শিয়া-সুন্নি বিরোধ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন এবং উভয় পক্ষের জবাব

শিয়া-সুন্নি বিভেদ ও দ্বন্দ বহু পুরনো বিষয়। এই দ্বন্দ নিরসনে ইতিহাসে বহু দ্বীনি ব্যক্তিত্ব বৃহত্তর মুসলিম ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন। ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পরপর ডা. জাকির নায়েকের ওস্তাদ আহমদ দীদাত ইরানের যান এবং সেখান থেকে ফিরে এসে শিয়া-সুন্নি ঐক্য ডায়লগে তাঁর অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছিলেন।

যা-ই হোক, এই দ্বন্দ নিশ্চিতভাবেই মুসলমানদের জন্য একটি নেতিবাচক ও দুর্বলতার দিক। এমনকি তা অনেককে চরমপন্থার দিকেও নিয়ে গিয়েছে। অতিতে শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ আলেমসমাজ ও কতিপয় জানাশোনা ব্যক্তির মাঝে সীমাবদ্ধ ছিল, বর্তমান সহজ তথ্যপ্রযুক্তির যুগে তা প্রায় সকল লেভেলে ছড়িয়ে পড়েছে। দেখা যাচ্ছে যে, একদল আরেক দলকে এমন অনেক অভিযোগ করছে, যেগুলো হয়তো শিয়া-সুন্নি উভয় আলেমই অগ্রহণযোগ্য বলে বাতিল করে দেবেন। তবে তথ্যের অবাধ প্রবাহের একটি সুবিধা হলো, এতে মিথ্যার প্রচার যেমন অতি সহজ, তেমনি একইভাবে মানুষের দ্বারে সত্যকে পৌঁছে দেয়াও খুব সহজ।

আমি ব্যক্তিগতভাবে শিয়া ও সুন্নি উভয়কেই মুসলিম ভাই বলে গণ্য করি। কিন্তু তাদের বৃহত্তর ঐক্যে পৌঁছানোর ব্যর্থতা, পরস্পর শত্রুতা ও প্রেজুডিস থেকে সত্য গ্রহণের অনীহা, ইত্যাদি দুনিয়ার বুকে আল্লাহর কাজ আঞ্জাম দেয়ার পথে পরিপন্থী বলেই মনে হয়। আল্লাহ তা'আলা মানুষকে পৃথিবীতে তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে পাঠিয়েছেন, এবং মুসলমনাদের দায়িত্ব হলো ঐক্যবদ্ধভাবে সেই কাজ আঞ্জাম দেয়া। কিন্তু সেই কাজ আঞ্জাম দেয়ার পরিবর্তে অনেকেই অন্তর্কোন্দলে এত বেশি ব্যতিব্যস্ত যে, শত্রুকে চেনা ও জানার সুযোগ ও যোগ্যতা -- কোনটিই হয়ে উঠছে না।

মুসলিম জাতির এই আভ্যন্তরীণ কোন্দল ফেইসুবকেও উঠে এসেছে। এমনই কিছু চরমপন্থী ও নিন্দনীয় প্রচার-প্রপাগ্যান্ডা দেখে সত্যকে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছি। তা থেকেই কিছুদিন আগে শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব বিষয়ে কিছু জিনিস পরিষ্কারভাবে জানার চেষ্টা করেছি। দীর্ঘদিন যাবৎ ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা করছেন, এমন একজনের কাছে কিছু প্রশ্ন পাঠিয়েছিলাম, যার জবাব ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরব ইন শা আল্লাহ। প্রশ্নগুলো ছিল :

১. ‚গাদিরে খুম" এর বিষয়টি কী?

২. ইসলামের ইতিহাসের প্রথম তিন খলিফা সম্পর্কে শিয়া দৃষ্টিভঙ্গি কী? প্রচলিত সুন্নি মতামতের সাথে মতানৈক্য কোথায়?

৩. ‚বারো ইমাম" কারা, এবং তাদের ব্যাপারে শিয়া ও সুন্নিদের দৃষ্টিভঙ্গি কী?

৪. হযরত আয়েশা (রা.) এর ব্যাপারে শিয়াদের প্রতি সুন্নি অ্যালিগেশানগুলো কী কী?

