শিয়া-সুন্নি বিরোধ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তৃতীয় প্রশ্ন: ‚বারো ইমাম" কারা এবং তাদের ব্যাপারে শিয়া ও সুন্নিদের দৃষ্টিভঙ্গি কী?

বারো ইমামী শিয়া তথা শিয়া মাযহাবের মূল ধারার অনুসারীদের মতে, রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর পরে পর্যায়ক্রমিকভাবে মুসলিম উম্মাহর ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং শাসনকর্তৃত্বের জন্য আল্লাহ তা—আলা বারো জন নিষ্পাপ ও নির্ভুল ব্যক্তিত্বকে মনোনীত করে রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর মাধ্যমে ঘোষণা করেছেন। তাঁরা হলেন যথাক্রমে হযরত —আলী (রাঃ), তাঁর পুত্রদ্বয় হযরত ইমাম হাসান (রাঃ) ও হযরত ইমাম হোসাইন (রাঃ), হযরত ইমাম হোসাইন (রাঃ)-এর পুত্র হযরত ইমাম যায়নুল —আবেদীন (ওরফে ইমাম সাজ্জাদ), তাঁর পুত্র হযরত ইমাম বাক্বের, তাঁর পুত্র হযরত ইমাম জা—ফার্‌ ছ্বাদেক্ব, তাঁর পুত্র হযরত ইমাম মূসা কাযেম্‌, তাঁর পুত্র হযরত ইমাম রেযা, তাঁর পুত্র হযরত ইমাম মুহাম্মাদ তাক্বী, তাঁর পুত্র হযরত ইমাম —আলী নাক্বী, তাঁর পুত্র হযরত ইমাম হাসান আসকারী ও তাঁর পুত্র হযরত ইমাম মাহ্‌দী (আঃ)।

এদের মধ্যে হযরত আলী (রাঃ) মসজিদে নামাযরত অবস্থায় খারেজী নামে পরিচিত একটি বিভ্রান্ত গোষ্ঠীর সদস্য জনৈক ব্যক্তির তলোয়ারের আঘাতে আহত হয়ে শহীদ হন, হযরত ইমাম হোসাইন (রাঃ) কারবালায় ইয়াযীদী বাহিনীর হাতে শহীদ হন, শিয়া মাযহাবের সূত্র অনুযায়ী হযরত ইমাম হাসান (রাঃ)সহ নয় জন ইমাম তাঁদের সমসাময়িক উমাইয়াহ্‌ ও —আব্বাসী শাসকদের ষড়যন্ত্রে বিষ প্রয়োগের ফলে শহীদ হন এবং এখন থেকে সহস্রাধিক বছর পূর্বে জন্মগ্রহণকারী হযরত ইমাম মাহ্‌দী (—আঃ) আল্লাহ তা—আলার ইচ্ছায় দীর্ঘ জীবন লাভ করে আত্মগোপনরত অবস্থায় এখনো বেঁচে আছেন এবং যথোপযুক্ত সময়ে আত্মপ্রকাশ করবেন।

সুন্নীদেরও কতক হাদীছে রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ) কর্তৃক তাঁর বংশে বারো জন ইমামের আবির্ভাব সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণীর কথা উল্লিখিত হয়েছে, তবে এসব হাদীছের গ্রহণযোগ্যতা সম্বন্ধে সুন্নী আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। কিন্তু এ সত্ত্বেও শিয়াদের প্রতিপক্ষ সুন্নী ধারায় এ ধরনের হাদীছের অস্তিত্ব যথেষ্ট গুরুত্ববহ।

