হজ্বের শ্লোগান

হজ্বের মওসুম আধ্যাত্মিকতার বসন্ত ও বিশ্বের বুকে তাওহীদ বা একত্ববাদের ঔজ্জ্বল্য তুলে ধরে। হজ্ব স্বচ্ছ ও পবিত্র পানির এমন এক ঝর্ণাধারা যা হাজীদেরকে পাপ ও অচেতনতা বা শৈথিল্য থেকে মুক্ত করতে পারে এবং খোদা-প্রদত্ত আলোকিত প্রকৃতিকে মানুষের মধ্যে ফিরিয়ে আনতে পারে। মিকাতে হাজীরা পার্থক্য ও আভিজাত্যের পোশাক খুলে ফেলে একই বর্ণের সার্বজনীন এহরামের পোশাক পরেন। আর এ বিষয়টি মুসলিম উম্মাহর মধ্যে সাম্য বা সাদৃশ্য এবং বিশ্বের মুসলমানদের ঐক্য ও সহমর্মিতার প্রতীকি নির্দেশনা তুলে ধরে। হজ্বের শ্লোগান হচ্ছে একদিকে

فَإِلَهُکُمْ إِلَهٌ وَاحِدٌ فَلَهُ أَسْلِمُوا وَبَشِّرِ الْمُخْبِتِینَ

“অতএব তোমাদের আল্লাহ্‌ তো একমাত্র আল্লাহ্‌ সুতরাং তাঁরই আজ্ঞাধীন থাক এবং বিনয়ীগণকে সুসংবাদ দাও।”–হজ্ব/৩৪

এবং অন্যদিকে

وَ الْمَسْجِدِ الْحَرامِ الَّذِي جَعَلْناهُ لِلنَّاسِ سَواءً الْعاكِفُ فِيهِ وَ الْبادِ

মসজিদুল হারামকে আমি প্রস্তুত করেছি স্থানীয় ও বহিরাগত সকল মানুষের জন্য সমান। -সূরা হজ্জ, আয়াত নং ২৫। এভাবে কাবাঘর তাওহীদ ও মুসলমানদের শ্লোগানের অভিন্নতা, ভ্রাতৃত্ব ও সাম্যেরও প্রকাশ।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মুসলমানরা এখানে সমবেত হয়েছেন পবিত্র কাবা ঘর প্রদক্ষিণ ও বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)সহ তাঁর পবিত্র আহলে বাইত (আঃ)‘র পবিত্র মাজার জিয়ারতের গভীর আগ্রহ বা প্রেম নিয়ে। তাদের উচিত ইসলামী ভ্রাতৃত্ব জোরদারের জন্য এই মহাসুযোগকে কাজে লাগানো। এই ভ্রাতৃত্ব মুসলমানদের অধিকাংশ সংকট বা যন্ত্রণা নিরাময়ের ওষুধ। আজ আমরা প্রকাশ্যেই দেখতে পাচ্ছি যে মুসলিম বিশ্বের অকল্যাণকামীরা মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির কাজে অতীতের চেয়েও বেশী সক্রিয় হয়েছে। অথচ আজ মুসলমানদের ঐক্য ও সহমর্মিতা অতীতের চেয়েও বেশী জরুরী। আজ মুসলিম বিশ্বের দেশে দেশে শত্রুদের রক্তাক্ত হাত প্রকাশ্যেই বিপর্যয় সৃষ্টি করছে। নোংরা ইহুদিবাদীদের নাগপাশে বন্দী ফিলিস্তিনের যন্ত্রণা ও দুঃখ-দূর্দশা দিনকে দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। মুসলমানদের প্রথম কেবলা আল আকসা মসজিদ মারাত্মক বিপদের সম্মুখীন। গাজার মজলুম ফিলিস্তিনীরা নজিরবিহীন গণহত্যা বা বংশনিধনযজ্ঞের শিকার হবার পর এখনও চরম দূর্দশার মধ্যে দিনাতিপাত করছে। দখলদারদের স্টীম রোলারের নিচে প্রতিদিন নতুন বিপর্যয়ের শিকার হচ্ছে আফগানিস্তান। নিরাপত্তাহীনতা কেড়ে নিয়েছে ইরাকী জনগণের ঘুম ও প্রশান্তি। ইয়েমেনে ভ্রাতৃহত্যা মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ে সৃষ্টি করেছে নতুন ক্ষত।