৫. "১১৪টি সূরার কোরআনকে শিয়ারা মূল কোরআন মনে করে না, তাদের আরো কিছু সূরা আছে" -- এজাতীয় অ্যালিগেশান কিসের থেকে এসেছে বা এমনটা আগে শুনেছেন কিনা।

উত্তরগুলো হুবহু তুলে দেবার আগে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করার প্রয়োজন বোধ করছি। আস্থাপূর্ণ উৎস মানুষের জ্ঞান অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এমন আস্থার ব্যক্তি বাবা-মা, ভাই-বোন, বন্ধু-শিক্ষক, দ্বীনি আলেম, সাহাবীগণ, নবীগণ এবং কুরআন পর্যন্ত বিস্তৃত। সবার পক্ষে সম্ভব নয় যে দীর্ঘ সময় জ্ঞান গবেষণা করে প্রয়োজনীয় সকল প্রশ্নের উত্তর খুঁজে নেবে। আমি এখানে যেই উত্তর তুলে ধরছি, সেটির উৎসের ব্যাপারে আমার আস্থা আছে। তবে অন্য কারো আস্থা না থাকাটাই স্বাভাবিক এবং পাঠকদেরকে মুক্ত বিচারবুদ্ধির দৃষ্টিতেই লেখাটিকে বিচার করতে অনুরোধ করছি। বিতর্ক, বিশেষত ফ্যালাসি এড়ানোর জন্য সোর্স অনুল্লেখিত রাখছি।

এছাড়াও, এই লেখার বিষয়বস্তুকে ডিফেন্ড করার জন্য আমি দায়বদ্ধ নই। তাছাড়া লেখায় শিয়া-সুন্নি উভয় মতামত নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে তুলনামূলকভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

লেখার ভাষা তুলনামূলকভাবে কঠিন মনে হতে পারে। কিন্তু স্পর্শকাতর বিষয়ে সম্পাদনা করা থেকে বিরত থেকেছি।

কয়েকটি সংবেদনশীল মাযহাবী প্রশ্নের জবাব

১- গাদিরে খুমের ঘটনা

গ্বাদীরে খুম্‌ মক্কা থেকে মদীনা শরীফে যাবার পথে মক্কার অদূরবর্তী একটি নীচু জায়গা। হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ) বিদায় হজ্বের পর মদীনায় ফিরে যাবার পথে ১৮ই যিল্‌হাজ্ব তারিখে গ্বাদীরে খুমে উপনীত হবার পর - যখন তাঁর সাথে হজ্ব করতে আসা ছ্বাহাবীদের অনেকে তাঁর আগে অনেক দূর চলে গিয়েছিলেন, অনেকে তাঁর থেকে পিছনে পড়ে ছিলেন এবং অনেকে তাঁর সাথে ছিলেন - তিনি তাঁর সাথের ছ্বাহাবীদের থামার জন্য নির্দেশ দিলেন, যারা আগে চলে গিয়েছিলেন তাঁদেরকে ফিরিয়ে আনার জন্য লোক পাঠালেন এবং যারা পিছনে পড়ে ছিলেন তাঁদের পৌঁছার জন্য অপেক্ষা করলেন। মরুভূমির প্রচণ্ড তাপদাহের মধ্যে সকলে এসে পৌঁছার পর কয়েকটি উটের জিন্‌ একত্র করে একটি মঞ্চ তৈরী করা হলো। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ) হযরত ‘আলী(রাঃ)কে সাথে নিয়ে মঞ্চে উঠলেন এবং সকলের উদ্দেশে একটি ভাষণ দিলেন। এ ভাষণের শেষে তিনি হযরত ‘আলী (রাঃ)-এর হাত উঁচু করে তুলে ধরে বললেনঃ “আমি যার মাওলা, অতঃপর এই ‘আলী তার মাওলা।”

এ ঘটনাটি শিয়া-সুন্নী উভয় ধারার হাদীছ্‌-গ্রন্থসমূহে বিপুল সংখ্যক সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যার সত্যতায় বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই এবং কোন হাদীছ-বিশারদ সন্দেহ করেন নি। এ ভাষণের বিস্তারিত পাঠ (text) সম্পর্কে কিছু মতপার্থক্য থাকলেও ওপরে উদ্ধৃত মূল ঘটনা ও উপরোক্ত ‚আমি যার মাওলা, অতঃপর এই ‘আলী তার মাওলা।” বাক্যটি সম্পর্কে কোনরূপ মতপার্থক্য নেই। মতপার্থক্য যা আছে তা হচ্ছে এ বাক্যে ব্যবহৃত ‚মাওলা” শব্দের তাৎপর্য সম্পর্কে।

