযুল আলাম, পৃষ্ঠা ২১৬, তারিখে তাবারি, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ৩৮৯)

২- আব্বাসিয় খলিফা মুসা হাদির মৃত্যু: ইতিহাসের বর্ণনা অনুযায়ি সন ১৭০ হিজরির উক্ত তারিখে আব্বাসিয় খলিফা মাহদি আব্বাসির পুত্র মুসা হাদি ২৫ অথবা ২৬ বছর বয়সে মৃত্যু বরণ করে। ইতিহাসের অন্য বর্ণনা অনুযায়ি ১৫, ১৮ তারিখটিও তার মৃত্যুর দিন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ইতিহাসে তার পাষন্ডতা, ক্রোধ এবং বিদ্বেষ ছিল প্রসিদ্ধ। (কালায়েদুন নুহুর, খন্ড রবিউল আওয়াল, পৃষ্ঠা ৮৯, তাতেম্মাতুল মুনতাহা, পৃষ্ঠা ২২৪, ২২২)

১৭ই রবিউল আওয়াল

১- হজরত মোহাম্মাদ (সা.)এর জন্মদিবস: হজরত মোহাম্মাদ (সা.) বর্তমান সৌদি আরবে অবস্থিত মক্কা নগরীর কুরাইশ বংশের বনু হাশিম গোত্রে জন্ম গ্রহণ করেন। প্রচলিত ধারনা মতে, তিনি ৫৭০ খ্রিস্টাব্দের ২৯ আগষ্ট বা আরবি রবিউল আওয়াল মাসের ১৭ তারিখ জন্মগ্রহণ কনে। সকল আলেমদের মতে রাসুল (সা.) শুক্রবার প্রভাতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মের সময় বিশ্বে অবিস্মরণিয় কিছু ঘটনা ঘটে যা ইতিহাসে লিপিবদ্ধ রয়েছে। তাঁর পিতার নাম আব্দুল্লাহ মাতার নাম ছিল আমিনা। (এলামুল ওয়ারা, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৩)

২- ইমাম জাফর সাদিক (আ.)এর জন্মদিবস: সন ৮৩ হিজরির উক্ত তারিখে ইমাম জাফর সাদিক (আ.) মদিনায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর নাম জাফর, উপনাম আবু আব্দুল্লাহ, উপাধি সাদিক। তাঁর পিতার নাম ইমাম বাকের (আ.) এবং মাতার নাম ছিল উম্মে ফারওয়া। (আল ইরশাদ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ১৭৯)

২২শে রবিউল আওয়াল

বণি নাযিরের যুদ্ধ: ৪র্থ হিজরি বণি নাযির নামক যুদ্ধটি সংঘটিত হয় এবং ইয়াহুদিদেরকে মদিনা থেকে বহিস্কার করা হয়। (আস সাহিহ মিনাস সিরাহ, খন্ড ৮, পৃষ্ঠা ৩৬)

২৩শে রবিউল আওয়াল:

কুম নগরিতে হজরত মাসুমা (সা.আ.) এর আগমণ: ফাতেমা-এ সানী, হজরত ইমাম মুসা ইবনে জাফার (আ.) এর কন্যা। তিনি শিয়াদের মাঝে কারিমায়ে আহলে বাইত (আ.) নামে সুপ্রসিদ্ধ। এছাড়া তিনি তাহেরাহ, হামিদাহ, বিররাহ, রাশিদাহ, তাকিয়াহ, নাকিয়াহ, সাইয়্যিদাহ, রাদ্বিয়াহ, উখতুর রেদ্বা, সিদ্দিকাহ, শাফিয়াহ ইত্যাদি উপাধীর অধিকারী। তার মায়ের নাম ‘নাজমা’। তিনি ১৭৩ হিজরী’র ১লা যিলক্বদ মদিনায় জন্মগ্রহণ করেন। হজরত ফাতেমা (সা. আ.) যখন ১০ বছরের ছিলেন, তখন তাঁর সম্মানিত পিতা ইমাম মুসা ইবনে জাফার (আ.) শহীদ হন। এর পর হতে পিতার ওসিয়ত অনুযায়ী এ মহিয়সী এবং ইমামের অপর সন্তানাদির অবিভাবকত্ব ইমাম রেজা (আ.) এর উপর অর্পিত হয়। হজরত ফাতেমা মাসুমা (সা. আ.) ছাড়াও ইমাম মুসা ইবনে জাফার (আ.) এর আরো কন্যা ছিলেন। তাদের মধ্যে শুধুমাত্র তিনিই ছিলেন বিশেষ মর্যাদার অধিকারী।

