সূরা ফাতেহার তাফসীর; পর্ব ১

ভূমিকা

আমরা জানি, বর্তমান উন্নত বিশ্বে কিছু তৈরী করা হলে নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ক্রেতাকে যন্ত্রের সাথে একটি নির্দেশিকা পুস্তিকাও সরবরাহ করে থাকে। ওই পুস্তিকায় যন্ত্রের খুঁটিনাটি দিক, বৈশিষ্ট্য, ব্যবহারের নিয়মাবলী, যন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর বিভিন্ন দিক বলে দেয়া হয়; যাতে ক্রেতা ওই যন্ত্র ব্যবহার করতে গিয়ে কোন সমস্যায় না পড়ে এবং এমন কোন কাজ না করে যাতে দ্রুত ওই যন্ত্রটি নষ্ট হয়ে যায়। আমি, আপনি, আমরা সব মানুষ এক ধরনের অত্যাধুনিক যন্ত্র, যাদেরকে এক মহা ক্ষমতাবান সত্ত্বা সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু আমাদের দেহ, আত্মা ও মনের মধ্যে নানা দুর্বলতা ও অজানা সব জটিলতার কারণে আমরা নিজেদের সম্পর্কে ভালোভাবে জানি না এবং সৌভাগ্য ও কল্যাণের পথ আমাদের জানা নেই। তাছাড়া আমরা কি টেলিভিশন কিংবা রেফ্রিজারেটরের চেয়ে নগণ্য কিছু যে, যন্ত্রের নির্মাতারা এসবের সাথে নির্দেশিকা পুস্তিকা দেয়াকে জরুরী মনে করছেন অথচ আমাদের স্রষ্টা আমাদের জন্য কোন বই বা পুস্তিকা লিখে দেবেন না?

আমাদের দৈহিক ও আত্মিক বৈশিষ্ট্যের বর্ণনাকারী এবং আমাদের যোগ্যতা, প্রতিভা ও ক্ষমতার বর্ণনাদানকারী কোন নির্দেশিকা বইয়ের কি কোন প্রয়োজন নেই? মানুষ কোন পথে চলবে এবং কোন পথে কিভাবে তার শক্তি ও যোগ্যতা কাজে লাগাবে, সেসবের বর্ণনা ও দিক নির্দেশনার কি কোন প্রয়োজন নেই? যেসব বিষয় মানুষের দেহ, মন ও আত্মার জন্য ক্ষতিকর এবং তাকে অকল্যাণের দিকে পরিচালিত করে সেসবের বর্ণনার কি কোন দরকার নেই? যে মহান স্রষ্টা তার অসীম জ্ঞান, ভালোবাসা ও দয়া দিয়ে আমাদের সৃষ্টি করেছেন তিনি আমাদেরকে এমনিই ছেড়ে দেবেন-এটা কি হতে পারে? না, এমনটি হতে পারে না। তাই আল্লাহপাক মানবজাতির পথ-নির্দেশনার জন্য সর্বশেষ আসমানী গ্রন্থ পবিত্র কোরআন পাঠিয়েছেন। যার মধ্যে মানুষ কীভাবে সুখী হতে পারে এবং কী কারণে সে দুর্দশাগ্রস্ত হবে ও ধ্বংসের মুখে পড়বে তার বর্ণনা দেয়া হয়েছে।

পবিত্র কোরআনে সুস্থ সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্ক, মানুষের নৈতিকতা, অধিকার, দেহ ও আত্মার খোরাক, ব্যক্তিগত ও সামাজিক দায়িত্ব, সমাজের সঠিক ও ভুল রীতি-নীতি, অর্থনৈতিক দিক নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এছাড়াও ব্যক্তি ও সমাজের সুখ-সমৃদ্ধি এবং অকল্যাণের সাথে জড়িত বহু বিষয় এই আসমানী গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে বিভিন্ন অতীত জাতির কাহিনী, যুদ্ধ-সংঘাত, বিভিন্ন নারী-পুরুষের জীবন পদ্ধতি তুলে ধরা হলেও এটি কোন গল্পের বই নয় বরং এটি আমাদের বর্তমান জীবনের জন্য এক মহা শিক্ষণীয় বই। তাইতো এই গ্রন্থের নাম কোরআন অর্থাৎ পাঠযোগ্য বই। এ বইটিকে তেলাওয়াত করতে হবে। অবশ্য শুধু মুখে মুখে তেলাওয়াত করলেই চলবে না। কারণ এ ধরনের পড়াতো ছোটদের পড়া। বরং গভীর চিন্তা-ভাবনার সঙ্গে পাঠ করতে হবে। অবশ্য পবিত্র কোরআনে আল্লাহপাক নিজেই এ ধরনের তেলাওয়াত করতে বলেছেন।