আরবী ভাষায় ‘মাওলা’ একটি বহু-অর্থ জ্ঞাপক শব্দ। এর অর্থ মনিব, দাস, বন্ধু, অভিভাবক ও শাসক।

শিয়া মাযহাবের মতে, এখানে ‘মাওলা’ বলতে ‘অভিভাবক ও শাসক’ বুঝানো হয়েছে। কিন্তু সুন্নী আলেমদের মতে, এখানে ‘বন্ধু’ বুঝানো হয়েছে।

সুন্নী আলেমদের দাবীর জবাবে শিয়া আলেমদের বক্তব্য হচ্ছে, কোরআন মজীদের বিভিন্ন আয়াত অনুযায়ী মুসলমানরা সকলেই পরস্পরের বন্ধু। এমতাবস্থায় হযরত ‘আলী (রাঃ)কে আলাদাভাবে মুসলমানদের বন্ধু হিসেবে পরিচিত করানো, তা-ও ঐ প্রচণ্ড গরমের মধ্যে এতো বড় একটা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে, বিচারবুদ্ধির দৃষ্টিতে একটি বাহুল্য ও বাড়াবাড়িমূলক কাজ হিসেবে গণ্য হতে বাধ্য - যে ধরনের কাজ কোন নবী-রাসূলের পক্ষেই সম্ভব নয়। অতএব, নিঃসন্দেহে রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ) একটি গুরুদায়িত্ব পালনের জন্যই তপ্ত মরুর কষ্টকর পরিস্থিতিতে এ ধরনের একটি বিশাল সমাবেশ ও অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এ কথাটি ঘোষণা করেন। আর যেহেতু তাঁকে আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল যে, তিনি আর বেশীদিন বাঁচবেন না -বিদায় হজ্বের ভাষণে তিনি যেদিকে ইঙ্গিত করেছিলেন, সেহেতু ইন্তেকালের আগে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর পরবর্তী স্থলাভিষিক্ত ব্যক্তি (মুসলিম উম্মাহ্‌র শাসক এবং পার্থিব ও দ্বীনী অভিভাবক)কে উম্মাহ্‌র সামনে পরিচিত করিয়ে যান।

শিয়া মাযহাবের পক্ষ থেকে তাদের এ ব্যাখ্যার সমর্থনে শিয়া-সুন্নী উভয় সূত্রে বর্ণিত আরো বহু হাদীছ ও ঐতিহাসিক ঘটনা এবং কোরআন মজীদের কোন কোন আয়াত উল্লেখ করা হয়।

এর মধ্যে একটি ঘটনা এরূপ যে, রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ) নবুওয়াতের দায়িত্ব পালনের জন্য আদিষ্ট হওয়ার পর তিনি যখন গোপনে বাছাই করা লোকদের মধ্যে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছিলেন তার এক পর্যায়ে আল্লাহ তাঁকে স্বীয় ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনকে দাওয়াত দেয়ার জন্য নির্দেশ দেন (সূরাহ্‌ আশ্‌-শু‘আরা : ২১৪)। তখন তিনি তাঁর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনকে তাঁর বাড়ীতে আপ্যায়ন করে ইসলামের দাওয়াত দেন। উক্ত মজলিসে তিনি সকলের সামনে হযরত ‘আলী (রাঃ)কে দ্বীনের কাজে তাঁর ওয়াযীর্‌ (বোঝা/ দায়িত্ব বহনকারী বা সহকারী), ওয়াছ্বী (trustee) ও খলীফা  (প্রতিনিধি ও স্থলাভিষিক্ত) হিসেবে ঘোষণা করেন।

উভয় ধারার কাছে গ্রহণযোগ্য আরেকটি হাদীছ অনুযায়ী, রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ) হযরত ‘আলী (রাঃ)কে সম্বোধন করে এরশাদ করেনঃ ‚তোমার সাথে আমার সম্পর্ক হচ্ছে হারূনের সাথে মূসার সম্পর্কের ন্যায়, কিন্তু আমার পরে আর কোন নবী নেই।”

