সূরা বাকারা ( ৬১ – ৭৩ পর্ব )

সূরা বাকারা ( ৬১ – ৭৩ পর্ব ) কোরআনের আলো ( ৬১তম পর্ব ) সুপ্রিয় পাঠক, কোরআনের আলোর গত পর্বে আমরা জেনেছি ইসলাম স্ত্রীর অধিকার রক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয় এবং স্ত্রীর উপর যেকোন শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন চালানো নিষিদ্ধ বলে উল্লেখ করেছে । যৌথভাবে জীবন যাপন অব্যাহত রাখতে স্বামী ও স্ত্রী সম্মত না হলে ইসলাম তালাক বা বিবাহ বিচ্ছেদকে, অনিশ্চিত অবস্থায় স্ত্রীকে উৎকন্ঠিত করে তাকে চাপের মুখে রাখার চেয়ে ভালো বলে মনে করে । আজকের পর্বে আমরা তালাক সম্পর্কে কোরআনের আয়াতের ব্যাখ্যা করবো । প্রথমে সুরা বাকারার ২২৮ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করবো । এ আয়াতের অর্থ হলো, ‘‘ যেসব স্ত্রী তালাক পেয়েছে তারা পুনরায় বিয়ের আগে তিন ঋতু পর্যন্ত অপেক্ষা করবে পবিত্র হওয়ার জন্য । আর তারা যদি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে তবে আল্লাহ তাদের গর্ভে যা সৃষ্টি করেছেন তা অন্য কাউকে বিয়ের লক্ষ্যে গোপন করা তাদের জন্য বৈধ নয়, বরং সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার সময় পর্যন্ত তাদের অপেক্ষা করা উচিত । আর এ সময়ের মধ্যে তাদের স্বামীরা যদি আপোস করতে চায়, তবে তাদের স্বামী তাদেরকে পুনরায় বিয়ে করার বেশি অধিকার রাখে । স্বামীদের জানা উচিত স্ত্রীদের উপর তাদের যেমন ন্যায়সঙ্গত অধিকার আছে, তেমনি স্বামীদের উপরও স্ত্রীদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার অছে । আল্লাহ সর্বশক্তিমান ও প্রজ্ঞাময় । এ আয়াতে পরিবারের ও সন্তানদের পবিত্রতা রক্ষার জন্য তালাকের পর পুনরায় বিয়ের আগে স্ত্রীদেরকে প্রায় তিন মাস অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে । যাতে তাদের গর্ভে যদি সন্তান থেকে তবে তা যেন স্পষ্ট হয় এবং নবজাতকের অধিকার যেন রক্ষা করা হয় । সম্ভবত এই নবজাতক তালাক প্রতিরোধের পটভূমি সৃষ্টি করতে পারে । এরই মধ্যে স্বামী বা স্ত্রী যদি তালাকের সিদ্ধান্তের জন্য অনুতপ্ত হয় এবং পুনরায় আগের মতো যৌথ জীবন শুরু করতে চায় তাহলে স্বাভাবিকভাবেই এক্ষেত্রে পুর্বের স্বামী অন্যদের চেয়ে বেশি অধিকার পাবে। আয়াতের শেষাংশে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া বিবাদ মিটানো ও সমঝোতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তাদের উভয়কেই একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে । আর এ লক্ষ্যে প্রথমে স্বামীদের উদ্দেশ্যে বলা হলো,‘‘তোমাদের স্ত্রীর যেমন ঘর ও সংসারের বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত, তেমনি তোমাদেরও স্ত্রীর অধিকার রক্ষার জন্য দায়িত্ব আছে । উপযুক্ত ও পছন্দনীয় পন্থায় এই দায়িত্ব পালন করতে হবে । এরপর স্ত্রীদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে, ‘‘ পরিবার পরিচালনার দায়িত্ব স্বামীর এবং এক্ষেত্রে স্ত্রীর চেয়ে স্বামীর যোগ্যতা বেশি । এবারে সুরা বাকারার ২২৯ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করবো । ‘‘যেকোন স্বামী দুই বার পর্যন্ত তালাক দিয়েও পূর্বের স্ত্রীর কাছে ফিরে যেতে পারে । এরপর হয় তাকে উপযুক্ত মর্যাদায় স্ত্রী হিসেবে রাখবে অথবা সদয়তার সাথে ত্যাগ করবে । স্বামী ও স্ত্রী যদি এ আশংকা করে যে তারা আল্লাহর নির্দেশ বজায় রাখতে পারবে না, তাহলে স্ত্রীর কাছ থেকে নিজের দেয়া সম্পদ থেকে কিছু ফিরিয়ে নেয়া স্বামীর জন্য বৈধ নয় । এরপর যদি তোমাদের ভয় হয় যে তারা উভয়ই আল্লাহর নির্দেশ বজায় রাখতে পারবে না তাহলে স্ত্রী যদি বিনিময় দিয়ে অব্যাহতি নিয়ে নেয় তবে উভয়ের মধ্যে কারোই কোন পাপ নেই । এই হলো আল্লাহর নির্দেশের সীমা এবং এই সীমানা লংঘন করো না । যারা আল্লাহর সীমা অতিক্রম করে তারা অত্যাচারী। আগের আয়াতে বলা হয়েছিল তালাকের পর স্ত্রীকে তিন মাস অপেক্ষা করতে হবে। যাতে তার গর্ভে যদি সন্তান থেকে থাকে তা যেন স্পষ্ট হয় এবং তালাকের বিষয়ে স্বামী অনুতপ্ত হলে যেন পুনর্মিলনের সম্ভাবনা থাকে । এই আয়াতে বলা হয়েছে স্বামী মাত্র দুইবার পর্যন্ত স্ত্রীকে তালাক দিয়ে তা ফিরিয়ে নিতে পারে । আর যদি তৃতীয়বার স্ত্রীকে তালাক দেয় তাহলে স্ত্রীর কাছে আর ফিরে যেতে পারবে না । এরপর পরিবার পরিচালনার বিষয়ে একটি জরুরী মূলনীতি উল্লেখ করা হয়েছে । পুরুষদের উদ্দেশ্যে এ মূলনীতিতে বলা হয়েছে স্বামীদেরকে হয় পৃথক থাকার সিদ্ধান্ত নিতে হবে অথবা স্ত্রীর সাথে স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করতে হবে । আর যদি একত্রে বসবাস একেবারেই সম্ভব না হয় তাহলে অত্যন্ত ভদ্রভাবে স্ত্রীকে মুক্তি দিয়ে দাও এবং এক্ষেত্রে অবশ্যই স্ত্রীর প্রাপ্য দেনমোহর পরিশোধ করতে হবে । আর যদি স্ত্রী নিজেই তালাকের জন্য পীড়াপীড়ি করেন, তাহলে স্ত্রী তার মোহরানা মাফ করে দিয়ে তালাক নিতে পারেন কিন্তু কোন অবস্থাতেই মোহরানা মাফ করিয়ে নেয়ার জন্য স্ত্রীর উপর কোন ধরনের চাপ দেয়া বা তালাক নিতে তাকে বাধ্য করানো যাবে না । এই আয়াত থেকে আমরা যা শিখলাম তাহলো প্রথমত : স্ত্রীর মানবীয় অধিকার ছাড়াও তার অর্থনৈতিক অধিকারও রক্ষা করতে হবে এবং স্ত্রীর সম্পদ ও মোহরানা থেকে স্বামী কিছুই গ্রহণ করতে পারবে না । দ্বিতীয়ত : তালাক বা বিবাহ বিচ্ছেদ যদি একান্তই অপরিহার্য হয়ে পড়ে তাহলে স্বহৃদয়তার সাথে তা করতে হবে এবং প্রতিশোধ ও বিদ্বেষের মনোভাব নিয়ে তা করা যাবে না । তৃতীয়ত : যেসব পরিবার তার সদস্যদের মধ্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধান মেনে চলে সেসব পরিবার অত্যন্ত সৌভাগ্যের অধিকারী আর যদি কোন পরিবার পাপের সাথে চলতে থাকে তবে তালাক বা বিবাহ বিচ্ছেদ ঐ পরিবার টিকে থাকার চেয়ে অনেক ভালো । এবারে সূরা বাকারার ২৩০ ও ২৩২ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করবো । এই আয়াতের অর্থ হলো, যদি কোন স্বামী দুই বার স্ত্রীকে তালাক দিয়ে পুনরায় তার কাছে ফিরে আসার পর স্ত্রীকে তৃতীয়বারের মতো তালাক দেয় তবে ঐ স্ত্রী তার জন্য আর বৈধ হবে না যদি না অন্য কোন পুরুষ তাকে বিয়ে করে । এই দ্বিতীয় স্বামী তাকে তালাক দিলে যদি তারা আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলার ইচ্ছে রাখে তবে তাদের উভয়ের জন্যই পরস্পরকে পুনরায় বিয়ে করাতে কোন পাপ নেই । আর এই হলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমা । আল্লাহ তো জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য স্পষ্ট বর্ণনা করেন । আর যখন তোমরা স্ত্রীদেরকে তালাক দিয়ে দাও এবং তারা নির্ধারিত ইদ্দত সমাপ্ত করে নেয়, তখন তোমরা নিয়ম অনুযায়ী তাদেরকে রেখে দাও । অথবা সহানুভূতির সাথে তাদেরকে মুক্ত করে দাও । আর তোমরা তাদেরকে জ্বালাতন ও বাড়াবাড়ির উদ্দেশ্যে আটকে রেখোনা । আর যারা এমন করবে, নিশ্চয়ই তারা নিজেদেরই ক্ষতি করবে । আর আল্লাহর নিদর্শনকে ঠাট্টারূপে গ্রহণ করো না । আল্লাহর সে অনুগ্রহের কথা স্মরণ কর যা তোমাদের ওপর রয়েছে এবং তাও স্মরণ কর, যে কিতাব ও জ্ঞানের কথা নাজেল করা হয়েছে তোমাদেরকে উপদেশ দেয়ার জন্য । আল্লাহকে ভয় কর এবং জেনে রাখ যে আল্লাহ সব বিষয়ে মহাজ্ঞানী । তোমরা যখন স্ত্রীদেরকে তালাক দাও এবং তারা তাদের ইদ্দতকাল পূর্ণ করে, তখন তারা যদি পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে বিধিমত সম্মত হয়, তবে স্ত্রীরা তাদের পূর্ব-স্বামীদের বিয়ে করতে চাইলে তাদেরকে বাধা দিওনা । এ দিয়ে তোমাদের মধ্যে যে কেউ আল্লাহ ও কেয়ামতের দিনে বিশ্বাস করে তাদেরকে উপদেশ দেয়া হচ্ছে । এরমধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে একান্ত পরিশুদ্ধতা ও অনেক পবিত্রতা । আর আল্লাহ যা জানেন, তোমরা তা জান না । ইসলাম বৈধ ও প্রাকৃতিক কামনা-বাসনাকে সম্মান করে এবং স্বামী ও স্ত্রীর পুণর্মিলন ও তাদের কোলে সন্তানের প্রতিপালনকে স্বাগত জানায় । আর এ জন্যই ইসলাম, কোন স্ত্রী যদি অন্য পুরুষকে বিয়ে করার পর পুনরায় তার থেকে আলাদা হয়ে যায় তবে পূর্বের স্বামীর সাথে উভয়ের সম্মতির ভিত্তিতে বিয়েকে বৈধ করেছে । এক্ষেত্রে তাদের পুণর্বিবাহে অভিভাবক বা অন্যকারো বাধা দেয়ার কোন অধিকার নেই এবং এক্ষেত্রে উভয়ের সম্মতিই বিয়ের আকদ্ হিসেবে যথেষ্ট বলে বিবেচিত হবে । এই আয়াত থেকে আমরা যা শিখলাম তা হলো বর নির্বাচনে কনের মতামতকে সম্মান দেখাতে হবে এবং বিয়ের ভিত্তি হলো বর ও কনের যথাযথ সম্মতি । অতএব আমরা পারিবারিক অধিকারের প্রতি সম্মান দেখানোর জন্য দম্পতিদের প্রতি আহবান জানাচ্ছি । আপনারা পরস্পরের অধিকার যথাযথভাবে পালন করুন যাতে সন্তানদের এ উষ্ণ আশ্রয়স্থল শীতল না হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত যেন বিবাহ-বিচ্ছেদ না ঘটে ।# কোরআনের আলো ( ৬২ তম পর্ব ) সুপ্রিয় পাঠক, কোরআনের আলোর গত কয়েকটি পর্বে আমরা পরিবার ও স্বামী-স্ত্রীর সমস্যা সম্পর্কে ইসলামের বিধি, বিধান নিয়ে আলোচনা করেছি । কোরআনের পরবর্তী আয়াতসমূহে আমরা দেখবো ইসলাম সন্তানের অধিকার আদায় করা এবং এমনকি স্বামী- স্ত্রী বিচ্ছিন্ন হবার পরও সন্তানের অধিকার আদায়ের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে । এ বিষয়ে সুরা বাকারার ২৩৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে " যে কেউ স্তন্যপানের কাল পূর্ণ করতে চায়, তারজন্য মায়েরা তাদের সন্তানকে পূর্ণ দুবছর স্তন্যপান করাবে । পিতার কর্তব্য হলো তালাকের পরও যথাযোগ্যভাবে সন্তানের মায়ের ভরণপোষণ করা । আর বাবা ও মাকে তাদের সন্তানের জন্য ক্ষতিগ্রস্থ করা যাবে না । অনুরূপভাবে সন্তান বা উত্তরাধিকারীদের ওপরও একই দায়িত্ব রয়েছে । কিন্তু যদি তারা পরস্পরের সম্মতি ও পরামর্শক্রমে স্তন্যপান বন্ধ রাখতে চায়, তবে তাদের কারো কোন অপরাধ নেই । যদি তোমরা নিজ সন্তানদেরকে স্তন্য দেয়ার জন্য ধাত্রীদের কাছে অর্পন করে নিয়ম অনুযায়ী কিছু দান কর, তবে তাতেও তোমাদের জন্য দোষ নেই এবং আল্লাহকে ভয় কর । আর জেনে রেখো যে, তোমরা যা করছ আল্লাহ তা খুব ভালোভাবে দেখছেন। ‘‘পরিবার হলো প্রতিটি সমাজের স্তম্ভ । এই ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়লে সমাজে সংকট দেখা দেবে । আগের আয়াতে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে বিবাহ-বিচ্ছেদ সম্পর্কে বলার পর এই আয়াতে তালাকের পর সন্তানের প্রতি তাদের কর্তব্য সম্পর্কে বলা হয়েছে । এই আয়াতে মাতৃস্নেহের গুরুত্ব বিচার করে ও শিশুর জন্য মায়ের দুধের প্রয়োজনের আলোকে শিশুকে দুবছর পর্যন্ত মায়ের দুধ খাওয়ানোর পরামর্শ দেয়া হয়েছে । এমনকি মা যদি সন্তানের বাবা থেকে বিচ্ছিন্নও হয় বা সন্তানের পিতার মৃত্যু ঘটে তবুও মাকে সন্তানের এই অধিকার পূরণ করতে হবে । স্বামীর সাথে বনি-বনা না হবার জন্য সন্তানের দৈহিক ও মানসিক ক্ষতি করা যাবে না । অবশ্য সন্তান ও সন্তানের মায়ের ভরন-পোষণের দায়িত্ব পালন করা সন্তানের পিতার দায়িত্ব এবং তাদের জন্য ক্ষতিকর হবে এমন কোন কাজ করার অধিকার সন্তানের পিতার নেই । এই আয়াত থেকে আমরা যা যা শিখলাম তা হলো, প্রথমত : শিশুদের অধিকার রক্ষা করা পিতা-মাতার জন্য অবশ্য পালনীয় দায়িত্ব । শিশুদেরকে তাদের পিতা-মাতার বিচ্ছেদের নেতিবাচক পরিণতির শিকার হতে দেয়া যাবে না । দ্বিতীয়ত : ইসলামী বিধান অনুযায়ী পরিবারের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর দায়িত্ব স্বামীর এবং পরিবারের ভরণ-পোষন যোগাতে স্ত্রী বাধ্য নয় । এবারে সুরা বাকারার ২৩৪ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করবো । এ আয়াতের অর্থ হলো, ‘‘ তোমাদের মধ্যে যারা স্ত্রী রেখে মারা যায় তাদের স্ত্রীদেরকে চারমাস ১০দিন অপেক্ষা করতে হবে । ইদ্দত বা এই নির্ধারিত সময় শেষ হবার পর তারা যথানিয়মে নিজেদের জন্য যা করবে, তাতে তাদের কোন অপরাধ নেই । তোমরা যা কর, আল্লাহ সে সম্পর্কে অভিজ্ঞ । তালাক ছাড়া অন্য যে করণে স্ত্রীকে দুঃখজনকভাবে স্বামী থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হয় তা হলো স্বামীর মৃত্যু । প্রাকৃতিকভাবে বা অসুস্থ হয়ে স্বামী মারা গেলে বিধবা স্ত্রীর কী করণীয় তা এই আয়াতে বলা হয়েছে । বিভিন্ন জাতি ও গোত্রের মধ্যে স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীর করণীয় সম্পর্কে ইতিহাসে বিভিন্ন প্রথার কথা জানা যায় । অনেকের বিশ্বাস, স্ত্রীকেও স্বামীর মৃত্যুর পর মরতে হবে এবং এজন্য স্বামীর সাথে তাকে জীবন্ত কবর দিতে হবে । কোন কোন জাতি স্ত্রীর পুনর্বিবাহকে নিষিদ্ধ করেছে । আবার অনেকে স্বামীর মৃত্যুর পর পরই বিধবা স্ত্রীর পুনর্বিবাহকে বৈধ বলে মনে করেন । এই সব চরম পন্থা ও বাড়াবাড়ির বিপরীতে ইসলাম মৃত স্বামীর মর্যাদা