সূরা পরিচিতি

আমরা জানি, পবিত্র কোরআনে ১১৪টি সূরা রয়েছে এবং প্রত্যেক সূরায় রয়েছে বেশ কয়েকটি আয়াত। পবিত্র কোরআনের প্রথম সূরাটিকে ফাতেহাতুল কিতাব বলা হয় যা কিনা সাধারণত: সূরা হামদ নামে পরিচিত। এই সূরাটি দিয়ে কোরআন শুরু হয়েছে বলে একে ফাতেহাতুল কিতাব বা সূরা ফাতেহা বলা হয়। সাত আয়াত বিশিষ্ট এ সূরার গুরুত্ব সম্পর্কে শুধু এতটুকুই বলতে হয় যে, প্রতিদিন নামাজে দশ বার এই সূরা পড়া ফরজ এবং এছাড়া নামাজ শুদ্ধ হবে না। ঐশী কিতাবের সূচনাকারী এই সূরাটি এমন এক আয়াত দিয়ে শুরু হয়েছে, যার মাধ্যমে কোন কাজ করলে ওই কাজের পরিণতি শুভ হয়। এবারে এ আয়াতটির উপর আলোকপাত করব।

সূরা ফাতেহার প্রথম আয়াতটি হলো-

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ (1

 

"পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে।" (১:১)

অতীতকাল থেকে মানুষের চিরাচরিত রীতি ছিল তাদের গুরুত্বপূর্ণ কাজ কোন মহৎ ও বিশিষ্ট ব্যক্তির নামে শুরু করা, যাতে ওই কাজটি সফল হয় এবং এর বরকত বাড়ে। যেমন মূর্তিপূজকেরা তাদের পূজনীয় কোন মূর্তির নাম আওড়ায় কাজের সফলতার জন্য। আজকাল রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তির নামে বা তার উপস্থিতিতে বিভিন্ন কাজের উদ্বোধন করা হয়। কিন্তু সব কিছুর ওপরে এবং সর্বশক্তিমান হলেন, মহান আল্লাহ্‌। তাঁরই ইচ্ছায় অস্তিত্বের শুরু এবং বিশ্বজাহানের সবকিছু সৃষ্টি হয়েছে। শুধু বিশ্ব প্রকৃতি নয় বরং শরীয়ত অর্থাৎ কোরআনসহ সকল আসমানী গ্রন্থ তাঁরই নামে শুরু হয়েছে। এছাড়াও ইসলামে ছোট-বড় সব কাজ, খাওয়া-পরা, লেখা-জোখা, ভ্রমণ, ঘুমানো, ইত্যাদি যে কোন কিছু শুরুর আগে আমাদেরকে ‘বিসমিল্লাহ্‌' বলতে বলা হয়েছে। কোন পশু যদি আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা ছাড়া জবাই করা হয় তাহলে তার গোশ্‌ত খেতে নিষেধ করা হয়েছে। বিসমিল্লাহ্‌ শুধু ইসলাম ধর্মের নির্ধারিত কিছু নয়। পবিত্র কোরআনেই দেখা যায়, হজরত নূহ (আ.) এর কিশ্‌তীর যাত্রা শুরু হয়েছিল বিসমিল্লাহ্‌ দিয়ে। হজরত সোলায়মান (আ.)ও সারা রাজ্যের রানী বিলকিসকে যে চিঠি লিখেছিলেন তা শুরু করেন বিসমিল্লাহ বলে। আমাদের বিশ্বাস-বিসমিল্লাহ একটি পূর্ণাঙ্গ আয়াত এবং সূরা ফাতেহার অংশ। কারণ রাসূলে খোদা (সা.) এর আহলে বাইত বা নবী বংশের সদস্যরা নামাজে কাউকে বিসমিল্লাহ্‌ পড়তে দেখলে কিংবা নিঃশব্দে বিসমিল্লাহ্‌ বলতে দেখলে রাগ করতেন। তাঁরা নিজেরা সব নামাজে এই আয়াতটি জোরে শব্দ করে পড়তেন।

বিসমিল্লাহ্‌ থেকে আমাদের কয়েকটি প্রধান শিক্ষণীয় বিষয় হলো-

প্রথমত: বিসমিল্লাহ্‌ ও খোদার নাম উচ্চারণ থেকে আল্লাহর প্রতি ভরসা ও তাঁর কাছ থেকে সাহায্য প্রার্থনার বিষয়টি বোঝা যায়। আল্লাহর নাম প্রত্যেক কাজে বরকতের উৎস।

দ্বিতীয়ত: বিসমিল্লাহ্‌ আয়াতটি প্রত্যেক কাজকে আল্লাহর রঙে রঞ্জিত করে এবং মানুষের কাজকে শিরক বা অংশীবাদ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে।

তৃতীয়ত: বিসমিল্লাহ্‌ মানে-হে আল্লাহ্‌! আমি তোমাকে ভুলিনি, তুমিও আমাকে ভুলো না। যে ব্যক্তি বিসমিল্লাহ্‌ বলে সে নিজেকে আল্লাহর অসীম শক্তি ও অপার করুণার সাথে সংযুক্ত করে। #