সুন্নিদের দৃষ্টিতে শিয়া-সুন্নীর মধ্যে পার্থক্য

সুন্নি ও শিয়া মুসলমানদের মধ্যে কিছু কিছু বিষয়ে মতভেদ থাকলেও অনেক মৌলিক বিষয়েই রয়েছে মতের মিল। যেমন, উভয় মাজহাবই এক আল্লাহ, অভিন্ন ধর্মগ্রন্থ তথা পবিত্র কোরআন এবং বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে সর্বশেষ নবী হিসেবে মানেন। উভয় মাজহাবই পরকালের প্রতি তথা পুনরুত্থান ও বিচার দিবসের প্রতি বিশ্বাস, নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত ও নারীদের পর্দা করা ফরজ হওয়ার বিষয়সহ আরও অনেক বিষয়েই একমত।

 ‘সুন্নি’ আরবি সুন্নাহ শব্দের সম্বন্ধবাচক বিশেষ্য। সুন্নাহ অর্থ পদ্ধতি, রীতি, প্রথা, বিধান, আচরণ ইত্যাদি। সাহাবিরা হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বাণী, কর্ম ও নির্দেশাদি পূর্ণরূপে অনুসরণ করেছেন বলে তাঁদের উক্তি, কাজ ও নির্দেশাদি অনুসারিরাই সুন্নি। বাংলাদেশে অধিকাংশ মুসলমান সুন্নি। সুন্নি নামটির উদ্ভব হয় আববাসি খলিফা আল-মুতাওয়াক্কিলের আমলে। তাঁকে সুন্নাহর পুনরুজ্জীবন সাধনকারী বলা হয়। অন্যদিকে ‘শিয়া’ শব্দটির অর্থ অনুসারী বা দল। ইসলামের ইতিহাসে হজরত আলী (রা.) অনুসারী দল (শিয়াত-ই-আলী, আলীর দল) সাধারণত শিয়া নামে পরিচিত। শিয়া মাজহাব প্রথমে রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ইসলামের খলিফা হিসেবে হজরত আবু বকর (রা.)-এর নির্বাচনের সময় থেকে শিয়া আন্দোলনের বীজ বপন করা হয়। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওফাতের সময় তাঁর জামাতা হজরত আলী (রা.) খলিফা হবেন বলে শিয়াদের দাবী ছিল যে, নবী করিম (সা.) এমন নির্দেশ দিয়ে গেছেন। কিন্তু তাঁদের এ দাবি উপেক্ষিত হলে হজরত আলী (রা.) সমর্থকেরা নিরুৎসাহিত হয়ে পড়েন। এরপর হজরত ওমর ও হজরত ওসমান (রা.) যখন খলিফা নির্বাচিত হলেন, তখনো তাঁরা তাঁকে নির্বাচিত করার জন্য চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। যারা পরবর্তীকালে ‘শিয়া’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

শিয়া ও সুন্নির মৌলিক পার্থক্য

শিয়া ও সুন্নি উভয় মাজহাবের মুসলমানরা আল্লাহর একত্ব এবং হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুয়তে বিশ্বাসী হলেও উভয়ের মধ্যে কতগুলো মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। এ পার্থক্যগুলো হলো-

১. সুন্নিরা খোলাফায়ে রাশেদীনের ইমামতে সমভাবে বিশ্বাসী। শিয়ারা হজরত আলী (রা.)-কে রাসুল (সা.)-এর একমাত্র ন্যায়সংগত উত্তরাধিকারী এবং প্রথম তিন খলিফাকে খিলাফতের অবৈধ দাবিদার মনে করে।

২. সুন্নিদের বিশ্বাস হজরত মুহাম্মদ (সা.) আখেরি নবী এবং তাঁর পরে আর কোনো নবী আসবেন না। শিয়াদের একটি বিরাট অংশবিশেষ (ইসমাইলীয়দের মধ্যে প্রচলিত বিশ্বাস) মনে করে, ইমাম ইসমাইল আখেরি নবী ছিলেন।

৩. সুন্নিরা হজরত ফাতেমা (রা.)-এর কোনো বিশেষ বংশধরকে ইমাম মাহদি বলে বিশ্বাস করে না। শিয়ারা তাঁর বংশধরের বিশেষ কোনো ব্যক্তিকে ইমাম মাহদি বলে বিশ্বাস করে।