রক্ষা এবং বিধবা স্ত্রী গর্ভবতী কিনা তা স্পষ্ট করার জন্য অপেক্ষার নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়েছে । কিন্তু এই সময় পেরিয়ে যাবার পর বিধবাকে নিজ পছন্দমত বিয়ে করার অনুমতি দিয়েছে এবং এক্ষেত্রে অন্যদের মতামত তার জন্য জরুরী নয় । এবারে সুরা বাকারার ২৩৫ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করবো । এ আয়াতের অর্থ হলো, ‘‘ ইদ্দতকালীন মহিলাদের কাছে তোমরা ইঙ্গিতে বিয়ের প্রস্তাব করলে অথবা তা তোমাদের মনে গোপন রাখলে তোমাদের কোন পাপ নেই । আল্লাহ জানেন যে তোমরা তাদের সম্বন্ধে আলোচনা করবে । কিন্তু উপযুক্ত কথাবার্তা ছাড়া গোপনে তাদের কাছে কোন অঙ্গীকার করো না । জেনে রাখ, তোমাদের অন্তরে যা আছে আল্লাহ তা জানেন । আল্লাহ ক্ষমাশীল, সহিষ্ণু । ‘‘আগের আয়াতে বলা হয়েছিল স্বামীর মৃত্যুর পর বিধবা স্ত্রীরা নিজেদের পছন্দমত যে কোন স্বামী গ্রহণ করতে পারে । এই আয়াতে বলা হয়েছে যদিও ইদ্দতকালীন সময়ে বিধবা স্ত্রীদেরকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়ার ক্ষেত্রে কোন বাধা নেই, কিন্তু রুচি সম্মত ও পরিবেশ সম্মতভাবে তাদের সাথে কথা বলতে হবে । কারণ স্বামী হারানোর কারণে তারা শোক-সন্তপ্ত রয়েছে । এই আয়াত থেকে আমরা যা শিখলাম তাহলো প্রথমত : ইসলাম প্রকৃতির ধর্ম । আর প্রত্যেক মানুষই স্বভাবগতভাবে বিয়ে করতে আগ্রহী । ইসলাম এই চাহিদার বিরোধীতা করে না । বরং নারী ও পুরুষের জন্য এর বৈধ ক্ষেত্র সৃষ্টি করেছে । দ্বিতীয়ত : বিয়ের আগে বিয়ের জন্য গোপন চুক্তি বা ওয়াদা করা এবং বিধবা স্ত্রীদের সাথে অনুপযোগী আচরণ করা থেকে দূরে থাকতে হবে । সুরা বাকারার ২৩৬ ও ২৩৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘‘ যদি তোমরা তোমাদের স্ত্রীকে স্পর্শ না করে অথবা তাদের মোহরানা বা প্রাপ্য নির্ধারন না করে তালাক দাও , তবে তোমাদের জন্য কোন দোষ নেই । তোমরা তাদের সংস্থানের ব্যবস্থা করবে । বিত্তবান তার সাধ্যমত ও বিত্তহীন তার সামর্থ অনুযায়ী বিধিমত সংস্থানের ব্যবস্থা করবে । আর এটাই ন্যায়পরায়ন লোকের কর্তব্য । তোমরা যদি তাদেরকে স্পর্শ করার আগেই তালাক দাও , অথচ মোহর ধার্য করে থাক, তবে যা তোমরা ধার্য করেছ তার অর্ধেক তাদেরকে দিতে পার । যদি না স্ত্রী অথবা যার হাতে বিবাহ-বন্ধন রয়েছে সে মাফ করে দেয় এবং মাফ করে দেয়াই আত্মসংযমের নিকটতর । তোমরা পরষ্পরের মধ্যে উদারতার কথা ভুলে যেওনা । তোমরা যা কর আল্লাহ তা দেখেন । এই দুই আয়াতে তালাকের সময় স্ত্রীর অর্থনৈতিক অধিকার রক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলা হয়েছে, বিয়ের মূল চুক্তিতে দেন মোহর ধার্য না করা হলেও নিজের আর্থিক সামর্থ অনুযায়ী স্ত্রীকে অর্থ দিয়ে বিচ্ছেদের তিক্ততা কিছুটা দূর করতে হবে । আর এটা হলো সৎকর্মশীলতার পরিচয়। আর যেক্ষেত্রে মোহরানা নির্ধারিত রয়েছে ও স্ত্রীকে স্পর্শ করা হয়েছে সেক্ষেত্রে স্ত্রীকে পূর্ণ মোহরানা দিতে হবে এবং এমনকি একদিন স্পর্শ করা হলেও পূর্ণ মোহরানা দিতে হবে । স্ত্রীকে স্পর্শ না করা হলেও পূর্ণ মোহরানা দেয়া উত্তম ও মহত্বের নিদর্শন । আর পুরোপুরি সম্ভব না হলে অর্ধেক পরিমান মোহরানা দিতে হবে । অবশ্য স্ত্রী চাইলে পুরো অংশ বা আংশিক পরিমানে মোহরানা মাফ করে দিতে পারে । এই দুই আয়াতের শিক্ষা হলো কোরআনের আকাঙিক্ষত পরিবার হবে এমন যে তালাকের সময়ও স্বামী-স্ত্রী মানবীয় ও নৈতিক বিষয়কে মনে রাখবে । অবশ্য পালনীয় অধিকার রক্ষা করা ছাড়াও উভয়পক্ষকে বিদ্বেষ ও রুক্ষতার পরিবর্তে একে অপরের প্রতি উদার ও ক্ষমাশীল হতে হবে । # কোরআনের আলো ( ৬৩ তম পর্ব ) সুপ্রিয় পাঠক, কোরআনের আলোর আজকের পর্বে ব্যক্তি, সমাজ ও পারিবারিক জীবনে ইসলামের বিধান সম্পর্কিত কয়েকটি আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করব। প্রথমে সুরা বাকারার ২৩৮ ও ২৩৯ নম্বর আয়াতের অর্থ নিয়ে আলোচনা করা যাক। এই দুই আয়াতের অর্থ হল, তোমরা নামাজের প্রতি যত্মবান হবে, বিশেষ করে মধ্যবর্তী নামাজের এবং আল্লাহর উদ্দেশ্যে তোমরা বিনীতভাবে দাঁড়াবে। যদি তোমরা শত্রু বা বিপদের আশঙ্কা কর তখন তোমরা পদচারী বা আরোহী অবস্থাতেই পড়। যদি তোমরা নিরাপদ বোধ কর, তবে আল্লাহকে স্মরণ করবে যেভাবে তিনি তোমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন, যা তোমরা জানতেনা। মানুষের শারীরিক সুস্থতার জন্য উপযুক্ত ও নিয়মিত খাদ্য গ্রহণ জরুরী। যদি খাবার থেকে বঞ্চিত থাকে, তাহলে তা অক্ষম বা অসুস্থ হয়ে পড়ে। তেমনি আমাদের আত্মার উন্নতি ও পূর্ণতা এবং সৃষ্টির উৎসের সাথে নৈকট্যের জন্য স্রষ্ট্রা অর্থাৎ আল্লাহর সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা দরকার। আর এজন্যেই খাবারের মত নামাজ ও দিনে কয়েকবার আদায় করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে যাতে আমাদের শরীর ও আত্মা সমানতালে পূর্ণতা লাভ করে এবং আমাদের আত্মা অপবিত্রতা থেকে মুক্ত হয়ে সতেজ ও প্রানবন্ত হয়। তাই এই আয়াতে নামাজের বিষয়ে সচেতন থাকার জন্য তাগিদ দেয়া হয়েছে এবং সন্ত্রাস ও যুদ্ধের সময় ও এই ওয়াজিব দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যুদ্ধের সময় নামাজকে স্বাভাবিক অবস্থার নামাজের মত আদায় করা সম্ভব নয় বলে ইসলাম বিকল্প পন্থাও দেখিয়ে দিয়েছে। এই আয়াত থেকে আমরা যা শিখলাম তা হল, নামাজ সব সময়ই মানুষের জন্য প্রয়োজনীয়। এমনকি যুদ্ধের ক্ষতি না করে মুজাহিদদেরকে শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে শক্তিশালী করে। এবারে সুরা বাকারার ২৪০ থেকে ২৪২ নম্বর আয়াতের অর্থ নিয়ে আলোচনা করব। এই তিন আয়াতের অর্থ হল, তোমাদের মধ্যে যারা মারা এবং স্ত্রীদেরকে ছেড়ে যায়, তারা যেন স্ত্রীদের বহিষ্কার না করে এক বছর পর্যন্ত তাদের ভরণ পোষণের ওসিয়ৎ বা অন্তিম- উপদেশ দিয়ে যায়। কিন্তু তারা যদি নিজেরাই চলে যায় এবং নিজেদের জন্য উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নেয়, তবে এর জন্য তোমাদের কোন দোষ নেই, আল্লাহ মহাপরাক্রন্ত বিজ্ঞানময়। তালাক প্রাপ্তা নারীদের সম্মানজনক ভাবে ভরণ-পোষণ করা ধর্মভীরূ স্বামীদের কর্তব্য। এভাবে আল্লাহ তাঁর নিদর্শন স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা বুঝতে পার। এই আয়াতে পুনরায় পরিবার বিষয়ে ইসলামের স্পষ্ট নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যেসব স্ত্রীর স্বামী মারা গেছে বা তালাক প্রাপ্ত হয়েছে, তাদের সম্পর্কে প্রথম নির্দেশ হল, যদি স্ত্রী মৃত স্বামীর সম্মানার্থে এক বছর পর্যন্ত বিয়ে না করে ও স্বামীর ঘরে থাকতে চায়, তাহলে তাকে উপযুক্ত পন্থায় ভরণ-পোষণ করতে হবে, এবং তাকে তার স্বামীর ঘর থেকে বের করে দেয়ার অধিকার কারো নেই। আর চারমাস দশদিন ইদ্দত বা বৈধব্য পালনের পর যদি স্ত্রী অন্য কোন পুরূষকে বিয়ে করতে চায়, তাহলে সেক্ষেত্রেও স্ত্রীকে বাধা দেয়ার অধিকার কারো নেই। বরং ইদ্দতের পর স্ত্রী তার নতুন স্বামী নির্বাচনে সম্পূর্ণ স্বাধীন। এরপর বলা হয়েছে, মুমিন স্বামীরা যেন বিচ্ছেদের সময় স্ত্রীকে মোহরানা দেয়া ছাড়াও তাকে নিজ সামর্থ অনুযায়ী অর্থ সাহায্য দেয় যাতে তার দুঃখ ও মানসিক তিক্ততা কিছুটা কমে যায়। এই আয়াত থেকে আমরা যা শিখতে পারি তার সার সংক্ষেপ হল, প্রথমত : ইসলাম পরিবারে নারীর অধিকার রক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। স্বামীর মৃত্যুর পরও নারীর ভরণ-পোষণ এবং এমনকি তালাকের পরও ইসলাম সম্মানজনকভাবে নারীর ভরণ-পোষণ করাকে জরূরী বলে মনে করে। দ্বিতীয়ত ; নারী তার উপযুক্ত স্বামী নির্বাচনের ব্যাপারে সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং পরিবারে মহিলাদের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। এবারে সুরা বাকারার ২৪৩ ও ২৪৪ নম্বর নিয়ে আলোচনা করা যাক। এই দুই আয়াতের অর্থ হল, তুমি কি তাদেরকে দেখনি মৃত্যুর ভয়ে যারা হাজারে হাজারে ঘর ছেড়ে চলে গিয়েছিল। আল্লাহ তাদেরকে বলেছিলেন তোমাদের মৃত্যু হোক। আর তাদের মৃত্যুর পর আল্লাহ তাদেরকে জীবিত করেছিলেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ মানুষের প্রতি অনুগ্রহশীল, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেনা। তোমরা আল্লাহর পথে সংগ্রাম কর, এবং জেনে রাখ তিনি শ্রবণকারী- মহাজ্ঞানী। এই আয়াতে এমন একটি জাতির কাহিনী বলা হয়েছে যারা নিজেদের ধর্ম রক্ষার জন্য শত্রুদের মোকাবেলা করতে প্রস্তুত ছিলনা এবং মৃত্যুর ভয়ে তারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মৃত্যু যে শুধু যুদ্ধ ক্ষেত্রেই হয়না এটা যে কোন স্থানেই সম্ভব তা বোঝানোর জন্য আল্লাহ তাদের মৃত্যু ঘটিয়ে পুনরায় জীবিত করেন, যাতে ভবিষ্যতে মানুষ এ ঘটনা থেকে শিক্ষা নেয়। এরপর মুসলমানদেরকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে, এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নাও, মনে রেখ যুদ্ধ থেকে পালানোর অর্থ মৃত্যু থেকে পালানো নয়। বরং যুদ্ধ থেকে পালানোর কারণেই তোমাদের ওপর আল্লাহর শাস্তি বা মৃত্যু নেমে আসতে পারে। তাই আল্লাহর ধর্মের শত্রুদের বিরূদ্ধে সংগ্রাম কর। আর মনে রেখো, যুদ্ধের ফলে তোমাদের যেসব কষ্ট হয়, আল্লাহ তা জানেন এবং যুদ্ধের ফলে ক্ষতিগ্রস্থদেরকে আল্লাহ পুরস্কৃত করবেন। এই দুই আয়াত থেকে আমরা যা শিখলাম তার সারাংশ হল, প্রথমত : পরকালে মৃত মানুষকে জীবিত করা অসম্ভব কোন বিষয় নয়। আল্লাহ এ পৃথিবীতেই মৃত বিষয়কে অনেকবার জীবিত করেছেন। দ্বিতীয়ত : ধর্ম যুদ্ধ থেকে হয়তো পালিয়ে যাওয়া সম্ভব, কিন্তু আল্লাহর সিদ্ধান্তের বাইরে কিছু করার চেষ্টা অর্থহীন। তৃতীয়ত : আল্লাহর ধর্ম রক্ষার জন্য জিহাদ বা ইসলামী ধর্মীয় যুদ্ধের লক্ষ্য দেশের সীমান্ত বৃদ্ধি নয় বা শক্তি-প্রদর্শন কিংবা বলপূর্বক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাও নয়। # কোরআনের আলো ( ৬৪তম পর্ব ) সুপ্রিয় পাঠক, কোরআনের আলোর আজকের পর্বে আমরা সুরা বাকারার ২৪৫ নম্বর থেকে ২৪৮ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখা নিয়ে আলোচনা করবো। প্রথমে ২৪৪ নম্বর আয়াতের অর্থ নিয়ে আলোচনা করা যাক। এই আয়াতের অর্থ হল, কে আল্লাহকে উত্তম ধন দেবে ? তিনি এটা তার জন্য বহুগুন বৃদ্বি করবেন। আল্লাহই মানুষের রিজিক বা আয় বাড়ান ও কমান এবং তাঁরই দিকে তোমাদের ফিরে যেতে হবে। পূর্ববর্তী আয়াতে জিহাদে অংশ নিতে মুমিনদের প্রতি আহবান জানানো হয়েছে। জিহাদের জন্য জীবন উৎসর্গ করা ছাড়াও জনগনের অর্থ সাহায্যের প্রয়োজন হয়। তাই এ আয়াতে মুমিনদেরকে আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয়ে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে বলা হয়েছে যে, আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয় হল আল্লাহকে উত্তম ধন দেয়ার। অবশ্য আল্লাহকে ধন দেয়া বলতে শুধু ধর্মযুদ্ধে অর্থ সাহায্য দেয়াকে বোঝায় না, একই সাথে সমাজের দরিদ্র ও বঞ্চিতদের যে কোন সাহায্য দেয়াও এই ধনের অন্তর্ভূক্ত। আল্লাহ দুনিয়ায় ও পরকালে মানুষকে এর বিনিময়ে অনেকগুণ বেশী প্রতিদান দেবেন। কারণ, আমাদের জীবিকার মালিক আল্লাহ । আর যা আমরা আল্লাহর রাস্তায় দান করব আল্লাহ তা হিসাবে রাখবেন এবং সময়মত এর প্রতিদান দেবেন। এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিক হল , রিজিক বা জীবিকার হ্রাস-বৃদ্ধি আল্লাহর হাতে এ কথা মনে রাখলে আমরা খুব সহজেই আল্লাহর পথে দান-খয়রাত করতে পারব। অথবা অন্তত:পক্ষে অন্যকে ধন দিয়ে সাহায্য করতে পারব। কারণ, আমরা আল্লাহর কাছেই এর প্রতিদান পাব। এবারে সুরা বাকারার ২৪৬ ও ২৪৭ নম্বর নিয়ে আলোচনা করব। এই দুই আয়াতের মধ্যে প্রথম আয়াতের অর্থ হল, তুমি কি মুসার পরবর্তী ইসরাইল বংশীয় প্রধানদের পরিনতি দেখনি ? তারা নিজেদের নবীকে বলেছিল আমাদের জন্য একজন নেতা নিযুক্ত যাতে আমরা আল্লাহর পথে সংগ্রাম করতে পারি, নবী বললেন এমন তো হতে পারে যে, যখন তোমাদেরকে যুদ্ধের আদেশ দেয়া হবে তখন তোমরা যুদ্ধ করবেনা ? তারা বলেছিল, যখন আমরা আমাদের বাড়ী ঘর ও সন্তানদের কাছ থেকে বিতাড়িত হয়েছি, তখন আমরা কেন আল্লাহর পথে সংগ্রাম করবনা ? এরপর যখন তাদেরকে যুদ্ধ করতে বলা হল, তখন তাদের অল্প সংখ্যক ছাড়া সবাই পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে। আল্লাহ অত্যাচারীদের কে ভালভাবেই জানেন। এবার ২৪৭ নম্বরের অর্থ হল, বনী ইসরাইলদের নবী তাদেরকে বলেছিলেন আল্লাহ তালুতকে তোমাদের সর্দার করেছেন। তারা বলল: সে কিভাবে আমাদের ওপর কর্তৃত্ব করবে যখন আমরা নিজেরাই শাসন কাজে তার চেয়ে বেশী যোগ্য এবং তার প্রচুর ধনসম্পদ ও নেই ? নবী বললেন, আল্লাহই তাকে তোমাদের জন্য মনোনীত করেছেন এবং তিনে তাঁকে দৈহিক শক্তি ও জ্ঞানের দিক