‘নবীগণদের কোন মৌরুসী সম্পত্তি থাকে না’ হাদিসটি কতটা যুক্তিযুক্ত?

শোনা যায় যে, আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া লিহি ওয়া সাল্লাম কোন মৌরুসী সম্পত্তি রেখে যান নি। মূলতঃ এ কথাটি প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর সর্ব প্রথম বর্ণনা করেছিলেন; যেটি নবীর স. কাছ থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেছেন :

 «إنّا معاشر الانبياء لانورث ما ترکت ... صدقة (احمد بن حنبل، 2/463)»

আমরা নবীগণ কোন মৌরুসী সম্পত্তি রেখে যাই না। আমরা যা রেখে যাই … তা সদকা হিসেবে পরিগণিত হবে (আহমাদ ইবনে হাম্বল, ২/৪৬৩)। কিন্তু আহলে বাইতের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ সমূহে হাদীসের এ অংশটি বর্ণনা করার পর বর্ণিত হয়েছে যে, সর্ব প্রথম ফাতেমা সালামুল্লাহি আলাইহার সত্যনিষ্ঠ দাবী প্রত্যাক্ষাণ করার জন্য আবু বকর তা বর্ণনা করেছিল যা কোরআন ও নবীদের সুন্নতের পরিপন্থি (কুলেইনি, ৩/৮০৯)। হযরত ফাতেমা যাহরা সা. তার যুক্তি এভাবে উপস্তাপন করেছিলেন: আল্লাহ তা’য়ালা কোরআনে বলেছেন :

قَالَ رَبِّ إِنِّي وَهَنَ الْعَظْمُ مِنِّي وَاشْتَعَلَ الرَّأْسُ شَيْبًا وَلَمْ أَكُنْ بِدُعَائِكَ رَبِّ شَقِيًّا * وَإِنِّي خِفْتُ الْمَوَالِيَ مِنْ وَرَائِي وَكَانَتِ امْرَأَتِي عَاقِرًا فَهَبْ لِي مِنْ لَدُنْكَ وَلِيًّا * يَرِثُنِي وَيَرِثُ مِنْ آلِ يَعْقُوبَ وَاجْعَلْهُ رَبِّ رَضِيًّا *

জাকারিয়া আ. বলল : হে আমার পালনকর্তা আমার অস্থি বয়স-ভারাবনত হয়েছে; বার্ধক্যে মস্তক সুশুভ্র হয়েছে (চুল পেকে গেছে); ওহে পরওয়ারদেগার! আপনাকে ডেকে আমিতো কখনও বিফল-মনোরথ হইনি। * আমি ভয় করি আমার পরবর্তি স্বগোত্রকে কারণ ‌ আমার স্ত্রী বন্ধ্যা; কাজেই আপনার পক্ষ থেকে আমাকে একজন (উত্তরসূরী) কর্তব্য পালনকারী (সন্তান) দান করুন। * সে স্থলাভিষিক্ত হবে আমার ও ইয়াকুব বংশের। আর হে আমার পালনকর্তা, তাকে এমন করুন যাতে আপনা সন্তোষভাজন হয় (মারিয়াম/৪-৬)।

আল্লাহ তা’য়ালা আরো বলেন :

 وَوَرِثَ سُلَيْمَانُ دَاوُدَ وَقَالَ يَا أَيُّهَا النَّاسُ عُلِّمْنَا مَنْطِقَ الطَّيْرِ وَأُوتِينَا مِنْ كُلِّ شَيْءٍ إِنَّ هَذَا لَهُوَ الْفَضْلُ الْمُبِينُ

সুলায়মান দাউদের উত্তরাধিকারী হয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘হে লোক সকল, আমাকে উড়ন্ত পক্ষীকূলের ভাষা শিক্ষা দেয়া হয়েছে এবং আমাকে সব কিছু দেয়া হয়েছে। নিশ্চয় এটা সুস্পষ্ট শ্রেষ্ঠত্ব।’ (নামল/১৬)

উপরোক্ত আয়াত সমূহ থেকে প্রমাণিত হয় যে, হযরত জাকারিয়া ও দাউদ আ. উত্তরসূরী রেখে গিয়েছিলেন। অন্যদিকে কোরআনের সূরা আহযাবের ৩৩ নং আয়াত থেকে প্রমাণিত হয় যে, ফাতেমা যাহরা সা. সহ অন্যান্য আহলে বাইতের সদস্যরা কখনো মিথ্যা কথা বলতে পারে না এবং তাঁরা কোরআন ও নবীর সুন্নত পরিপন্থি কোন কথা বলতে পারেন না। বরং কোরআনে আরো বলা হয়েছে যে,

إِنَّ الَّذِينَ يُؤْذُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ لَعَنَهُمُ اللَّهُ فِي الدُّنْيَا وَالآخِرَةِ وَأَعَدَّ لَهُمْ عَذَابًا مُهِينًا
যারা আল্লাহ্‌ ও তাঁর রসূলকে কষ্ট দেয়, আল্লাহ্‌ তাদের প্রতি ইহকালে ও পরকালেকে অভিসপ্ত করেন এবং তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন অবমাননাকর শাস্তি (আহযাব/৫৭)। আহলে সুন্নতের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ সমূহে বর্ণিত হয়েছে : ফাতেমা আমার দেহের অংশ, যে তাকে কষ্ট দিল সে আমাকে কষ্ট দিল। অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে যে, ফাতেমা বেহেশ্তের মহিলাদের সর্দারনী। এসব যুক্তি ও হাদিসের সাথে যদি আলোচিত হাদিসটির পর্যালোচনা করি, তবে কোনটি সত্য বলে প্রমাণিত হবে? বেহেশ্তের সর্দারনী কি মিথ্যা দাবী করতে পারেন? যদি তিনি মিথ্যা দাবী করেন, তবে কিভাবে তিনি বেহেশ্তের সর্দারনী হবেন? নিশ্চয়েই তা সম্ভব নয়। অতএব বলা যায় ফাতেমা মিথ্যা বলেন নি, বরং তার দাবী মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে এহেন হাদীসটি বর্ণনা করা হয়েছে। মূলতঃ কোরআন ও সহিস হাদিসের দৃষ্টিভঙ্গি ও আহলে বাইতের অনুসারী আলেমদের ঐক্যমতের ভিত্তিতে প্রমাণিত হয় যে, এ হাদিসটি জাল এবং নবীর স. আহলে বাইতকে অর্থনৈতিকভাবে দূর্বল করার লক্ষ্যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।

তথ্যসূত্র 1- কোরআন মজিদ 2- নাহজুল বালাগা 3- আসকালানি, ইবনে হাজার (মৃ: ৮৫২ হি.), ফাতহুল বারি শারহি সাহিহিল বুখারি, বৈরুত-লেবানন, দ্বিতীয় প্রকাশ। 4- আহমাদ ইবনে হাম্বল (মৃ: ২৪১), মুসনাদে আহমাদ, বৈরুত, দারু সাদের প্রকাশনা। 5- কুলেইনি, মোহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব (মৃ: ৩২৯ হি), আল কফি, ফারসী অনুবাদ: মোহাম্মদ বাকের কামরেয়ি, কোম, ১৩৭৫ ফা. তৃতীয় প্রকাশ।