স্ত্রী পরিচালনা

যেরূপ ‎স্বামী পরিচালনা করাটা, একজন গৃহকর্তী নারীর বৃহত্তম দায়িত্ব এবং ইসলামি ‎শরিয়তে সেটিকে আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রাম করার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে; সেরূপ স্ত্রী পরিচালনা ‎করাটাও, একজন গৃহকর্তা পুরুষের বৃহত্তম ও মূল্যবানতম কাজ এবং পারিবারিক সৌভাগ্যের ‎গোপন রহস্য। স্ত্রী পরিচালনা করাটা একটা সহজ কাজ নয়, বরং এমন কতক গোপন রহস্য ‎রয়েছে যে, যিনিই তা পরিপূর্ণরূপে জানবেন তিনিই তার স্ত্রীকে নিজের পছন্দ মত, একজন আদর্শ ‎গৃহিনী রূপে বরং রহমতের ফেরেস্তা রূপে গড়তে পারবেন।

যে পুরুষ প্রকৃতপক্ষে স্ত্রী পরিচালনা করতে চান, তাকে অবশ্যই স্বীয় স্ত্রীর চরিত্র ও ‎আত্মিকতাকে পূর্ণরূপে অর্জন করতে হবে, তার অভ্যন্তরীণ চাহিদাসমূহ ও আত্মিক পছন্দসমূহের ‎ব্যাপারে অবগত হতে হবে; আর সে অনুসারে জীবনের কর্মসূচীকে সুবিন্যস্ত করতে হবে। স্বীয় ‎চরিত্র ও আচার-ব্যবহারের মাধ্যমে এমনইভাবে তার মাঝে অনুপ্রবেশ করতে হবে ও তার হৃদয় ‎জয় করতে হবে, যাতে তিনি গৃহ ও জীবনের প্রতি আনন্দিত হয়ে উঠেন এবং প্রেম ও ভালবাসা ‎সহযোগে গৃহ পরিচালনা করেন।

স্ত্রী পরিচালনা, একটি সামগ্রিক ও অস্পষ্ট কথা যা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের মুখাপেক্ষী। আমরা ‎আগামী আলোচনাসমূহে সেটি নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করব।

স্ত্রীর পরিপূর্ণতায় স্বামীর দায়িত্ব-কর্তব্য

যে কন্যাটি স্বামীর গৃহে প্রবেশ করছেন, তিনি একটি গৃহের পরিচালনার দায়িত্বভার কাঁধে ‎গ্রহণ করছেন। আর গৃহ পরিচালনার জন্যে বিভিন্ন তথ্যের আবশ্যক রয়েছে। রান্না-বান্না, ‎পোশাক ধওয়া, অতিথি আপ্যায়নের শিষ্টাচার, উঠা-বসা প্রভৃতির তথ্য থাকতে হবে। স্বামী নিজের ‎সদ্য প্রবেশ করা স্ত্রীর নিকট অপেক্ষা রাখেন যে, তিনি প্রতিটি কাজের দক্ষতা রাখবেন এবং পূর্ণ ‎প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একজন নারী হবেন। কিন্তু অনুতাপের বিষয় যে, কখনও কখনও এই অপেক্ষাগুলি ‎ফলপ্রসূ হয়ে উঠে না; অর্থাৎ নববধু হয় একেবারেই জীবন যাপনের শিষ্টাচার জানেন না, কিংবা ‎কোনো কিছু জানলেও, তা খুবই সীমিত।

করা যেতে পারে? এটিও আমাদের সামাজিক অন্যতম ত্রুটি। না পিতা-মাতা শর্তাধীন ‎যে, তারা তাদের কন্যাকে জীবনের শিষ্টাচার শিক্ষা দিবেন, আর না শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের কর্মসূচী ‎এরূপ যে, নিষ্ফল বিষয়বস্তুর স্থলে তাদেরকে জীবন যাপনের শিষ্টাচার শিক্ষা দিবেন। যাই হোক, ‎কোনো উপায়ই নেই, প্রতিকার করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

