সুন্নিদের দৃষ্টিতে কারবালার শহীদ ইমাম হোসাইন (রা.) এর অনুপম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য

-মুহাম্মদ জাফর উল্লাহ্

নীল সিয়া আস্মান লালে লাল দুনিয়া-

“আম্মা! লা’ল তেরি খুন কিয়া খুনিয়া।”

কাঁদে কোন ক্রন্দসী কারবালা ফোরাতে,

সে কাঁদনে আঁসু আনে সীমারেরও ছোরাতে!...

উষ্ণীয় কোরানের, হাতে তেগ আরবীর,

দুনিয়াতে নত নয় মুসলিম কারো শির,-

তবে শোন ঐ শোন বাজে কোথা দামামা,

শমশের হাতে নাও, বাঁধো শিরে আমামা!...

জাগো, ওঠো মুসলিম, হাঁকো হায়দরী হাঁক,

শহীদের দিনে সব, লালে-লাল হ’য়ে যাক।

                 -কাজী নজরুল ইসলাম

সত্য ও ন্যায়ের ঝাণ্ডাবাহী জান্নাতে যুবকদের সর্দার সৈয়দ ইমাম হোসাইন (রা.) ছিলেন নবী বংশের উজ্জ্বল প্রদীপ। কারবালার রক্তাক্ত প্রান্তরে শাহাদাতের অভূতপূর্ব ঘটনার আকস্মিকতায় তাঁর সুবিশাল জীবনের অনেক দিকই অধিকাংশ মুসলমানের নিকট অজানা। শোকবিহ্বল উম্মতে মুহাম্মদী (সা.) প্রায় ক্ষেত্রে আশুরার আলোচনায় কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার বর্ণনা শুনেই ক্ষান্ত হন কিন্তু তাঁর পূত-পবিত্র বর্ণাঢ্য জীবন ও কর্ম এবং অনুপম চারিত্রিক মাধুর্য তাদের কাছে অজানাই থেকে যায়।

নবী দৌহিত্র, মা ফাতিমা ও মহাবীর আলীর কলিজার টুকরা ইমাম হোসাইনের জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে রয়েছে তাঁর উন্নত চরিত্রের নিদর্শন। যা প্রতিটি মুমিন মুসলমানের জন্য অনুকরণীয় ও অনুসরণীয় আদর্শ।

বিশ্বমানবতার মুক্তিদূত মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর স্নেহ ছায়ায় লালিত ইমাম হাসান ও হোসাইন (রা.) ছিলেন চেহারা-সুরতে চলনে-বলনে নবীজীরই প্রতিরূপ। শিশুকাল হতেই নবীজীর সাহাবীগণ তাঁদের অত্যন্ত স্নেহ, সম্মান ও শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন। তাঁদের ভালবাসার কথা নবীজী বহুস্থানে বহুবার উচ্চারণ করেছেন- একথা সর্বজনবিদিত। নবীজীর অনেক হাদীসে তা উদ্ধৃত।

ছোটবেলা হতেই তাঁরা নবীগৃহে স্বয়ং রাসূলে পাক (সা.) হতে দ্বীনি শিক্ষা লাভ করেন। পিতা ‘জ্ঞানের দরজা’ হযরত আলী (রা.) ও মাতা খাতুনে জান্নাত ফাতিমার সান্নিদ্ধ ছিল তাঁদের শিক্ষার সবচেয়ে বড় সহায়ক।

হযরত হোসাইন (রা.) ছিলেন একজন উৎকৃষ্ট কোরআনে হাফেজ ও জগৎ শ্রেষ্ঠ ক্বারী। মসজিদে নববীর আঙ্গিনায় খুব অল্প বয়সেই তিনি পবিত্র কোরআন হেফজ করেন। তাঁর সুললিত কণ্ঠের কোরআন তিলাওয়াত শোনার জন্য সাহাবীরা ছিলেন দিওয়ানা। ইবাদত বন্দেগীতে তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ, অতুলনীয়। আয-যুবায়ের বিন বকর (রা.) বলেন, মুসআব আমাকে জানিয়েছেন যে হযরত হোসাইন (রা.) ২৫ বার মদীনা হতে মক্কায় পায়ে হেঁটে পবিত্র হজ্ব পালন করেছেন।