সারা বিশ্বের মুসলমানদের ভেবে দেখা উচিত ইরাক, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যে নির্বিচারে অশান্তি, যুদ্ধ, বিস্ফোরণ, সন্ত্রাসী হত্যাকান্ড ও গণহত্যা ঘটছে, এসবের পরিকল্পনা কোথায় ও কিভাবে করা হচ্ছে? এ অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে জমিদারসুলভ ভঙ্গীতে পাশ্চাত্যের সেনাদল প্রবেশের আগে কেনো এইসব দূর্যোগ ও সংকট ছিল না? দখলদাররা একদিকে ফিলিস্তিন, লেবানন ও অন্যান্য অঞ্চলের গণ-প্রতিরোধ আন্দোলনগুলোকে সন্ত্রাসী বলছে এবং অন্যদিকে এ অঞ্চলে হিংস্রতাপূর্ণ গোত্রীয় ও ধর্মীয় সন্ত্রাস পরিচালনা করছে। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা একশ বছরেরও বেশী সময় ধরে প্রথমে বৃটেন ও ফ্রান্সসহ পাশ্চাত্য এবং পরে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের মাধমে শোষিত, অধিকৃত ও অপমানিত হয়েছে। তারা লুট করেছে এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ এবং দমন করেছে এ অঞ্চলের জনগণের স্বাধীনতাকামী চেতনা। এ অঞ্চলের জাতিগুলো বিজাতীয় আগ্রাসীদের অন্তহীন লালসার কাছে পণবন্দী। এরপর জাতিগুলোর ইসলামী জাগরণ ও প্রতিরোধ আন্দোলন বিশ্বের জালিম গোষ্ঠীগুলোর জন্য ঐ অবস্থা অব্যাহত রাখা অসম্ভব করে তুলেছে।

শাহাদত এবং আল্লাহর জন্য জীবন উৎসর্গ করার রীতি ইসলামী জিহাদের ময়দানে আবারো ফিরে এসেছে অনন্য শক্তি হিসেবে। ফলে দিশেহারা হয়ে পড়া আগ্রাসীরা প্রতারণাপূর্ণ কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে এবং নব্য উপনিবেশ-ব্যবস্থা কায়েম করেছে। আজ বহুরূপী উপনিবেশবাদী দানব ইসলামকে নতজানু করার জন্য তার সমস্ত শক্তি নিয়ে ময়দানে অবতীর্ণ হয়েছে। তারা এ লক্ষ্যে সামরিক শক্তি, বজ্রমুষ্ঠি ও প্রকাশ্য দখলদারিত্ব থেকে শুরু করে ইবলিসী প্রচারণা-প্রপাগান্ডার ধারাবাহিক মাধ্যম ব্যবহার করছে। তারা এ জন্য মিথ্যাচার ও গুজব রটানোর হাজারো প্রচারযন্ত্র এবং ঘাতক-স্কোয়াড ও নির্দয় সন্ত্রাসী চক্রও ব্যবহার করছে। এ ছাড়াও একই লক্ষ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছে নৈতিক অনাচার, মাদকদ্রব্য এবং ধ্বংস করছে যুব সমাজের চরিত্র ও দৃঢ় ইচ্ছা। ওরা প্রতিরোধকামী শক্তিগুলোর ঘাঁটিতে সব ধরনের রাজনৈতিক হামলা চালাচ্ছে যাতে ধর্মীয় হানাহানি, জাতিগত বিদ্বেষ এবং ভাই ও ভাইয়ের মধ্যে শত্রুতা উসকে দেয়া যায়।

পরস্পরের প্রতি সন্দেহ ও অবিশ্বাসের পরিবর্তে মুসলিম জাতি, গোত্র ও ইসলামী ফেরকাগুলোর মধ্যে বন্ধুত্ব, আস্থা ও সহমর্মীতা প্রতিষ্ঠিত হলে শত্রুদের ষড়যন্ত্র ও নীলনক্সার একটা বড় অংশ ব্যর্থ হবে এবং মুসলিম বিশ্বের ওপর তাদের ক্রমবর্ধমান আধিপত্য বিস্তারের চক্রান্ত নস্যাত হয়ে যাবে। হজ্ব হচ্ছে, এই মহান লক্ষ্য অর্জনের অন্যতম বৃহৎ সুযোগ।