পুরুষ যেহেতু তার স্ত্রীর সঙ্গে এক জীবনব্যাপী জীবন যাপন করতে চান, তাই নিরুপায় ‎হয়েই তার শিক্ষাদান ও প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে চেষ্টা করতে হবে, যাতে তার দোষ-ত্রুটিগুলিকে ‎দূরীভূত করতে পারেন। আর যেহেতু পুরুষ সাধারণতঃ বয়সের দিক হতে নিজ স্ত্রীর চেয়ে বড় ‎হন এবং অভিজ্ঞতা ও তথ্যাদির দিক হতেও আধিক্যতা রাখেন; সেহেতু যদি তিনি সামান্য ধৈর্য ‎ধরেন ও সহনশীল হন, তাহলে তার ত্রুটিসমূহকে দূরিভূত করতে পারবেন এবং নিজের পছন্দ ‎মত করে তাকে গড়তে পারবেন। তিনি নিজে যেসব কাজ জানেন সেগুলো নম্রতা ও মিষ্টিভাষার ‎মাধ্যমে তাকে শিক্ষা দিবেন। আর মাতা, বোন, ফুফু ও খালার ন্যায় বাড়ির অভিজ্ঞ ও দক্ষ ‎মহিলাদের নিকট হতে এ বিষয়ে সাহায্য নিতে পারেন এবং তাদের পথনির্দেশনা হতে উপকৃত ‎হতে পারেন। অনুরূপভাবে যেসব পুস্তক রান্নাবান্না, গৃহ পরিচালনা, অতিথি আপ্যায়ন, স্বামীর ‎দেখাশুনা ও সামাজিক শিষ্টার সম্পর্কে লিখা হয়েছে সেসব হতেও উপকৃত হতে পারেন।

নিজ স্ত্রীকে চরিত্র বিষয়ক বই-পুস্তক পড়ার প্রতি উৎসাহিত করবেন। সামাজিক শিষ্টাচার ‎ও চলাফেরার পদ্ধতি সম্পর্কে তাকে শিক্ষা দিবেন। যদি তার নিকট হতে কোনো মন্দ চরিত্র ও ‎শিষ্টাচার বিরোধী কার্যকলাপ ঘটে যায়, তাহলে মিষ্টিভাষা ও সমবেদনার মাধ্যমে তাকে স্মরণ ‎করাতে হবে, না অভিযোগের স্বরে কেননা, হয়তো ভাল ফলাফল বয়ে আনবে না।

পুরুষ যদি জীবনের প্রথম এক, দুই বৎসর ধৈর্য ধরেন ও সহনশীলতা দেখান এবং ‎বুদ্ধিমত্তা ও চিন্তাশীলতার মাধ্যমে স্বীয় স্ত্রীর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দানে পদক্ষেপ নেন, তাহলে তাকে ‎নিজের পছন্দ মত গড়িয়ে তুলতে পারবেন। যদি তিনি শতাংশই কৃতকার্য না হন, তবুও ‎নিঃসন্দেহে কিছুটা ফলপ্রসূ হবে।

এটি ঠিক যে, এই কাজের জন্যে সময়, ধৈর্য ও সহনশীলতা ব্যয় করা আবশ্যক; কিন্তু এ ‎ব্যাপারে যত বেশি পুঁজি বিনিয়োগ করা যাবে ততই বেশি লাভ আছে। কারণ স্ত্রী হচ্ছে স্বামীর ‎জীবনের অংশীদার এবং তার সন্তান-সন্ততির প্রতিপালক। আর এই কারণে, জীবনের অনন্তকাল ‎পর্যন্ত এই কাজের উপকার ভোগ করবেন।

পুরুষ যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি সচেতন দৃষ্টি রাখবেন তা হচ্ছে এই যে, তিনি স্বীঢ মুসলমান স্ত্রীকে ইসলামের বিধি-বিধান শিক্ষা দিবেন। যদিও নিয়ম এই যে, দ্বিন ইসলামের ‎বিধি-বিধান ও নিয়ম-কানুন তাদের জানা উচিত, কিন্তু সাধারণতঃ সেসব বিষয়ে তারা অজ্ঞ; ‎এমনকি কখনও কখনও অজু, নামাজ, গোসল ও তায়াম্মুমের মত ইসলামের প্রাথমিক বিধি-বিধান ‎ও নিয়ম-কানুনও জানেন না। অবশ্য এই কাজটি, আপনার স্ত্রীর পিতা-মাতার দায়িত্ব; কিন্তু ‎এতদসত্ত্বেও তারা দায়িত্ব পালনে গাফলতি ও অবহেলা করেছেন এবং নিষ্পাপ ও সরলমনা ‎কন্যাদেরকে নিয়তির গৃহে প্রেরণ করেছেন; আর এই গুরুদায়িত্ব স্বামীর কাঁধে অর্পিত হয়েছে। ‎তাদেরকে ধর্মীয় দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে পরিচিত করতে হবে এবং ইসলামের ওয়াজিব ও হারাম ‎বিষয়সমূহ তাদেরকে শিক্ষা দিতে হবে। তাদের বোধশক্তি অনুসারে তাদেরকে ইসলামি আকিদা-‎বিশ্বাস ও চরিত্র শিক্ষা দিতে হবে। যদি আপনারা নিজেরাই এই দায়িত্ব কাঁধে নিতে পারেন, ‎তাহলে কতই না উত্তম হয়; অন্যথা বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের সঙ্গে পরামর্শের মাধ্যমে ইসলামের ‎জ্ঞানগত ও চারিত্রিক উপাদেয় পত্রিকা ও বই-পুস্তকসমূহ প্রস্তুত করতঃ তাদের এখতিয়ারে দিতে ‎হবে এবং উপাদেয় বই-পুস্তকসমূহ অধ্যয়নের জন্যে তাদেরকে অনুপ্রাণিত করতে হবে।

