শিয়া-সুন্নি বিরোধ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ দ্বিতীয় প্রশ্ন: প্রথম তিন খলীফা সম্বন্ধে শিয়া মাযহাবের দৃষ্টিভঙ্গি কী?

এ প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগে এ বিষয়ে সুন্নি আলেমদের বক্তব্য তুলে ধরব:

সুন্নী মাযহাব সমূহের ওলামায়ে কেরামের বক্তব্য 

সুন্নী মাযহাব সমূহের ওলামায়ে কেরামগণ সাধারণতঃ রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর ইন্তেকালের পরে পর্যায়ক্রমে ইসলামী হুকুমতের দায়িত্বে অধিষ্ঠিত প্রথম চার খলীফাকে ‚খুলাফায়ে রাশেদীন“ (সঠিক পথানুসারী খলীফাগণ) বলে অভিহিত করে থাকেন। [এটা একটা রাজনৈতিক উপাধি, আল্লাহ বা রাসূল (ছ্বাঃ)-এর কাছ থেকে প্রাপ্ত নয়।] 

কিন্তু শিয়া মাযহাবের অনুসারীরা প্রথম তিন খলীফাকে বৈধ গণ্য করে না। আর তা না করার কারণ ওপরের আলোচনায় উল্লিখিত হয়েছে। যেহেতু তারা হযরত ‘আলী (রাঃ) ও তাঁর বংশে আগত আরো এগার জন ইমামকে মুসলিম উম্মাহ্‌র জন্য আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে মনোনীত ও রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর মাধ্যমে ঘোষিত ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয়-রাজনৈতিক নেতা মনে করে সেহেতু স্বাভাবিকভাবেই তারা তিন খলীফাকে অবৈধ শাসক গণ্য করে থাকে।

তবে শিয়া মাযহাবের অন্যতম গৌণ ধারা ‘যায়েদীয়াহ্‌’ প্রথম দুই খলীফাকে বৈধ গণ্য করে। অন্যদিকে শিয়া মাযহাবের মূল ধারা অর্থাৎ ইছনা'‌‘আশারীয়াহ্‌ বা ‘বারো ইমামী’ ধারা সাধারণভাবে প্রথম তিন খলীফাকে অবৈধ গণ্য করলেও বর্তমান ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের ধর্মীয়-রাজনৈতিক নেতাদের অনেকে প্রথম তিন খলীফার শাসনকে যোগ্যতম ব্যক্তির উপস্থিতিতে ন্যূনতম যোগ্যতার অধিকারী ব্যক্তির নামাযে ইমামতী করার সাথে তুলনা করেছেন। অর্থাৎ তাঁদের মতে, হযরত ‘আলী (রাঃ)-এর উপস্থিতিতে প্রথম তিন খলীফাকে খেলাফতে অধিষ্ঠিতকরণ ছিল ঐ ধরনের ভুল পদক্ষেপ যার ফলে তাঁদের শাসন অবৈধ না হলেও তাঁদের শাসনামলে ইসলামী উম্মাহ্‌ উপযুক্ততম ব্যক্তির শাসনের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হয়েছিল। তাঁরা আরো বলেন, উপযুক্ততম, এমনকি আল্লাহর পক্ষ থেকে মনোনীত নেতার নেতৃত্ব ও শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার অন্যতম শর্ত হচ্ছে উম্মাহ্‌ কর্তৃক তাঁকে ‚আল্লাহর পক্ষ থেকে মনোনীত নেতা ও শাসক” হিসেবে চিনতে পারা; যারা চিনতে পেরেছে তাদের জন্য তাঁর নেতৃত্ব মেনে নেয়া ফরয (এবং চিনতে পারা সত্ত্বেও মেনে না নিলে তা হবে নেফাক্ব), কিন্তু যারা চিনতে পারে নি তাদের ওপর এ ব্যাপারে কোন দায়িত্ব নেই। এমতাবস্থায় ছ্বাহাবীদের মধ্যে অনেকেই হয়তো হযরত ‘আলী (রাঃ)-এর নেতৃত্ব ও শাসনকর্তৃত্বকে ফরয বলে মনে করেন নি।

তবে বারো ইমামী শিয়া মাযহাবের অতীতের আলেমগণ মনে করতেন (সম্ভবতঃ বর্তমান আলেমদেরও একটি বিরাট অংশ মনে করেন) যে, হযরত ‘আলী (রাঃ)-এর পরিবর্তে প্রথম তিন খলীফাকে শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিতকরণের বিষয়টি সচেতনভাবে ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হয়েছিল অর্থাৎ এর পিছনে ইসলামপূর্ব যুগের গোত্রপ্রীতির অবশিষ্ট প্রভাব কাজ করেছিল। অর্থাৎ নেতৃত্ব ও শাসনকর্তৃত্বকে বণি হাশেমের [রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর বংশের] হাত থেকে বের করে নেয়ার উদ্দেশ্যেই এটা করা হয়েছিল।