মুসলমানরা যদি কোরআন ও সুন্নাহর অভিন্ন বিষয়গুলোর ওপর ভিত্তি করে নিজেদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার মাধ্যমে বহুরূপী শত্রুদের সামনে দাঁড়িয়ে যায়, তবে শত্রুরা মুসলমানদের দৃঢ়তা ও ঈমানের কাছে আত্মসমর্পন করতে বাধ্য হবে। ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান এ ধরনের সফল প্রতিরোধের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ওরা ইসলামী ইরানে পরাজিত হয়েছে। ত্রিশ বছরের শত্রুতা ও ষড়যন্ত্র- অর্থাৎ সামরিক অভ্যূত্থানও ৮ বছরের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধ থেকে শুরু করে ইরানের ওপর অবরোধ আরোপ ও এদেশের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা, মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ ও প্রচারণার ঝড় তোলা থেকে শুরু করে জ্ঞানবিজ্ঞানের উন্নতি বিশেষ করে পরমাণু প্রযুক্তি অর্জনে ইরানকে বাধা দেয়া, এমনকি ইরানের সাম্প্রতিক জাকজমকপূর্ণ ও অর্থবহ প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পরবর্তী ঘটনায় উস্কানি ও সুস্পষ্ট হস্তক্ষেপ- শত্রুদের এ ধরনের সব অপতৎপরতা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। সেই সাথে পবিত্র কোরানের এই আয়াত- ان کید الشیطان کان ضعیفأ (নিশ্চয়ই শয়তানের কৌশল অত্যন্ত দুর্বল)- ইরানী জনগণের চোখের সামনে আরো একবার বাস্তব বলে প্রমাণিত হয়েছে। বিশ্বের অন্য দেশগুলোতেও যেখানেই জনগণ ঈমান ও দৃঢ় সংকল্পকে পূঁজি করে অহংকারী ও বলদর্পী শক্তিগুলোর সামনে দাঁড়িয়েছে সেখানেই মুমিনরা বিজয়ী এবং অত্যাচারীরা নিশ্চিত পরাজয় ও লাঞ্ছনার শিকার হয়েছে। লেবাননে ৩৩ দিনের প্রতিরোধ সংগ্রামের বিজয় এবং গাজাবাসীর অকুতোভয় সংগ্রাম ও বিজয় ছিলো গত ৩ বছরে এই বাস্তবতার আরো কিছু জ্বলন্ত উদাহরণ।

সৌভাগ্যবান হাজ্বী, বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলোর আলেম সমাজ ও খতীবগণ এবং হারামাইনিশ শারিফাইনের জুমার নামাজের খতীবের প্রতি আমার বিনীত পরামর্শ থাকবে, আপনারা যে কোন বিষয়কে সঠিকভাবে উপলব্ধি করার মাধ্যমে আজকের জরুরী কর্তব্য সম্পর্কে পুনরায় সচেতন হোন। সমস্ত শক্তি ও ক্ষমতা দিয়ে শ্রোতাদের সামনে শত্রুদের ষড়যন্ত্রসমূহকে তুলে ধরুন এবং মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানান। তাদের বলুন, তারা যেন মুসলমানদের মধ্যে যেসব বিষয় অবিশ্বাস ও সন্দেহ সৃষ্টি করে সেসব থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকে এবং নিজেদের সমস্ত শক্তি ও আক্রোশ ইসলামের শত্রুদের বিশেষ করে ইহুদীবাদী চক্র ও মার্কিন সরকারের বিরুদ্ধে যেন কাজে লাগায়। মুসলমানরা যেন হজ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা- বারাআত বা মুশরিকদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয়টি কথা ও কাজে প্রমাণ করে।

মহান আল্লাহর কাছে আমার নিজের এবং আপনাদের সবার জন্য হেদায়াত, সাফল্য, সাহায্য ও রহমত কামনা করছি।

ওয়াসসালামু আলাইকুম,

সাইয়েদ আলী হোসেইনি খামেনেয়ী

৩রা জিলহাজ্ব ১৪৩০ হিজরি

সূত্র:রেডিও তেহরান

কীওয়ার্ড: