হযরত আলী (আ.)-এর গুণাবলী

যদি হযরত আলী (আ.)কে আমাদের নেতা হিসেবে গ্রহণ করি, তবে তা হবে একজন পূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ মানুষকে আমাদের অগ্রগামী হিসেবে গ্রহণ করা যার মধ্যে সবগুলো মানবিক মূল্যবোধ সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বিকাশ লাভ করেছে।

যখন রাত্রি নেমে আসে, রাত্রির নিস্তব্ধতা চারিদিক আচ্ছন্ন করে ফেলে তখন কোন সাধক বা আরেফই আলী (আ.)-এর পদমর্যাদায় পৌঁছতে পারে না। এমন প্রাণবন্ত ইবাদত যেন স্রষ্টার সাধনায় নিমগ্ন ও পরমাকৃষ্ট, তাঁর দিকে ধাবমান প্রবলভাবে। আবার যখন তিনি অন্য কোন বিষয়ে মশগুল, উদাহরণস্বরূপ যখন তিনি যুদ্ধ ও সংগ্রামে লিপ্ত (যুদ্ধক্ষেত্রে) তরবারীর আঘাতে তাঁর দেহ ক্ষত-বিক্ষত, শরীর থেকে মাংস বিচ্ছিন্ন হয়ে এক দিকে পড়ে গেছে, কিন্তু এতটা নিমগ্ন যে, অনুভব করেন নি এক টুকরা মাংস তাঁর দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। গভীর মনঃসংযোগের কারণে সে দিকে লক্ষ্যই নেই। আলী (আ.) ইবাদতের সময় এতটা উত্তপ্ত ও উদ্বেলিত হয়ে উঠেন যে, আল্লাহর প্রেম ও ভালোবাসায় তাঁর অস্তিত্ব যেন এক প্রজ্বলিত শিখা যার অবস্থান এ পৃথিবীতে নয়। নিজেই এক দল ব্যক্তিকে এভাবে বর্ণনা করেছেন,

هَجَمَ بِهِم العلم على حقيقة البصيرة و باشروا روح اليقين و استلانوا ما استوعرة المترفون و انسوا بما استوحش منه الجاهلون و صحبوا الدّنيا بابدان ارواحها معلقة بالمحلّ الأعلى

জ্ঞান তাদের দিকে তার দিব্যতাসহ প্রকৃতরূপে ধাবিত হয়েছে, ইয়াকীনের প্রাণকে তারা কর্মে নিয়োজিত করেছে, যা দুনিয়াদারদের জন্য কঠিন ও অসহ্য তা তাদের কাছে সহজ হয়ে গেছে, জাহেলরা যা থেকে ভীত তারা তার প্রতি আকৃষ্ট, যদিও তারা মানুষের মাঝে শারীরিকভাবে অবস্থান করছেন তা সত্ত্বেও তাদের আত্মা উচ্চতর এক স্থানে সংযুক্ত।' (নাহজুল বালাগা, হেকমত(প্রজ্ঞাপূর্ণ বাণী) ১৪৭।)

ইবাদতরত অবস্থায় তাঁর শরীর থেকে তীর খুলে ফেলা হয়েছে, অথচ তিনি এমনভাবে আল্লাহর দিকে আকৃষ্ট ও ইবাদতে নিমগ্ন যে অনুভবও করেননি। ইবাদতের মেহরাবে তিনি এতটা ক্রন্দনশীল যার নজীর কেউ দেখেনি। আবার দিনের বেলায় আলী (আ.) যেন ভিন্ন কোন মানুষ। সঙ্গীদের সাথে যখন বসেন তখন হাসি মুখ, খোলা-মেলা তাঁর আচরণ। তাঁর চেহারা সব সময় হাস্যোজ্জ্বল। আলী (আ.) এত বেশি মুক্ত মনের ছিলেন যে, আমর ইবনে আস তাঁর বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাত যে, আলী খেলাফতের উপযুক্ত নয়। কারণ হাসিমুখ ও মনখোলা মানুষ খেলাফতের জন্য অনুপযোগী। খেলাফতের জন্য কঠিন মুখাবয়বের প্রয়োজন যাতে মানুষ তাকে ভয় পায়। এটা নাহজুল বালাগায় আলী (আ.) নিজেই বর্ণনা করেছেন-