তাঁরা তাঁদের এ মতের সপক্ষে গ্বাদীরে খুমের ঘটনা ছাড়াও আরো অনেক যুক্তি উপস্থাপন করে থাকেন। গ্বাদীরে খুমে রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর উক্তি সম্পর্কে তাঁদের কথা এই যে, এমনকি এতে হযরত ‘আলী (রাঃ)-এর নেতা ও শাসক মনোনীত হওয়ার বিষয়টিকে যদি কেউ অকাট্য বলে মনে না-ও করে তথাপি যেহেতু এটাও একটা সম্ভাবনা এবং রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ) আন্য কারো ব্যাপারে এ ধরনের কথা (অন্ততঃ এরূপ আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে) বলেন নি, সেহেতু ইসলামের নীতিমালার অন্যতম ‘সতর্কতার নীতিমালা’ অনুযায়ী তাঁকেই খলীফা  করা উচিত ছিল; তা না করে উম্মাতের ভবিষ্যতকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়া হয়।

তিন খলীফার খেলাফতে অধিষ্ঠানের প্রক্রিয়ার ত্রুটি ও দুর্বলতাও তাঁদের অন্যতম যুক্তি।  হযরত ‘আলী (রাঃ) সহ বণি হাশেমের বিশিষ্ট ছ্বাহাবীগণ যখন রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করার কাজে ব্যস্ত তখন তাঁদেরকে বাদ দিয়ে কিছু সংখ্যক ছ্বাহাবী একত্রিত হয়ে হযরত ওমরের (রাঃ) প্রস্তাবক্রমে হযরত আবূ বকর (রাঃ)কে খলীফা  নির্বাচন করেন এবং এ সংবাদ সর্বত্র প্রচার করেন, ফলে অন্য ছ্বাহাবীগণ কোনরূপ চিন্তাভাবনার অবকাশ না পেয়ে ‘ইতিমধ্যেই নির্বাচিত খলীফা ’ হিসেবে তাঁর পক্ষে বাই‘আত্‌ করেন। তাঁদের মতে, রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর কাফন-দাফনে অংশ না নিয়ে, বণি হাশেমকে বাদ দিয়ে এবং মসজিদে নববীর পরিবর্তে অন্যত্র বসে অল্প সংখ্যক ছ্বাহাবীকে নিয়ে খলীফা নির্বাচনের বিষয়টি ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত।

এখানে উল্লেখ্য যে, ইসলাম গ্রহণ ও পালন এবং ইসলামের জন্য নিষ্ঠা ও ত্যাগ স্বীকারের ক্ষেত্রে বণি হাশেমের লোকেরা সকলের তুলনায় অগ্রগণ্য ছিলেন। তাই আল্লাহ তা‘আলা তাঁদের প্রতি, বিশেষ করে আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসা পোষণকে মুসলমানদের জন্য অপরিহার্য করেছেন এবং একে রাসূলুল্লাহ্(ছ্বাঃ)-এর দ্বীনী দাওয়াতের পারিশ্রমিক হিসেবে গণ্য করেছেন, এরশাদ হয়েছেঃ “(হে রাসূল!) বলুন, আমি এর (নবুওয়াতের দায়িত্ব পালনের জন্য) জন্য আমার ঘনিষ্ঠ স্বজনদের প্রতি ভালোবাসা ব্যতীত কোন পারিশ্রমিক চাই না।” (সূরাহ্‌ আশ্‌-শূরা : ২৩)

সুন্নীদের দৃষ্টিতে হযরত ‘আলী (রাঃ) খুলাফায়ে রাশেদীনের অন্যতম এবং হযরত ফাতেমাহ্‌ (রাঃ) নারীকুলের শ্রেষ্ঠ ও বেহেশতে নারীদের নেত্রী - যার মর্যাদা হযরত মার্‌ইয়াম্‌ (‘আঃ)-এরও ওপরে। কিন্তু তাঁরা উভয় ও বণি হাশেমের ছ্বাহাবীগণ হযরত আবূ বকর(রাঃ)কে খলীফা  হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার করেন, কারণ, তাঁরা খেলাফতের অধিকার হযরত ‘আলী (রাঃ)-এর বলে মনে করতেন।  তাঁদের এ অস্বীকৃতি এবং হযরত ফাতেমাহ্‌র গৃহে আশ্রয় গ্রহণের কারণে হযরত ওমর হযরত ফাতেমাহ্‌র গৃহে আগুন দিতে চেয়েছিলেন। পরে অন্যরা চাপের মুখে (অনেককে বন্দী করে নেয়া হয়েছিল) বাই‘আত্‌ করলেও হযরত ফাতেমাহ্‌ ও হযরত ‘আলী (রাঃ) বাই‘আত্‌ করেন নি। হযরত ফাতেমাহ্‌ সুস্পষ্ট ভাষায় হযরত আবূ বকরের খেলাফতকে অবৈধ বলেন, তাঁর সাথে বিতর্ক করেন এবং তাঁর প্রতি অসন্তুষ্টি ঘোষণা করেন। তাঁর অসন্তুষ্টির গুরুত্ব এখানে যে, শিয়া-সুন্নী উভয় ধারার হাদীছ্‌ অনুযায়ী, রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)এরশাদ করেছেনঃ ‚ফাতেমাহ্‌র সন্তুষ্টিতে আমার সন্তুষ্টি, আর আমার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং ফাতেমাহ্‌র অসন্তুষ্টিতে আমার অসন্তুষ্টি, আর আমার অসন্তুষ্টিতে আল্লাহর অসন্তুষ্টি।”