নামায-কালামে তিনি কখনো শৈথিল্য প্রদর্শন করেন নি। শাহাদাতে কারবালার অর্থাৎ আশুরার পূর্বরাতে তিনি পরিবার পরিজন নিয়ে অবর্ণনীয় খুতÑপিপাসায় কাতর অবস্থায়ও সারারাত আল্লাহ্র আরাধনায় মশগুল ছিলেন। আশুরার দিন শাহাদাতের পূর্বমুহূর্তে শহীদী খুনে রক্তাক্ত কারবালা প্রান্তরে শত্রু সৈন্য বেষ্টিত সঙ্কটময় মুহূর্তেও যোহরের নামায আদায় করেন।

ইমাম হোসাইন (রা.) কেমন জ্ঞান সাধক ছিলেন তার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ হলো : একবার আমীর মুয়াবিয়া (রা.) কুরাইশ বংশীয় একজন লোককে বলেছিলেন, “মসজিদে নববীতে যখন তুমি একদল লোককে (একজনকে ঘিরে) চক্রাকারে নিশ্চল হয়ে বসে থাকতে দেখবে, যেন মনে হবে তাদের মাথার উপর পাখি বসে আছে, ধরে নেবে যে, তা হচ্ছে আবু আবদুল্লাহ্র (ইমাম হোসাইনের) পাঠচক্র, যাঁর জামা হাতের কব্জির অর্ধেকাংশ পর্যন্ত প্রলম্বিত। লোকেরা তাঁর পাঠ গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছে।” ফিক্হ শাস্ত্রে তাঁর জ্ঞান ছিল গভীর। (তারিখে ইবনে আসাকির)।

ঘোড় সোয়ার ও অসি চালনায় তিনি বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেন। কিশোর বয়স হতেই ইমাম হোসাইন (রা.) যুদ্ধবিদ্যার সবক গ্রহণ করেন। যৌবনে পদার্পণের সাথে সাথে তিনি মুসলিম সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। তিনি দু’একটি যুদ্ধেও সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন। জিহাদের ডাকে প্রয়োজনের মুহূর্তে সাড়া দিতে তিনি কখনো পিছপা হতেন না। বাইজেন্টাইন (রোমান) সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপল (ইস্তাম্বুল) জয়ের যুদ্ধেও এই অকুতোভয় সৈনিক অংশ নিয়েছিলেন। জিহাদের ময়দানে তাঁর উপস্থিতি মুসলিম মুজাহিদদের অপরিসীম অনুপ্রেরণায় উদ্বুদ্ধ করত।

তিনি ছিলেন দানশীল। গরীব অসহায়ের দরদী। তাঁর দুয়ার হতে কেউ খালি হাতে ফিরে যায়নি। মানুষের অসহায়ত্ব দেখলে তাঁর মন হাহাকার করে উঠত।

একবার এক গ্রাম্য গরীব বেদুইন মদীনার অলিগলি ঘুরে কোথাও কিছু না পেয়ে ইমাম হোসাইন (রা.) এর দুয়ারে এসে হাজির। তিনি তখন গভীর ধ্যানে নামায রত। ভিক্ষুকের হাঁকডাকে তাড়াতাড়ি নামায শেষ করে দুয়ারে এসে দেখেন গরীব লোকটির অবস্থা সত্যিই শোচনীয়। তিনি গৃহভৃত্য কাম্বারের কাছে জানতে পারলেন তাঁর পরিবারের খরচের জন্যে মাত্র ২০০ দিরহাম অবশিষ্ট আছে। তিনি বললেন : তা নিয়ে এসো, কারণ এমন একজন প্রার্থী এখানে উপস্থিত হয়েছে যার প্রয়োজন আমার পরিবারের সদস্যদের প্রয়োজনের চাইতে অনেক বেশি। ইমাম হোসাইন (রা.) সে অর্থের পুরোটাই গরীব বেদুইনের হাতে তুলে দিয়ে বললেন : এটা রাখো, আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাই, আমার অন্তর তোমার জন্য বিগলিত, আমার যদি আরো থাকত, তাও তোমাকে দিয়ে দিতাম। উন্মুক্ত আকাশ হতে সম্পদের বারিপাত ঝরুক তোমার মাথার উপর; কিন্তু ভাগ্যের উপর সন্দেহ আমাদের অসুখি করে রাখে।”