৪. সুন্নিরা সুন্নাহ ও হাদিসের সমর্থক; শিয়ারা অধিক আগ্রহে তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য মেনে চলে।

৫. সুন্নিদের মতে, ইমাম মুসলিম সমাজ থেকে নির্বাচিত হবেন এবং তিনি তাঁর কার্যকলাপের জন্য মুসলমানদের কাছে জবাবদিহি করবেন। ইমামের পদ কোনো পরিবার বা গোষ্ঠীর জন্য সংরক্ষিত থাকবে না। যেকোনো মুসলমান, এমনকি গোলামও উপযুক্ত যোগ্য বলে বিবেচিত হলে তাঁকে সবার ইমাম নির্বাচন করা যাবে। পক্ষান্তরে, শিয়াদের মতে, ইমাম মুসলিম উম্মতের একচ্ছত্র নেতা। তিনি আল্লাহ কর্তৃক নিযুক্ত এবং তাঁকে নিযুক্ত করার মানুষের কোনো অধিকার নেই।

৬. সুন্নিরা জুমার নামাজ জামাতে আদায় করে; কিন্তু শিয়াদের মতে, এ নামাজ ব্যক্তিগতভাবে পড়া যায়।

বিশ্লেষণ: শিয়াদের মতে, এ নামাজ ব্যক্তিগতভাবে পড়া যায়। এ কথাটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। কারণ শিয়াদের মতে জুমার নামাজ আল্লাহ মনোনীত ইমামের উপস্থিতিতে ওয়াজিব। কিন্তু আল্লাহ মনোনীত ইমামের অনুপস্থিতিতে ওয়াজিবে তাখিরি, অর্থাৎ জুমার নামাজ পড়লে জোহর পড়া লাগবে না। কিন্তু জুমআর নামাজ না পড়লে জোহর পড়া আবশ্যক। -দেখুন শিয়াদের মাসলা মাসায়েল গ্রন্থ তৌযিহুল মাসায়েল।

৭. ধর্মীয় পর্ব উদযাপনেও সুন্নি ও শিয়াদের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। শিয়ারা ইমাম হুসাইন (রা.)-এর নির্মমভাবে শাহাদাতবরণের স্মৃতি রক্ষার্থে মহররম পর্ব উদযাপনকালে তাজিয়া মিছিল বের করে এবং শোকের মাতম হিসেবে নিজের শরীরকে ক্ষতবিক্ষত করে। এ ক্ষেত্রে সুন্নিরা কেবল ১০ই মহররম বিশেষ ইবাদত বন্দেগি করে।

বিশ্লেষণ: এ কথাটি: ‚শিয়ারা ইমাম হুসাইন (রা.)-এর নির্মমভাবে শাহাদাতবরণের স্মৃতি রক্ষার্থে মহররম পর্ব উদযাপনকালে তাজিয়া মিছিল বের করে এবং শোকের মাতম হিসেবে নিজের শরীরকে ক্ষতবিক্ষত করে।“ আংশিক সত্য ও আংশিক মিথ্যা। কারণ সব শিয়ারা এমন করেন না। বিশ্বের প্রধান শিয়া দেশ ইরানের ধর্মীয় নেতা ফতোয়া দিয়েছেন: শোকের মাতম হিসেবে নিজের শরীরকে ক্ষতবিক্ষত করা হারাম।

৮. শিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে মুতা (অস্থায়ী) বিবাহ বৈধ। পক্ষান্তরে, সুন্নি কানুনে এ ধরনের বিবাহ স্বীকৃত নয়।

৯. সুন্নিরা ইমামকে আল্লাহর প্রতিচ্ছায়া মনে করে না। শিয়ারা ইমামকে আল্লাহর প্রতিচ্ছায়া মনে করে।

 বিশ্লেষণ: এ কথাটি শিয়াদের উপর একটা অপবাদসরূপ। কারণ শিয়াদের মধ্যে এক গ্রুপ এরূপ ছিল, তাদের নাম গালি (ইমামদের মর্যাদা নিয়ে বাড়া-বাড়ি কারী দল) কিন্তু শিয়া ইসনা আশারীদের মতে তারা কাফের।

মহান আল্লাহ যেন সব মুসলমানকে ইসলামের সঠিক পথে চলার তওফিক দান করেন এ মিনতি করছি।