থেকে সমৃদ্ধ করেছেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময় ও প্রজ্ঞাময়। হযরত মুসা (আঃ) যুগ শেষ হবার পর বনী ইসরাইলীরা আরাম আয়েশ প্রিয় হয়ে ওঠায় পূনরায় তাদের ওপর তাগুত বা জালেম শক্তির কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তারা তাদের ভূ-খন্ড থেকে বিতাড়িত হয়। ফলে তাদের মধ্যে কেউ কেউ উদ্ধাস্তর জীবন থেকে মুক্তি ও স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। আর এ লক্ষ্যে তারা তৎকালীন নবীর কাছে তাদের জন্য এমন এক নেতা নির্বাচনের আহবান জানায় যে নেতার নেতৃত্বে তারা তাগুতি শ্বাসনের বিরূদ্ধে যুদ্ধ করবে। যদি ও ঐ নবী বনী ইসরাইলীদের অতীত আচরণের আলোকে এটা জানতেন যে ইহুদীরা যুদ্ধ ও সংগ্রাম করার মত লোক নয়,তবুও তাদের অজুহাত তোলার পথ বন্ধের জন্য তালুত নামের এক দরিদ্র অখ্যাত রাখালকে তাদের সেনা অধিনায়ক করেন। বনী ইসরাইলীরা ভেবেছিল জাতির একজন উচ্চপদস্থ ব্যক্তিকে এ পদে নিয়োগ করা হবে। কিন্তু তাদের এ আশা পূর্ণ না হওয়ায় তারা তালুতের সেনাপতিত্ব মেনে নেয়নি এবং এমনকি তারা তালুতের চেয়ে নিজেদেরকে যোগ্য বলে দাবী করে। অথচ যুদ্ধের জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও শারীরীক শক্তির দিক থেকে তালুত অন্যদের চেয়ে বেশী যোগ্য ছিল। আর এ কারণেই আল্লাহ তাকে সেনাপতি পদে মনোনীত করেন। এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিক হল, প্রথমত : নিজেকে পরিবারকে বা দেশকে রক্ষার জন্য সংগ্রাম আল্লাহর পথে জিহাদ হিসেবে বিবেচিত হয়। দ্বিতীয়ত : ধর্ম রাজনীতি থেকে পৃথক নয়। ইতিহাসের দীর্ঘ পরিক্রমায় আল্লাহর নবীগন মানুষকে অত্যাচারী শাসকদের নিপীড়ন থেকে মুক্ত করার জন্য ব্যাপক প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। তৃতীয়ত : দায়িত্ব পালনের সঠিক মানদন্ড হল শারীরিক ও জ্ঞানগত যোগ্যতা, অর্থ-বিত্ত, বংশ-গৌরব বা পদ নয় । এবারে সুরা বাকারার ২৪৮ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করব। এই আয়াতের অর্থ হল, বনী ইসরাইলীদের কে তাদের নবী বলেছিল, অধিনায়কত্বের জন্য তার যোগ্যতার নিশ্চিত নিদর্শন হল, তোমাদের কাছে একটি সিন্দুক আসবে যার মধ্যে তোমাদের প্রতিপালকের কাছ থেকে শান্তি ও অন্যান্য বিষয়,যা মুসার ও হারুনের সম্প্রদায় ত্যাগ করে গেছে। ফেরেশতারা তা বহন করে আনবে, তোমরা যদি বিশ্বাস স্থাপনকারী হও তবে এর মধ্যে নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য নিদর্শন আছে। যখন অবাধ্য ও একগুঁয়ে বনী ইসরাইলীরা তালুতের নেতৃত্ব মেনে নিতে রাজী হল না, তখন তাদের নবী ইহুদীদেরকে আলাহর নির্দেশ মানতে বাধ্য করার জন্য বলেন। জেনে রাখ, আল্লাহ বনী ইসরাইলের পবিত্র সিন্দুককে তালুতের মাধ্যমে তোমাদের কাছে ফিরিয়ে আনবেন। এটা হল সেই সিন্দুক বা বাক্স যাতে হযরত মুসা (আঃ)র মা নবজাতক মুসাকে রেখেছিলেন এবং আল্লাহর নির্দেশে তা নীল দরিয়ায় ভাসিয়ে দেন। এভাবে আল্লাহ মুসাকে ফেরাউনের সেনাদের হাত থেকে রক্ষা করেন। এরপর শিশু মুসা ফেরাউনের কাছে পৌঁছলে ফেরাউন ও তার স্ত্রীর হৃদয়ে মুসার প্রতি এত ভালবাসা জন্মায় যে তারা মুসাকে নিজেদের সন্তান হিসেবে গ্রহণ করে। এই সিন্দুকটিকে ফেরাউনের দরবারে রাখা হত এবং মুসা (আঃ) যখন নবুওত লাভ করেন তখন তাতে তাওরাত গ্রন্থ রাখা হয়। মুসা (আঃ)র মৃত্যুর সময় এতে তাঁর বর্মও অন্যান্য স্মৃতি চিহৃ সংরক্ষণ করে তা বনী ইসরাইলের কাছে রাখা হয়। ইহুদীদের কাছে এই গ্রন্থ অত্যন্ত পবিত্র বলে বিবেচিত হত। যুদ্ধের সময় এই সিন্দুককে অগ্রভাগে রাখা হত যাতে সেনারা প্রশান্ত ও দৃঢ় চিত্তের অধিকারী হয়। কিন্তু সিন্দুকটি শত্রুদের হস্তগত হওয়ায় ইহুদীরা দু:খিত ও অসন্তুষ্ট ছিল। অবশেষে তালুতের যুগে আল্লাহর সাহায্যের ফলে ঐ সিন্দুকটি পুনরায় ইহুদীদের কাছে ফিরে আসে।সবশেষে আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি আমরা যেন স্বদেশ ও নিজ ধর্ম রক্ষার জন্য জীবন ও সম্পদ ত্যাগ করতে দ্বিধান্বিত না হই।আর সমাজের নেতা নির্বাচনের জন্য আমরা যেন ব্যক্তির জ্ঞান ও যোগ্যতাকে সব সময় প্রাধান্য দেই। পার্থিবও ক্ষণস্থায়ী বিষয়কে যেন এক্ষেত্রে প্রাধাণ্য না দেই। # কোরআনের আলো ( ৬৫তম পর্ব ) সুপ্রিয় পাঠক ! কোরআনের আলোর আজকের পর্বে বনী ইসরাইল জাতির নেতা হিসেবে তালুতের নির্বাচন পরবর্তী ঘটনা সম্পর্কিত আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হবে । প্রথমেই সুরা বাকারার ২৪৯ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা করা যাক । এই আয়াতের অর্থ হলো " এরপর তালুত যখন সেনাদলসহ বের হল তখন সে বলেছিল নিশ্চয়ই আল্লাহ একটি নদী দিয়ে তোমাদের পরীক্ষা করবেন । এরপর যেই সেখান থেকে পানি পান করবে সে আমার দলভূক্ত নয়। আর যারা তার স্বাদ গ্রহণ করবে না, তারা আমার দলভূক্ত । অবশ্য যে, তার হাতে এক কোষ পানি নেবে, সেও আমার দলভূক্ত । কিন্তু নদীর কাছে পৌঁছার পর, অল্প সংখ্যক লোক ছাড়া সবাই নদী থেকে পানি পান করে । তালুত ও তার বিশ্বাসী সঙ্গীরা যখন নদীর তীরে পৌঁছেছিল, তখন তারা বলেছিল যে জালুত ও তার সেনাদলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার শক্তি ও সাধ্য আজ আমাদের নেই । যাদের ধারনা ছিল যে, তারা নিশ্চই আল্লাহর সাথে মিলিত হবে । তারা বলেছিল আল্লাহর আদেশে অনেক সময় ক্ষুদ্র দল বৃহৎ দলের ওপর জয়ী হয়েছে এবং আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গী । গত পর্বে আমরা বলেছি যখন আল্লাহ তালুতকে বনি ইসরাইলীদের প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করলেন তখন তারা তা মেনে নিতে রাজী হয়নি । তারা যুদ্ধ থেকে পালানোর জন্য অজুহাত তুলতে লাগলো । পরবর্তী পর্যায়ে একদল তালুতের সেনাপতিত্ব মেনে নিয়ে তার সাথে শহরের বাইরে রওনা হয় । কিন্তু তালুত তাদের আনুগত্যের মাত্রা যাচাই করার জন্য একটি নদীকে পরীক্ষার মাধ্যম করে বলেন, আমার প্রকৃত সহযোগী তারাই যারা তৃষ্ণা সত্ত্বেও প্রাণভরে ঐ নদীর পানি পান করবে না । শুধু হাতের তালু দিয়ে পানি নিয়ে গলা ভেজাবে মাত্র । এই আয়াতে বলা হয়েছে যে বেশি সংখ্যক লোকই এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়নি । পানি দেখে তারা তাদের তৃষ্ণাকে নিয়ন্ত্রনে রাখতে পারেনি । আর তৃতীয় পর্যায়ে তারা শত্রুদের কাছে নিজেদের বিকিয়ে দেয় এবং জালুতের সেনাদের সাথে য্দ্ধু করতে তাদের অক্ষমতা প্রকাশ করে । শুধুমাত্র প্রকৃত মোমেনরা যারা কিনা আল্লাহর প্রেমের মাধ্যমে তাদের মনোবলকে সুদৃঢ় রেখেছিল তারা প্রচন্ডভাবে রুখে দাঁড়ায় এবং শত্রুসেনাদের বিশাল সংখ্যা দেখেও মোটেও ভীত হয়নি । এবারে এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো, প্রথমত : পানীয় ঐশী পরীক্ষার অন্যতম মাধ্যম। এজন্যে শুধু হারাম নয়, মাঝে মধ্যে হালাল বস্তু থেকেও দূরে থাকতে হবে, যাতে ইসলামী সমাজের নেতার প্রকৃত ও বাহ্যিক অনুসারীদের চিহ্নিত করা যায়। দ্বিতীয়ত : আল্লাহর প্রতিশ্রুতিগুলো ও পরকালের প্রতি ঈমাণ সমস্যা ও বাধা-বিপত্তীর মোকাবেলায় মানুষের ক্ষমতা ও শক্তিকে বৃদ্ধি করে। তৃতীয়ত : যুদ্ধ বা আন্দোলনের ক্ষেত্রে প্রতিরোধ ও দৃঢ়তা অব্যাহত রাখা জরুরী। তালুত ও জালুতের ঘটনায় দেখা গেছে, অত্যাচারী তাগুতি সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রামে শ্লোগান দেয়ার জন্য বহু লোক থাকা সত্ত্বেও খুব কম সংখ্যক লোকই শত্রুর বিরুদ্ধে রূখে দাঁড়িয়ে ছিল। এবারে সুরা বাকারার ২৫০ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করব। এই আয়াতের অর্থ হল, "তারা যখন যুদ্ধ ক্ষেত্রে জালুত ও তার সেনা বাহিনীর মুখোমুখী হল, তখন তারা বলল : আমাদের কে ধৈর্য ও দৃঢ়তা দান কর এবং অবিশ্বাসী দলের উপর আমাদের কে বিজয়ী কর। আমরা আগেই বলেছিলাম, ইহুদীরা জালুতের সেনাদেরকে দেখে ভয় পেয়ে যায় এবং শুধুমাত্র প্রকৃত ঈমানদাররাই যুদ্ধ করতে প্রস্তুত হয়। কিন্তু প্রকৃত ঈমানদাররা ও এটা জানতো যে আল্লাহর সাহায্য ছাড়া এত শক্তিশালী সেনাবাহিনীর ওপর বিজয় লাভ সম্ভব নয়। তাই তারা আল্লাহর কাছ থেকে সাহায্য প্রার্থনা করে এবং যুদ্ধের তীব্রতা ও শত্রুর মোকাবেলায় দৃঢ়তা ও ধৈর্য দেয়ার জন্যেও আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে। এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিক গুলো হল, প্রথমত : চেষ্টা ও সাধনা ছাড়া শুধু দোয়া কার্যকরী হয় না। তালুতের বিশ্বস্ত সঙ্গীরা যুদ্ধের ময়দানে এসে বিজয়ের জন্য প্রার্থনা করেছিল। দ্বিতীয়ত : ঈমানদার বা বিশ্বাসীদের লক্ষ্য হল, মিথ্যার ওপর সত্যের বিজয় এক জাতির ওপর অন্য জাতির কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা নয়। তাই তালুতের সঙ্গীরা অবিশ্বাসীদের ওপর বিজয় প্রার্থনা করে। এবারে সুরা বাকারার ২৫১ ও ২৫২ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করব। এই আয়াতের অর্থ হল, এরপর আল্লাহর ইচ্ছায় তালুত ও তার সঙ্গীরা শত্রুদেরকে পরাজিত করেছিল এবং জালুত দাউদের হাতে নিহত হয়। পরে আল্লাহ দাউদকে রাজত্ব ও জ্ঞান দান করেছিলেন এবং আল্লাহ নিজ ইচ্ছামত তাকে শিক্ষা দান করেন। যদি আল্লাহ এক দলকে অন্যদল দিয়ে দমন না করতেন, তবে নিশ্চয়ই পৃথিবী অশান্তিপূর্ণ হত। কিন্তু আল্লাহ বিশ্বাসীর প্রতি অনুগ্রহশীল। এই সব হল আল্লাহর নিদর্শন আপনার কাছে এটা সত্যরূপে পাঠ করছি এবং নিশ্চয়ই আপনি রাসূলদের অন্তর্ভূক্ত। মোমেনদের প্রচেষ্টা ও আল্লাহর সাহায্যের ফলে অবশেষে অতি অল্প সংখ্যক বিশ্বাসী সুসজ্জিত বিশাল বাহিনীর ওপর জয়লাভ করে। দাউদ নামের বিশ্বাসী ও সাহসী এক যুবক শত্রুদলের সেনাপতি জালুতকে হত্যা করে। এরপর আল্লাহ দাউদের সাহসিকতা ও ঈমানের পুরস্কার হিসেবে তাঁকে নবী পদে উন্নীত করেন এবং তাঁকে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা শিক্ষা দেন। আল্লাহ দাউদের পুত্র সোলায়মানকেও নবুওত দান করে দাউদকে সম্মানিত করেছিলেন। পাঁচটি আয়াতে উল্লেখিত এই ঘটনা বর্ণনার উদ্দেশ্য হল, ঈমানদারদের মনোবলকে শক্তিশালী করা। সেই সাথে এসব আয়াত এক শ্রেণীর মুসলমানদের জন্যেও সাবধানবাণী হিসেবে বিবেচিত হয় যারা মক্কা ও তাদের ঘরবাড়ী ত্যাগ করেছিল। তারা সংখ্যায় ছিল অল্প এবং তারা ধন সম্পদের অধিকারী ছিলনা কিন্তু তালুতের যুগের ইহুদীদের মত তারাও মক্কার মুশরিকদের কাছে বলতো আমাদের নবী হবার জন্য মোহাম্মদ কোন দিক থেকে বেশী যোগ্য? অথচ মক্কায় অনেক নামকরা ও শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব রয়েছেন। এবারে এই আয়াতের মূল শিক্ষণীয় দিকগুলো একে একে উল্লেখ করছি। প্রথমত : কেউ যখন যোগ্যতা ও প্রতিভার প্রকাশ ঘটায় শুধুমাত্র তখনই সে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ লাভ করে। দাউদ আল্লাহর পথে সাধনার মাধ্যমেই নবুওতের মর্যাদা লাভ করেছিলেন। দ্বিতীয়ত : যদি ধর্মের শত্রুর বিরূদ্ধে জিহাদ ফরজ বা অবশ্য পালনীয় কর্তব্য না হতো তাহলে পৃথিবী অবিচার ও অশান্তিতে ভরে উঠতো তাই, আল্লাহর রাস্তায় শহিদ হবার ব্যাপারে দুঃখ থাকা উচিত নয়। তৃতীয়ত : এই ঘটনা থেকে আমরা এটাও শিখতে পারি যে, বিজয়ের শর্তগুলো হল, শক্তিশালী ও যোগ্য নেতা থাকা, আল্লাহর ওপর নির্ভর করা বা ভরসা রাখা ধৈর্য ও দৃঢ় মনোবলের অধিকারী হওয়া এবং যুদ্ধের জন্য ঐশী উদ্দেশ্য থাকা ,( যেমন -জাতির কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে সত্যের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা।) # কোরআনের আলো ( ৬৬তম পর্ব ) সুপ্রিয় পাঠক ! কোরআনের আলো অনুষ্ঠান থেকে আপনাদের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। প্রথমে সুরা বাকারার ২৫৩ নম্বর আয়াতের অর্থ নিয়ে আলোচনা করা যাক। এই আয়াতের অর্থ হল, এই সকল নবী আমি তাঁদের কারো উপর কারো শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি। তাঁদের মধ্যে কারো সাথে আল্লাহ কথা বলেছেন এবং তাঁদের কাউকে পদ মর্যাদায় উন্নত করেছেন। আমি মরিয়মপুত্র ঈসাকে স্পষ্ট নিদর্শনাবলী দান করেছি এবং তাঁকে পবিত্র আত্মা বা জিবরাইলের মাধ্যমে শক্তিশালী করেছি। আল্লাহ চাইলে এইসব নবী আসার পর এবং মানুষের কাছে স্পষ্ট নিদর্শনাদী আসার পরও তারা একে অপরের সাথে যুদ্ধ করতনা। কিন্তু আল্লাহ মানুষকে পথ নির্দেশনা বা হেদায়াত গ্রহণে বাধ্য করতে চাননি। মানুষ সত্য মেনে নেয়ার ব্যাপারে মত-বিরোধে লিপ্ত ছিল। