রাসূলুল্লাহ (সা.) মাটির মানুষ না নূরের তৈরী?

প্রশ্নটি বহুল আলোচিত এবং এ বিষয়ে দু’টি ভিন্ন মত রয়েছে:

ক- নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়ালিহি ওয়া সাল্লাম নুরের তৈরি।

খ-  নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়ালিহি ওয়া সাল্লাম নুরের তৈরি নন বরং তিনি ছিলেন আমাদেরই মত মাটির মানুষ।

এ পর্যায়ে প্রতিটি যুক্তি কোরআন হাদিসের আলোকে পর্যালোচনা করব:

ক- নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়ালিহি ওয়া সাল্লাম নুরের তৈরি

কোরআনী দলিল

হে আহলে-কিতাব! তোমাদের কাছে আমার রাসূল আগমন করেছেন! কিতাবের যেসব বিষয় তোমরা গোপন করতে, তিনি তার মধ্য থেকে অনেক বিষয় প্রকাশ করেন এবং অনেক বিষয় মার্জনা করেন। মূলতঃ তোমাদের কাছে একটি উজ্জল জ্যোতি এসেছে এবং একটি সমুজ্জল গ্রন্থ। (সূরা মায়িদা আয়াত- ১৫)

«يَأَهْلَ الْكِتَابِ قَدْ جَاءَكُمْ رَسُولُنَا يُبَينِ‏ُّ لَكُمْ كَثِيرًا مِّمَّا كُنتُمْ تخُْفُونَ مِنَ الْكِتَابِ وَ يَعْفُواْ عَن كَثِيرٍ  قَدْ جَاءَكُم مِّنَ اللَّهِ نُورٌ وَ كِتَابٌ مُّبِين»

অর্থঃ আলোচ্য আয়াতে নূর দ্বারা নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে বুঝানো হয়েছে। নিম্নে কয়েকটি প্রসিন্ধ তাফসীরের আলোকে দলিল উপস্থাপন করা হলঃ-

১- বিশ্ব বিখ্যাত মুফাসসিরে কোরআন হযরত ইবনে আববাস (রাঃ) এর বিশ্ব বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ ইবনে আববাস এর মধ্যে আছে-

قد جاءكم من الله نور و كتاب مبين يعني محمدا صلي الله عليه ؤسلم-

অর্থঃ নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট হতে তোমাদের  কাছে নূর অর্থাৎ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসেছেন। (তাফসীরে ইবনে আববাস পৃষ্ঠা ৭২)।

২- ইমাম আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে জারীর আত্-তবারী (রা) তাঁর বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ ইবনে জারীর এর মধ্যে বলেন-

قد جاءكم من الله نور و كتاب مبين يعني باالنؤر محمدا صلي الله عليه ؤسلم الذي انار الله به الحق واظهربه الاسلام ومحق به الشرك-

 

অর্থঃ নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট হতে তোমাদের  কাছে নূর অর্থাৎ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসেছেন, যে নূর দ্বারা আল্লাহ সত্যকে উজ্জ্বল ও ইসলামকে প্রকাশ করেছেন এবং শিরিককে নিশ্চিহ্ন করেছেন। (আবু জাফর মোহাম্মদ ইবনে জারীর তাবারী, জামেউল বায়ান ফি তাফসীরিল কোরআন, ৬ষ্ঠ খন্ড, পৃষ্ঠা ১০৪, সূরা মায়িদা আয়াত ১৫)।

৩- মুহীউস্সুন্নাহ আল্লামা আলাউদ্দীন আলী ইবনে মুহাম্মদ (রাঃ) (যিনি ‘খাজিন’ নামে পরিচিত) তাফসীরে খাজেনের মধ্যে বলেন-

قد جاءكم من الله نور و كتاب مبين يعنى باالنؤر محمدا صلي الله عليه وسلم انما سماه الله نور الانه يهداى بالنور في الظلام-

 

অর্থঃ নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট হতে তোমাদের  কাছে নূর অর্থাৎ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসেছেন। আল্লাহ তায়া’লা তাঁর নামকরণ করেছেন নূর, কারণ তাঁর নূরেতে হেদায়ত লাভ করা যায়। যেভাবে অন্ধকারে নূর দ্বারা পথ পাওয়া যায়। (তাফসীরে খাজিন ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা ৪১৭)।

দলিল নং ৪

ইমাম হাফেজ উদ্দীন আবুল বারাকাত আব্দুল্লাহ ইবনে আহমদ আন- নাসাফী (রা) এই আয়াত শরীফ  ( قد جاءكم من الله نور و كتاب مبين) প্রসঙ্গে বলেন-

والنور محمد عليه والسلام لانه يهتداي به كما سمي سراجا منيرا-

 

আর নূর হলেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। কেননা তাঁর নূরেতে হেদায়ত লাভ করা যায়, যেমন তাঁকে উজ্জ্বল প্রদীপ বলা হয়েছে। (তাফসীরে মাদারিক ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা ৪১৭)।

৫- ইমামুল মুতাকাল্লেমীন আল্লামা ফখরুদ্দীন রাযী (রা) এই আয়াত শরীফ  ( قد جاءكم من الله نور و كتاب مبين) প্রসঙ্গে বলেন-

ان المراد بالنور محمد صلي الله عليه و سلم وبالكتاب القران-

অর্থঃ নিশ্চয়ই নূর দ্বারা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং কিতাব দ্বারা আল কোরআন মজীদকে বুঝানো হয়েছে। (তাফসীরে কবীর ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা ৩৯৫, সূরা মায়িদা আয়াত ১৫)।

আর যারা বলে যে ‘নূর ও কিতাবে মুবীন’ দ্বারা কুরআন মজীদকেই বুঝানো হয়েছে, ইমাম রাযী (রা) সে সম্পর্কে বলেন-

هذا ضعيف لان العطف يوجب المغايرة بين المعطوف والمعطوف عليه-

 

এই অভিমত দুর্বল, কারণ আতফ (ব্যাকরণগত সংযোজিত) মা‘তুফ (সংযোজিত) ও মা‘তুফ আলাইহি (যা তার সাথে সংযোজন কারা হয়েছে ) এর মধ্যে ভিন্নতা  প্রমাণ করে। (তাফসীরে কবীর ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা ৩৯৫)।

৬- ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রা) বলেনঃ

قد جاءكم من الله نور هو نور النبى صلي الله عليه وسلم-

 

অর্থঃ নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট হতে তোমাদের কাছে নূর এসেছে, তা হল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নূর মোবারক। (তাফসীরে জালালাইন শরীফ পৃষ্ঠা ৯৭)

৭- আল্লামা মাহমূদ আলূসী বাগদাদী (রা) বলেন-

  قد جاءكم من الله نور هو نورعظيم هو نور الانوارالنبى المختار صلى الله عليه وسلم الى ذهب قتادة والزجاج-

 

অর্থঃ নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট হতে তোমাদের কাছে মহান নূর এসেছে । আর তিনি হলেন নূরুল আনোয়ার নবী মোখতার সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। এটাই হযরত কাতাদাহ ও যুজাজের অভিমত। (তাফসীরে রুহুল মাআনী ৬ষ্ঠ খন্ড, পৃষ্ঠা ৯৭)।

৮- আল্লামা ইসমাঈল হক্কী (রা) বলেন-

قيل المراد باالاول هو الرسول صلى الله عليه وسلم وبالثانى القران-

 

অর্থঃ বলা হয়েছে যে, প্রথমটা অর্থাৎ নূর দ্বারা রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বুঝানো হয়েছে এবং দ্বিতীয়টা অর্থাৎ কিতাবে মুবীন দ্বারা কুরআন কে বুঝানো হয়েছে। (তাফসীরে রুহুল বয়ান ২খন্ড, পৃষ্ঠা ২৬৯)

আরো অগ্রসর হয়ে বলেন-

سمى الرسول نورا لان اول شيئ اظهره الحق بنور قدرته من ظلمة العدم كان نور محمد صلي الله عليه و سلم كما قال اول ما خلق الله نورى-

 