উভয় সূত্রে বর্ণিত আরো কতক হাদীছ অনুযায়ী, রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ) এরশাদ করেনঃ আলী আমা থেকে এবং আমি আলী থেকে। ‚আলীকে যে ভালোবাসলো সে আমাকে ভালোবাসলো এবং আলীর সাথে যে দুশমনী করলো সে আমার সাথে দুশমনী করলো।”

রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ) বিভিন্ন যুদ্ধে যখন সেনাবাহিনী পাঠান তার অনেকগুলোতে হযরত ‘আলীকে সেনাপতি করে পাঠান এবং শীর্ষস্থানীয় ছ্বাহাবীগণকে তাঁর অধীনে যুদ্ধ করার জন্য পাঠান, কিন্তু যেসব যুদ্ধে অন্য কাউকে সেনাপতি করে পাঠান সেসব যুদ্ধে হযরত ‘আলীকে পাঠান নি, বরং তাঁকে নিজের কাছে রেখে দেন।

শিয়া মাযহাবের যুক্তি হচ্ছে, এসব ঘটনা ও হাদীছ এটাই প্রমাণ করে যে, হযরত ‘আলী (রাঃ) ছিলেন রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর সহকারী এবং তাঁর দ্বারা পরবর্তী নেতা ও শাসক হিসেবে মনোনীত।

শিয়া মাযহাবের যুক্তি

শিয়া মাযহাবের পক্ষ থেকে এ মর্মে বিচারবুদ্ধির (reason) দলীল উপস্থাপন করা হয় যে, যেহেতু রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর পরে আর কোন নবী আসবেন না সেহেতু ইসলামী উম্মাহকে বিভ্রান্তি ও পথচ্যুতি থেকে রক্ষা করার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে নবীর গুণাবলীর অধিকারী নিষ্পাপ ও নির্ভুল নেতা ও শাসক মনোনীত হওয়া অপরিহার্য, আর এ ধরনের ব্যক্তি ছিলেন (পর্যায়ক্রমে) হযরত ‘আলী ও তাঁর বংশে আগত এগারো জন ইমাম। হযরত ‘আলী যে নিষ্পাপ ছিলেন তার প্রমাণ, কোরআন মজীদে রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর আহলে বাইতের পবিত্রতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে (সূরাহ্‌ আল্‌-আহযাব : ৩৩) এবং শিয়া-সুন্নী উভয় সূত্রের হাদীছ অনুযায়ী আহলে বাইত্‌ বলতে হযরত ফাতেমাহ্‌, হযরত ‘আলী, হযরত ইমাম হাসান ও হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ)কে বুঝানো হয়েছে।

মাযহাবের যুক্তি

সুন্নীদের পক্ষ থেকে বলা হয় যে, রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর ইন্তেকালের পরে মুসলিম উম্মাহ্‌র জন্য কোরআন-সুন্নাহ্‌ই যথেষ্ট এবং তারা নিজেরাই নিজেদের নেতা নির্বাচন করতে পারে; আল্লাহর পক্ষ থেকে নেতা মনোনীত করার প্রয়োজন নেই।

এর জবাবে শিয়াদের পক্ষ থেকে বলা হয় যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে মনোনীত নিষ্পাপ ও নির্ভুল নেতা ব্যতীত অন্য নেতার ভুল না করার কোনই নিশ্চয়তা নেই এবং ইসলামের ইতিহাস প্রমাণ করে যে, এসব নেতারা ভুল করেছেন এবং মুসলিম উম্মাহ্‌র মধ্যে ফিতনাহ্‌-ফাসাদ, রক্তপাত ও গোম্‌রাহী (এমনকি খলীফাকে হত্যার মতো ঘটনা) এ কারণেই ঘটেছে।