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ ঈমান এনেছিল। আবার অনেকেই কাফের বা অবিশ্বাসী হয়েছিল। আল্লাহ যদি চাইতেন, তাহলে এই দুই দল পরষ্পরের সাথে সংগ্রাম করতনা। কিন্তু আল্লাহ যা চান, তাই করেন। আগের আয়াতে বলা হয়েছিল আল্লাহ হযরত দাউদ (আঃ) কে প্রজ্ঞা ও শাসন-ক্ষমতা দান করেন। এই আয়াতে নবীদের মধ্যে মর্যাদা ও অবস্থানের পার্থক্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, সমস্ত নবীরা একই মর্যাদার অধিকারী নন। তাঁদের কারো ওপর কারো শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে। যেমন, হযরত মুসা (আঃ) কোন মাধ্যম ছাড়াই আল্লাহর সাথে কথা বলতেন এবং হযরত ঈসা (আঃ) সব সময় জিবরাইলের মাধ্যমে সাহায্য পেতেন। এরপর মানুষ সম্পর্কে আল্লাহর এক গুরূত্বপূর্ণ নীতির কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে মানুষ তার নিজস্ব পথ নির্ধারনের ক্ষেত্রে স্বাধীন। তারা ইচ্ছে করলে ঈমান আনতে পারে বা বিশ্বাসী হতে পারে। তারা ইসলামের নবীর অনুসারী হতে পারে কিংবা শুধুমাত্র অন্য কোন নবীর প্রতিও ঈমান আনতে পারে। নি:সন্দেহে যদি আল্লাহ চাইতেন, তবে তিনি মানুষের মধ্যে মতবিরোধ ও বিবাদ দূর করতে পারতেন এবং সব মানুষকে জোর করে একই পথের অনুসারী করতেন। কিন্তু এটা আল্লাহর নিয়ম নয়। বরং আল্লাহর নিয়ম হল, মানুষ স্বাধীনভাবেই কোন ধর্ম গ্রহণ করবে অথবা কোন ধর্মকে প্রত্যাখ্যান করবে। সুরা বাকারার ২৫৩ নম্বর আয়াতের শিক্ষণীয় দিক হল, প্রথমত : জোরপূর্বক ধর্মে দিক্ষিত করা মূল্যহীন। কেউ যদি স্বেচ্ছায় কোন ধর্ম গ্রহণ করে, তবেই তার মূল্য থাকবে। তাই ধর্ম নিয়ে মানুষের মধ্যে মতভেদ থাকা স্বাভাবিক এবং কোন ধর্ম গ্রহণ করা বা না করা মানুষের ইচ্ছা বা বিচার-বিবেচনার ওপর নির্ভর করে। দ্বিতীয়ত : আল্লাহ নবীদেরকে স্পষ্ট যুক্তি ও দলীল- প্রমাণ সহকারে পাঠিয়েছেন। মানুষ কখনো অহমিকা বা খেয়ালীপনার কারণে এবং কখনো অজ্ঞতার কারণে নবীদেরকে মেনে নেয়না। এবারে সুরা বাকারার ২৫৪ নম্বর আয়াতের অর্থ নিয়ে আলোচনা করব। এই আয়াতের অর্থ হল, হে বিশ্বাসীগণ, আমি তোমাদের যে জীবিকা দান করেছি, শেষ বিচারের দিন আসার আগেই তা থেকে ব্যয় কর, শেষ বিচারের দিন ক্রয়-বিক্রয়, বন্ধুত্ব ও সুপারিশ থাকবেনা। জেনে রাখ, অবিশ্বাসীরাই সীমালংঘনকারী। এই আয়াতে মুমিনদের প্রতি হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করে বলা হয়েছে যে, দুনিয়ার জীবনকে যেন তারা সূবর্ণ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে এবং কিয়ামত বা বিচার দিবসের জন্য তারা যেন পাথেয় সংগ্রহ করে। তাই এ দুনিয়াতেই আল্লাহর সাথে লেন-দেন করতে হবে এবং এজন্যে নিজের সম্পদ থেকে অন্যদের দান-খয়রাত করতে হবে। বিচার দিবসে কেনা ও বেচার কোন ব্যবস্থা নেই এবং শাস্তি থেকে মুক্তি-পাওয়া বা সৌভাগ্য কেনার কোন সুযোগ নেই। বন্ধু এবং নিজের আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে মহৎ লোকদের ওপর ও ভরসা করা উচিত নয়। কারণ, বিচার দিবসে তারাও কোনই উপকার করতে পারবেনা এবং তাদের সুপারিশ ও মধ্যস্থতাও কোন কাজে লাগবেনা। এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিক হল, আমাদের মধ্যে দানশীলতার মনোভাব সৃষ্টির জন্য আল্লাহ ৩টি দিকের কথা উল্লেখ করেছেন। প্রথমত : আমাদের যা কিছু আছে তা আমাদের এসব কিছু দিয়েছেন। দ্বিতীয়ত : আল্লাহ তার দেয়া সম্পদ থেকে কিছু অংশ দান করতে বলেছেন, সমস্ত সম্পদ দান করতে বলেননি। তৃতীয়ত : বিচার দিবসে এই দান অন্য সব বন্ধুর চেয়ে ভালো বন্ধু হয়ে দেখা দেবে। এবারে সুরা বাকারার ২৫৫ নম্বর আয়াতের অর্থ নিয়ে আলোচনা করব। এই আয়াতের অর্থ হল, আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য বা মাবুদ নাই। তিনি চির-জিবীত ও নিত্য-বিরাজমান। তন্দ্রা বা নিদ্রা তাঁকে স্পর্শ করেনা, আকাশ ও জমীনে যা কিছু আছে সবই তাঁর। কে এমন আছে যে তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর কাছে অনুরোধ করতে পারে? তাদের সম্মুখ ও পেছন বা বর্তমান ও ভবিষ্যত সম্পর্কে তিনি জানেন। তা-ছাড়া তাঁর অনন্ত জ্ঞানের কোন বিষয়েই কেউ ধারণা করতে পারেনা, অবশ্য আল্লাহ যতটা চান, ততটা জ্ঞান কাউকে দান করেন। সমস্ত আকাশ ও জমীন তিনিই পরিচালনা করছেন। এসবের রক্ষনাবেক্ষণ তাঁর জন্য কষ্টকর নয়। তিনি মহান ও মহিয়ান। এই আয়াতে কুরসী শব্দ থাকায় তা আয়াতুল কুরসি নামে বিখ্যাত। এতে এক আল্লাহর গুনাবলী ও সত্ত্বার বর্ণনা দেয়া হয়েছে। সমস্ত ঐশী ধর্মের মূল বানী হল, তৌহিদ বা একত্ববাদ। একত্ববাদ মানুষকে মূর্তি ও কল্পিত খোদার উপাসনা করা থেকে মুক্তি দেয়। তৌহিদ মানুষকে তাগুতি ও অত্যাচারী শাসকের যাঁতকেল থেকে মুক্তি তরে তাদেরকে স্বাধীনতা ও সৌভাগ্যের পথ দেখায়। লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ হল, এমন এক পরিচিত বাক্য যা জন্মের সময় মুসলমান নবজাতকের কান ও অন্তরকে প্রশান্তি দেয় এবং প্রতিদিন আযানের মধুর ডাকের সাথে এই বাক্য তাঁর সত্বায় মিশে যায়। লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর অর্থ হল, আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ উপাস্য হবার যোগ্য নয়। সমস্ত পূর্ণতা ও সৌন্দর্যের উৎস তিনি। আল্লাহ ছাড়া যা কিছু আছে তাদের কেউই নিজ থেকে পূর্ণতারঅধিকারী নয় বলে তারা উপাস্য হতে পারেনা এবং তারা ভক্তি-শ্রদ্ধা পাবারও যোগ্য নয়। প্রকৃত জীব হল, সেই জীবন যার ধ্বংস নেই এবং ঐ জীবনের অধিকারী হলেন আল্লাহ । আল্লাহ ছাড়া আর সবই ধ্বংসশীল। একমাত্র আল্লাহই কারো ওপর নির্ভরশীল নয় এবং সব কিছুই আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল। আল্লাহ কখনোই দূর্বলতা, ক্লান্তি, ঘুম ও তন্দ্রার শিকার হননা। আল্লাহ যদি মুহুর্তের জন্যেও বিশ্বকে স্বাধীন অবস্থায় ছেড়ে দেন, তাহলে কোন কিছুই অবশিষ্ট থাকতো না। তিনিই সব কিছুর মালিক এবং সবই তাঁর রাজত্বের অন্তর্ভূক্ত বা মালিকানাধীন। কোনো মালিকানাধীন সত্ত্বার উপাসনা করবে? আমরা কেনো নিজের স্রষ্টা ও মালিকের উপাসনা করব না ? এবং কেনই বা অন্যদের দ্বারস্থ হব ? অবশ্য মুশরিকরাও আল্লাহকে বিশ্বের স্রষ্টা বলে মনে করে, কিন্তু তারা এটাও মনে করে যে, বিভিন্ন মূর্তি তাদের মুক্তির জন্য সুপারিশ করবে। এই আয়াতে বলা হয়েছে, কল্পিত ও মনগড়া আশ্রয় ত্যাগ কর। শুধুমাত্র ঐশী মহাপুরুষ নবী বা আল্লাহর আওলিয়ারা সুপারিশ করতে পারবেন এবং তারাও আল্লাহর অনুমতি ছাড়া সুপারিশ করতে পারবেন না। আয়াতের শেষাংশে কুরসী শব্দ প্রয়োগ করে আল্লাহর অসীম শক্তি ও জ্ঞানের এ ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে যে আল্লাহ শুধু প্রাণযুক্ত সত্ত্বার মালিক নন, সমস্ত সৃষ্টি জগতের সব কিছুর উপরই তাঁর কর্তৃত্ব রয়েছে এবং কোন কিছুই তাঁর কর্তৃত্ব ও ইচ্ছা থেকে স্বাধীন নয়। এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিক হল, আমরা এমন সত্ত্বার কাছে মাথানত করব যিনি জ্ঞান, ক্ষমতা, অনুগ্রহ প্রভৃতি দিকে চরম পূর্ণতার অধিকারী এবং যিনি সব ধরনের দূর্বলতা ও দোষ ত্রুটি থেকে মুক্ত। # কোরআনের আলো ( ৬৭তম পর্ব ) সুপ্রিয় পাঠক ! কোরআনের আলো অনুষ্ঠান থেকে আপনাদের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। আজকের পর্বে সুরা বাকারার ২৫৬ নম্বর আয়াত থেকে ২৫৯ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করব । প্রথমে সুরা বাকারার ২৫৬ ও ২৫৭ নম্বর আয়াতের অর্থ ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করা যাক। এই আয়াতের অর্থ হল, ধর্ম গ্রহণের ক্ষেত্রে কোন জোর জবরদস্তি নেই। কারণ, বিভ্রান্তির পথ থেকে সত্য পথকে সুস্পষ্ট করা হয়েছে। যে শয়তান বা তাগুতকে অস্বীকার করেছে এবং আল্লাহর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করেছে, সে এমন সুদৃঢ় রজ্জু ধরে আছে যা কখনও ছিন্ন হবার নয়। আর আল্লাহ শ্রবণকারী মহাজ্ঞানী। যারা আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছে, আল্লাহ তাদের অভিভাবক, তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে যান। অন্যদিকে কাফেরদের পৃষ্ঠপোষক হল, তাগুত বা শয়তান, যে তাদের কে আলো থেকে অন্ধকারে নিয়ে যায়। এরাই নরকের অধিবাসী। সেখানে তারা স্থায়ীভাবে থাকবে। ঈমান বা বিশ্বাসের সম্পর্ক হৃদয়ের সাথে। আর বিশ্বাস কখনও জোর করে চাপিয়ে দেয়া যায়না। আচার আচরণ, দলীল প্রমাণ ধর্মীয় উপদেশ বা বতৃতা মানুষের মনকে কোন ব্যক্তি বা আদর্শের প্রতি বিশ্বাসী করে তোলে। মহান আল্লাহ মানুষের পূর্ণতা ও উন্নতির জন্য একদিকে নবী রাসুল ও ঐশী গ্রন্থ পাঠিয়েছেন, তেমনি অন্যদিকে মানুষকে তার ইচ্ছামত নবী বা ঐশী গ্রন্থ বেছে নেয়ার বা অস্বীকার করার ও অধিকার দিয়েছেন। আর এজন্যে নবীরাও ঈমান আনার জন্যে কাউকে বাধ্য করেননি। এছাড়াও তাঁরা জানতেন জোর করে বিশ্বাস গ্রহণে বাধ্য করার কোন মূল্য নেই। কেউ যদি শয়তানী বা স্বৈরাচারী তাগুতী শক্তির কর্তৃত্ব অস্বীকার করে ও শুধু আল্লাহর দাসত্ব মেনে চলে তাহলে আল্লাহ তার তত্ত্বাবধান করে এবং জীবনের সংকটময় মুহুর্তে ও সব সময়ই তাকে সুপথ দেখিয়ে রক্ষা করেন। আর যারা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ওপর ভরসা করে তারা তাগুতা, শির্ক ও কু-সংস্কারের অন্ধকারে নিমজ্জিত হয় এবং আল্লাহ তাদেরকে বাস্তবতা উপলব্ধির পথ থেকে দূরে রাখেন। এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিক হল, প্রথমত : ধর্মের প্রতি বিশ্বাস তখনই মূল্যবান, যখন তা সচেতনতা ও জ্ঞান ভিত্তিক হয় এবং তা নিজ ইচ্ছায় কেউ গ্রহণ করে। দ্বিতীয়ত : সত্যের পথ একটি , কিন্তু বিচ্যুতি বা বিভ্রান্তির পথ অনেক। আর এজন্যে পবিত্র কোরআনে নূর বা আলোকে একবচনে ও জুলমাতকে অন্ধকার সমূহ অর্থাৎ বহুবচনে উল্লেখ করা হয়েছে। তৃতীয়ত : সত্যের পথ হল আলোকিত এবং তা উন্নতি, গতিশীলতা, আশা ও প্রশান্তি এনে দেয়। আর মিথ্যার পথ হল অন্ধকারময় এবং তা বিভ্রান্তি, অজ্ঞতা ও অস্থিরতা সৃষ্টি করে। এবারে সুরা বাকারার ২৫৮ নম্বর আয়াতের অর্থ নিয়ে আলোচনা করা যাক। এই আয়াতের অর্থ হল, হে নবী, আপনি কি তার প্রতি লক্ষ্য করেননি, যে দম্ভভরে ইব্রাহীমের সাথে তাঁর প্রতিপালক সম্পর্কে বিতর্ক করেছিল, যেহেতু আল্লাহ তাকে রাজত্ব দান করেছিল। যখন ইব্রাহীম বলেছিল, আমার প্রতিপালক তিনি, যিনি জীবন দান করেন ও মৃত্যু ঘটান। সে অর্থাৎ নমরুদ বলেছিল, আমিই জীবন দান করি ও মৃত্যু ঘটাই। ইব্রাহীম বলল: নিশ্চয়ই আল্লাহ সূর্যকে পূর্ব দিকে উদয় করান, তুমি ওকে পশ্চিম দিক থেকে উদয় করাও এতে সেই অবিশ্বাসী হতবুদ্ধি হয়েছিল এবং আল্লাহ অত্যাচারীদলকে পথ প্রদর্শন করেন না। ইতিহাস থেকে জানা যায় নমরুদ ছিল প্রাচীন ইরাকের ব্যবিলনের রাজা। সে নিজেকে খোদা বলে দাবী করত এবং প্রজাদের কে নিজের দাস বা বান্দা বলে মনে করত। যখন সে শুনল, ইবরাহীম (আঃ) মানুষকে এক আল্লাহর দিকে আহবান করছে তখন সে ইবরাহীম (আঃ) বললেন, মানুষের জন্ম ও মৃত্যু আল্লাহরই হাতে। নমরুদ তখন দুজন বন্দীকে এনে একজনকে মুক্তি দেয়ার ও অন্য বন্দীকে হত্যার নির্দেশ দেয় এবং বলে এভাবে আমি যাকে ইচ্ছে মৃত্যু দেই ও যাকে ইচ্ছে জীবিত রাখি। যদিও নমরুদের এই কাজ বিভ্রান্তি ছাড়া অন্য কিছু নয়। তবুও ইবরাহীম (আঃ) পূর্ব দিকে সূর্যের উদয় হওয়াকে আল্লাহর সৃষ্টি জগতের একটি মূলনীতি হিসেবে উল্লেখ করেন ও নমরুদ পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদয় করাতে পারবে কিনা, প্রশ্ন করেন। নমরুদ এ প্রশ্ন শুনে হতবাক ও নিরুত্তর থাকে। কিন্তু সে সত্যকে মেনে নিতে রাজী হয়নি এবং পবিত্র কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী নমরুদ তখন হযরত ইবরাহীম (আঃ) কে আগুনে পুড়িয়ে মারার নির্দেশ দেয়। এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হল, প্রথমত : কোন মানুয়ের মধ্যে যদি জ্ঞান বা সচেতনতা না থাকে তাহলে সে মানুষ ক্ষমতা পেয়ে নিজেকে আল্লাহর দাস ভাবার পরিবর্তে নিজেই প্রভু হবার দাবী করতে পারে এবং এভাবে সে অহংকারী ও গর্বিত হয়ে পড়ে। দ্বিতীয়ত : নবীরা যুক্তি ও প্রমাণের মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহর দিকে আহবান করেন। কিন্তু অসত্যপন্থীরা ভুল, অন্যায় ও জোর জবরদস্তির পন্থা ছাড়া অন্য কিছুর আশ্রয় নিতে পারেনা। এবারে সুরা বাকারার ২৫৯ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা যাক। এই আয়াতের অর্থ হল, অর্থাৎ ঐ ব্যক্তির কাহিনী কি জান যে ধ্বংস হয়ে যাওয়া কোন জনবসতি অতিক্রমের সময় বলেছিল, মৃত্যুর পর কিভাবে আল্লাহ একে জীবিত করবেন? এরপর আল্লাহ তাকে একশত বছর মৃত রেখে পূনরায় জীবিত করেন। আল্লাহ বলেন: তুমি কতকাল অবস্থান করলে? সে বলল, একদিন বা একদিনের কিছু অংশ। আল্লাহ বললেন না, তুমি বরং একশত বছর অবস্থান করেছ। তোমার খাবার ও পানীয়ের দিকে লক্ষ্য কর তা অবিকৃত আছে এবং তোমার গাধার দিকে তাকাও কারণ, তোমাকে মানব জাতির জন্য নিদর্শনস্বরূপ করব। আর গাধার হাড়গুলোর দিকে তাকাও, কিভাবে সেগুলোকে যুক্ত করি ও মাংস দিয়ে ঢেকে দেই। যখন এই বাস্তবতা তার কাছে স্পষ্ট হল, তখন সে বলল, আমি জানি যে, আল্লাহ সব বিষয়ে সর্বশক্তিমান। বিভিন্ন তাফসীর গ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ী