অর্থ: আল্লাহ তায়া‘লা রসূল আকরাম  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নাম রেখেছেন নূর। কেননা আল্লাহ তায়া‘লা তাঁর কুদরতের নূর থেকে সর্বপ্রথম যা প্রকাশ করেছেন তা তো মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নূর মোবারক। যেমন তিনি ফরমায়েছেন- আল্লাহ তায়া‘লা সর্বপ্রথম আমার নূর মোবারক কে সৃষ্টি করেছেন। (তাফসীরে রুহুল বয়ান ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা ৩৬৯)।

৯- ইমাম মুহীউস সুন্নাহ আবু মু‏হাম্মদ আল- হোসাইন আল-ফাররা আল-বাগাভী (রা) বলেন-

قد جاءكم من الله نور يعنى باالنؤر محمدا صلي الله عليه وسلم-

 

অর্থঃ নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট হতে তোমাদের  কাছে নূর অর্থাৎ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসেছেন। (তাফসীরে মাআলিমুত তান্যীল, ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা ২৩, তাফসীরে খাযিনের পাদ টীকা) 

দ্বিতীয় মত: রাসূলুল্লাহ (সা.) মাটির মানুষ, নূরের তৈরী নন

আল্লাহ বলেন, ‘(হে নবী!) ‘তুমি বলে দাও, নিশ্চয়ই আমি তোমাদের মত একজন মানুষ মাত্র। (পার্থক্য হ’ল) আমার নিকট ‘অহি’ করা হয় ...’ (কাহ্ফ ১৮/১১০) ।

«قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِّثْلُكمُ‏ْ يُوحَى إِلىَ‏َّ أَنَّمَا إِلَاهُكُمْ إِلَاهٌ وَاحِدٌ  فَمَن كاَنَ يَرْجُواْ لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَ لَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدَا»

 

এটা কেবল আমাদের নবীই নন, বরং বিগত সকল নবীই স্ব স্ব কওমের উদ্দেশ্যে একথা বলেছিলেন, ‘নিশ্চয়ই আমরা তোমাদের মত মানুষ মাত্র’ (ইবরাহীম ১৪/১১)।

«قَالَتْ لَهُمْ رُسُلُهُمْ إِن نحَّْنُ إِلَّا بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ وَ لَاكِنَّ اللَّهَ يَمُنُّ عَلىَ‏ مَن يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ  وَ مَا كاَنَ لَنَا أَن نَّأْتِيَكُم بِسُلْطَنٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ  وَ عَلىَ اللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُون»

 

বস্ত্ততঃ ফেরেশতারা হ’ল নূরের তৈরী, জিনেরা আগুনের তৈরী এবং মানুষ হ’ল মাটির তৈরী মুসলিম হা/২৯৯৬; মিশকাত হা/৫৭০১; মুমিনূন ২৩/১২, আন‘আম ৬/২)।

তবে কোরআনের সূরা মায়েদার ১৫ নং আয়াতের পাশাপাশি অনেক হাদিসই বর্ণিত হয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়ালিহি ওয়া সাল্লাম নূরের তৈরি ছিলেন। তবে এর অর্থ হল এরূপ যে, তাঁর মূল অস্তিত্ব নুরের কিন্তু তাঁর দৈহিক অবয়ব ছিল মাটির তৈরি। আর তাই  কুরআনে বলা হয়েছে যে, তিনি তোমাদের মত মানুষ ছিলেন’ (কাহফ ১৮/১১০)। আর মানুষ বলেই তো তিনি পিতা-মাতার সন্তান ছিলেন এবং সন্তানের পিতা ছিলেন। তিনি খানা-পিনা ও বাজার-ঘাট করতেন। অতএব রাসূল (ছাঃ) যে মাটির তৈরী মানুষ।

 অতএব বিবেক দিয়ে বিচার করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়ালিহি ওয়া সাল্লাম ‘র সৃষ্টি মূলতঃ দু’টি অস্তিত্ব ছিল: প্রথমতঃ মূল অস্তিত্ব ছিল নূরের কিন্তু তাঁর দৈহিক অবয়ব ছিল মাটির তৈরি।

গ্রন্থ সূত্রসমূহ

  1. আবু জাফর মোহাম্মদ ইবনে জারীর তাবারী (মৃ: ৪র্থ হিজরি), জামেউল বায়ান ফি তাফসীরিল কোরআন, বৈরুত, দারুল মারেফাত, ১৪১২ হি, প্রথম।