তাদের মতে, কোরআন নিজেই যথেষ্ট নয়; এর জন্য নিষ্পাপ ও নির্ভুল ব্যাখ্যাকারী ও বাস্তবায়নকারী প্রয়োজন, নচেৎ আল্লাহ জিব্‌রাঈলের মাধ্যমে সরাসরি কোরআন পাঠাতেন, কোরআনের সাথে রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)কে পাঠাতেন না। এছাড়া রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর ইন্তেকালের পরে চার জন খলীফা  চার নিয়মে দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হয়েছেন - যাকে সঠিক বলে গ্রহণ করলে মানতে হবে যে, ইসলামে কোন সুনির্দিষ্ট শাসকনিয়োগ পদ্ধতি নেই।

অন্যদিকে রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর পর কোরআন-সুন্নাহকে যথেষ্ট বলা হলেও প্রথম তিন খলীফা  রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর খুব কম সংখ্যক হাদীছের সাথে পরিচিত ছিলেন, কারণ, তাঁদের কেউই নবুওয়াতের তেইশ বছর পুরোপুরি রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর সাহচর্যে ছিলেন না; একমাত্র হযরত ‘আলীই তাঁর পূর্ণাঙ্গ সাহচর্যে ছিলেন এবং এ সাহচর্যের কারণে কোরআনের পূর্ণাঙ্গ তাৎপর্য ও রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর সমগ্র সুন্নাতের সাথে পরিচিত ছিলেন - যে কারণে, (শিয়া-সুন্নী উভয় সূত্র অনুযায়ী) রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ) বলেছেনঃ ‚আমি জ্ঞানের নগরী, আর ‘আলী তার (তাতে প্রবেশের) দরযা।” তাছাড়া প্রথম খলীফা  ও দ্বিতীয় খলীফা  হাদীছ লিপিবদ্ধকরণ নিষিদ্ধ করেন এবং অনেক লিখিত হাদীছ পুড়িয়ে ফেলেন। কোন কোন শিয়া মনীষীর মতে, দু’টি কারণে তাঁরা হাদীছ্‌ লিপিবদ্ধকরণে বাধা সৃষ্টি করেন। একটি কারণ হচ্ছে এই যে, যেহেতু তাঁরা রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর সুন্নাতের জ্ঞানে পারদর্শী ছিলেন না সেহেতু বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভুল করতেন এবং সুন্নাতের জ্ঞানে পারদর্শী ছ্বাহাবীগণ তাঁদেরকে শুধরে দিতেন (যার অনেক দৃষ্টান্ত সুন্নী ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লিখিত হয়েছে), এমতাবস্থায় হাদীছ লিপিবদ্ধ করা হলে তাঁদেরকে সুন্নাত্‌-বিশেষজ্ঞ ছ্বাহাবীদের ওপর আরো বেশী নির্ভরশীল হয়ে পড়তে হতো এবং তা খলীফা  হিসেবে তাঁদের মর্যাদাকে ম্লান করে ফেলতো। দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে এই যে, সুন্নাত্‌ লিপিবদ্ধ করা হলে তা অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের নিজস্ব বিবেচনা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতো। তাই তাঁরা হাদীছ্‌ লিপিবদ্ধকরণ নিষিদ্ধ করে অধিকতর স্বাধীনতা ভোগ করতে চেয়েছিলেন। আর তাঁরা যে সব সময় সুন্নাতের অনুসরণ করেন নি তার প্রমাণ হযরত ওমর (রাঃ)-এর পরে হযরত ‘আলী (রাঃ)কে দুই খলীফা র নীতি অনুসরণ করার শর্তে খলীফা  করার প্রস্তাব দেয়া হলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন।

এমনকি হাদীছ্‌ লিপিবদ্ধকরণ নিষিদ্ধের পিছনে নিহিত তাঁদের উদ্দেশ্য যদি ভালোও হয়ে থাকে তথাপি তা ছিল বিরাট একটি ভুল কাজ যার ফলে পরবর্তীকালে হাজার হাজার জাল হাদীছ রচিত হওয়া সহ মুসলিম উম্মাহ্‌র মধ্যে বিভিন্ন ধরনের বিভ্রান্তি ও মতানৈক্য সৃষ্টি হয়েছিল; যেহেতু তাঁরা আল্লাহর মনোনীত নিষ্পাপ ও নির্ভুল নেতা এবং রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর যথার্থ স্থলাভিষিক্ত ছিলেন না এ কারণেই তাঁরা এতো বড় ভুল করেছিলেন।

চলবে ইন শা আল্লাহ।