ভিক্ষুকটি ইমাম বংশের মার্যাদার কথা কৃতজ্ঞচিত্তে উচ্চারণ করতে করতে বিদায় নিল। (তারিখে ইবনে আসাকির ৪র্থ খ-)

তিনি ঋণগ্রস্ত অনেক সাহাবীকে ঋণমুক্ত করেছেন। কবিদের তিনি ভালবাসতেন। মুক্ত হস্তে তাদের দান করতেন। কেউ কেউ তাতে আপত্তি করলে তিনি বলতেন : সেই অর্থই সর্বোত্তম যা একজন মানুষের মর্যাদা রক্ষা করে। (তাহজিবুল কামাল)

তিনি বিভিন্ন মজলিসে লোকদের উদ্দেশে বলতেন, “যে দানশীল সে-ই সম্মানিত হবে, যে কৃপণ সে লাঞ্ছিত হবে। আপন প্রয়োজনের অর্থ বিলিয়ে দেয়ার মাঝেই রয়েছে মহত্ব। প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যে ক্ষমা করে দেয় সে-ই সবচেয়ে উত্তম। আত্মীয়তার বন্ধনকে যে অটুট রাখে সে-ই শ্রেষ্ঠ। যে অন্যকে ইহ্সান করে আল্লাহ্ তাকে ইহ্সান করেন, কারণ আল্লাহ্ সৎকর্মশীলদের ভালবাসেন।”

হযরত উসামা বিন যায়েদ (রা.) অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তিনি ভাবলেন যে তাঁর সময় শেষ হয়ে এসেছে। তিনি বলতে লাগলেন, “আমি তো ৬০ হাজার দিরহাম ঋণি। এটা আদায় হলে আমার মৃত্যুকালীন কষ্ট লাঘব হতো। কে আমার ঋণভার লাঘব করবে?”

ইমাম হোসাইন (রা.) একথা শুনলেন। তিনি কালবিলম্ব না করে উসামার কাছে গেলেন এবং তাঁর সব ঋণ পরিশোধ করে দিলেন।

সৈয়দ ইমাম হোসাইন (রা.) ছিলেন স্নেহশীল পিতা, অনুগত ভ্রাতা এবং আত্মীয়তার অটুট বন্ধনে আবদ্ধ একজন আদর্শ মানব। তাঁর সন্তানরা যেমন তাঁকে হৃদয় দিয়ে ভালবাসত তেমনি আত্মীয়-স্বজনরা মক্কা হতে কুফার পথে পথে, কারবালা প্রান্তরে গভীর সঙ্কটময় মুহূর্তেও তাঁর সাথে ছিলেন। একে একে সকল পুরুষ সদস্য হাসি মুখে শাহাদাতের পিয়ালা পান করেছে তবুও ইমামকে একা ছেড়ে যান নি। পৃথিবীর ইতিহাসে এ দৃশ্য বিরল। অতীতে কেউ এরূপ ঘটনা দেখেনি, শোনেনি, ভবিষ্যতেও কেউ তা দেখবে না, শুনবে না।

ইমাম হাসান (রা.) কর্তৃক আমীর মুয়াবিয়া (রা.) এর পক্ষে খিলাফত ছেড়ে দেবার সিদ্ধান্ত প্রথমে ইমাম হোসাইন (রা.) মানতে চাননি। কিন্তু যখন দেখলেন ইমাম হাসান (রা.) তাঁর সিদ্ধান্তে অটল তখন তিনি বললেন, “আপনি আমার চেয়ে বড়, আপনি খলিফা ও আমার গুরুজন, আপনাকে মানার জন্য আমি আদিষ্ট হয়েছি; অতএব আপনার কাছে যা উত্তম বলে মনে হয় তাই করুন।”

সূত্র: http://www.dailysangram.com/post/254500-

তারিখ: ১১-১০-২০১৬