ইতিপূর্বে যেমন উল্লেখ করা হয়েছে, কোরআন মজীদে রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর আহলে বাইতের পবিত্রতার কথা বলা হয়েছে। শিয়াদের মতে, আহলে বাইত্‌ বলতে হযরত ফাতেমাহ্‌ (রাঃ) ও উক্ত বারো জন ইমামকে বুঝানো হয়েছে। সুন্নী আলেমগণ এ দাবীটি সম্পর্কে সাধারণতঃ নীরব থাকেন। কিন্তু হযরত ফাতেমাহ্‌, হযরত —আলী, হযরত ইমাম হাসান ও হযরত ইমাম হোসাইন (রাঃ)-এর আহলে বাইত্‌-এর অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিষয়টি বিতর্কের উর্দ্ধে তাই হযরত আলী (রাঃ)-এর পরে মুসলিম উম্মাহ্‌র নেতৃত্ব ও শাসনকর্তৃত্বের অধিকারের বিষয়ে হযরত ইমাম হাসান ও হযরত ইমাম হোসাইনের (রাঃ) ব্যপারে দ্বিমত নেই। তাই দেখা যায় যে, মসজিদে নববীর কর্তর্তত্ব আহলে বাইতের কট্টোর বিরোধী পন্থীদের হাতে থাকা সত্বেও তার ভিতর বারো ইমামের নাম খোদাই করা আছে।

উল্লেখ্য, সুন্নীদের জুম্‌আহ্‌ ও ঈদের খোত্‌বায় বিশেষভাবে আহলে বাইতের এ চার ব্যক্তির কথা উল্লেখ করা হয়। আরো স্মর্তব্য যে, হানাফীদের (যারা সুন্নীদের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ) নামাযের দরূদে আলে মুহাম্মাদ্‌-এর প্রতি দরূদ প্রেরণ করা হয় (শাফেয়ী, মালেকী ও হাম্বালী মাযহাবেও তা-ই কিনা তা অনুসন্ধানের বিষয়), আর এ দরূদে আলে মুহাম্মাদকে আলে ইবরাহীমের (যারা ছিলেন নবী, অতএব, নিষ্পাপ ও নির্ভুল) সাথে তুলনা করা হয়েছে।

এছাড়া এ চার ব্যক্তিত্ব সম্বন্ধে সুন্নী ধারার হাদীছে উল্লিখিত আছে যে, হযরত আদম (—আঃ) নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল খাওয়ার পর যখন কী করবেন বুঝতে পারছিলেন না তখন তিনি —আরশের দিকে মনোনিবেশ করলে সেখানে পাঁচটি নূরানী ছায়ামূর্তি বা নাম দেখতে পান এবং আল্লাহর কাছে জানতে চান যে, এরা কারা। তখন আল্লাহ বলেন, এরা তোমার বংশে আসবে এমন পাঁচ ব্যক্তি যাদেরকে সৃষ্টির সিদ্ধান্ত না নিলে আমি কিছুই সৃষ্টি করতাম না। তখন আদম (আঃ) তাঁদেরকে উসীলাহ্‌ করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলে আল্লাহ আদম ও হাওয়া (আঃ)কে ক্ষমা করে দেন। এ পাঁচটি নাম (বা নূরানী ছায়ামূর্তি) :মুহাম্মাদ, আলী, ফাতেমাহ্‌, হাসান ও হোসাইন।

এসব দলীল থেকে ইসলামে এ চার ব্যক্তির গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান বুঝা যায়।

এরপর, সুন্নী সমাজে সাধারণভাবে হযরত ইমাম যায়নুল আবেদীন্‌ (রঃ)কে খুবই ভক্তি ও ভালোবাসার সাথে স্মরণ করা হয় এবং তাঁর নাম —ইমাম— শব্দ সহকারে উল্লেখ করা হয় এবং তাঁর যুগে তাঁর চেয়ে অধিকতর উত্তম কোন লোক তথা তাঁর চেয়ে বড় কোন অলি-আল্লাহ ছিলেন বলে উল্লেখ করা হয় না। এর মানে হচ্ছে, আল্লাহর পক্ষ থেকে মনোনীত মনে করা হোক বা না হোক, তাঁর যুগে দ্বীন-দুনিয়ার নেতৃত্বের অধিকার তাঁরই ছিল বলে সুন্নীদের পক্ষ থেকে পরোক্ষভাবে স্বীকার করা হয়।

