হজরত ফাতেমা মাসুমা (সা.আ.) 'র কুম আগমণের কারণ

এস, এ, এ

প্রশ্ন: যখন হজরত ফাতেমা মাসুমা (সা.আ.) সাভেতে মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন তখন কেন তিনি সাভেতে অবস্থান করেন নি এবং কেন কুম অভিমুখে রওনা হওয়ার নির্দেশ দান করেন?

উত্তর: উক্ত প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে আমাদেরকে মাসুম (আ.)দের থেকে বর্ণিত রেওয়ায়েত এবং ইতিহাসের প্রতি দৃষ্টিপাত করতে হবে। তাহলেই  আমাদের কাছে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। এক্ষেত্রে আমরা  বিভিন্ন দলিল সমূহ উপস্থাপন করবো যেন বিষয়টি আমাদের সম্মানিত পাঠক এবং দর্শকদের কাছে আরো স্পষ্ট হতে পারে। নিন্মে হজরত ফাতেমা (সা.আ.) 'র কুম আগমণের কিছু কারণ উল্লেখ করা হলো:

১- ইতিহাসের প্রতি দৃষ্টিপাত করলে আমরা দেখতে পাই যে, সে যুগে সাভে’এর লোকজন আহলে বাইত (আ.)’এর ভক্ত বা অনুসারি ছিল না। (গান্জিনে আসারে কুম, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৮২)

২- বিভিন্ন রেওয়ায়েত অনুযায়ি কয়েক শতাব্দি পূর্বে কুম আহলে বাইত (আ.)’এর অনুসারিদের কেন্দ্রস্থল ছিল। ৮৩ হিজরিতে আব্দুর রহমান বিন মোহাম্মাদ বিন আশআশ ১৭ জন তাবেঈন আলেম এবং প্রখ্যাত শিয়াদেরকে যেমন: কুমাইল, সাঈদ বিন জুবাইর’কে  নিয়ে কুম শহরে আগমণ করেন এবং তারা সকলেই জামকেরান গ্রামে জীবন যাপন করতেন।

আশআর’এর বংশধরগণ যারা ইয়েমেন এবং কুফার প্রসিদ্ধ মুসলমান ছিল তারা প্রথম শতাব্দির শেষ দশকে কুমে আসেন এবং তখন থেকেই কুম আহলে বাইতের অনুসারি এবং ভক্তদের জন্য একটি কেন্দ্রেস্থলে পরিণত হয়। (কামেল ইবনে আসির, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ৮২)

৩- হজরত ফাতেমা মাসুমা (সা.আ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে তিনি বলেছেন: আমার বাবা ইমাম কাযিম (আ.) বলেছেন: কুম হচ্ছে আমাদের অনুসারিদের কেন্দ্রস্থল। (কামেল ইবনে আসির, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ৩৭)

৪- তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে যে, কুম রাসুল (সা.)'র যুগ থেকেই ছিল ধর্মিয় শহর সমূহের মধ্যে অন্যতম! আনাস বিন মালেক বলেন: একদা আমি রাসুল (সা.)’এর সমিপে উপস্থিত ছিলাম তখন সেখানে হজরত আলি (আ.) আসেন। রাসুল (সা.) তাকে অভ্যর্থনা জনান এবং তাঁর চক্ষুদ্বয়ের মাঝে চুম্বন করে বলেন: হে আলি! আল্লাহ যখন তোমার বেলায়াতের কথা আসমান সমূহের কাছে উপস্থাপন করেন তখন সপ্তম আসমান তোমার বেলায়াতের স্বিকৃতি দানের ক্ষেত্রে অগ্রণি ভুমিকা পালন করে। তখন আল্লাহ তাকে নক্ষত্র সমূহ দ্বারা সুসজ্জিত করে। তার পরে মক্কা তোমার বেলায়াতের স্বিকৃতি দানের ক্ষেত্রে অগ্রণি ভুমিকা পালন করে। আল্লাহ মক্কাকে কাবা শরিফ দ্বারা সম্মানিত করেন। অতঃপর মদিনা তোমার বেলায়াতের স্বিকৃতি দানের ক্ষেত্রে অগ্রণি ভুমিকা পালন করে। আল্লাহ তাকে শান্তি দান করেন। এভাবে কুফা তোমার বেলায়াতের স্বিকৃতি দান করে আল্লাহ তাকে তোমার দ্বারা সম্মানিত করেছেন। অতঃপর যখন কুম তোমার বেলায়াতের স্বিকৃতি দান করে তখন আল্লাহ আরবদের দ্বারা (আশআরি শিয়া) সম্মানিত করেন এবং উক্ত শহরের দিকে বেহেস্তের একটি দরজাকে খুলে দেন।

উক্ত রেওয়ায়েত থেকে যে বিষয়টি স্পষ্ট হয় তা হচ্ছে এসব কিছুর মূলে হজরত আলি (আ.)'র বেলায়াতের মূখ্য ভূমিকা রয়েছে। আর কুম’এর সম্মান বৃদ্ধির মূলে হজরত আলি (আ.)’এর বংশধর এবং তাঁর প্রকৃত অনুসারি ও ভক্তদের মূখ্য ভুমিকা রয়েছে।

৫- অন্য রেওয়ায়েত সমূহে বর্ণিত হয়েছে যে, হজরত আলি (আ.) কুমবাসিদের প্রতি দোয়া, দুরুদ ও সালাম প্রেরণ করেছেন।

৬- ইমাম সাদিক (আ.) কুমকে আহলে বাইত (আ.) 'র জন্য আশ্রয়স্থল এবং পবিত্রস্থান বলে আখ্যায়িত করেছেন।

৭- ইমাম কাযিম (আ.) কুম শহরকে আহলে বাইত (আ.)দের ভালবাসার নীড় বলে উল্লেখ করেছেন এবং তিনি আরো বলেছেন যে, বেহেস্তের দসজা সমূহের মধ্যে একটি দরজা কুমের দিকে খোলা রয়েছে।

৮- ইমাম সাদিক (আ.) ইমাম কাযিম (আ.)’এর জন্মের আগে ভবিষ্যত বাণি করেন যে, ইমাম কাযিম (আ.)’এর একজন কন্যা কুম শহরে মৃত্যুবরণ  করবে এবং তার নাম হবে ফাতেমা। তাঁর শেফায়াতের কারণে আমাদের শিয়াদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৬০, পৃষ্ঠা ২১৬)

সুতরাং হজরত ফাতেমা মাসুমা (সা.আ.)এর কুমে আগমণের পিছনে ইমাম (আ.)'দের ভবিষ্যতবাণি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। যেমনভাবে ইমাম হুসাইন (আ.)’এর শাহাদতের স্থান, কাল নির্ধারিত ছিল এবং তিনি মদিনা থেকে কারবালার উদ্দেশ্যে রওনা হন অনুরূপভাবে হজরত ফাতেমা মাসুমা (সা.আ.)ও মদিনা থেকে সাভে’এর উদ্দেশ্যে রওনা হন এবং তিনি অবগত ছিলেন যে তাঁকে কুম শহরে যেতে হবে! আর তাই আমরা ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখতে পাই যে, যখন তিনি সাভে নামক স্থানে আসেন তখন তাঁর কাফেলার উপরে হামলা করা হয় এবং তাঁকে বিষ প্রয়োগ করা হয়। অতঃপর তিনি সাভে থেকে কুম অভিমুখে রওনা হন এবং তার কিছুদিন পরেই তিনি ইহলোকে পাড়ি দেন।

আর এগুলোই ছিল হজরত ফাতেমা মাসুমা (সা.আ.) 'র কুম আগমণের মূখ্য কারণ সমূহের মধ্যে অন্যতম।