শিয়া-সুন্নি বিরোধ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ চতূর্থ প্রশ্ন: হযরত —আয়েশাহ্‌ (রাঃ) সম্পর্কে শিয়া দৃষ্টিভঙ্গি কী?

হযরত —আয়েশাহ্‌ (রাঃ) সহ রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর বিবিগণ সম্বন্ধে সুন্নীদের দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে নেহায়েতই অন্ধ ভক্তিমূলক - যার পিছনে কোন অকাট্য দলীল নেই। কিন্তু শিয়া মাযহাবের অনুসারীগণ হযরত খাদীজাহ্‌ (রাঃ) ব্যতীত তাঁদের অন্য কারো সম্পর্কে এরূপ কোন অন্ধ ভক্তি পোষণ করে না।  [হযরত খাদীজাহ্‌ (রাঃ) এর ব্যতিক্রম।  কারণ, শিয়া-সুন্নী উভয় ধারার হাদীছে তাঁকে মানবকুলের চারজন শ্রেষ্ঠতমা নারীর অন্যতম বলে উল্লেখ করা হয়েছে।]

অবশ্য কোরআন মজীদে রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর বিবিগণকে মু—মিনদের মা অর্থাৎ মাতৃতুল্য সম্মানার্থ (অর্থাৎ সম্মানের যোগ্য) বলে উল্লেখ করা হয়েছে এবং রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর ইন্তেকালের পরে তাঁদের কাউকে বিবাহ করা উম্মাতের জন্য হারাম করা হয়েছে। কিন্তু মু—মিনদের মা হিসেবে সম্মানার্থ হওয়ার মানে এনে নয় যে, তাঁরা অনিবার্যভাবে নিষ্পাপ ও নির্ভুল হবেন; কোরআনে বা হাদীছে তাঁদের জন্য এরূপ কোন মর্যাদা উল্লেখ করা হয় নি। তাঁদেরকে আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্তও গণ্য করা হয় নি, অর্থাৎ তাঁদের পবিত্রতা বা নিষ্পাপত্বের কথা বলা হয় নি। আখেরাতে তাঁদেরকে তাঁদের আমলের ভিত্তিতে দেখা হবে।

কোরআন মজীদে তাঁদের দ্বারা গুনাহ্‌ সংঘটিত হওয়ার সম্ভাবনা অস্বীকার করা হয় নি। যেমন, আল্লাহ তা—আলা এরশাদ করেনঃ ‚হে নবী! আপনার স্ত্রীদেরকে বলুন, তোমরা যদি পার্থিব জীবন ও তার সৌন্দর্য (ভোগ-বিলাসিতা) কামনা কর তাহলে এসো, আমি তোমাদেরকে ভোগ্য উপকরণাদির ব্যবস্থা করে দেই এবং তোমাদেরকে উত্তমভাবে বিদায় করে দেই। আর তোমরা যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে এবং পরকালের গৃহকে কামনা কর তাহলে অবশ্যই (জেনো যে,) আল্লাহ তোমাদের মধ্যকার উত্তম কর্ম সম্পাদনকারীদের জন্য মহাপুরস্কার প্রস্তুত করে রেখেছেন। হে নবী-পত্নীগণ! তোমাদের মধ্য থেকে যে প্রকাশ্যে অশ্লীল কাজ করবে তাকে দ্বিগুণ শাস্তি দেয়া হবে এবং এটা আল্লাহর জন্য খুবই সহজ।” (সূরাহ্‌ আল্‌-আহ্‌যাব : ২৮-৩০)

কোরআন মজীদের সূরাহ্‌ আত্‌-তাহ্‌রীম্‌ থেকে জানা যায় যে, হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ) তাঁর কোন একজন স্ত্রীর কাছে একটি গোপন কথা বললে তিনি গোপনীয়তা ভঙ্গ করে তা রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর অপর এক স্ত্রীর কাছে বলে দেন। এছাড়া তাঁর দুই স্ত্রী [যথাসম্ভব ঐ দু—জনই অর্থাৎ যারা একজন আরেক জনের কাছে রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর গোপন কথা বলে দিয়েছিলেন] ‚রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর বিরুদ্ধে” পরস্পরকে সাহায্য করতে তথা তাঁর বিরুদ্ধে কোন একটি বিষয়ে চক্রান্ত করতে যাচ্ছিলেন। এ জন্য আল্লাহ তা—আলা তাঁদেরকে কঠোর ভাষায় তিরষ্কার করেন ও সতর্ক করে দেন এবং তাওবাহ্‌ করার জন্য নছ্বীহত্‌ করেন। সুন্নী সূত্রের হাদীছ্‌ অনুযায়ী এ দু—জন ছিলেন হযরত —আয়েশাহ্‌ (রাঃ) ও হযরত হাফ্‌ছ্বাহ্‌ (রাঃ)। [পবিত্র কোরআনুল্‌ করীম - মুফতী মুহাম্মাদ শফীর তাফসীরের মাওলানা মুহিউদ্দন খান কৃত বাংলা অনুবাদ, পৃঃ ১৩৮৭)]

এতে কোনই সন্দেহ নেই যে, যে কোন ঈমানদার কর্তৃক, বিশেষ করে নবীর (সাঃ) একজন ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি কর্তৃক - যাকে তিনি বিশ্বাস করে কোন গোপন কথা বলেছিলেন - তাঁর গোপন কথা অন্যের কাছে বলে দেয়া একটি গুরুতর অপরাধ ছিল। কিন্তু এখানেই শেষ নয়।