একখানা সহজ ব্যবহারিক পুস্তিকা তাদের এখতিয়ারে দিবেন। আর প্রয়োজন সাপেক্ষে ‎একজন নির্ভরযোগ্য, দ্বিনদার ও বিজ্ঞ ব্যক্তিতে তাদের শিক্ষাদানের জন্যে নির্বাচন করতে পারেন।

যাই হোক, স্ত্রীকে ন্যায়ের প্রতি আদেশ, অন্যায় হতে নিষেধ, দিক নির্দেশনা ও পথপ্রদর্শন ‎করা স্বামীর অন্যতম আবশ্যকীয় দায়িত্ব। যদি স্বামীর স্বীয় দায়িত্ব-কর্তব্য অনুসারে আমল করেন, ‎তাহলে তার ফলাফল এই দাঁড়াবে যে, তিনি একজন ধার্মিকা, সতী-সাধ্বী, দয়ালু, চরিত্রবতী, ‎জ্ঞানবতী ও জীবন যাপনের উপযোগিনী স্ত্রী লাভ করবেন। আর পরকালের সওয়াব ছাড়াও, এই ‎পৃথিবীতেও তিনি তার লাভ দ্বারা উপকৃত হবেন। আর যদি দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেন, ‎তাহলে ফলাফল এই দাঁড়াবে যে, এই পৃথিবীতে একজন অজ্ঞ ও দুর্বল ইমানের স্ত্রী পাবেন, ধর্মীয় ‎ও চারিত্রিক নিষ্পাপতা থাকবে না এবং কিয়ামত দিবসেও শক্তিমান মহান আল্লাহর প্রশ্নের সম্মুখীন ‎হবেন।

মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন:‎

‘হে ইমানদারগণ! তোমাদের নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবারকে জাহান্নামের আগুন ‎হতে বাঁচাও, যে আগুনের জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর।’‎

ইমাম সাদেক [আ.] বলেন: ‘উল্লেখিত আয়াতটি অবতীর্ণ হলে একজন মুসলমান কান্না ‎করছিলেন এবং বলছিলেন: আমি তো জাহান্নামের আগুন হতে নিজেকে বাঁচাতেই অপারগ, ‎এতদসত্ত্বেও পরিবারকেও জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাতে আদিষ্ট হয়েছি!!’‎

রসুল আকরাম [সা.] বলেন: ‘এতটুকুই যথেষ্ট যে, আপনি যেসব কাজ করতে আদিষ্ট ‎হয়েছেন সেসবের প্রতিই তাদেরকে আদেশ করবেন এবং যেসব কাজ থেকে আপনি বিরত ‎থাকতে আদিষ্ট হয়েছেন সেসব কাজ থেকে তাদেরকে বিরত থাকতে বলবেন।’‎

অপর এক হাদিসে তিনি বলেন: ‘পুরুষকে পরিবারের অভিভাবকত্বের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, ‎আর প্রত্যেক অভিভাবকই নিজের অধীন ব্যক্তিদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।’‎

আরও তিনি অপর এক বক্তব্যে নারীদের কথা স্মরণ করে বলেন: ‘তারা তোমাদেরকে ‎অন্যায় কাজকামের প্রতি বাধ্য করার পূর্বেই তোমরা তাদেরকে কল্যাণকর কাজকামের প্রতি ‎আহ্বান জানাও!’