হযরত আলী (আ.) এর দৃষ্টিতে ফাতেমা

(১) মুয়াবিয়াহ’র এক পত্রের উত্তরে হযরত আলী (আঃ) লিখেছিলেন : ‘মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম এর কন্যা আমার সহধর্মিনী, তার মাংস আমার রক্ত ও মাংসের সাথে মিশে গেছে। (২) হযরত আহমাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম এর দৌহিত্ররা হচ্ছে ফাতেমা [আলাইহাস সালাম] হতে আমার সন্তানেরা, তোমাদের মধ্যে হতে কে আমার মত এমন বৈশিষ্ঠের অধিকারী।

(৩) * সাকীফাহ’র ঘটনায় হযরত আলী তার শ্রেষ্ঠত্বের বিভিন্ন বিষয় উল্লেখ ও মহানবী (স.) এর পর মুসলিম সমাজের নেতৃত্ব তার দায়িত্বে বর্তায় এ কথা উল্লেখ করে আবু বকরের উদ্দেশ্যে বলেন : ‘তোমাকে আল্লাহর শপথ দিচ্ছি! আল্লাহর রাসূল (স.) যাকে তাঁর কন্যার জীবনসঙ্গী হিসেবে নির্ধারণ করেছেন এবং বলেছেন, মহান আল্লাহ তাকে তোমার [আলী] জীবসঙ্গী হিসেবে নির্ধারণ করেছেন, সে কি আমি নাকি তুমি? আবু বকর বললেন : তুমি।

(৪) ফাতেমা হযরত আলী (আ.) এর রুকুন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম হতে বর্ণিত একটি হাদীসে উল্লিখিত হয়েছে যে, তিনি আলী (আ.) এর উদ্দেশ্যে বলেন :

 «سلام علیك یا ابا الریحانتین، فعن قلیل ذهب ركناك.»

অনুবাদ : হে দু’টি ফুলের পিতা তোমার উপর সালাম হোক, অতি শীঘ্রই তোমার দু’টি রুকুন (ভিত্তি) তোমার নিকট হতে চলে যাবে’।

(৫) মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম এর শাহাদাতের পর হযরত আলী (আ.) বলেন : ‘তিনি ছিলেন আমার জন্য দু’টি রুকুনের একটি’। তিনি হযরত যাহরা (সা. আ.) এর শাহাদাতের পর বলেন : ‘সে ছিল আমার দ্বিতীয় রুকুন’ আল্লাহর আনুগত্যে সহায়তাকারী নবী ও নিষ্পাপ ইমামগণ (আ.) মানবজাতির সৌভাগ্য ও সাফল্যতাকে শুধুমাত্র আল্লাহর আনুগত্যের মাঝে নিহীত বলে জানতেন, এ কারণেই তাদের সর্বোত্তম বন্ধু ও সহকর্মী ছিলেন তারাই যারা তাদেরকে এ পথে সহযোগিতা করতেন। হযরত আলীকে (আ.) মহানবী (স.) প্রশ্ন করলেন : ‘তোমার সহধর্মীকে কেমন পেয়েছো? তিনি উত্তরে বললেন : মহান আল্লাহর আনুগত্য করার ক্ষেত্রে সর্বোত্তম সহযোগী।

(৬) হযরত আলী (আ.), হযরত যাহরা (সা. আ.) এর বাক্যের শরণাপন্ন হয়েছেন আরবায়া মেয়াহ’ (চারশত) হাদীসে হযরত আলী (আ.) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন : মৃত ব্যক্তিদের [দাফনের জন্য] প্রস্তুত করার সময় উত্তম কথাবার্তা বল, তিনি বলেন : হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম এর ওফাতের পর বণি হাশিমের নারীরা হযরত ফাতেমা যাহরা (সা. আ.) কে সহযোগিতা করছিলেন, তখন তিনি তাদের উদ্দেশ্যে বলেন : এ অবস্থা ত্যাগ করে দোয়া ও প্রার্থনা কর’।

(৭) মুসলিম জাহানের শ্রেষ্ঠ নারী হযরত ফাতেমা যাহরা মৃত্যু পূর্বে ওসিয়ত ও কথাবার্তার সময় হযরত আলী (আ.) তাঁর উত্তরে বলেন : আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি, তুমি এ বিষয়ের চেয়ে অধিক জ্ঞানী, পরহেজগারিনী, সম্মানিতা ও সত্কর্মশীল। তোমার বিরহ ও তোমার শূন্যতা আমার জন্য অত্যন্ত কষ্টের, কিন্তু এ বিষয় হতে পলায়ন সম্ভব নয়। আল্লাহর কসম তুমি বিদায় নিয়ে মহানবী (স.) এর বিয়োগের ব্যাথা পূনরায় জাগিয়ে তুলেছো। নিঃসন্দেহে তোমার মুসিবত অত্যন্ত বৃহৎ যার সান্ত্বনা কোন ব্যক্তি কোন কিছুর মাধ্যমেই দিতে সক্ষম নয় এবং কোনকিছুই তার স্থান দখল করতে পারবে না। যদিও হযরত আলী (আ.) ছিলেন একজন মাসুম ইমাম এবং তার সকল কথাই ছিল হুজ্জাত [দলীল স্বরূপ এবং যার পালন অত্যাবশ্যক] তা সত্ত্বেও তিনি নিজের কথার সাথে হযরত ফাতেমা যাহরা (সা. আ.) এর বাণীর শরণাপন্ন হয়েছিলেন। আর এ বিষয়টি হযরত সিদ্দিকায়ে তাহেরা (সা. আ.) এর ইসমাত তথা নিষ্পাপত্ব এবং তার সকল কাজকর্ম ও বাণী যে হুজ্জাত তার প্রমাণ স্বরূপ, আর এ বিষয়ে নারী ও পুরুষের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। ফাতেমা (সা. আ.) এর ক্রোধে মহান আল্লাহ্ ক্রোধান্বিত হন হযরত আলী (আ.), মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহ হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন :

«انَّ اللهَ عَزَّوَجَلَّ لَیَغضِبُ لِغَضِبِ فاطِمَه وَ یَرضی لِرِضاها»

‘নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ ফাতেমা’র ক্রোধে ক্রোধান্বিত এবং তার সন্তুষ্টিতে সন্তুষ্ট হন’।

(৮) এটাই ছিল মহান আল্লাহর ইচ্ছা যে, হযরত যাহরা (সা. আ.) সকলের পূর্বে মহানবী (স.) এর সাথে মিলিত হবে। তার পরে আমার ধৈর্য ফুরিয়ে এসেছে এবং আমি ধৈর্য হারিয়ে ফেলেছি। কিন্তু আপনার মৃত্যুতে যেভাবে ধৈর্যধারণ করেছি, আপনার কন্যার মৃত্যুতেও ধৈর্যধারণ ছাড়া কোন উপায় নেই, ধৈর্যধারণ আমার জন্য খুবই কষ্টকর। তাঁর পরে আসমান ও যমীন আমার নিকট অত্যন্ত ঘৃনিত ও নোংরা হয়ে গেছে এবং আমার অন্তর হতে দুঃখ কখনই দূর হয় না। আমার চোখ নিদ্রাহীন এবং দুঃখের আগুনে আমার অন্তর দগ্ধ হয়েছে, [এ আশা রাখি যে,] মহান আল্লাহ (অতিশীঘ্রই) আমাকে আপনার নিকট অবস্থান দান করবেন। যাহরা’র মৃত্যু আমার জন্য এমনটি আঘাত স্বরূপ যা আমার অন্তরকে ক্লান্ত করেছে এবং আমার ব্যাথাকে দীর্ঘায়িত করেছে... তিনি অন্যত্র হযরত ফাতেমা (সা. আ.) এর উদ্দেশ্যে বলেন :

 « انَّ اللهَ لَیَغضِبُ لِغَضَبِكِ وَ یَرضی لِرِضاكِ»

‘মহান আল্লাহ্, তোমার ক্রোধে ক্রোধান্বিত এবং তোমার সন্তুষ্টিতে সন্তুষ্ট’।

(৯) নিজের চাওয়ার উপর ফাতেমা’র চাওয়াকে প্রাধান্য প্রদান হযরত যাহরা (সা. আ.) যখন ইমাম (আ.) কে ওসিয়ত করছিলেন, তখন উভয়েই ক্রন্দন করলেন। অতঃপর ইমাম (আ.) তাঁর মাথাকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে বললেন : ‘যা কিছু ওসিয়ত করতে চাও করো, নিশ্চয়ই তোমার প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি পূরণ করবো, যা কিছু নির্দেশ দেবে তা পূরণ করবো এবং তোমার নির্দেশকে নিজের মতামতের উপর প্রাধান্য দেব’।

তথ্য সূত্র

(মূল : নাহজুল বালাগাহ গবেষণা বিষয়ক পত্রিকা হতে গৃহীত)

(১) বিহারুল আনওয়ার, ৪১তম খণ্ড, পৃ. ১৫১ ও ২২৪।

(২) নাহজুল বালাগাহ।

(৩) তাবারসী, আল ইহতিজাজ (বৈরুতে প্রকাশিত, প্রকাশক : মুয়াসসাসাতুল আ’লামী লিলমাতবুয়াত, দ্বিতীয় সংস্করণ, প্রকাশকাল ১৯৮৩), ১ম খণ্ড, পৃ. ১৩৫।

(৪) প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১২৩।

(৫) আল্লামা হাফেজ মুহিদ্দীন তাবারী, যাখায়েরুল উকবা ফি মানাকিবি যাভিল কুরবা (দারুল মা’রেফাহ কর্তৃক বৈরুতে প্রকাশিত), পৃষ্ঠা ৫৬।

(৬) বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ৪৫, পৃষ্ঠা ১১৭।

(৭) জাওয়াদী আমোলী, যান দার আয়িনেয়ে জালাল ও জামাল, পৃষ্ঠা ৪২।

(৮) কানযুল উম্মাল (মোয়াসসাসাতুর রেসালাহ বৈরুত কর্তৃক প্রকাশিত), ১২তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১১।

(৯) প্রাগুক্ত।

(১০) প্রাগুক্ত।

(১১) প্রাগুক্ত।