বনী ইসরাইলের নবী হযরত উজাইর (আঃ)র জীবনে এ ঘটনা ঘটেছিল বলে জানা যায়। তিনি ধ্বংসস্তুপে পরিনত একটি শহর অতিক্রমের সময় পুনরুত্থান বা কিয়ামত দিবসে মৃতদের পুনর্জীবিত করার ঘটনা দেখতে চেয়েছিলেন। যদিও তিনি কিয়ামতের ওপর ঈমান রাখতেন,তা সত্ত্বেও তিনি অন্তরের প্রশান্তির জন্য অনুরুপ কিছু দেখানোর জন্য আল্লাহর কাছে অনুরোধ করেন। আর আল্লাহর নির্দেশে এই ঘটনা ঘটার ফলে তার কাছে আল্লাহর শক্তির বিষয়টি প্রত্যক্ষভাবে প্রমানিত হয়। একশত বছর পরও পচনশীল খাবার তাজা ছিল এবং আল্লাহর অনুগ্রহে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া গাধার হাঁড় পূণরায় প্রথম অবস্থা ফিরে পায়। অর্থাৎ গাধাটিও জীবিত হয়। উজাইর নিজে একশ বছর মৃত থাকা সত্ত্বেও তার শরীরে কোন পরিবর্তন ঘটেনি। বরং তিনি ঘুম থেকে জেগে ওঠা মানুষের মতই সতেজ ছিলেন। এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিক হল, প্রথমত : পুনরুত্থান দিবস বা কেয়ামতের দিনে মানুষের পুনরায় জীবিত হওয়াটা অসম্ভব কিছু নয়। আর আল্লাহ পৃথিবীতেই এর প্রমান দেখিয়েছেন। দ্বিতীয়ত : আল্লাহ বিভিন্ন পন্থায় পৃথিবীতে তার শক্তির প্রমান দেখিয়ে থাকেন যাতে মানুষ এটা বুঝতে পারে যে, আল্লাহ সব কিছু করার ক্ষমতা রাখেন, তাই পুনরুত্থান বা কিয়ামতের ব্যাপারে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। # কোরআনের আলো ( ৬৮তম পর্ব ) সুপ্রিয় পাঠক ! কোরআনের আলো অনুষ্ঠান থেকে আপনাদের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। কোরআনের আলোর গত অনুষ্ঠানে আমরা উজাইর নবী ঘটনা থেকে এটা জানতে পেরেছি যে কিভাবে আল্লাহ তাঁর মৃত্যুর একশ বছর পর পূণরায় তাকে এ দুনিয়ায় জীবিত করেছিলেন। এঘটনার মাধ্যমে আল্লাহ কিয়ামত বা বিচার দিবসে মৃত মানুষদের কে কিভাবে জীবিত করবেন সেটাই তাঁকে দেখিয়েছিলেন। কোরআনের আলো অনুষ্ঠানে আজ আমরা হযরত ইবরাহীম (আঃ)র জীবনের একটি ঘটনা নিয়ে আলোচনা করব। হযরত ইবরাহীম (আঃ) একদিন নদীর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। এমন সময় এক মৃত জন্তুকে দেখলেন যা শরীরের কিছু অংশ নদীর মধ্যে এবং অন্য কিছু অংশ ছিল শুস্ক তীরের মধ্যে। পানির ও ডাঙ্গার জন্তুরা ঐ মৃত জন্তুটির গোস্ত খাচ্ছিল। ইবরাহীম (আঃ) এ ঘটনাটি দেখে ভাবলেন, যদি মানুষের শরীরের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঘটনা ঘটে, তাহলে মানুষের দেহ অন্যান্য জন্তুদের হেদের অংশ হয়ে পড়বে আর সে ক্ষেত্রে কিয়ামতের দিন এই ব্যক্তি কিভাবে তার আগের শরীর নিয়ে জীবিত হবে ? ইবরাহীম (আঃ) ছিলেন আল্লাহর রাসুল। পুনরূত্থানের প্রতি বিশ্বাস রাখা সত্ত্বেও তিনি এধরনের মৃত ব্যক্তির জীবিত হবার ধরণ বা প্রক্রিয়া দেখিয়ে দেয়ার জন্য আল্লাহর কাছে অনুরোধ করেন। সুরা বাকারার ২৬০ নম্বর আয়াতে আল্লাহর সাথে তাঁর সংলাপের বিষয়টি উল্লেখিত হয়েছে। এবারে সুরা বাকারার ২৬০ নম্বর আয়াতের অর্থ ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করা যাক। এই আয়াতের অর্থ হল, যখন ইবরাহীম বলল, হে আমার প্রতিপালক আপনি কিভাবে মৃতদের জীবিত করবেন তা আমাকে দেখিয়ে দিন। এর উত্তরে শুনল, তুমি কি বিশ্বাস কর না ? উত্তরে সে বলল হ্যাঁ, কিন্তু আমি আমার মন কে প্রশান্ত করার জন্য তা দেখতে চাই। এরপর আল্লাহ বললেন, চারটি পাখি নাও এবং তাদের গোশত কেটে টুকরো টুকরো করে মিশিয়ে ফেল এরপর প্রত্যেক পাহাড়ের ওপর ওদের এক এক খন্ড রেখে তাদের নাম ধরে ডাক, তারা তোমার কাছে দৌড়ে আসবে। জেনে রাখ যে, আল্লাহ অতুলনীয় শক্তিশালী ও বিজ্ঞানময়। হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী চারটি পাখি জবাই করে সেগুলোর গোশতের টুকরো ভালোভাবে মিশিয়ে ফেলেন। এরপর তিনি সেগুলোর টুকরো দশটি পাহাড়ের চূড়ায় রেখে পাখিগুলোর নাম ধরে ডাকলেন। আল্লাহর ইচ্ছায় পাখিগুলোর বিচ্ছিন্ন গোশত বিভিন্ন স্থান থেকে এসে এক জায়গায় জড়ো হল এবং আগের মতই জীবিত হয়ে ইবরাহীমের কাছে আসল। এভাবে হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর প্রশ্নের জবাব পেলেন। এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিক হল, প্রথমত : পুনরূত্থান শারীরিক এবং প্রকৃতির নিয়মের ওপর আল্লাহর শক্তি কর্তৃত্বশীল। প্রকৃতির নিয়ম আল্লাহর শক্তির ওপর কর্তৃত্বশীল নয়। তাই কারো শরীরের বিভিন্ন অংশকে জড়ো করা এবং আগের মতই মানুষের শরীর গঠন করা পুনরূত্থান বা বিচার দিবসে আল্লাহর জন্য কঠিন কোন কাজ নয়। দ্বিতীয়ত : যুক্তি ও প্রমান বিবেককে কোন কিছু মেনে নিতে বাধ্য করে , কিন্তু মানুষের মন শুধু যুক্তির মাধ্যমে প্রশান্ত হয় না। তাই আমাদের কে পূর্ণ ও আন্তরিক ভাবে বিশ্বাসী হবার জন্য আল্লাহর নেয়ামত বা অনুগ্রহ সমূহ এবং তাঁর শক্তির দিকে মনোযোগ ও দৃষ্টি দিতে হবে। এবার সুরা বাকারার ২৬১ নম্বর আয়াতের অর্থ নিয়ে আলোচনা করা যাক। এই আয়াতের অর্থ হল, যারা আল্লাহর পথে নিজের ধন সম্পদ দান করে, তাদের দৃষ্টান্ত এমন যেন একটি শস্যবীজে সাতটি শীষ উৎপনড়ব হয়েছে এবং এর প্রত্যেক শীষে একশ শস্য রয়েছে। আল্লাহ যার জন্য ইচ্ছা আরো বহুগুনে বাড়িয়ে দেন। আল্লাহ প্রশস্ত মহাজ্ঞানী। এই আয়াত থেকে পরবর্তী ১৪টি আয়াতে দান-খয়রাত ও সুদ বর্জনের ওপর আলোচনা করা হয়েছে। আমরা যানি, প্রত্যেক সমাজে বিভিন্ন উপায় বা পেশার মাধ্যমে টাকা উপার্জন করা হয়। এই সব সমাজে মাঝে-মধ্যে বন্যা, ভূমিকম্প ও দুর্ভিক্ষের মত এমন সব প্রাকৃতিক দূর্যোগ ঘটে যে, তাতে সমাজের অনেক মানুষ তাদের আয়-উপার্জন হারিয়ে ফেলে এবং জীবিকা উপার্জনের ক্ষমতা ও তাদের থাকেনা। এদের রক্ষা বা মুক্তির উপায় কি ? এই সব মানুষরা চিরকাল কি দরিদ্র হয়েই থাকবে ? আর তারা যদি ধনীদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় তবে, তাদের কে কি সুদ যুক্ত ঋণ দিয়ে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ঐ ঋণ পরিশোধের কষ্টকর প্রক্রিয়ার মধ্যে বেঁধে রাখা উচিত ? নাকি তাদের কে সুদ মুক্ত ঋণ দেয়া উচিত ? এই সুদ নামের সমস্যা সমাজের অর্থ-নৈতিক রোগের মধ্যে অন্যতম। কারণ, অর্থশালী লোক সুদের মাধ্যমে আরো অর্থশালী এবং দরিদ্রদের সুদ দেয়ার ফলে আরো দরিদ্র হয়। আর এভাবে সমাজে ধনী ও গরীবের মধ্যে ব্যবধান বৃদ্ধি পায়। কিন্তু ইসলাম সুদকে হারাম করেছে এবং মুসলমানদের মধ্যে সাম্য ও ভাতৃত্বের অনুভূতি জাগিয়ে তোলার জন্য তাদেরকে আল্লাহর পথে দান করতে উৎসাহ দেয়। যারা সুদ নেয়ার জন্য ঋণ দেয়, তারা তাদের সম্পদ বাড়ানোর জন্যই ঋণ দেয়। তাই আল্লাহ এ আয়াতে বলেছেন, আল্লাহর পথে দান খয়রাত ও মানুষের সম্পদ বৃদ্ধি করে এবং এমনকি তা সাতশত গুন বৃদ্ধি পায়। আর এভাবে তোমাদের সম্পদ তো বাড়ছেই, একই সাথে দানকৃত সম্পদ সমাজের প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র বিমোচনও ভূমিকা রাখছে। এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিক হল, প্রথমত : আল্লাহর পথে ও গরীবদের সাহায্যের জন্য দান-খয়রাত পবিত্র নিয়তে ও হালল সম্পদ থেকে করতে হবে।আর এরকম দান-খয়রাতে কারো সম্পদের ক্ষতিতো হয়ই না, বরং এর ফলে ব্যক্তি ও সমাজের সম্পদ বৃদ্ধি পায়। দ্বিতীয়ত : আল্লাহর দয়ার কোন সীমা নেই। যে কেউ তার প্রচেষ্টা ও যোগ্যতা অনুযায়ী আল্লাহর রহমত লাভ করে। এবারে আমরা সুরা বাকারার ২৬১ ও ২৬৩ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করব। এই দুই আয়াতের অর্থ হল, যারা আল্লাহর পথে নিজের ধনসম্পদ ব্যয় করে এবং যা ব্যয় করে, তার কোন প্রতিদান চায়না ও কষ্ট দেয় না, তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের কাছে পুরস্কার আছে এবং তাদের জন্য কোন আশঙ্কা নেই, এবং তারা দুঃখিত হবেনা। যে দানের ফলে মানুষকে কষ্ট দেয়া হয়, সেই দানের চেয়ে উত্তম ও কল্যাণকর কথা এবং ক্ষমা শ্রেয়। আল্লাহ মহাক্ষমাশালী ও সহনশীল এবং তিনি তোমাদের সম্পদের মুখাপেক্ষী নন। আগের আয়াতে মানুষকে আল্লাহর পথে দান-খয়রাতের জন্য উপদেশ দেয়া হয়েছে। এই আয়াতে দান-খয়রাতের সঠিক পদ্ধতি উল্লেখ করে বলা হয়েছে, যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য গরীবদের কিছু দান করতে চাও, তবে প্রতিদানের আশা করো না এবং দান করার পর তাদের কে খোচাঁনো বা মন্দ আচরণের মাধ্যমে কষ্ট দিওনা। কারণ, যে মানুষ গরীব কাউকে কিছু দান করে তা-তার নিজের সম্পদ ছিল না। তাই আল্লাহর সম্পদ দানের কারণে প্রতিদান আশা করা ঠিক নয়। বরং বঞ্চিত ব্যক্তি ধনীর দান গ্রহণ করে ধনীকে পরকালে সওয়ার অর্জনের সুযোগ করে দেয়ায় এর প্রতিদান আশা করতে পারে। আসলে আল্লাহর পথে দান-খয়রাত করে মানুষের বাহবা বা প্রতিদান চাওয়া আল্লাহর পথে দান বলেই বিবেচিত হয়না। কেউ কারো উপকার করে দুঃখিত বা দুশ্চিন্তা গ্রস্থ হবেনা। কারণ, আল্লাহ দান-খয়রাতকারীর শুভ পরিনামের নিশ্চয়তা দিয়েছেন। এমনকি অর্থ সম্পদ দান না করে ও যারা গরীব দুঃখীদের প্রতি ভালো কথা ও সহৃদয় ব্যবহার করে থাকে আল্লাহ তাদের এ কাজকে দানের পর বঞ্চিতদের কষ্ট দেয়ার চেয়ে উত্তম বলে উল্লেখ করেছেন। এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিক হল, প্রথমত : আমরা কোন কাজ যদি আল্লাহর জন্য শুরূ করি তাহলে ঐ কাজের জন্য যেন অহংকার ও প্রতিদানের আশার মত ধ্বংসাতড়বক কোন কিছুর শিকার না হই, সেদিক লক্ষ্য রাখতে হবে। কারণ, এসব বিষয় ঐসব ভালো কাজকে মূল্যহীন করে ফেলবে। দ্বিতীয়ত : মুমিন ব্যক্তির সম্মান রক্ষা করা তার শারীরিক ও বৈষয়িক চাহিদা মেটানোর চেয়ে বেশী ও গুরুত্বপূর্ণ। তাই কোন মুমিন বা বিশ্বাসী ব্যক্তির সম্মান যাতে ক্ষুনড়ব না হয়, সে দিকে আমাদের লক্ষ্য রাখা উচিত। # কোরআনের আলো ( ৬৯তম পর্ব ) সুপ্রিয় পাঠক ! কোরআনের আলো অনুষ্ঠানে আপনাদের সাদর আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। কোরআনের আলোর আজকের পর্বে সুরা বাকারার ২৬৪ নম্বর আয়াত থেকে ২৬৭ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করব। আসুন প্রথমে সুরা বাকারার ২৬৪ ও ২৬৫ নম্বর আয়াতের অর্থ নিয়ে আলোচনা করা যাক। এই আয়াতের অর্থ হল, হে বিশ্বাসীগণ, দানের কথা প্রচার করে ও কষ্ট দিয়ে তোমরা তোমাদের দানকে ঐ ব্যক্তির মত নিস্ফল করোনা, যে নিজের সম্পদ থেকে নিজেকে জাদির করা ও লোক দেখানোর জন্য দান করে থাকে এবং আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করেনা। তাদের দৃষ্টান্ত হচ্ছে এমন শক্ত পাথরের মত, যার ওপর কিছু মাটি থাকে, কিন্তু প্রবল বৃষ্টিপাত তা পরিস্কার করে দেয় ফলে, কোন বীজ থেকেই আর গাছ উদগত হয় না এবং যা তারা উপার্জন করেছে,তার কিছুই তারা তাদের কাজে লাগাতে পারেনা। আল্লাহ অবিশ্বাসী সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না। যারা আল্লাহর সন্তুটি লাভের জন্য ও নিজেদের আত্মার উন্নতির জন্য ধন সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উপমা উচ্চ মিতে অবস্থিত উদ্যানের মত যাতে প্রবল বৃষ্টি হয়, ফলে তার ফল মূল দ্বিগুন জন্মে। যদি প্রবল বৃষ্টি না-ও হয়, তবে শিশিরই যথেষ্ট। তোমরা যা কর আল্লাহ তা দেখেন। এই দুই আয়াতের আগের আয়াতে আল্লাহর পথে দান করার জন্য বিশ্বাসী বা মুমিনদের প্রতি উৎসাহ দেয়া হয়েছিল। আর এ দুই আয়াতে আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য দান ও অগ্রহণযোগ্য দানকে দুটি উপমা দিয়ে বুঝানো হয়েছে। কপট দানশীল ব্যক্তির লোক দেখানো দানকে শক্ত পাথরের ওপর অল্প কিছু নরম মাটির সাথে তুলনা করা হয়েছে। আর শক্ত পাথরে উদ্ভিদ জন্মেনা। তাই তার দানে অন্য মানুষের উপকার হলেও তার নিজের মধ্যে কোন প্রভাব ফেলেনা এবং নিজে ঐ দানের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হয়। আর যে শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুটির উদ্দেশ্যে তথা মানুষের বাহবা পাবার আশা না করেই পবিত্র উদ্দেশ্যে দান করে তাঁর দান উচুঁ ভূমির উচ্চ ফলনশীল জমিতে বোনা বীজের মত। তাতে বৃষ্টি কম বা বেশী যা-ই হোক না কেন নীচু জমির চেয়ে অন্তত দুইগুন বেশী ফলন হয়। কারণ, এই জমি বৃষ্টির পানিকে খুব ভালভাবে ধরে রাখতে পারে এবং গাছের মূলও এ জমিতে সুদৃঢ়ভাবে বিকাশের সুযোগ পায়। এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হল, প্রথমত : সৎ উদ্দেশ্যে বা পবিত্র নিয়তে করা ভাল কাজেরই মূল্য রয়েছে। অসৎ উদ্দেশ্য পূরণের জন্য করা ভালো কাজের কোন মূল্য নেই। দ্বিতীয়ত : সৎ উদ্দেশ্যে মানুষের সেবা ও মানুষের মধ্যে ভাল গুনাবলী জোরদার বা বিকাশের মধ্যেই রয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টি। তৃতীয়ত : লোক দেখানো ভাল কাজ বিচার দিবস ও আল্লাহর প্রতি প্রকৃত বিশ্বাস না থাকারই প্রমাণ। এবারে সুরা বাকারার ২৬৬ নম্বর আয়াতের অর্থ নিয়ে আলোচনা করা যাক। এই আয়াতের অর্থ হল, তোমাদের মধ্যে কেউ কি এমনটি পছন্দ করবে যে তার খেজুর ও আঙ্গুরের একটি বাগান থাকবে, যার পাশ দিয়ে প্রবাহিত হবে নদী এবং ঐ বাগানের সবধরনের ফল মূল থাকবে। আর সে ব্যক্তি যখন বার্ধক্যে উপনীত হবে, তখন তার সন্তান-সন্ততি দূর্বল থাকবে। এরপর অগিড়বপ্রবাহ বিশিষ্ট এক ঘূর্ণীঝড়ে সে বাগান পুড়ে যায়। এভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য নিদর্শনাবলী স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেন যেন তোমরা চিন্তা কর। এই আয়াত ও একটি উপমা তুলে ধরেছে। কোন ব্যক্তি যখন লোক দেখানোর জন্য ভালো কাজ করে, কিন্তু এরপর অন্যকে কথা ও কাজে কষ্ট দেয় সে যেন নিজেই নিজের কাজের ফলকে নষ্ট করে। দরিদ্র ও বঞ্চিতদেরকে দান করা হল মানব-সমাজের বাগানে গাছ লাগানোর মত। খুব কষ্টকর এই কাজের প্রতিদান ও ফল রয়েছে। কিন্তু যদি এই কাজে সাবধানতা অবলম্বন করা না হয়, এবং লোক দেখানোর মত সমস্যা এর সাথে যুক্ত হয় তাহলে এর কল্যাণ অল্প সময়ের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। পরিনামে দুর্ভোগ ও অনুতাপ ছাড়া কিছুই অবশিষ্ট থাকেনা। বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে, একদিন মহানবী (সাঃ) মুসলমানদের উদ্দেশ্য করে বললেন, আল্লাহকে স্মরণ কর। প্রতিবার আল্লাহর জিকর বা আল্লাহর স্মরণের ফলে বেহেশতে তোমাদেরকে একটি গাছ দেয়া হবে। মুসলমানদের মধ্যে একজন বলল, তাহলে আমরা বেহেশতে অনেক বাগানের মালিক হ্ব। নবী (সাঃ) বললেন, অবশ্য যে মুখ দিয়ে আল্লাহকে স্মরণ কর, তা দিয়েই গর্বীত বা পরচর্চার কারণে সমস্ত গাছ পুড়ে যায়। বিচার দিবস বা কিয়ামতের দিন মানুষ সৎ কাজের মুখাপেক্ষী । আর এটা খুবই যে বেদনাদায়ক কপটতা লোক দেখানো ভালো কাজ এবং অন্যকে কষ্ট দেয়ার মত অপরাধগুলো মানুষের সমস্ত নেক আমল ধ্বংস করে দিয়েছে। এই আয়াতে শিক্ষণীয় দিক হল, ভালো কাজ করে সেজন্য অহংকার করতে নেই। কারণ অন্য কোন খারাপ কাজ ভাল কাজের ফল ধ্বংস করে দেয়। অনেক কষ্ট করে গাছ লাগানোর পর বাগানের গাছ বড় হয় এবং ফলবান হয়। কিন্তু আগুন এক মুহুর্তের মধ্যে বাগান পুড়ে ফেলে। এবারে সুরা বাকারার ২৬৭ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করব। এই আয়াতের অর্থ হল, হে বিশ্বাসীগণ, তোমরা যা উপার্জন কর ও যা আমি ভূমি থেকে উৎপাদন করি, তার মধ্যে যা উৎকৃষ্ট তা ব্যয় কর এবং তা থেকে এমন মন্দ বস্তু ব্যয়ের ইচ্ছা করনা, যা তোমরা চোখ বন্ধ করে বা একান্ত অনিচ্ছায় গ্রহণ কর। জেনে রেখো আল্লাহ তোমাদের সাহায্যের মুখাপেক্ষী নন। তিনি মহাসম্পদশালী ও প্রশংসিত। গরীব ও বঞ্চিতদেরকে কি দান করা উচিত এ নিয়ে মুসলমানরা রাসুল (সাঃ) কে প্রায়ই প্রশ্ন করতো। এই আয়াতে একটি সামগ্রীক নিয়ম উল্লেখ করে বলা হয়েছে, পবিত্র ও ভালো বা উৎকৃষ্ট সম্পদ থেকে দান কর। আয়-উপার্জন বা ব্যবসা থেকে যে টাকা বা সম্পদ অর্জিত হয়, কিংবা ক্ষেত খামার থেকে যে খাদ্য ফসল উৎপনড়ব হয়, তা থেকে দান করা উচিত। যেসব খাবার বা পোশাক পূরনো বা মূল্যহীন হয়ে গেছে, সে সব অন্যদের দান করা উচিত নয়। মদীনার কোন কোন মানুষ শুকনো ও অনুনড়বত খেজুর ফকিরদের দান করে উন্নত খেজুর নিজেদের প্রতি তিরস্কার করে এ আয়াতে বলা হয়েছে, যা ফকিরদের দিলে তা যদি তোমাদেরকেই দেয়া হত, তাহলে কি তোমরা সে সব গ্রহণ করতে ? এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিক হল, প্রথমত : দান খয়রাতের ক্ষেত্রেও গরীবদের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করা উচিত। মূল্যহীন ও আজে বাজে জিনিষ দান করার অর্থ হল অন্যদের অসম্মান করা। দ্বিতীয়ত : দানের উদ্দেশ্য হল কৃপনতা থেকে মুক্তি অপ্রয়োজনীয় ও তুচ্ছ জিনিষ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া নয়। তৃতীয়ত : মানুষের বিবেক অন্যদের সাথে আচরণে ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় মানদন্ড। যা আমরা ভালবাসিনা, তা যেন অন্যদের দান না করি। # কোরআনের আলো ( ৭০তম পর্ব ) সুপ্রিয় পাঠক ! কোরআনের আলো অনুষ্ঠান থেকে আপনাদের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। কোরআনের আলোর গত অনুষ্ঠানে আমরা দান করার ব্যাপারে মুমিনদের প্রতি উপদেশমূলক আয়াতের ব্যাখ্যা আলোচনা করেছিলাম। আজকের পর্বেও এ সম্পর্কিত পরবর্তী ব্যাখ্যা জানবেন। প্রথমে সুরা বাকারার ২৬৮ ও ২৬৯ নম্বর আয়াতের অর্থ নিয়ে আলোচনা করব। এই আয়াতের অর্থ হল, দান খয়রাতের সময় শয়তান তোমাদেরকে অভাবের ভয় দেখায় এবং লোভ ও কৃপণতার মত বিভিন্ন জঘন্য কাজে উৎসাহ দেয়। কিন্তু আল্লাহ তোমাদেরকে তাঁর ক্ষমা ও অনুগ্রহের তথা প্রাচুর্যের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। আল্লাহ প্রশস্ত মহাজ্ঞানী। তিনি যাকে ইচ্ছা জ্ঞান বা প্রজ্ঞা দান করেন এবং যাকেই তিনি প্রজ্ঞা দেন, সে নিশ্চিতভাবে প্রচুর কল্যাণ লাভ করে। জ্ঞানীরা ছাড়া কেউই উপদেশ গ্রহণ করে না। শয়তান ও শয়তানের বৈশিষ্টের অধিকারী মানুষেরা বিভিন্ন উপায়ে দান-খয়রাত ও অন্যকে সাহায্য করা থেকে মানুষকে বিরত রাখে। শয়তান এ কূমন্ত্রনা দেয় যে, তোমার নিজেরই অর্থ সম্পদের দরকার হবে। আবার কখনো এ কূমন্ত্রনা দেয় যে, কেন তুমি কষ্ট করছ বা কেন তাকে সাহায্য করছ ? যদি আল্লাহ চাইতেন তাহলে সে দরিদ্র ও অভাবী হত না। এই সব লোকেরা মানুষকে দান করতে বাধা দেয়, এবং মানুষকে সম্পদ জমা করতে বলে, একইসাথে তারা মানুষকে অভাব ও দারিদ্রের ভয় দেখায়। অথচ এ দুনিয়ায় আমাদের যতটুকু খোদার অনুগ্রহ দরকার, তার চেয়ে বেশী অনুগ্রহ দরকার হবে বিচার দিবসে। এছাড়াও যারা আল্লাহর রাস্তায় গরীবদের দান খয়রাত করে আল্লাহ তাদের ভবিষ্যত কল্যাণের নিশ্চয়তা দিয়েছেন অথাৎ তারা দারিদ্রের মোকাবেলায় বীমার সুবিধে পাবে। দুঃখজনক ব্যাপার হল, অনেকেই এই কৌশলপূর্ণ দিকের প্রতি গুরুত্ব দেননা এবং শয়তানের প্ররোচনার শিকার হয়। তারা শুধু অর্থ সম্পদকেই কল্যাণ বলে মনে করে। অথচ প্রকৃত কল্যাণ হল, প্রজ্ঞা বা দূরদর্শীতার অধিকারী হওয়া এবং সঠিক পথ বাছাইয়ের ক্ষমতা লাভ করা। তাই প্রকৃত জ্ঞানীরা আল্লাহর ক্ষমার ওয়াদা সত্ত্বেও শয়তানের কূমন্ত্রনায় কান দেন না। এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিক গুলো হল, প্রথমত : দারিদ্রের ভয়ে কৃপনতা করা উচিত নয়। কারণ, শয়তানই দারিদ্রের ভয় দেখায় যাতে আমরা দান না করি। তাই আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরনের মাধ্যমে দারিদ্রের ভয়ের মোকাবেলা করতে হবে। দ্বিতীয়ত : সুস্থ বিবেকের অধিকারী ব্যক্তি শয়তানে প্রলোভন ও কূমন্ত্রনায় কান না দিয়ে আল্লাহর ওয়াদায় বিশ্বাস করে। ইসলামের দৃষ্টিতে সেই জ্ঞানী যে আল্লাহর অনুগত নিজের খেয়াল খুশী তথা প্রবৃত্তি, শয়তান ও খোদা বিরোধী লোকদের অনুসারী ব্যক্তি জ্ঞানী নয়। এবারে সুরা বাকারার ২৭ ও ২৭১ নম্বর আয়াতের অর্থ নিয়ে আলোচনা করব। এই আয়াতের অর্থ হল, যা কিছু তোমরা দান কর বা মানত কর আল্লাহ তা জানেন। অত্যাচারীদের কোন সাহায্যকারী নেই। তোমরা যদি তা প্রকাশ্যে দান কর, তবে ভাল। আর যদি তা গোপনে কর এবং অভাবগ্রস্থকে দাও, তবে তা তোমাদের জন্য আরো ভাল। এতে তোমাদের অনেক অকল্যাণ বা পাপ দূর হবে। তোমরা যা কর, আল্লাহ সে সম্পর্কে জানেন। দান-খয়রাতের পথে একটি বড় বাধা হল, অধিকাংশ দাতা এটা চান যে, দানের জন্য তার প্রশংসা করা হোক। তাই, এই আয়াতে আল্লাহ বলছেন, তোমার ভালো কাজের দিকে কেউ লক্ষ্য না করুক কিংবা কেউ কৃতজ্ঞতা না জানাক, কিন্তু আমি আল্লাহ তো তোমার ভাল কাজের সাক্ষী রইলাম এবং আমার কাছে তোমার কাজ লিপিবদ্ধ বা রেকর্ড হয়ে রইল। তবে কি তোমরা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দান করছ না ? যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই দান করে থাকো তবে কেন মানুষের কাছে প্রতিদানের আশা করছ ? তাই মানুষের জানা উচিত, আল্লাহ তাদের সব কাজই দেখছেন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিই হল সৎকাজের মূল লক্ষ্য। কোরআনের ভাষায় দরিদ্র ও অভাবগ্রস্থদের প্রতি উদাসীনতা হল জুলুম বা অন্যায় এবং জালেম লোকেরা বিচার দিবসে সব ধরনের সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত হবে। আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা ও দরিদ্রদের প্রতি উদাসীন জালেমদের জন্য বিচার দিবসে কোন সুপারিশের কোন ক্ষেত্রই তৈরি করেনি। দান করার ক্ষেত্রে জাকাতের মত ওয়াজেব বা অবশ্য পালনীয় দান প্রকাশ্যে করা ভাল, কিন্তু মুস্তাহাব বা ইচ্ছাধীন দান গোপনে করা ভাল। সম্ভবত: এর যুক্তি হল ওয়াজেব বা অবশ্য পালনীয় কাজ করা সবারই দায়িত্ব এবং এতে সাধারণত: লোক দেখানোর প্রবণতা থাকেনা। এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হল, প্রথমত : আল্লাহ আমাদের দানের খবর রাখেন। তাই সবচেয়ে ভালো সম্পদ থেকে আল্লাহর রাস্তায় দান করতে হবে এবং দানের উদ্দেশ্য হতে হবে সবচেয়ে মহৎ আর সবচেয়ে মহৎ উদ্দেশ্য হল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। দ্বিতীয়ত : দান করতে হবে কখনো প্রকাশ্যে এবং কখনো গোপনে। প্রকাশ্য-দানে অন্যান্যরা দান করতে উৎসাহী হয়। আর গোপনে দানের মাধ্যমে অহংকার ও নিজেকে জাহির করা থেকে দূরে থাকা যায়। তৃতীয়ত : দান-খয়রাত হল গোনাহ মাফ বা ক্ষমা লাভের একটি মাধ্যম। তওবা ও ক্ষমা লাভের জন্য অনেক সময় দান খয়রাত করা উচিত যাতে আল্লাহ আমাদের গোনাহ বা পাপ ক্ষমা করে দেন। এবারে সুরা বাকারার ২৭২ নম্বর আয়াতের অর্থ নিয়ে আলোচনা করব। এই আয়াতের অর্থ হল, হে নবী, মানুষের সুপথ পাওয়াটা আপনার দায়িত্ব নয়, আল্লাহ যাকে চান সে-ই সুপথ পায় এবং মানুষ তাদের সম্পদ থেকে যা দান করে, তা তাদের জন্যই দান করে। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্য ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্যে দান করো না। তোমরা যদি তোমাদের বৈধ সম্পদ থেকে দান কর তার পুরস্কার তোমাদের ওপর জুলুম করা হবে না। বিভিন্ন তাফসীরের বর্ণনায় দেখা যায়, মুসলমানরা দরিদ্র মুশরিকদের দান করার ব্যাপারে সন্দিহান ছিল। যখন তাঁরা রাসুল (সঃ) কে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করল তখন এ আয়াত নাজেল হয়। এ আয়াতে বলা হয়েছে জোর করে ধর্ম চাপিয়ে দেয়া উচিত নয়। তাই প্রকৃত মুসলমানের সাহায্য পাবার জন্য মুসলমান হবার সার্টিফিকেট দেখাতে হয় না। আল্লাহ যেমন এ পৃথিবীতে বিশ্বাসী অবিশ্বাসী নির্বিশেষে সবাইকে জীবিকা ও অন্যান্য অনুগ্রহ দিয়ে থাকেন, তেমনি কোন প্রকৃত মুসলমান অভাবী ও দরিদ্রকে সাহায্য করার ক্ষেত্রে ? কে মুসলমান ও কে অমুসলমান তা দেখেন না। কারণ, অন্যান্য মানুষ ও আল্লাহর সৃষ্টি বলে সাহায্য পাবার অধিকার রাখে। আর ইসলামের শত্রু নয় এমন দরিদ্র অমুসলিমদের সাহায্য করলেও বিচার দিবসে এর পূর্ণ প্রতিদান পাওয়া যাবে। ইসলাম মানব প্রেমের ধর্ম ও মানব দরদী ধর্ম। এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিক হল, প্রথমত : খোদায়ী গ্রহণ বাধ্যতামূলক নয় এবং কেউ কাউকে ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করতে পারেনা। এমনকি নবী ও কাউকে ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করতে পারেন না। দ্বিতীয়ত : ইসলাম মানব সেবার ধর্ম। ইসলাম অমুসলমানদের মধ্যেও দারিদ্র ও অভাবকে মেনে নেয়না। তৃতীয়ত : কেউ যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দান করে, তাহলে সে তার সৎ কাজের প্রতিদান পৃথিবীতে ও পরকালে ও পেয়ে থাকে। কোরআনের আলো ( ৭১ তম পর্ব ) সুপ্রিয় পাঠক, কোরআনের আলোর আজকের পর্বে আমরা সুরা বাকারার ২৭৩ থেকে ২৭৭ নম্বর আয়াতের তেলাওয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করবো । প্রথমেই আমরা সুরা বাকারার ২৭৩ ও ২৭৪ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করবো । এই দুই আয়াতের অর্থ হলো, দান ও সদকা এমন অভাবগ্রস্তদের প্রাপ্য ,যারা আল্লাহর ধর্মের কাজ করতে গিয়ে অসুস্থ বা বিপদগ্রস্ত হয়েছেন । তারা একদিকে নিজেদের জীবিকা অর্জনের জন্য চলাফেরার ও সফরের ক্ষমতা রাখেনা। আর অন্যদিকে তীব্র আত্মসংযম ও মর্যাদার কারণে লোকজন তাদেরকে ধনী এবং অভাবমুক্ত মনে করে । কিন্তু তুমি তাদের লক্ষণ দেখে চিনতে পারবে । তারা মানুষের কাছে ব্যাকুলভাবে কিছু চায়না । বিশ্বাসীরা জেনে রাখো , তোমরা শুদ্ধ সম্পদ থেকে যা দান কর , আল্লাহতা জানেন । যারা দিনে ও রাতে , গোপনে ও প্রকাশ্যে দান করে , আল্লাহর কাছে তাদের পুরুষ্কার রয়েছে , সুতরাং তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা দানের জন্য দুঃখিত হবেনা । এই দুই আয়াতের ব্যাখ্যা হলো , ইসলাম মুসলিম সমাজে ন্যায়বিচার ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য যেসব পরামর্শ দেয় , সেসবের মধ্যে অন্যতম হলো ,দান-খয়রাত । অর্থাৎ ইসলাম ধনী ও সম্পদশালীদেরকে তাদের সম্পদের কিছু অংশ দরিদ্র ও বঞ্চিতদের দান করতে বলে । এই আয়াতে দান করার একটি গুরুত্বপূর্ণ খাতের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে ,যারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ ও অভিবাসন বা হিজরতের কারণে সম্পদ হারিয়েছে এবং আয়-উপার্জনের কোন ক্ষমতাও যাদের নেই তাদেরকে যেন দান করা হয় । সংযমী হবার কারণে এই শ্রেণীর মানুষ অন্যদের কাছে কিছু চায়না এবং নিজেদের অভাবের কথাও তুলে ধরেনা । তাই সাধারণ মানুষ তাদেরকে অভাবমুক্ত মনে করে । কিন্তু মুমিনদেরকে এই শ্রেণীর সম্মানিত মানুষের ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করতে হবে এবং এইসব দ্বীনি ভাইয়েরা যেন কষ্ট না পায় সে ব্যবস্থা করতে হবে । ইসলামের ইতিহাসে দেখা গেছে ইসলামের প্রাথমিক যুগে নবী (সাঃ)র অনেক সহযোগী তাঁর সাথে মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেছিলেন । মদীনায় তাদের ঘরবাড়ী ,অর্থ-সম্পদ কিছুই ছিলনা । কারণ ,মক্কার মুশরিকরা তাদের সমস্ত ধন-সম্পদ দখল করে নিয়েছিলেন । মদীনার মানুষ তাদের অনেককে নিজেদের ঘরে স্থান দেয় ও তাদের ব্যয়ভার বহন করতে থাকে । তবে মুহাজিরদের অধিকাংশই মসজিদে নব্বীর ‘ সুফফাহ নামক স্থানে আশ্রয় নেয় । এই দুই আয়াতে তাদের আভাব মোচনের জন্য মুমিনদেরকে আহবান জানানো হয়েছে । এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো, প্রথমত : ধনীদের সম্পদের মধ্যে আল্লাহ দরিদ্রদের অধিকার রেখেছেন । দ্বিতীয়ত : মুসলিম সমাজে দরিদ্ররা তাদের অভাবের কথা বলার আগেই যেন তাদের অভাব মেটানো হয় । এতে করে মুমিনের সম্মান ক্ষুন্ন হবার কোনো সুযোগ থাকবে না । মুসলিম সমাজে মুমিনের সম্মান ক্ষুন্ন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ । তৃতীয়তঃ কোরআনের দৃষ্টিতে, তারাই দরিদ্র বা ফকীর যারা বিভিন্ন শারিরীক সমস্যা যেমন- রোগ,বার্ধক্য, প্রাকৃতিক দূর্যোগ বা যুদ্ধ প্রভৃতি কারণে জীবিকা অর্জনের ক্ষমতা রাখে না । অথচ তারা বৈষয়িক চাহিদা পূরণের চেয়ে সম্মান রক্ষাকে বেশী গুরুত্ব দিয়ে থাকেন । তাই যারা বিভিন্ন সমাজে উপস্থিত হয়ে তাদেরকে অর্থ দেয়ার জন্যে মানুষকে পীড়াপীড়ি করে তারা দরিদ্র নয় , বরং ভিক্ষুক । চতুর্থতঃ যারা আল্লাহর রাস্তায় দান খয়রাত করে , আল্লাহ তাদেরকে ভবিষ্যতে দারিদ্র্য থেকে দূরে রাখবেন এবং তাদের কোনো ভয় নেই । কারণ , আল্লাহর ওপর ভরসা করার কারণে তারা নিজেদের দানের জন্য কখনও অনুতপ্ত বা দুঃখিত হবেনা । এবারে সুরা বাকারার ২৭৫ও ২৭৬ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করবো । এই দুই আয়াতের অর্থ হলো, যারা সুদ খায় তারা অর্থ ও সম্পদের জন্য এত উন্মত্ত যে তারা মাতালদের মত ভারসাম্যহীন এবং শয়তানের প্রভাবিত পাগলের মত তারা নিজ অবস্থান থেকে দাঁড়াবে । তাদের এই অবস্থা এজন্য যে , তারা বলে, বেচা-কেনা তো সুদের মত! অথচ আল্লাহ বেচা-কেনাকে বৈধ করেছেন এবং সুদকে অবৈধ বা হারাম করেছেন । অতএব, যার কাছে তার প্রতিপালকের উপদেশ আসার পর সে সুদ গ্রহণ থেকে বিরত রয়েছে অতীতে তার সুদ নেয়ার বিষয়টি আল্লাহ বিবেচনা করবেন । কিন্তু যারা পুনরায় সুদ নিতে আরম্ভ করবে , তারাই নরকের অধিবাসী, সেখানে তারা স্থায়ী হবে । আল্লাহ সুদের আয়কে ধ্বংস করেন এবং দানকে বাড়িয়ে দেন , আল্লাহ অবিশ্বাসী বা অকৃতজ্ঞ পাপীদের ভালবাসেন না । সুপ্রিয় পাঠক, আপনারা হয়তো লক্ষ্য করেছেন , মহান আল্লাহ সুরা বাকারার পর পর ১৪ টি আয়াতে মুমিনদেরকে দান খয়রাতে উৎসাহিত করেছেন এবং এর ব্যক্তিগত ও সামাজিক সুফলেরও বর্ণনা করেছেন । একদিকে দানশীলতার চেতনা বৃদ্ধি করা ও দুনিয়ার প্রতি আকর্ষণ কমানো এবং অন্যদিকে শ্রেণী বৈষম্য হ্রাস করাসহ ইসলামী সমাজে ভ্রাতৃত্বের চেতনা বৃদ্ধি করা ও সাম্য প্রতিষ্ঠায় উৎসাহ দেয়া এসব আয়াতের মূল লক্ষ্য । আর এসব আয়াতের পর পবিত্র কোরআনে সুদ সমস্যার উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে সুদ সমাজের অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট করা ছাড়াও ব্যক্তির মানসিক ভারসাম্যকেও নষ্ট করে । সুদের কারণে একদিকে ধনীদের বিরুদ্ধে গরীবদের ঘৃণা ও বিদ্বেষ বাড়তে বাড়তে তা বিস্ফোরণের পর্যায়ে উপনীত হয় এবং অন্যদিকে তা সুদখোরের মধ্যে এমন উন্মত্ততা সৃষ্টি করে যে, সে অর্থ ও স্বর্ণ ছাড়া আর কিছুই চেনেনা । এ ধরনের ব্যক্তি টাকার জন্য মানবিকতা পর্যন্ত বিসর্জন দেয় । সুদখোর সমাজের উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কোন ইতিহাস ভূমিকা রাখেনা । চিন্তা ও শ্রম না খাটিয়েই সে অভাবগ্রস্তকে ঋণ দিয়ে তার কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ দাবী করে । এরফলে দরিদ্ররা আরো দরিদ্র ও দূর্বল এবং ধনীরা আরো ধনী হয় । আর সমাজের বঞ্চিত শ্রেণীর ওপর এটা সবচেয়ে বড় ধরনের জুলুম । আর এ জন্যেই সমস্ত ঐশী গ্রন্থে সুদকে হারাম করা হয়েছে এবং সুদখোরদের জন্য শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে । দৃশ্যত : সুদের মাধ্যমে অর্থের বৃদ্ধি, ও দান সদকার মাধ্যমে সম্পদ হ্রাস পেলেও সম্পদের হ্রাস-বৃদ্ধি ও বরকত আল্লাহর ইচ্ছাধীন । সুদের মাধ্যমে যে অর্থ অর্জিত হয় তা ব্যক্তির জন্য সৌভাগ্য বয়ে আনে না । সুদের আয়ের বিরুদ্ধে বঞ্চিতদের ঘৃণা থাকে বলে সুদখোর জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা পায়না এবং অনেকসময় তার আসল সম্পদও হাতছাড়া হয়ে যায় । অথচ দানশীল ব্যক্তি দানের জন্য সমাজে জনপ্রিয়তা লাভ করায় নিরাপত্তা ও প্রশান্তি লাভ করে এবং তার উন্নতি ও কল্যাণের পথ প্রশস্থ হয় । এখানে এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো একে একে উল্লেখ করছি । প্রথমত : সুদ গ্রহণ ব্যক্তির মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করে এবং এরফলে সমাজের অর্থনৈতি ভারসাম্য নষ্ট হয় । সুদখোর ভালোবাসার পরিবর্তে ঘৃণা অর্জন করে এবং সুদ গ্রহণের কারণে সমাজে ন্যায় বিচারের পরিবর্তে জুলুম ও নিপীড়নের বিস্তার ঘটে । দ্বিতীয়ত: ইসলাম পূর্ণাঙ্গ ও পরিপূর্ণ ধর্ম । তাই এ ধর্মে অর্থনৈতিক কর্মসূচিও রয়েছে । ইসলাম মানুষের ওপর নিস্প্রাণ ইবাদত চাপিয়ে দেয় না এবং পার্থিব বিষয়ে মানুষকে দিক-নির্দেশণা বিহীনভাবে ছেড়ে দেয়নি । তৃতীয়ত : সুদ-গ্রহণ এক ধরনের অকৃতজ্ঞতার প্রকাশ । আল্লাহ আমাদেরকে যে সম্পদ দিয়েছেন তা আল্লাহর দেয়া আমানত মাত্র । এ সম্পদ থেকে বঞ্চিতদের দান না করা হলো, আল্লাহর নেয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা । এ অকৃতজ্ঞতা সম্পদের ধ্বংস ডেকে আনে। এবারে সুরা বাকারার ২৭৭ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করবো । এই আয়াতের অর্থ হলো, যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে ও সৎকাজ করে এবং নামাজ প্রতিষ্ঠিত করে ও জাকাত দেয়, তারা আল্লাহর কাছ থেকে পুরস্কার পাবে। ভবিষ্যতের জন্য তাদের কোন আশঙ্কা নেই এবং অতীতের জন্যেও তারা দুঃখিত বা অনুতপ্ত হবে না । এই আয়াতে প্রকৃত মুমিনের পরিচয় দিয়ে বলা হয়েছে যে, প্রকৃত মুমিন বা বিশ্বাসী শুধু নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক সৃষ্টি করে না, জাকাত দেয়ার মাধ্যমে সে আল্লাহর সৃষ্টির সাথেও সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে । প্রকৃত মুমিন বা বিশ্বাসীরা ধর্মকে প্রাণহীন শুষ্ক দায়িত্বের মধ্যে সীমিত করে না । তারা অন্যদের কল্যাণের জন্যেও সচেষ্ট থাকে । সবশেষে আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থণা করছি, জাকাত ও দানশীলতার বিস্তৃতির মাধ্যমে সমাজে যেন সুদখোর ও বঞ্চিতদের অধিকার ক্ষুন্নকারীদের তৎপরতার কোন অবকাশ না থাকে এবং সমাজে যেন ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হয় । # কোরআনের আলো ( ৭২তম পর্ব ) সুপ্রিয় পাঠক , কোরআনের আলোর গত অনুষ্ঠানগুলোতে আমরা ব্যক্তি ও সমাজের ওপর সুদের অশুভ প্রভাব সম্পর্কিত আয়াত নিয়ে আলোচনা করেছি। আজকের পর্বেও সুদ সংক্রান্ত আয়াত নিয়ে আলোচনা করব। প্রথমে সুরা বাকারার ২৭৮ ও২৭৯ নম্বর আয়াতের অর্থ নিয়ে আলোচনা করবো। এই দুই আয়াতের অর্থ হলো, হে বিশ্বাসীরা, আল্লাহকে ভয় কর। যদি বিশ্বাসী হও, তাহলে সুদ বাবদ মানুষের কাছে যা তোমাদের পাওনা ছিল তা পরিত্যাগ কর। আর যদি তা না কর, তবে ধরে নেয়া হবে যে, তোমরা আল্লাহও তার রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছ। যদি তোমরা ক্ষমা প্রার্থনা কর, তবে তোমাদের জন্যই তোমাদের মূলধন রয়েছে। তোমরা সুদ নিয়ে অত্যাচার করোনা এবং মূলধন হারিয়ে অত্যাচারিতও হয়ো না। পবিত্র কোরআনে যখন সুদ বর্জনের নির্দেশ দেয়া হয়, তখন কোন কোন মুসলমান মানুষের কাছ থেকে সুদ বাবদ অনেক অর্থ পাওনা ছিল। তাই তারা এ বিষয়ে রাসুলের কাছে প্রশ্ন করলে এই দুই আয়াত নাজেল হয় এবং নবী (সঃ) মুসলমানদের সমাবেশে সুদ সংক্রান্ত সকল চুক্তিকে বাতিল ঘোষণা করেন। রাসুল (সঃ) সবার আগে সুদের লেন দেন থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য নিজের আত্মীয় স্বজন ও বংশের প্রতি আহবান জানান। পূর্ববর্তী আয়াতে আমরা দেখেছি যে, বঞ্চিতদের অর্থ সাহায্য করা ও তাদের ঋণ দেয়া আল্লাহকে ঋণ দেয়ার সমতুল্য। আর আল্লাহ নিজেই তাদের পুরস্কার দিবেন। এই আয়াতে সুদ নিয়ে বঞ্চিতদের ওপর জুলুম করার বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, যদি সুদ নেয়া থেকে বিরত না হও,তাহলে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল বঞ্চিতদের পক্ষ হয়ে যুদ্ধ করবেন। এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো, প্রথমত : ঈমান আনার অর্থ শুধু নামাজ পড়া ও রোজা রাখা নয়। অবৈধ সম্পদ থেকে দূরে থাকাও ঈমান ও খোদাভৗরুতার শর্ত। দ্বিতীয়ত : ইসলাম মালিকানাকে সম্মান করে, কিন্তু সুদ গ্রহণ ও শোষনের অনুমতি দেয় না। তৃতীয়ত : অত্যাচার করা ও অত্যাচারিত হওয়া উভয়ই নিন্দনীয়। তাই সুদ দেয়া ও নেয়া দুটোই নিষিদ্ধ। এবারে সুরা বাকারার ২৮০ ও ২৮১ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করবো। এই দুই আয়াতের অর্থ হলো, ঋণী যদি অভাবগ্রস্ত হয়, তবে তার সচ্ছলতার জন্য অপেক্ষা কর, আর যদি ঋণ ফেরত দেয়ার ক্ষমতাই না থাকে তাহলে তাদের ঋণ মাফ করে দেয়াই উত্তম। তোমরা সেই দিনকে ভয় কর, যে দিন তোমরা আল্লাহর দিকে ফিরে যাবে, তখন যে যা অর্জন করেছে , তা সম্পূর্ণরূপে দেয়া হবে এবং তোমাদের ওপর অন্যায় করা হবেনা। পূর্ববর্তী কয়েকটি আয়াতে দানখয়রাত ও ঋণ দেয়ার জন্য মুমিনদেরকে উৎসাহিত করার পর,সুদ না নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এই আয়াতে একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে যে, ঋণ দেয়ার পর সুদ নেয়া তো চলবেই না, একই সাথে চুক্তিবদ্ধ ব্যক্তি যদি স্বল্প সময়ে ঋণ পরিশোধের ক্ষমতা না রাখে , তবে তাকে সময় দেয়া উচিত এবং এমনকি যদি ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি ঋণ পরিশোধের ক্ষমতাই না রাখে, তাহলে ঋণ মাফ করে দেয়ার উপদেশ দেয়া হয়েছে। ঋণ মাফ করে দেয়ার জন্য পরকালে প্রতিদান দেয়া হবে বলেও আল্লাহ ঘোষনা করেছেন। ধর্মের এইসব উপদেশ যদি সমাজে বাস্তবায়িত হত তাহলে সমাজে সচ্ছলতা পবিত্রতা ও ভ্রাতৃত্ব কতই না বৃদ্ধি পেত। এর ফলে অভাবগ্রস্তদের অভাব পূর্ণ হওয়া ছাড়াও ধণীরা লোভী কৃপণ ও দুনিয়াপূজারী হত না এবং ঋণীও দরিদ্রের মধ্যে ব্যবধান ও হ্রাস পেত। এবারে এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিক গুলো হলো, প্রথমত : বঞ্চিতদের কল্যাণ সাধনই হল, দান খয়রাত ও ঋনের মূল উদ্দেশ্য। তাই এমন কিছু করা উচিত নয়, যাতে ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে বঞ্চিতরা আরো অভাবগ্রস্থ হয়ে পরে। দ্বিতীয়ত : ইসলাম বঞ্চিতদের প্রকৃত সহায়। তাই সুদকে নিষিদ্ধ করে এবং দানকে উৎসাহিত করে ইসলাম সমাজের অর্থনৈতিক শূন্যতা পূরণ করছে। তৃতীয়ত : দরিদ্র ও বঞ্চিত জনগনের সন্তুষ্টি অর্জন করা, সম্পদ অর্জনের চেয়ে ভালো। এবারে সুরা বাকারার ২৮২ নম্বর নিয়ে আলোচনা করবো। এই আয়াতের অর্থ হলো, হে বিশ্বাসীগণ, যখন একে অন্যের সাথে কোন নির্দিষ্টকালের জন্য ধারের আদান প্রদান করবে তখন তা লিখে রাখ এবং তোমাদের মধ্যে কোন লেখক যেন ন্যায়ভাবে লিখে দেয়, আল্লাহ যেভাবে শিক্ষা দিয়েছেন সেভাবে লিখতে লেখক যেন অস্বীকার না করে। অতএব তার লিপিবদ্ধ করাই উচিত এবং যে ব্যক্তির ওপর দায়িত্ব সেও লিখিয়ে নেবে এবং তার উচিত নিজ প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করা, আর যার ওপর দায়িত্ব সে যদি লেখাতে অযোগ্য অথবা দুর্বল হয়, তবে তার অভিভাবকেরা ন্যায়সঙ্গত ভাবে লিখিয়ে নেবে এবং তোমাদের মধ্যে দুজন পুরুষ সাক্ষীকে