হযরত ইমাম বাক্বের (রঃ) ছিলেন স্বীয় যুগে সবচেয়ে বড় আলেম এবং দ্বীনী দৃষ্টিতে তাঁর চেয়ে যোগ্য কেউ ছিলেন না; সুন্নী আলেমগণ তাঁর নাম —ইমাম— শব্দ সহকারে উল্লেখ করে থাকেন। অর্থাৎ তাঁর যুগে তিনি ছিলেন দ্বীন-দুনিয়ার নেতৃত্বের জন্য যোগ্যতম ব্যক্তি। কোন কোন মতে, হযরত ইমাম আবূ হানীফাহ্‌ স্বল্পকালের জন্য হলেও তাঁর ছাত্র ছিলেন বা নিদেন পক্ষে তাঁর শিক্ষাদান মজলিসে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এ কারণে তিনি সুন্নী সমাজের কাছেও বিশেষ শ্রদ্ধার পাত্র।

হযরত ইমাম জা—ফার্‌ ছ্বাদেক্ব (রঃ)কে-ও সুন্নী আলেমগণ —ইমাম— শব্দ সহকারে উল্লেখ করে থাকেন। তিনি কেবল স্বীয় যুগেরই শ্রেষ্ঠতম জ্ঞানী ছিলেন না,বরং রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ) ও হযরত —আলী (রাঃ)-এর পরে সম্ভবতঃ তিনি ছিলেন মানব জাতির ইতিহাসে শ্রেষ্ঠতম জ্ঞানী। হযরত ইমাম আবূ হানীফাহ্‌ (রঃ) দুই বছর তাঁর কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেন। ইমাম আবূ হানীফাহ্‌ (রঃ) বলেনঃ “আমি জা—ফার্‌ ইবনে মুহাম্মাদের চেয়ে বড় কোন আলেমকে দেখি নি।” হযরত ইমাম মালেক (রঃ)-ও ইমাম জা—ফার্‌ ছ্বাদেক্ব (রঃ)-এর ছাত্র ছিলেন। নিঃসন্দেহে ইমাম জা—ফার্‌ ছ্বাদেক্ব (রঃ) ছিলেন স্বীয় যুগে দ্বীন-দুনিয়ার নেতৃত্বের জন্য যোগ্যতম ব্যক্তি। কিন্তু ইমাম মালেক স্বৈরাচারী —আব্বাসী খলীফা  মান্‌ছূরের সাথে সমঝোতায় পৌঁছার পর ইমাম জা—ফার্‌ ছ্বাদেক্ব (রঃ)-এর কাছ থেকে দূরে সরে যান। অন্যদিকে ইমাম আবূ হানীফাহ্‌ (রঃ) মানছূরের সাথে সহযোগিতা করতে অস্বীকার করায় তাঁকে কারাগারে নিক্ষেপ করে বিষপ্রয়োগে হত্যা করা হয়; অতঃপর তাঁর শিষ্য আবূ ইউসুফ্‌ ও মুহাম্মাদ্‌ বিন্‌ হাসান্‌ শায়বানী তাঁর নীতির বরখেলাফ করে মান্‌ছূরের সাথে সহযোগিতা করেন এবং ইমাম জা—ফার্‌ ছ্বাদেক্ব (রঃ) এর থেকে দূরে সরে গিয়ে ইমাম আবূ হানীফাহ্‌ (রঃ)-এর নাম ব্যবহার করে হানাফী মাযহাব তৈরী করেন। বস্তুতঃ এভাবেই আহলে বাইতের ইমামগণের ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সুন্নী ধারা গড়ে তোলা হয়।

পরবর্তী পাঁচ জন ইমাম সম্পর্কে সুন্নী সমাজে তেমন একটা আলোচনা নেই, অবশ্য অনেক সুন্নী আলেমের কাছেই হযরত ইমাম রেযা (রঃ)-এর জ্ঞানগত যোগ্যতা একটি স্বীকৃত বিষয়। সুন্নী সমাজে সামগ্রিকভাবে তাঁদের সম্পর্কে সতর্কতার নীতি অবলম্বন করা হয়, অর্থাৎ তাঁদের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট ভাষায় প্রশংসামূলক তেমন কিছু উল্লেখ করা না হলেও তাঁদের প্রসঙ্গ এলে সসম্মানে তাঁদের কথা উল্লেখ করা হয়।