عجباً لابنِ النابغةٍ يزعمُ لاهلِ الشامِ أنَّ فيَّ دُعابة وَ انِّي امروٌ تلعابة

নাবেগার সন্তানের (আমর বিন আস) কথায় বিস্মিত হই যে বলে, আলী মানুষের সাথে হাসি মুখে কথা বলে, খুব হাসি-ঠাট্টা করে, মজাদার লোক।

যখন আলী (আ.) শত্রুর সাথে যুদ্ধের ময়দানে একজন যোদ্ধার বেশে আবির্ভূত তখনও তিনি মন খোলা ও হাসি মুখ। কবি বলছেন,

هو البكاّءُ في المحرابِ ليلاً                                   هو الضحاّكُ إذا اشتدَّ الضربُ

তিনি ইবাদতের মেহরাবে যেমন অত্যন্ত ক্রন্দনশীল তেমনি যুদ্ধের ময়দানে হাস্যোজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত।

তিনি কেমন মানুষ? এটাই কোরআনী মানুষ। কোরআন এমন মানুষই চায়।

انَّ ناشية اللّيلِ هي اشدّ وَطاً وَّ اقومُ قيلاً انَّ لكَ في النّهارِ سبحاً طويلا

নিশ্চয় (ইবাদতের উদ্দেশ্যে) রাত্রিকালের উত্থান আত্মশুদ্ধির জন্য সর্বাধিক কঠিন পন্থা এবং বাক্যালাপে সর্বাধিক দৃঢ়তা দানকারী। নিশ্চয় দিবসে তুমি দীর্ঘ কর্ম ব্যস্ততায় নিমগ্ন থাক। (সুরা মুজ্জাম্মিল:৬-৭) অর্থাৎ রাতকে ইবাদতের জন্য রাখ আর দিনকে সামাজিক কাজকর্মের জন্য। আলী যেন রাতে এক ব্যক্তিত্ব, আর দিনে অন্য এক ব্যক্তিত্ব।

হাফেজ শিরাজী একজন মুফাসসির ছিলেন। তাই তিনি কোরআনের রহস্যকে বেশ ভালোভাবেই উপলব্ধি করতেন। নিজস্ব ভঙ্গিতে ভাষার গাঁথুনীতে এ বিষয়টি তিনি কবিতায় এনেছেন-

روز در كسب هنر كوش كه می‏خوردن روز            دل چون آينه در زنگ ظلام اندازد

 آن زمان وقت می‏صبح فروغ است كه شب               گرد خرگاه افق پرده شام اندازد

“দিনে রত হও অর্জনের চেষ্টায়

রাত তো মাতাল হওয়ার সময় শরাবের নেশায়।

হৃদয়রূপ আয়নায় মরিচা তো পড়বেই

মরিচা সরানোর সময় তো রাতের আঁধারেই।"

আলী (আ.)-এর দিবারাত্রি এমনই ছিল। বিপরীত চরিত্রের সমন্বয়- যা পূর্ণ মানবের জন্য প্রয়োজনীয় বৈশিষ্ট্য তা হাজার বছর আগের আলীর মধ্যে দেখা যায়। সাইয়্যেদ রাজী নাহজুল বালাগার ভূমিকায় বলছেন, ‰যে বিষয়টি সব সময় বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করি এবং যাতে সবচেয়ে বেশি বিস্মিত হই তা হলো আলী (আ.)-এর বক্তব্যগুলোর যে কোন একটিতে প্রবেশ করলে মনে হয় যেন এক বিশ্বে প্রবেশ করেছি। কখনো কোন আবেদের জগতে, কখনো বা যাহেদের জগতে, কখনো দর্শনের জগতে, কখনো আধ্যাত্মিকতার জগতে, কখনো সৈনিক বা সামরিক কর্মকর্তার জগতে, কখনো ন্যায়পরায়ণ বিচারক বা শাসকের বা ধর্মীয় নেতার জগতে। পুরো বিশ্বেই আলী উপস্থিত। মানব বিশ্বের কোন স্থানেই আলী (আ.) অনুপস্থিত নন।"

সাফিউদ্দিন হিল্লী যিনি অষ্টম হিজরী শতাব্দীর একজন কবি ছিলেন তিনি বলেছেন,

جُمِعَتْ في صِفاتِكَ الاَضدادُ                                       فَلِهَذا عزَّتُ لكَ الاَنداد

“বিপরীত বৈশিষ্ট্য হয়েছে তোমায় সমন্বিত

তাই তুমি হয়েছ মহিমান্বিত।"

زاهدٌ حاكمٌ حليمٌ شجاعٌ                                          ناسكٌ فاتِكٌ فقيرٌ جوادٌ

“দুনিয়াবিমুখ শাসক তুমি, সাহসী ও বীর

সহনশীল দাতা তুমি, দুনিয়াত্যাগী ফকির।"

সহনশীলতা ও ধৈর্যের ক্ষেত্রে তুমি যেমন সর্বোচ্চ পর্যায়ে তেমনি সাহসিকতার ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ পর্যায়ে। রক্তপাতের ক্ষেত্রে যেখানে কোন নিকৃষ্ট ব্যক্তির রক্ত ঝরাতে হবে সেখানে তিনি শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা, আবার ইবাদতের ক্ষেত্রে সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদতকারী। নিঃস্ব ও সম্পদহীন তিনি, অথচ সর্বশ্রেষ্ঠ দাতা। দানশীল ছিলেন বলেই সম্পদ তাঁর হাতে গচ্ছিত থাকত না।

‰দাতা কভু পারে না সম্পদ সঞ্চয় করিতে

প্রেমিক অন্তর পারে না কভু ধৈর্য ধরিতে,

পানিকেও ধারণ করা যায় না কোন ছাকনিতে।'

তেমনি আলী (আ.)-কে বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে-

خُلقُ يُخْجلُ النسيمَ مِنَ العطفِ                                  وَ بأسٌ يذوبُ منهُ الجمادَ

“কোথাও তোমার চরিত্র এমন যে, তোমার কোমলতা দেখে মৃদুমন্দ বাতাসও লজ্জা পায়

কখনো তোমার দৃঢ়তা পাথরকেও হার মানায়।"

অর্থাৎ তাঁর সাহসিকতা, শৌর্য আর সংগ্রামী আত্মার মোকাবিলায় পাথর, শীলা বা ধাতুও গলে যায়। আবার তাঁরই চারিত্রিক কোমলতা মৃদুমন্দ বাতাসকেও লজ্জা দেয়। একই ব্যক্তির মধ্যে কোমলতা ও কঠোরতার এক অপূর্ব সমন্বয়। তুমি কেমন আশ্চর্য সৃষ্টি?

অতএব, পূর্ণ মানব অর্থ সেই মানুষ যিনি সব ধরনের মানবিক মূল্যবোধের ময়দানে বিজয়ী বীর। মানবতার সবগুলো ময়দানেই তিনি শ্রেষ্ঠ। এখান থেকে আমরা কি শিক্ষা নেব? এ শিক্ষা নেব যে, ভুল করে শুধু একটি মূল্যবোধকে গ্রহণ করে অন্যান্য মূল্যবোধকে যেন আমরা ভুলে না যাই। যদিও আমরা সবগুলো মূল্যবোধের ক্ষেত্রেই শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে পারব না, কিন্তু নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত সব মূল্যবোধই একত্রে ধারণ তো করতে পারি। যদি পূর্ণ মানুষ নাও হই অন্তত ভারসাম্যপূর্ণ মানুষ তো হতে পারি। আর তখনই একজন প্রকৃত মুসলমান হিসেবে সবগুলো ময়দানে আমরা উপস্থিত হতে পারব।

সুতরাং এটাই পূর্ণ মানুষের রূপ। ইনশাআল্লাহ্ আমরা পরবর্তী বৈঠকে বাকী অংশ আলোচনা করব।