সাক্ষী কর, কিন্তু যদি দুজন পুরুষ না পাওয়া যায়, তাতে সাক্ষীদের মধ্যে তোমরা নির্ভর যোগ্য ও বিশ্বস্ত একজন পুরুষ ও দুজন নারী মনোনীত কর। যদি দুই একজন ভুলে যায়, তবে একজন অন্যজনকে স্মরণ করিয়ে দেবে। যখন সাক্ষীদের সাক্ষ্য দেয়ার জন্য আহবান করা উচিত নয়। আর ছোট হোক বর হোক বিরক্ত হয়োনা, আল্লাহর কাছে তা ন্যায্যতর ও প্রমাণের জন্য দৃঢ়তর এবং তোমাদের মধ্যে সন্দেহ উদ্রেক না হবার নিকটতর, কিন্তু তোমরা পরস্পরে ব্যবসায় যে নগদ অর্থ আদানপ্রদান কর, তা না লিখলে কোন দোষ নেই, তোমরা যখন পরস্পর বেচা-কেনা কর , তখন সাক্ষী রেখো, লেখক ও সাক্ষী যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। যদি তোমরা তাদের ক্ষতিগ্রস্থ কর, তা তোমাদের জন্য পাপ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তিনি তোমাদের শিক্ষা দেন আল্লাহ সব বিষয়ে মহাজ্ঞানী। সুরা বাকারার এই আয়াত পবিত্র কোরআনের দীর্ঘতম আয়াত। মানুষের অর্থ সম্পদ রক্ষার বিষয়ে এতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। দান খয়রাত করা ও ঋণদেয়ার উপদেশ সম্পর্কিত আয়াত এবং সুদ নেয়া নিষিদ্ধ ঘোষনার আয়াতের পর এই আয়াতে লেন দেনের সঠিক পদ্ধতি উল্লেখ করা হয়েছে যাতে মানুষকে লেন দেনের ক্ষেত্রে সব ধরনের ভুল ও অন্যায় থেকে দূরে রাখা যায় এবং কোন পক্ষই যেন ক্ষতিগ্রস্থ না হয়। লেন-দেনের সঠিক পদ্ধতির যেসব শর্ত উল্লেখ করা হয়েছে, এবারে তা সংক্ষেপে তুলে ধরছি। প্রথমত : যে কোন ধর্মাবলম্বীর সাথে বেশী বা কম অর্থের ঋণ বা অন্য কোন ধরনের লেন-দেন করা হোক না কেন তা দলীল আকারে লিখে রাখা উচিত। দ্বিতীয়ত : কোন তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে দলীল লেখাতে হবে। তা-না হলে দেনার দায় লেখকের ওপর চাপানোর ভয় থাকে। তৃতীয়ত : দেনাদার ও দলীল লেখককে আল্লাহর ভয় রাখতে হবে এবং কারো অধিকার লংঘন করা যাবে না। চতুর্থত : লিখিত প্রমান ছাড়াও উভয় পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য দু-জন সাক্ষী থাকতে হবে। পঞ্চমত : নগদ লেন-দেনের ক্ষেত্রে লিখিত দলীল জরুরী নয়। সাক্ষীই এক্ষেত্রে যথেষ্ট। এবারে সুরা বাকারার ২৮২ নম্বর আয়াতের শিক্ষণীয় দিক গুলো তুলে ধরছি। প্রথমত : ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ ও সামাজিক ধর্ম। ব্যক্তিগত দিক ও মানুষের আত্মিক দিকের বিকাশ ছাড়াও এ ধর্মে সমাজের অর্থনৈতিক এবং আইনগত বা অধিকারগত বিষয়ের ওপর গভীর দৃষ্টি দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয়ত : লেন-দেনের চুক্তি লিখে রাখার কথা বলা হয়েছে এমন এক সময়ে যখন সাধারণ মানুষ লেখা-পড়া জানতো না। আর এ থেকেই বোঝা যায় শিক্ষা ও জ্ঞানের উন্নতির প্রতি ইসলাম ধর্ম গুরুত্ব আরোপ করে। তৃতীয়ত : চুক্তি পত্র লিখতে বলার উদ্দেশ্য হলো, জনগণের মধ্যে বিশ্বাস ও আস্থা সৃষ্টি করা। অবিশ্বাস সৃষ্টি এর উদ্দেশ্য নয়। ভুল করা , ভুলে যাওয়া বা অবহেলা করা সমাজের অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে বিনষ্ট করে। চতুর্থত : লেন-দেন যথাযথ ভাবে লিখে রাখা বা রেকর্ড করার তিনটি সুবিধে রয়েছে। সুবিধেগুলো হলো, ন্যায় বিচারের নিশ্চয়তা, সাক্ষীদের জন্য লেন-দেনের দলীল থাকা এবং অবিশ্বাস ও সন্দেহের পথ বন্ধ হওয়া। # কোরআনের আলো ( ৭৩ তম পর্ব ) সুপ্রিয় পাঠক , কোরআনের আলোর আজকের পর্বে আমরা পবিত্র কোরআনের দীর্ঘতম সুরা বাকারার শেষের কয়েকটি আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করব। আগের কয়েকটি আয়াতে আমরা ব্যবসা ও লেন-দেন যদি নগদ না হয় সেক্ষেত্রে এবং ঋণের ক্ষেত্রে দলীল প্রমাণ লিখে রাখার ব্যাপারে কোরআনের দিক নির্দেশনা সম্পর্কে জেনেছি। সুরা বাকারার শেষের কয়েকটি আয়াতেও এ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। তো শুরুতেই আমরা সুরা বাকারার ২৮৩ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করবো। এই আয়াতের অর্থ হল, যদি তোমরা সফরে থাক এবং কোন লেখক না পাও তবে নগদ নয় এমন লেন-দেনের ক্ষেত্রে বা ঋণ-প্রদানের ক্ষেত্রে কিছু বন্ধক রাখ। যদি কেউ কাউকে বিশ্বাস করে, তবে যাকে বিশ্বাস করা হয়েছিল, তার উচিত গচ্ছিত দ্রব্য ফিরিয়ে দেয়া এবং নিজ প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করা। হে মুসলমান, কারো অধিকারের ব্যাপারে সাক্ষ্য বা সাক্ষী গোপন করোনা। যে কেউ তা গোপন করবে তার অন্তর পাপপূর্ণ হবে। তোমরা যা কর সে বিষয়ে আল্লাহ সবিশেষ অবহিত। গত অনুষ্ঠানে আমরা যেমনটি বলেছিলাম ইসলাম মানুষের অর্থনৈতিক অধিকার রক্ষার জন্য নগদ নয়,এমন সব ধরনের লেন-দেনের লিখিত দলীল রাখার পরামর্শ দেয় এবং দুজন স্বাক্ষীর উপস্থিতিতে দলীল লিখতে বলা হয়েছে, যাতে কোন পক্ষের ভুল বা স্মৃতি বিভ্রটের কারণে সমস্যা দেখা না দেয়। ইসলাম এ বিষয়ে এত গুরুত্ব দিয়েছে যে, সফরের সময়ও লেন-দেনের দলীল লিখে রাখার পরামর্শ দিয়েছে। আর যদি কোন লেখক না পাওয়া যায় তাহলে কোন কিছু গচ্ছিত রেখে লেন-দেনকে সুদৃঢ় করতে বলেছে। কিন্তু পাওনাদার ও দেনাদার উভয়কেই একথা মনে রাখতে হবে যে তাদের কাছে যা রয়েছে তা হলো, আমানতকে মূল মালিকের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। পাওনাদারের কাছে যা বন্ধক রয়েছে তা হলো, আমানত এবং এই বন্ধকের অপব্যবহারের অধিকার তার নেই। বরং এই বন্ধক অক্ষত ও সুরক্ষিত অবস্থায় দেনাদারের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য সচেষ্ট হতে হবে। দেনাদারকে ও বিশ্বস্ত বলে ধরে নেয়া হয় এবং এ জন্যেই তাকে ঋণ দেয়া হয়। তাই সময়মত দেনা শোধ করা তাদের দায়িত্ব। এতে করে পাওনাদারেরও ক্ষতি হয় না। বিশেষ করে, যে সব ক্ষেত্রে পাওনাদার দেনাদারকে এতটা পর্যন্ত বিশ্বাস করে যে, তার কাছ থেকে কোন বন্ধক বা জামানত না নিয়েই তাকে ঋণ দিয়েছে, সে সব ক্ষেত্রে অবশ্যই আল্লাহকে স্মরণ রাখা উচিত এবং পাওনাদারের অধিকার নষ্ট করা উচিত নয়। এই আয়াতের শেষাংশে মুমিন মুসলমানদের পরামর্শ দেয়া হয়েছে যে, মানুষের অধিকারের ব্যাপারে কথা বলতে বা সাক্ষ্য দিতে কেউ যেন অবহেলা না করে কারণ, আল্লাহ মানুষের অন্তরের খবর রাখেন এবং কেউ যদি কারো অধিকারের ব্যাপারে নীরব থাকে বা অধিকার গোপন রাখে, তাহলে তা হবে অত্যন্ত বড় পাপ। যদিও মানুষ অনেক সময় তা বুঝতে পারেনা। এই ধরনের পাপ মানুষের আত্মাকে অপবিত্র করে। এই আয়াতের মূল শিক্ষণীয় দিক হলো, প্রথমত : নগদ নয় এমন সব লেনদেন মুখের কথার ভিত্তিতে করা উচিত নয়। বরং লিখিত প্রমাণ রেখে স্বাক্ষী রেখে ও প্রয়োজন হলে বন্ধক বা জামানত রেখে লেন-দেন সুদৃঢ় করা উচিত। দ্বিতীয়ত : সময় মত দেনা পরিশোধের মাধ্যমে পারস্পরিক বিশ্বাস অটুট রাখতে হবে এবং সমাজের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা রক্ষা করতে হবে। এবারে সুরা বাকারার ২৮৪ নম্বর আয়াতের অর্থ নিয়ে আলোচনা করা যাক। এই আয়াতের অর্থ হল,আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে, সমন্ত আল্লাহরই, তোমাদের অন্তরে যা আছে, তা প্রকাশ কর অথবা গোপণ রাখ, আল্লাহ সে সবই জানেন এবং সে অনুযায়ী আল্লাহ তোমাদের হিসাব গ্রহণ করবেন। এরপর আল্লাহ যাকে শাস্তির উপযুক্ত মনে করেন তাকে শাস্তি দিবেন এবং যাকে ক্ষমার উপযুক্ত মনে করেন , তাকে ক্ষমা করবেন। আল্লাহ সব বিষয়ে সর্বশক্তিমান। এই আয়াতে বিশ্বাসীদের সাবধান করে দিয়ে বলা হয়েছে এমন ধারণা করো না যে শুধু শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ যেমন- চোখ, কান, হাত, পা এসব দিয়ে যেসব পাপ করা হয়েছে সে সব পাপেরই শাস্তি দেয়া হবে। আল্লাহ অন্তরের পাপ সম্পর্কেও অবহিত এবং অন্তরের পাপ অনুযায়ী আল্লাহ তোমাদের বিচার করবেন। অন্তরের গোণাহ বা পাপ বলতে চিন্তাগত বিকৃতি, কুফরী বিশ্বাস, জনগনের অধিকার গোপন করা প্রভৃতিকে বোঝায়। কিন্তু শয়তান যদি মানুষের অন্তরে খারাপ কাজের কূ-মন্ত্রনা দেয় এবং মানুষ যদি খারাপ কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েও ঐ কাজে জড়িত না হয়, তাহলে সে জন্য শাস্তি পাবেনা। অবশ্য পাপের চিন্তা বা ইচ্ছা, ধীরে ধীরে মানুষের অন্তরকে অন্ধকার ও কলুষিত করে এবং পাপের পথ খুলে দেয়। এবারে সুরা বাকারার ২৮৫ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করব। এই আয়াতের অর্থ হল, রাসুল, তাঁর প্রতি তাঁর প্রতিপালক হতে যা অবতীর্ণ হয়েছে, তা বিশ্বাস করেন এবং বিশ্বাসীরাও আল্লাহকে, তাঁর ফেরেশতাদেরকে বিশ্বাস করেন। আর তাঁরা বলেন , আমরা আল্লাহর রাসুলদের মধ্যে কোন পার্থক্য করিনা তাদের সবার প্রতিই আমরা ঈমান রাখি। তাঁরা বলে, আমরা শুনলাম ও স্বীকার করলাম, হে আমাদের প্রতিপালক । আমরা তোমারই কাছে ক্ষমা চাইছি এবং তোমারই দিকে চরম প্রত্যাবর্তন। ইসলামের দৃষ্টিতে, বিশ্ব একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মত এবং বিশ্ববাসীকে মুক্তির পথ দেখানোর জন্য ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে নবী বা শিক্ষক পাঠানো হয়েছে। এই নবীরা মানবজাতির শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সমৃদ্ধ ও বিকশিত করেছে। মানুষের চিন্তা ও বিবেক যখন আল্লাহর পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচী উপলদ্ধি করার যোগ্য হল, তখন আল্লাহ হযরত মুহাম্মদ (সঃ )কে মানবজাতির জন্য সর্বশেষ নবী হিসেবে মনোনীত করেন। তাই একজন মুসলমান সমন্ত নবী ফেরেশতা ও আল্লাহর পক্ষ থেকে ফেরেশতাদের মাধ্যমে প্রেরিত সমস্ত গ্রন্থের প্রতি বিশ্বাস রাখে এবং তাঁরা নবীদের মধ্যে কোন বৈষম্য করেনা। এবারে সুরা বাকারার ২৮৬ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করব। এই আয়াতের অর্থ হল, আল্লাহ কাউকে সাধ্যের চেয়ে বেশী দায়িত্ব দেননা। ভালো কাজের মাধ্যমে যা সে অর্জন করেছে, তা তার জন্যই , আর যা সে খারাপ কাজের মাধ্যমে অর্জন করে তাও তারই জন্য। বিশ্বাসীরা বলে , হে আমাদের প্রতিপালক যদি আমাদের ভুল ত্রুটি হয়, তবে আপনি আমাদের অপরাধী করবেন না, হে আমাদের প্রতিপালক , পাপ ও বিদ্রোহের কারণে আমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর যেমন গুরুভার অর্পন করেছিলেন, আমাদের ওপর তেমন গুরুদায়িত্ব অর্পণ করবেন না। যে শাস্তি সহ্য করার ক্ষমতা আমাদের নেই, সে শাস্তি আমাদের ওপর আরোপ করবেন না। আমাদের কে ক্ষমা করুন, আমাদেরকে দয়া করুন,আপনিই আমাদের প্রভু । তাই অবিশ্বাসী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদের জয়যুক্ত করুন। মহান আল্লাহতালা মানুষকে বিভিন্ন গুণ ও যোগ্যতা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। কেউ বেশী প্রতিভাবান, কেউ কম প্রতিভাবান, কেউ শক্তিশালী ও সুঠাম স্বাস্থ্যের অধিকারী। আবার কেউ দূর্বল ও রুগ্ন। কেউ ফর্সা , কেউ কালো এবং কেউ নারী ও কেউ পুরুষ। এসবের মধ্যে কোন কোন পার্থক্য মানব প্রজন্ম সৃষ্টি ও রক্ষার জন্য জরুরী। আবার কোন কোন পার্থক্য বা বৈষম্য মানুষের ওপর জুলুম ও সামাজিক অবিচারেরই ফল মাত্র । এটা স্বাভাবিক যে, এই সব পার্থক্য ও বৈষম্য মানুষের শরীর এবং মনের ওপর ব্যাপক প্রভাব রাখে। মানুষের মধ্যে এতসব পার্থক্য সত্ত্বেও আল্লাহ যদি তাদের কাছ থেকে একই ধরনের প্রত্যাশা রাখেন , তবে তা হবে অবিচার । তাই এ আয়াতে আল্লাহর অন্যতম প্রধান গুন হিসেবে তাঁর ন্যায়পরায়নতার কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ কাউকে তার ক্ষমতা বা সাধ্যের চেয়ে বেশী দায়িত্ব দেন না এবং তার কাছে এর চেয়ে বেশী প্রত্যাশা ও করেন না। তাই শাস্তি ও পুরস্কার দায়িত্ব অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের হবে। আল্লাহ সোবহানাহু-তায়ালা , বিচার দিবসে প্রত্যেকের কাছ থেকে তার উপলব্ধি ক্ষমতা, ধর্মীয় জ্ঞান অনুযায়ী হিসাব নিবেন। তাই আলর ন্যায় বিচার অনুযায়ী মানুষ যদি কোন ফরজ কাজ বা আল্লাহর নির্দেশ অনিচ্ছাকৃতভাবে বা ভুলক্রমে অমান্য করে পাপে লিপ্ত হয়, তাহলে তা পাপ বলে বিবেচিত হবে না। জানা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে যেসব পাপ করা হয় শুধুমাত্র সেসব পাপের জন্যই শাস্তি দেয়া হবে। এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিক গুলো হলো , প্রথমত : ইসলাম সহজ সরল ধর্ম। ইসলাম সাধ্যের চেয়ে বেশী দায়িত্ব পালন করতে বলে না। যেমনটি ইসলামের নবী (সাঃ) ও বলেছেন, আমি সহজ ও সরল ধর্মের নবী মনোনীত হয়েছি। দ্বিতীয়ত : পুরস্কার ও শাস্তির ভিত্তি হলো, কাজ বা তৎপরতা। আর কাজ করা হয় ইচ্ছার ভিত্তিতে। তাই ভুল করে যেসব অপরাধ করা হয় সেগুলোর জন্য আল্লাহ শাস্তি দিবেন না। তৃতীয়ত : আল্লাহ মানুষের প্রতি দয়ালু , করুণাময় এবং ক্ষমাশীল। তাই মানুষ তওবা করলে আল্লাহ তাদের পাপ ক্ষমা করে দেন এবং পাপের কালিমা থেকে তাদেরকে পবিত্র করেন। # ( সূরা বাকারা সমাপ্ত )

সম্পর্কিত বিষয়বস্তু