আল্লাহ তা—আলা এরপর এরশাদ করেনঃ “তোমাদের দু—জনের অন্তর অন্যায়ের প্রতি ঝুঁকে পড়ার কারণে তোমরা যদি তাওবাহ্‌ করো (তো ভালো কথা), নচেৎ তোমরা দু—জন যদি তাঁর (রাসূলের) বিরুদ্ধে পরস্পরকে সহায়তা কর (তথা তাঁর বিরুদ্ধে চক্রান্ত কর) তাহলে (জেনে রেখো,) অবশ্যই আল্লাহই তাঁর অভিভাবক, আর এছাড়াও জিবরাঈল, উপযুক্ত মু—মিনগণ ও ফেরেশতাগণ তাঁর সাহায্যকারী।” (সূরাহ্‌ আত্‌-তাহ্‌রীমঃ ৪)

পরবর্তী আয়াত থেকে মনে হয় যে, তাঁদের দু—জনের কাজটি এমনই গুরুতর ছিল যে কারণে হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ)-এর পক্ষ থেকে তাঁদেরকে তালাক প্রদান করা হলেও অস্বাভাবিক হতো না।

এ থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে, হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ)-এর বিবিগণ মা—ছূম (নিষ্পাপ ও নির্ভুল) ছিলেন না এবং তাঁরা আহলে বাইত্‌-এর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। কিন্তু এরপরও অনেকে ভাবাবেগের বশে কেবল আল্লাহর রাসূলের স্ত্রী হবার কারণে তাঁদেরকে পাপ ও ভুলের উর্দ্ধে গণ্য করেন। তাঁদের এ ভুল ভেঙ্গে যাওয়ার জন্য কোরআন মজীদের নিম্নোক্ত আয়াতই যথেষ্ট হওয়া উচিত - যা হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ)-এর স্ত্রীগণের সমালোচনা ও তাঁদের উদ্দেশে উচ্চারিত হুমকির ধারাবাহিকতায় তাঁদেরকে সতর্ক করার লক্ষ্যে নাযিল হয়েছেঃ

“যারা কাফের হয়েছে তাদের জন্য আল্লাহ নূহের স্ত্রী ও লূত্বের স্ত্রীর উপমা প্রদান করেছেন; তারা দু—জন আমার দু—জন নেক বান্দাহ্‌র আওতায় (বিবাহাধীনে)ছিল, কিন্তু তারা উভয়ই তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করলো। ফলে তারা দু—জন (নূহ্‌ ও লূত্ব) তাদের দু—জনকে আল্লাহর (শাস্তি) থেকে রক্ষা করতে পারলো না; আর তাদেরকে বলা হলোঃ (অন্যান্য) প্রবেশকারীদের সাথে দোযখে প্রবেশ করো।” (সূরাহ্‌ আত্‌-তাহ্‌রীম্ : ১০)

এ থেকে সুস্পষ্ট যে, কেবল নবীর স্ত্রী হওয়ার কারণেই কেউ সমালোচনার উর্দ্ধে বিবেচিত হতে পারেন না। আর হযরত —আয়েশাহ্‌ কেবল উপরোক্ত ঘটনার সাথেই জড়িত ছিলেন না। রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর ইন্তেকালের আগে ও পরে তিনি সমালোচনাযোগ্য আরো কতগুলো কাজে জড়িত ছিলেন। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর হচ্ছে হযরত —আলী (রাঃ)-এর (যাকে সুন্নীরাও বৈধ খলীফা  মনে করে) —উটের যুদ্ধ— নামে বিখ্যাত যুদ্ধে ও পরে বছ্বরাহ্‌র যুদ্ধে নেতৃত্ব দান - যে দুই যুদ্ধে হাজার মুসলমান নিহত হন। অথচ আল্লাহ তা—আলা বিশেষভাবে রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর বিবিগণকে গৃহে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন(সূরাহ্‌ আল্‌-আহ্‌যাব : ৩৩)। কিন্তু তিনি আল্লাহ তা—আলার এ আদেশের নাফরমানী করেছেন।

শিয়া মাযহাবের অনুসারীরা হযরত —আয়েশাহর এসব কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে থাকে।  কারণ, তারা মনে করে যে, তাঁর এসব কর্মকাণ্ডের কারণে ইসলাম ও ইসলামী উম্মাহ্‌র অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে।

কোরআন ও শিয়া মাযহাব

শিয়া-সুন্নী নির্বিশেষে সকলেরই ঐশী গ্রন্থ কোরআন মজীদ একটিই; এতে কোনই পার্থক্য নেই।  পার্থক্য যা কিছু আছে তা কোরআনের ব্যাখ্যায় এবং ব্যাখ্যায় মতপার্থক্য একই মাযহাবের বিভিন্ন মুফাসসিরের মধ্যেও রয়েছে। যারা প্রচার করেছে যে, শিয়াদের আলাদা কোরআন রয়েছে তারা নিঃসন্দেহে মিথ্যাবাদী। আর যারা কোনরূপ অনুসন্ধান না করেই এ মিথ্যাকে সত্য বলে গ্রহণ করেছে ও অন্যদেরকে বলছে তারা চরম দায়িত্ব-জ্ঞানহীন। বর্তমান বিশ্ব হচ্ছে সহজ যোগাযোগ ও তথ্যপ্রবাহের যুগ; এ যুগে এ ধরনের মূর্খতাসুলভ আচরণ বিস্ময়কর। ইরান হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বেশী শিয়া অধ্যুষিত দেশ।  বাংলাদেশের হাজার হাজার মানুষ সেখানে বসবাস করেছেন ও করছেন; আজ পর্যন্ত তাঁদের কেউ কি ইরানে মুদ্রিত ভিন্ন কোন কোরআন দেখেছেন? এরূপ কেউ পেয়ে থাকলে তা দেখাতে পারেন।