হযরত ফাতেমাহ্‌ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর ইন্তেকালের পর মোটামুটি তিন মাস মতান্তরে ছয় মাসের মতো বেঁচে ছিলেন।  এ সময় তিনি হযরত আবূ বকর (রাঃ)-এর অনুকূলে বাই‘আত্‌ করা তো দূরের কথা, প্রতিবাদস্বরূপ তাঁর সাথে কথা বলা থেকেও বিরত থাকেন। অন্ততঃ এর মধ্যে হযরত ‘আলী (রাঃ)-ও বাই‘আত্‌ করেন নি; এর পরে তিনি বাই‘আত্‌ হয়েছেন কিনা তার কোন অকাট্য প্রমাণ নেই, তবে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহ্‌র বৃহত্তর স্বার্থে তিনি হযরত আবূ বকর(রাঃ)কে (এবং পরবর্তী দুই খলীফাকেও), বিশেষ করে ফিক্বহী ও বিচারিক বিষয়াদিতে ইসলামের সঠিক বিধান ব্যক্ত করে সহযোগিতা করেছেন।

প্রথম খলীফা  হযরত আবূ বকর (রাঃ) অল্প সংখ্যক ছ্বাহাবী কর্তৃক নির্বাচিত হলেও তিনি তাঁর পরবর্তী খলীফার পদে হযরত ওমরকে মনোনীত করে যান এবং এটাকেও ছ্বাহাবীগণ ‘সম্পাদিত কাজ’ হিসেবে মেনে নেন। অর্থাৎ সুন্নীদের দাবী অনুযায়ী জনগণ কর্তৃক নির্বাচনের ধারণা এখানেও বাস্তবায়িত হয় নি। অনেক শিয়া মনীষীর মতে, যেহেতু হযরত ওমরের চেষ্টায়ই হযরত আবূ বকর খলীফা  হয়েছিলেন সেহেতু তিনি ওমরকে খলীফা করে এর প্রতিদান দিয়েছেন এবং ‘আলীর অধিকারকে উপেক্ষা করেছেন। আর হযরত ওমর (রাঃ) ইন্তেকালের পূর্বে ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে দিয়ে তাঁদের নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে খলীফা  করার জন্য ‘অলঙ্ঘনীয়’ নির্দেশ দিয়ে যান (অর্থাৎ এখানেও জনগণের সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার ছিল না)।

কমিটি প্রথমে হযরত আলী (রাঃ)কে এ শর্তে খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের অনুরোধ জানায় যে, তিনি আল্লাহর কোরআন, রাসূলের সুন্নাত্‌ ও পূর্ববর্তী দুই খলীফার অনুসৃত নীতি অনুযায়ী শাসনকার্য পরিচালনা করবেন। কিন্তু হযরত ‘আলী (রাঃ) বলেন যে, তিনি খলীফা  হলে কোরআন, সুন্নাতে রাসূল (ছ্বাঃ) ও এরপর তাঁর নিজের বিচারবুদ্ধি অনুযায়ী শাসনকার্য চালাবেন। অর্থাৎ তিনি পূর্ববর্তী দুই খলীফার সকল নীতিকে সঠিক মনে করতেন না। এমতাবস্থায় হযরত ওসমান (রাঃ) কমিটির শর্ত মেনে নিয়ে খলীফা হন, কিন্তু তিনি যেভাবে শাসনকার্য চালান তাতে দেশে অসন্তোষ ও শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহ সৃষ্টি হয় এবং হযরত আবূ বকর (রাঃ)-এর পুত্র আবদুর রহমান বিন্‌ আবূ বকর সহ শীর্ষস্থানীয় অনেক ছ্বাহাবীর নেতৃত্বে হাজার হাজার ছ্বাহাবীর অংশগ্রহণে সৃষ্ট গণ-অভ্যুত্থানে হযরত ওসমান (রাঃ) নিহত হন। এরপর সর্বস্তরের জনগণ পরবর্তী খলীফা  হিসেবে হযরত ‘আলী (রাঃ)কে নির্বাচিত করে। এই প্রথম বারের মতো আক্ষরিক অর্থে জনগণ খলীফা  নির্বাচিত করলো।