হযরত ইমাম মাহ্‌দী (—আঃ) সম্পর্কে সুন্নী সমাজে ভিন্ন মত রয়েছে। যদিও সুন্নী ধারার কোন কোন হাদীছে হযরত ইমাম হাসান —আসকারী (রঃ)-এর পুত্রকেই হযরত ইমাম মাহ্‌দী (—আঃ) বলে উল্লেখ করা হয়েছে, তবে সাধারণভাবে সুন্নী সমাজে বিরাজমান ধারণা হচ্ছে এই যে, হযরত ইমাম মাহ্‌দী (—আঃ)এখনো জন্মগ্রহণ করেন নি; তিনি পরে জন্মগ্রহণ করবেন।  অবশ্য এ ধারণার পিছনে অকাট্য দলীল নেই।

হযরত ইমাম মাহ্‌দী (—আঃ) সম্পর্কে শিয়া-সুন্নী উভয় ধারার অসংখ্য হাদীছে শেষ যুগে মদীনাহ্‌র মসজিদে নববী থেকে তাঁর আত্মপ্রকাশ এবং বিশ্বব্যাপী ইসলামী বিপ্লব ও শাসন প্রতিষ্ঠার কথা থাকলেও সুন্নী ধারার হাদীছে আত্মপ্রকাশের আগে তাঁর জীবন কেমন হবে ও তাঁর তৎপরতা কী হবে সে সম্পর্কে কোন কথা নেই। কিন্তু শিয়া ধারার হাদীছ্‌ অনুযায়ী হযরত ইমাম মাহ্‌দী (—আঃ)-এর বয়স পাঁচ বছর হলে তাঁর পিতা হযরত ইমাম হাসান —আসকারী (রঃ)ইন্তেকাল করেন। ইন্তেকালের সময় তাঁর দেয়া নির্দেশ অনুযায়ী হযরত ইমাম মাহ্‌দী (—আঃ)কে গোপন করে রাখা হয় এবং তিনি হযরত ইমাম হাসান —আসকারী (রঃ)-এর চার জন ঘনিষ্ঠ শিষ্যের মাধ্যমে শিয়াদের সাথে যোগাযোগ রাখতেন। এ সময়টাকে —সংক্ষিপ্ত আত্মগোপনকাল— বলা হয় - যার মেয়াদ ষাট বছর। উপরোক্ত চার ব্যক্তির মধ্যকার সর্বশেষ ব্যক্তি মারা গেলে তিনি পুরোপুরি আত্মগোপন অবস্থা পরিগ্রহণ করেন এবং এখনো সে অবস্থায় আছেন;একে —দীর্ঘ আত্মগোপনকাল— বলা হয়। এখানে —আত্মগাপন— মানে পুরোপুরি লোকচক্ষুর অন্তরালে অবস্থান নয়, বরং লোকদের কাছে স্বীয় পরিচয় প্রকাশ না করা; হয়তো তিনি ভিন্ন পরিচয়ে সমাজেই বসবাস করছেন এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করছেন, বিশেষ করে দ্বীনী ও রাজনৈতিক বিষয়াদিতে মতামত দিচ্ছেন।

হযরত ইমাম মাহদী (—আঃ)-এর দীর্ঘ জীবন সম্বন্ধে শিয়া মাযহাবের ব্যাখ্যা হচ্ছে এই যে, আল্লাহ তা—আলা চাইলে যে কাউকে দীর্ঘজীবী করতে পারেন এবং মানব জাতির ইতিহাসে বহু দীর্ঘজীবী মানুষের কথা জানা যায়, যেমন, কোরআন মজীদে উল্লেখ করা হয়েছে যে, হযরত নূহ্‌ (—আঃ) সাড়ে নয়শ— বছর দ্বীনের দাওয়াত দিয়েছিলেন। হযরত খিযির (—আঃ)-এর দীর্ঘ জীবনও মশহূর বিষয়। আর আল্লাহ যেহেতু হযরত ইমাম মাহ্‌দী (—আঃ)-এর মাধ্যমে তাঁর বিশেষ এক সৃষ্টিলক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে চান সেহেতু পরিস্থিতির প্রয়োজনে তিনি তাঁকে দীর্ঘজীবী করবেন এটাই স্বাভাবিক।

চলবে ইন শা আল্লাহ-