সন ২০১ হিজরির উক্ত তারিখে ইমাম রেযা (আ.)এর বোন হজরত ফাতেমা মাসুমা (সা.আ.) পবিত্র কুম নগরিতে আগমণ করেন এবং দিন পরে তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। (বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৫৭, পৃষ্ঠা ২১৯)

২৫শে রবিউল আওয়াল:

১- দুমাতুল জুন্দাল-এর যুদ্ধ: সন ৫ হিজরিরে উক্ত তারিখে যুদ্ধটি সংঘটিত হয়। উক্ত এলাকায় কিছু লোকজন একত্রিত হয়ে বিভিন্ন কাফেলাদেরকে লুট করতো। রাসুল (সা.) উক্ত ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত হলে তিনি মদিনাতে নিজের স্থলে সাবা বিন আরফাতা গাফফারিকে রেখে নিজেই ২৫শে রবিউল আওয়াল এক হাজার সৈন্য নিয়ে মদিনা থেকে বাহিরে আসেন। যখন রাহজানরা রাসুল (সা.) এর আগমণ সম্পর্কে অবগত হয় তখন তারা পালিয়ে যায়। তখন মুসলমানরা তাদের সকল মালামালকে নিয়ে ২০শে রবিউস সানি মদিনায় ফিরে আসে। (কালায়েদুন নুহুর, খন্ড রবিউল আওয়াল, পৃষ্ঠা ১৫০)

২- ইমাম হাসান (আ.) ও মাবিয়ার মাঝে সন্ধি: ইমাম হাসান (আ.)এর সাথে মাবিয়ার সন্ধি সংঘটিত হয়। মুয়াবিয়ার সঙ্গে ইমাম হাসান (আ.)’র সন্ধির কিছু শর্ত:

-আহলে বাইতের অনুসারীদের রক্ত সম্মানিত ও হেফাজত থাকবে এবং তাদের অধিকার পদদলিত করা যাবে না।

-মুয়াবিয়াকে হজরত আলী (আ.)’র বিরুদ্ধে মিথ্যাচার, গালি-গালাজ, অপবাদ ও প্রচারণা বন্ধ করতে হবে।

-জামাল ও সিফফিনের যুদ্ধে যারা শহীদ হয়েছেন ইরানি প্রদেশগুলোর সরকারি আয় থেকে তাদের পরিবারগুলোকে এক মিলিয়ন দেরহাম অর্থ সাহায্য দিতে হবে।

- ইমাম হাসান (আ.) মুয়াবিয়াকে আমিরুল মু’মিনিন বলে উল্লেখ করবেন না।

-মুয়াবিয়াকে অনৈসলামী আচার-আচরণ পরিহার করতে হবে এবং আল্লাহর কিতাব ও সুন্নাত অনুযায়ী আমল করতে হবে।

-মুয়াবিয়া কোনো ব্যক্তিকেই (খেলাফতের জন্য) নিজের উত্তরসূরি মনোনীত করতে পারবে না। মুয়াবিয়া মারা গেলে খেলাফত ফেরত দিতে হবে ইমাম হাসান (আ.)’র কাছে।

-ইমাম হাসান (আ.) যদি মারা যান, তাহলে মুসলিম জাহানের খেলাফত হস্তান্তর করতে হবে রাসুল(সা.)এর ছোট নাতি হজরত ইমাম হুসাইন(আ.)’র কাছে।

কিন্তু মুয়াবিয়া প্রকাশ্যেই নির্লজ্জভাবে সন্ধির শর্তগুলো লঙ্ঘন করেছিল। মুয়াবিয়া ৫০ হিজরিতে গোপনে বিষ প্রয়োগ করে ইমাম হাসান(আ.)-কে শহীদ করে। ৬০ হিজরিতে মৃত্যুর কিছু দিন আগে মুয়াবিয়া তার মদ্যপ ও লম্পট ছেলে ইয়াজিদকে মুসলমানদের খলিফা বলে ঘোষণা করে।

মুয়াবিয়া বলত যেখানে টাকা দিয়ে কাজ হয় সেখানে আমি টাকা বা ঘুষ ব্যবহার করি, যেখানে চাবুক দিয়ে কাজ হয় সেখানে আমি তরবারি ব্যবহার করি না, আর যেখানে তরবারি দরকার হয় সেখানে তরবারি ব্যবহার করি। (বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৪৪, পৃষ্ঠা ৬৫)